কিডনি রোগ প্রতিরোধযোগ্য

চলতি বছরের বিশ্ব কিডনি দিবসের স্লোগান হলো—‘প্রটেক্ট ইউর কিডনিস, সেভ ইউর হার্ট’ অর্থাত্ ‘আপনার কিডনি সুস্থ্য রাখুন ও হার্ট রক্ষা করুন’।
পৃথিবীতে কিডনি রোগ ব্যাপক বিস্তার লাভ করছে। উন্নয়নশীল বিশ্বে এর বিস্তার আরও বেশি। যুক্তরাষ্ট্রসহ উন্নত বিশ্বে এর হার শতকরা ১১ ভাগ অর্থাত্ প্রতি ৯ জনের ১ জনই কিডনি রোগী। অস্ট্রেলিয়ায় এ হার শতকরা ১৫ ভাগ। উন্নয়নশীল বিশ্বে এ হার যে আরও বেশি হতে পারে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। বাংলাদেশের অবস্থা ভয়াবহ
বিগত ৫ বছর থেকে কিডনি ফাউন্ডেশন ও বিএসএমএমইউ’র তত্ত্বাবধানে মিরপুরের বস্তিবাসীসহ ঢাকা শহরের কিছু এলাকা, সাভারের প্রত্যন্ত গ্রাম ও পাবনার বনগ্রামে কিডনি রোগ শনাক্তকরণের কাজ চলছে। মিরপুরের বস্তিবাসীদের মধ্য থেকে ১ হাজার পুরুষ ও মহিলার ওপর সমীক্ষা হয় ২০০৫ সালে। এতে দেখা যায়, শতকরা ১৬ ভাগ রোগী কিডনি রোগে ভুগছে। বিএসএমএমইউ’র চিকিত্সক, নার্স, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরদের মধ্যে সমীক্ষা করে পাওয়া গেছে শতকরা ১২ ভাগ কিডনি রোগী। আর সাভারের গ্রামাঞ্চলে পাওয়া যায় শতকরা ১৭ ভাগ। এসব সমীক্ষা থেকে প্রতীয়মান হয়, কিডনি রোগে বাংলাদেশে অবস্থান ভয়াবহ এবং এটা প্রতিরোধ করা জরুরি।

প্রধান প্রধান কিডনি রোগ
প্রায় ১ হাজার কিডনি অকেজো রোগীর ওপর সমীক্ষা করে দেখা গেছে, তাদের ৪৬ ভাগ নেফ্রাইটিস, ৩৮ ভাগ ডায়াবেটিস ও ১১ ভাগ উচ্চ রক্তচাপের কারণে কিডনি বিকল হয়েছে। সুতরাং আমাদের উপরোক্ত তিনটি কারণ শনাক্ত করে সঠিক সময় সঠিকভাবে চিকিত্সা দেয়া জরুরি।

নেফ্রাইটিস বা প্রস্রাবের প্রদাহ
নেফ্রাইটিস কিডনির একটি প্রধান রোগ। যে কোনো বয়সে এ রোগ হতে পারে। শিশুদের ক্ষেত্রে ৯০ ভাগ নিরাময় যোগ্য, জটিলতা বাধে বড়দের ক্ষেত্রে। সাধারণত দু’ধরনের নেফ্রাইটিস হতে পারে। সংক্রামক এবং অসংক্রামক। শতকরা ২০ ভাগ সংক্রামক কারণে এবং ৮০ ভাগই অসংক্রামক কারণে, যার কারণ এখনও সম্পূর্ণ অজানা। সংক্রামক কারণগুলো প্রতিরোধ বা প্রতিকার করা যায়। কিন্তু অসংক্রামক রোগের চিকিত্সা বেশ জটিল।

কিডনি রোগের উপসর্গগুলো
সাধারণত এ রোগে শরীর ফুলে যায়, রক্তচাপ বৃদ্ধি পায় এবং প্রস্রাবে আমিষ নির্গত হয়। এমনকি প্রস্রাবে লোহিত কণিকা, কাষ্ট বা শ্বেত কণিকায় যেতে পারে। রক্তে ক্রিয়েটিনিন নামক যৌগিক পদার্থ বেড়ে যাতে পারে। রক্তে চর্বির পরিমাণ বৃদ্ধি পায়। শুধু কিডনি বায়োপসির মাধ্যমে এ ধরনের রোগকে শনাক্ত করা যায়। কিডনি বায়োপসি হচ্ছে, কিডনি থেকে টিসু সুচের মাধ্যমে বের করে তা অনুবিক্ষণ যন্ত্রে পরীক্ষা করা। প্রাথমিক পর্যায়ে চিকিত্সার মাধ্যমে শতকরা ৩০ ভাগ ক্ষেত্রে রোগ নিরাময় করা যায়। শতকরা ৬০ ভাগ রোগী চিকিত্সা সত্ত্বেও ১০ থেকে ১৫ বছরের ভেতর কিডনির কার্যকারিতা লোপ পায় এবং কিডনি সম্পূর্ণ অকেজো হয়।

উচ্চ রক্তচাপ থেকে কিডনি রোগ
বেশিরভাগ সাধারণ মানুষের ধারণা, উচ্চ রক্তচাপে উপসর্গ না হওয়া পর্যন্ত চিকিত্সার দরকার নেই। অনেকের ধারণা, সামান্য উচ্চ রক্তচাপে ওষুধ না খাওয়াই ভালো। আবার কারও কারও ধারণা, ওষুধ সেবন করে যখন রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের ভেতর যাবে তখন ওষুধ না খেলেই ভালো। আবার অনেকে মনে করে সারা জীবন একই ওষুধ খেলে শরীরে অনেক ক্ষতি হতে পারে। আসলে এ সবই ভুল চিন্তা, যা থেকেই রক্তচাপ সুপ্ত অবস্থায় থেকে যায়। এর ফলাফল হিসেবে পরবর্তীকালে কিডনি অকেজো হতে সাহায্য করে। আর এভাবেই কিডনি যখন অকেজো হয়ে যায় তখন রোগী বুঝতে পারে তার কিডনির কার্যকারিতা আর নেই। তখন চিকিত্সকের করার কিছুই থাকে না। আসলে রক্তচাপ এমন একটি রোগ, যার শতকরা ৮০ ভাগের কোনো উপসর্গই হয় না। শুধু রুটিন রক্তচাপ পরীক্ষা করেই তা বোঝা যায়। সুতরাং যার বয়স ৩০-এর ঊর্ধ্বে বংশে উচ্চ রক্তচাপ রয়েছে বা কিডনি রোগ রয়েছে তাকে অবশ্যই অবশ্যই বছরে ১-২ বার রক্তচাপ পরীক্ষা

করাতে হবে।
ওপরের রক্তচাপকে বলে সিস্টোলিক এবং নিচের রক্তচাপকে বলে ডায়াস্টোলিক। যখন রক্তচাপের পূর্বাভাস লক্ষ্য করা যায়, তখন থেকে চিকিত্সা শুরু করা প্রয়োজন এবং জীবনযাত্রা পরিবর্তন করে, লবণ পরিহার করে, প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট হেঁটে বা ব্যায়াম করলে, ওজন বেশি থাকলে তা কমিয়ে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করা যায়। কিন্তু স্টেজ-১ হলে তা ওষুধের দ্বারা নিয়ন্ত্রণ করতে হয়।
কিডনি রোগ প্রাথমিক পর্যায়ে মারাত্মক নয়। শুরুতে শনাক্ত করা গেলে বেশিরভাগ রোগীকেই প্রতিরোধ করা সম্ভব। এজন্য কারও কিডনি রোগ হোক বা না হোক, তার প্রস্রাব ও রক্তের কিছু পরীক্ষার মাধ্যমে জানা সম্ভব কিডনি রোগ হয়েছে কিনা। তবে কিডনি রোগ হওয়ার আগে সচেতন হওয়া প্রতিটি মানুষের জন্যই জরুরি।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: