ফতোওয়া প্রাথমিক ধারণা

এক.
ফতোওয়া বা ইফতা আরবি শব্দ। এর আভিধানিক অর্থ হলো, ‘যে কোনো প্রশ্নের উত্তর দেয়া।’
শরিয়তের পরিভাষায় এর অর্থ হলো, ‘দালায়েলে শরাইয়্যাহর (শরিয়তের সুস্পষ্ট প্রমাণের) ভিত্তিতে কোনো প্রশ্নের বা জিজ্ঞাসার জবাব দেয়া। শরিয়তের সর্বসম্মত দলিল ও প্রমাণ চারটি : যথা—
১. কোরআন, ২. সুন্নাহ ৩. ইজমা ৪. কিয়াস
ক. কোরআন : মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নবুওয়ত লাভের পর মৃত্যু পর্যন্ত সুদীর্ঘ তেইশ বছরে প্রয়োজন ও চাহিদা অনুযায়ী পবিত্র কোরআন মাজিদ অবতীর্ণ হয়েছে। এতে সর্বমোট ৬৬৬৬টি আয়াত রয়েছে। এর মধ্যে পাঁচ শতাধিক আয়াত হলো শুধু আইনকানুন সম্পর্কীয়। অবশিষ্টগুলো হলো ওয়াজ-নসিহত ও ইতিহাস। তবে এই ওয়াজ-নসিহত ও ইতিহাসের মধ্য থেকেও কিছু আইনকানুন বের হয়েছে। এগুলোই ফিকহের মূল উত্স।
খ. সুন্নাহ : রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনুসরণ ও অনুকরণ করার জন্য মহান আল্লাহ নির্দেশ প্রদান করেছেন। সে কারণেই সাহাবিরা সর্বদা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পদাঙ্ক অনুসরণ করতেন, যা করতে দেখতেন তাই করতেন এবং কখনও তারা কোনো সমস্যায় পড়লে তা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এসে জেনে নিতেন। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অসংখ্য সুন্নাহ হতে প্রায় এক হাজার হাদিস ইসলামী ফিকহের মূল উত্স হিসেবে স্বীকৃত হয়েছে।
গ. ইজমা : ইজমা হলো উম্মতে মুহাম্মদীর সর্বসম্মত অভিমত। কোরআন ও হাদিসে নব উদ্ভাবিত কোনো সমস্যার সুস্পষ্ট সমাধান না পাওয়া গেলে তখন এ উম্মতের মুজতাহিদরা কোরআন ও সুন্নাহর আলোকে এর গবেষণা চালাতেন। এরপর কোনো নির্দিষ্ট সমাধান বের হলে যদি তাতে সবাই ঐকমত্য পোষণ করতেন, তবে তাকে ইজমা বলত। এটি ফিকহে ইসলামীর একটি মূল উত্স। যেমন—হজরত আবু বকরকে (রাজি.) খলীফা নিযুক্ত করার ব্যাপারে কোন সুস্পষ্ট নির্দেশনা না থাকার ফলে সবাই সাহাবিদের সর্বসম্মত অভিমত দ্বারা তার খিলাফতের বৈধতা প্রমাণিত হয়েছে।
ঘ. কিয়াস : কোরআন, সুন্নাহ ও ইজমা দ্বারা মীমাংসিত কোনো বিষয়ের সঙ্গে অনুরূপ কোনো বিষয়কে উপমা দ্বারা সাদৃশ্য বিধান করে হুকুম উদ্ভাবন করাকে কিয়াস বলে। এটা হাদিস দ্বারা সাবেত আছে। যেমন—দশম হিজরিতে হজরত মুআজকে (রাজি.) ইয়েমেনের বিচারক নিযুক্ত করে পাঠানোর সময় রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোরআন ও সুন্নায় কোনো সমাধান না পাওয়া গেলে কীভাবে সমাধান করবে বলে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, জবাবে হজরত মুআজ (রাজি.) বললেন, আমি ইজতিহাদ করে তার ফয়সালা করব। এ জবাবে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অত্যন্ত খুশি হয়েছিলেন। এতে বোঝা যায়, কিয়াসও ইসলামী ফিকহের মূল উেসর অন্যতম।
এই দালায়েলে শরইয়্যাহর অভিজ্ঞ ব্যক্তিই ফতওয়া দিতে পারেন। অভিজ্ঞ ব্যক্তির ফতওয়া দেয়ার অধিকার কোরআন হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। সুতরাং ফতওয়ার এই অধিকার রহিত করার ক্ষমতা কারও নেই।
দুই.
কোরআন-সুন্নাহ এবং ইজমায়ে উম্মতের অকাট্য প্রমাণ দ্বারা শরীয়তের যেসব বিষয় প্রমাণিত আছে, যেমন—তাওহিদ, রেসালাত, আখিরাত, নামাজ, রোজা, হজ, জাকাত, হালাল, হারাম ইত্যাদি। এসব বিষয় কেউ অস্বীকার করলে সে কাফির হয়ে যাবে। আর কিয়াসের দ্বারা প্রমাণিত বিষয় অস্বীকার করলে কাফির না হলেও এটি গোমরাহির অন্তর্ভুক্ত।
তিন.
ফতওয়ার প্রথম উত্স কোরআন। কোরআনের সব আহকাম ও মাসায়েল আল্লাহর পক্ষ থেকে ফতওয়া। এজন্য প্রথম ফতওয়াদানকারী হলেন স্বয়ং আল্লাহ রাব্বুল আলামিন। কোরআনের দুটি আয়াতে আল্লাহতায়ালা ফতওয়া দেন বলে সুস্পষ্ট ঘোষণা রয়েছে—
‘(হে নবী) তারা আপনার কাছে নারীদের ব্যাপারে ফতওয়া (সিদ্ধান্ত) জানতে চায়, আপনি (তাদের) বলে দিন, আল্লাহ তায়ালা তাদের ব্যাপারে ফতওয়া (সিদ্ধান্ত) ঘোষণা করেছেন।’ [সূরা নিসা : আয়াত-১২৭]
আরো এরশাদ হয়েছে—
‘(হে নবী) তারা আপনার কাছে (বিভিন্ন বিষয়ে) ফতওয়া জানতে চায়, আপনি বলুন, আল্লাহতায়ালা সে ব্যক্তির উত্তরাধিকার সংক্রান্ত ব্যাপারে তোমাদের তাঁর ফতওয়া (সিদ্ধান্ত) জানাচ্ছেন।’ [সূরা নিসা : আয়াত-১৭৬]
যার অর্থ হলো, কোরআনের সব আহকাম আল্লাহর ফতওয়া।
হাদিসে বর্ণিত সব মাসায়েল, আইন, আহকাম হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পক্ষ থেকে ফতওয়া। এজন্য তিনি হলেন, উম্মতের প্রধান ও প্রথম মুফতি। আল্লামা কারাফী বলেন : ‘তিনিই উম্মতের মুফতিয়ে আজম।’
চার.
এই দুই প্রধান উেসর ভিত্তিতেই পরবর্তীকালে ইজমা এবং কিয়াসের সৃষ্টি। এ দুটোর ভিত্তিতেও যে ফতওয়া দেয়া হয়, তাও শরয়ী ও অহিভিত্তিক ফতওয়া।
এখানে একথা মনে রাখা দরকার, অহি-ই হলো শরীয়তের মূল উত্স ও ভিত্তি।
অহি প্রথমত দুই প্রকার : যথা—১. অহিয়ে সরীহ বা স্পষ্ট অহি। ২. অহিয়ে গাইরে সরীহ বা অস্পষ্ট অহি।
অহিয়ে সরীহ দুই প্রকার। যথা—১. অহিয়ে মাতলু যা নামাজ ও নামাজের বাইরে তিলাওয়াত করা হয়। ২. অহিয়ে গাইরে মাতলু যা নামাজে তিলাওয়াত করা হয় না।
অহিয়ে মাতলু হলো কোরআন। আর অহিয়ে গাইরে মাতলু হলো হাদিস।
অহিয়ে গাইরে সরীহ যাকে অহিয়ে খফিও বলা হয়। তিন প্রকার। যথা—১. ইজতিহাদে নবী ২. ইজমায়ে উম্মত ৩. ইজতিহাদে মুজতাহিদীন এবং ফুকাহা।
কাজেই শরীয়তে ফতওয়ার মূল উত্সই হলো, অহি। আর অহির ওপর প্রচলিত আদালতের নিয়ন্ত্রণের কোনো অধিকার নেই।
পাঁচ.
ফতওয়া এবং কাজার (বিচার ব্যবস্থা) ভেতর পার্থক্য আছে। ফতওয়া হলো জিজ্ঞাসার ভিত্তিতে বা জিজ্ঞাসা ছাড়াও ইসলামের প্রয়োজনীয় বিষয় জনসাধারণকে অবহিত করা। এটি প্রত্যেক আলেম ও মুফতির জন্য ফরজ।
হাদিসে বলা হয়েছে—‘জিজ্ঞাসা করার পরও যারা জবাব না দেবে, কিয়ামতের দিন তাদের মুখে আগুনের বেড়ি পরিয়ে দেয়া হবে।’ কাজেই ফতওয়া বন্ধের অধিকার কোনো সরকারের নেই।
কাজার অর্থ হলো, ইসলামী আইন বাস্তবায়ন করা। এর সম্পর্ক হলো, ইসলামী আদালত ও হুকুমতের সঙ্গে। যেমন—হুদুদ, কিসাস, দিয়্যাত ইত্যাদি।
এ জাতীয় আইন বাস্তবায়নে প্রয়োজন ইসলামী সরকার। এ জাতীয় আইন সমাজের কোনো কোনো ক্ষেত্রে ইসলামী আইন সম্পর্কে অজ্ঞ লোকদের দ্বারা বাস্তবায়নের অপচেষ্টার কোনো যৌক্তিকতা নেই; বরং এটি ফতওয়াকে বন্ধ করার একটি গভীর ষড়যন্ত্র।

2 Responses to “ফতোওয়া প্রাথমিক ধারণা”

  1. Mominul Islam Says:

    আপনার এ সাইটে এস খুব ভালো লাগলো।। চেষ্টা করবো আবার আসতে।
    মোমিন
    বগুড়া
    +৮৮০১৭১১১১২৬৯৪
    http://momin1.wordpress.com


Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: