যুবক মুহাম্মদ সাঃ

যুবক মুহাম্মদ সাঃ যখন যৌবনে পদার্পণ করেন, তখন আরবের পরিবেশের চরম নোংরা অবস্থা থাকলেও নিজের যৌবনকে রেখেছেন নিষ্কলঙ্ক। যে সমাজে ব্যভিচার যুবকদের জন্য গর্বের ব্যাপার ছিল, সেই সমাজে এই অসাধারণ যুবক নিজের দৃষ্টিকে পর্যন্ত কুলষিত করেননি। যে সমাজে প্রত্যেক অলিগলিতে মদ তৈরির কারখানা এবং ঘরে ঘরে পানশালার পর নারীর প্রতি প্রেম নিবেদন ও মজলিসে কবিতা পাঠের জমজমাট আসর বসত, সেই সমাজে এই নবীন যুবক এক ফোঁটা মদও মুখে নেননি। যেখানে জুয়া জাতীয় অনুষ্ঠানের রূপ পরিগ্রহ করেছিল, সেখানে আপাদমস্তক পবিত্রতায় মণ্ডিত এই যুবক জুয়ার স্পর্শ পর্যন্ত করেননি। যে সমাজে দেব মূর্তির সামনে সিজদা করা ধর্মীয় প্রথা হয়ে দাঁড়িয়েছিল, সেখানে সে সমাজে হজরত ইব্রাহিমের বংশধর এই পবিত্র মেজাজধারী তরুণ আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো কাছে মাথাও নোয়াননি। কোনো মুশরিকসুলভ ধ্যানধারণাও পোষণ করেননি। যে সমাজে যুদ্ধ একটি খেলা এবং রক্তপাত একটি তামাশায় পরিণত হয়েছিল, সেখানে মানবতার সম্মানের পতাকাবাহী এই যুবক এক ফোঁটাও কারো রক্তপাত করেননি। কুরাইশদের পক্ষ হয়ে এই যুবক ফিজার যুদ্ধে অংশ নেন। কিন্তু সেখানেও কারো রক্ত তার হাত রঞ্জিত করেনি।

যুবক মুহাম্মদের সুঠাম দেহকান্তি, নির্ভীক নয়নযুগল, সুগোল মুখমণ্ডল, কৃষ্ণ কেশ, শান্ত-মিষ্ট সুন্দর স্বভাব সহজেই মানুষের চিত্ত আকর্ষণ করে। আলাপ-আলোচনা, বাদ-প্রতিবাদে তাঁর জোড়া মেলে না। সত্যবাদিতায় ও সরল ব্যবহার তাঁর সমান একজন মক্কায় খুঁজে পাওয়া যায় না। ঋজুতায়, আন্তরিকতায়, হৃদ্যতায়, সততায় ও বিশ্বস্ততায় তাঁর তুলনা কারো চোখে পড়ে না। তাই তো, এই যুবক মুহাম্মদ সাঃ মক্কাবাসীর কাছে আল-আমিন­ সবার গভীর বিশ্বাসের পাত্র। অন্ধকার আরববাসীর আন্তরিক শ্রদ্ধায় ঘোষণা ও উপাধি আল-আমিন, আস-সাদিক। গোটা আরব সমাজে নামটি বলতেই সবাই এই তরুণ যুবক মুহাম্মদ সাঃ-এর কথাই বুঝত। এ নামেই লোকসমাজে তিনি স্মরণ হতেন। নিখিল ভারত থিওসুফিক্যাল সোসাইটির নেত্রী বিখ্যাত ইংরেজ মহিলা অ্যানি বেসন্তি লিখেছেনঃ ‘শ্রেষ্ঠ নবীর (সাঃ) যে গুণটি আমার অন্তরে তাঁর প্রতি ভক্তির সঞ্চার করেছে, তা হলো তাঁর সেই অনন্য বিশেষণ যা তাঁর স্বদেশবাসীকে তাঁকে আল-আমিন (পরম বিশ্বস্ত) নামে অভিহিত করতে বাধ্য করেছিল। মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষে সবার কাছে এর চেয়ে বেশি অনুসরণযোগ্য ব্যাপার আর কিছুই হতে পারে না। যার গোটা সত্তা, সততা ও সত্যবাদিতার প্রতিমূর্তি তিনি যে সর্বাধিক সম্ভ্রান্ত ও সম্মানিত তাতে সন্দেহের অবকাশ কোথায়? সত্যের পয়গাম-বাহক কেবল এমন ব্যক্তিই হতে পারেন।’

আরবীয়দের মূর্খতা, বাচালতা, অন্যায়, অপকর্ম, অত্যাচার, হত্যা-লুণ্ঠন, মারামারি, কাটাকাটি, আত্মগর্ব ও পরশ্রীকাতরতা দেখে যুবক মুহাম্মদ সাঃ-এর মানবপ্রেমে বিগলিত মন প্রায়ই কেঁদে উঠত। সর্বদা চিন্তা ও চেষ্টা করতেন কিভাবে এই সব অন্যায় বিদূরিত হবে। কিভাবে জনসমাজ কুলষমুক্ত হবে। বিশেষ করে নগণ্য কথার ওপরে ফিজার যুদ্ধে যে নৃশংস হত্যাকাণ্ড এবং যত নির্মমভাবে মানুষের প্রাণ বিনাশ ঘটল! … সেই দৃশ্য দেখে তিনি আরো অধীর হয়ে ওঠেন। ভাবতে থাকেন কিভাবে এসবের মূলোৎটান করা যায়। বুঝলেন­ এই অন্ধসমাজকে নতুন আলো দিতে হবে ‘কথায় নয় কাজে’।

আরব দেশে জীবনের কোনো নিরাপত্তা ছিল না। নিষ্ঠুর মানুষ সব সময় দরিদ্র ও গরিবদের ওপর অত্যাচার করত। সামান্য ঘটনা নিয়ে বেধে যেত যুদ্ধ, লড়াই। যুগ যুগ ধরেও তার রেশ চলতে থাকত। কিন্তু কত দিন। আর কত দিন! এইভাবে তো জীবন চলে না। সমাজ চলে না। এই পাশবিকতার শেষ প্রয়োজন। একটি সোনার সমাজ গড়তে হবে। আগত মানুষের জন্য এই বিভীষিকা অধ্যায় রেখে যাওয়া যায় না। এরূপ ভাবনা যেন দয়ার্দÛচিত্তের লোকগুলোর কল্পনা জগৎকেও নাড়া দিতে শুরু করে। তাই তো দীর্ঘস্থায়ী ফিজার যুদ্ধের পর কারো কারো বোধোদয় হয় এবং সমর বিভীষিকা থেকে পরিত্রাণের পন্থা অন্বেষণ করতে থাকে। শান্তির জন্য একটি কমিটি গঠনের আপ্রাণ চেষ্টা চালালেন। ভাবতে লাগলেন নানা দিক নিয়ে। অবশেষে যেন খুঁজে পেলেন একটি দিক। একটি পথ। একটি শান্তির ঠিকানা।

প্রাচীনকালে আরব জাহানের ভয়ঙ্কর যুদ্ধবিগ্রহ বন্ধের লক্ষ্যে বিভিন্ন গোত্রের কিছু মহৎব্যক্তি মিলিত হয়ে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেছিলেন। তারা এ মর্মে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়েছিলেন­ ‘আমরা সর্বদা মজলুমদের সাহায্য করব এবং জালিমদের প্রতিরোধ করব।’ ফজল বিন ওয়াদা, ফজল বিন ফাজালা ও ফুজায়েল বিন হারিছ সেই চুক্তির প্রধান। তাদের নামানুসারেই সেই চুক্তির নামকরণ করা হয়েছিল ‘হিলফুল ফুজুল’। এ সংগঠনটির অস্তিত্ব লোপ পেয়ে গিয়েছিল। কিন্তু তখনো লোকমুখে তার আলোচনা বন্ধ হয়নি। যুবক মুহাম্মদ সাঃ-এর চাচা যুবায়ের বিন আবদুল মোত্তালিব পুনরায় সেই চুক্তি নতুন করে পুনরুজ্জীবিত করার প্রস্তাব করেন। যুবায়ের বিন আবদুল মোত্তালিব একটি কবিতায় সেই চুক্তির ব্যক্তিদের নামটি এভাবে লিপিবদ্ধ করেন­ ফজল বিন ওয়াদা, ফজল বিন ফাজালা, ফুজায়েল বিন হারিছ প্রমুখ­ এ ব্যাপারে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, মক্কায় থাকবে না কোনো অত্যাচারী।/এ মতেও পাকা পোক্ত তাদের চুক্তি­ থাকবে নিরাপদ-আগন্তুক/অতিথিবৃন্দ ও মক্কাবাসী।

ফিজার যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে ‘শাওয়াল মাসে’। ‘জিলকদ’ মাসে ‘হিলফুল ফুজুলের’ কার্যক্রম সূচিত হয়। যুবায়ের বিন আবদুল মোত্তালিবের নেতৃত্বাধীন হাশেমি, যুহরাহ ওতাইম গোত্র ‘আবদুল্লাহ বিন জাদআন’ নামক এক অভিজাত কোরাইশ অধিবাসীর গৃহে সমবেত হন এবং আরব থেকে সব প্রকার অত্যাচার নির্মূল করার জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হন। সে দিন যুবক মুহাম্মদ সাঃ-ও এই অঙ্গীকারনামা অনুষ্ঠানের একজন সক্রিয় অংশগ্রহণকারী ছিলেন। হিলফুল ফুজুল সংগঠনের সদস্যরা এই মর্মে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হন­ ১. আমরা দেশের অরাজকতা ও অশান্তি দূর করব; ২. আমরা পথিকদের জানমালের হিফাজত করব; ৩. আমরা নিঃস্ব দরিদ্রদের সাহায্য করব; ৪. সবলদের দুর্বলদের প্রতি অত্যাচার করা থেকে বিরত রাখব।

অত্যাচারিত ব্যক্তি স্বগোত্রের, অপর গোত্রের কিংবা বহিরাগত যে-ই হোক তার প্রতি সাহায্যের হাত সম্প্রসারিত করতে হবে। এতে কোনো শৈথিল্য প্রদর্শন করা যাবে না।

ইতিহাস-রচয়িতাদের মতানুসারে, সে দিন যুবক মুহাম্মদ সাঃ-এর বয়স ছিল ‘বিশ’ বছরের কম নয়। তবুও তিনি এই চুক্তিতে শামিল ছিলেন। নবীয়ে আরাবি সাঃ এই চুক্তিতে শামিল হয়ে উৎসাহিত হয়ে কাজ করতে লাগলেন। তিনি বেশির ভাগ কবিলার সরদার এবং বিজ্ঞ লোকদের দেশের প্রচলিত অরাজকতা, পথচারীদের লুণ্ঠিত হওয়া, দরিদ্রদের প্রতি ধনী ও আমির ব্যক্তিদের অত্যাচার-অনাচারের কথা বলতে বলে এ অবস্থার নিরসনের জন্য উদ্বুদ্ধ করতে থাকেন।

নবীয়ে আরাবি সাঃ নবুওয়াত লাভের পর এই চুক্তি সম্পর্কে বলেন, ‘হিলফুল ফুজুল চুক্তি নবায়নের সময় আমি আবদুল্লাহ বিন জাদআনের গৃহে উপস্থিত ছিলাম। এই চুক্তির বিপক্ষে কেউ যদি একটি লাল বর্ণের উট দিতে চাইত, তাহলে আমি তার বিরুদ্ধচারণ করতাম। যদি আজো কেউ আমাকে সেই অঙ্গীকারের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে সাহায্যার্থে আহ্বান করে, তবে অবশ্যই আমি তাতে অংশ নেবো।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: