স্বাস্থ্যখাতে থ্রিজি টেকনোলজি

 

ডা. ফেরদৌস আরা একজন অল্প বয়সী সফল গাইনি সার্জন। বর্তমানে সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে একটি বেসরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে কর্মরত আছেন। সকাল ৮টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত মেডিকেল কলেজ ছাত্রছাত্রীদের ক্লাস, হাসপাতালের রোগী, অপারেশন ও বিকালে প্রাইভেট চেম্বার—সর্বোপরি সংসারের ব্যক্তিগত কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকতে হয়। প্রতিদিন সকালে বাসা থেকে অফিসে যাওয়ার পথে নিজের গাড়িতে বসেই অথবা অবসর সময়ে নিজস্ব ল্যাপটপ ও ইন্টারনেটের মাধ্যমে আধুনিক চিকিত্সা বিজ্ঞান সম্পর্কে প্রয়োজনীয় জ্ঞান অর্জন করে থাকেন। অল্প বয়সী এ সার্জন শহরে বসবাসরত খুব অল্পসংখ্যক রোগীকে চিকিত্সাসেবা প্রদান করতে পারেন। অনেক চিকিত্সক ছুটির দিনে ঢাকার বাইরে গিয়ে চিকিত্সাসেবা প্রদান করলে ডা. হোসনে আরার পক্ষে তা সম্ভবপর হয়ে ওঠে না। কারণ তার সময়ের স্বল্পতা ও শহর থেকে দূরে বলে।
ডা. ফেরদৌস আরার অল্প বয়সে যথেষ্ট খ্যাতি ও অর্থ উপার্জনের সক্ষমতা থাকলেও একটি চাপা কষ্ট তাকে বারবার পীড়া দেয়। কবে আসবে সেদিন, যেদিন আধুনিক ডিজিটাল চিকিত্সা ব্যবস্থার মাধ্যমে গ্রামে ফেলে আসা চাচি, মামী, বোন, মা’দের এবং গ্রামের সেই কৃষক ভাইদের—যাদের মাথার ঘাম পায়ে ফেলা পরিশ্রমের অর্থেই হোসনে আরার মতো হাজারও গাইনি, মেডিসিন, আই, নেফ্রোলজি ও রেডিওলজিসহ বিশেষজ্ঞ ডাক্তার এ দেশে তৈরি হয়েছে।
স্বাস্থ্যখাতে থ্রিজি বা থার্ড জেনারেশন টেকনোলজি চিকিত্সক ফেরদৌস আরার এই স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে পারে। তৃতীয় বিশ্বের দারিদ্র্য উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের মতো একটি দেশে সরকারের একার পক্ষে গ্রামে বসবাররত দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মাঝে উন্নত চিকিত্সাব্যবস্থা এই স্বল্পসংখ্যক চিকিত্সকের মাধ্যমে পৌঁছানো সম্ভব নয়। এজন্য সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি হাসপাতালগুলোয়ও ডিজিটাল সিস্টেমের মাধ্যমে এদেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে আধুনিক চিকিত্সাসেবা পৌঁছে দেয়া।
গত ১০ বছরে আমাদের এই নদীমাতৃক দেশে রাস্তা-ঘাট, ট্রেন ও প্লেন যোগাযোগ ব্যবস্থা যতটা উন্নত হয়নি, তার চেয়ে বেশি উন্নয়ন হয়েছে টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা। এই টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা কাজে লাগিয়ে ৩-এ টেকনোলজির মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ও শিক্ষাখাতকে ডিজিটাল করা যেতে পারে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এমনকি ভারত ও নেপালে থ্রিডি টেকনোলজির মাধ্যমে স্বাস্থ্যখাতকে ডিজিটাল করার পরিকল্পনা চলছে। যেহেতু বর্তমানে বিভিন্ন হাসপাতাল মেশিনারি যেমন এক্স-রে, সিটি স্ক্যান, এমআরআই, আলট্রাসনোগ্রামসহ অনেক ল্যাবরেটরির মেশিন কম্পিউটার দ্বারা পরিচালিত হয় এবং ডাটা সরাসরি সার্ভারে সংরক্ষণ করা যায় সেহেতু বর্তমান সরকারি ও প্রাইভেট হাসপাতালগুলো যদি এখনই আধুনিক ডিজিটাল সিস্টেমের আওতায় না আনা হয় তবে অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাত হুমকির সম্মুখীন হবে এবং আধুনিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা থেকে পিছিয়ে পড়বে। তাই এখনই স্বাস্থ্যখাতে সঠিক ভবিষ্যত্ পরিকল্পনা করতে হবে।
কী এই থ্রিজি টেকনোলজি
থ্রিজি টেকনোলজি এমন একটি ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে ছবি ও কথা একই সঙ্গে মোবাইল যোগাযোগ ব্যবস্থার মাধ্যমে অত্যন্ত অল্প খরচে অন্য জায়গায় পাঠানো সম্ভব। থ্রিজি টেকনোলজি ব্যবহারের জন্য একটি থিজি পড়সঢ়ধঃরনষব গড়নরষব ও Laptop প্রয়োজন হতে পারে। এই টেকনোলজি ব্যবহার করে সিটি স্ক্যান, আইআরআই, আলট্রাসনোগ্রামসহ বিভিন্ন ল্যাবরেটরি টেস্ট রিপোর্ট চিকিত্সকরা সরাসরি কোনো মেশিন থেকে কম্পিউটার সার্ভারের মাধ্যমে নিজস্ব ল্যাপটপে সংরক্ষণের মাধ্যমে দূরের কোনো রোগীকে চিকিত্সা প্রদান করতে পারবেন। এই টেকনোলজি ব্যবহার করে টেলিমেডিসিন ও কম্পিউটারাইজড হাসপাতাল ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমকে আরও গতিশীল করা যেতে পারে, যা ভবিষ্যত্ স্বাস্থ্যখাতকে করতে পারে অধিকতর উন্নত।

ডিজিটাল হেলথ সিস্টেমের অসুবিধাগুলো
বাংলাদেশের ডিজিটাল স্বাস্থ্যব্যবস্থা একটি নতুন ক্ষেত্র। এই ক্ষেত্রে কাজ করতে গেলে নিম্নলিখিত অসুবিধা দেখা যায়—

১. ডিজিটাল স্বাস্থ্য সিস্টেমকে উন্নয়ন, কার্যকর প্রয়োজনীয় কম্পিউটার বিশেষজ্ঞের অভাব। ব্যাংক ও টেলিযোগাযোগ খাতে কম্পিউটার বিশেষজ্ঞদের যথেষ্ট মূল্যায়ন করা হলেও স্বাস্থ্যখাতে কম্পিউটার বিশেষজ্ঞদের তেমন মূল্যায়ন করা হয় না। তাই মেধাবী কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়াররা এই ব্যবস্থায় আসতে চায় না।
২. অধিকাংশ হাসপাতালগুলোয় ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ডাক্তার হওয়ায় হাসপাতাল কম্পিউটারাইজড সিস্টেমের ওপর অভিজ্ঞতা না থাকায় ওই সিস্টেমটি হাসপাতালে কার্যকর করতে চায় না। তবে অনেক তরুণ ডাক্তার স্বাস্থ্যখাতে ডিজিটাল সিস্টেম করা সময়ের দাবি বলে মনে করেন।
৩. সরকারের পাশাপাশি প্রাইভেট হাসপাতালগুলোকে এই সিস্টেম চালু করার জন্য যথেষ্ট আন্তরিক হতে হবে। প্রতিটি সরকারি হাসপাতালে প্রাথমিকভাবে একটি করে কম্পিউটার ইউনিট করা যেতে পারে।
৪. সাধারণত রোগীরা সরাসরি ডাক্তারের কাছ থেকে ব্যবস্থাপত্র গ্রহণে অভ্যস্ত। ডিজিটাল সিস্টেমের মাধ্যমে রোগীদের চিকিত্সা গ্রহণের সচেতনতা বৃদ্ধির ব্যবস্থা করতে হবে।
৫. কম্পিউটারাইজড হাসপাতাল সিস্টেমের ওপর বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি কোর্স চালু করা যেতে পারে।
৬. মেডিকেলে শেষ বর্ষে ইন্টার্নি করার সময় অন্যান্য ট্রেনিংয়ের পাশাপাশি কম্পিউটারের ওপর বিশেষ ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
৭. কোনো একটি সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতাল তৈরির আগে এখাতে প্রয়োজনীয় পরিমাণ অর্থবরাদ্দ থাকতে হবে এবং আর্কিটেকচারাল ডিজাইনে কম্পিউটার নেটওয়ার্কের ব্যবস্থা রাখতে হবে।
৮. প্রতিটি সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালগুলোয় কম্পিউটারাইজড হাসপাতাল ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম চালু করার পর ওই সিস্টেমগুলোকে একটি কেন্দ্রীয় নেটওয়ার্কের আওতায় আনা যেতে পারে।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: