রাগের আগুন বশে রাখুন

 

মানুষ কেন রাগে?

এক কথায় এর উত্তর দেয়া সম্ভব নয়। ক্রোধান্বিত হওয়ার প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ নানাবিধ কারণ রয়েছে। আনন্দ-বেদনা-হতাশার মতো নিত্যনৈমিত্তিক আবেগের কথা যদি বলি, তাহলে ক্রোধ বা রাগও তেমন একটি আবেগ। কোন ঘটনায় আমরা যেমন খুশি কিংবা মনোক্ষুণ্ন হই, তেমনি কোন কোন ঘটনায় আমরা রাগান্বিতও হই ডা· এআরএম সাইফুদ্দীন একরাম অন্যান্য আবেগের মতো রাগও একটি স্বাভাবিক মানবিক আবেগ। পৌরণিক কাহিনীগুলোতে দেবতাদের ক্রোধান্বিত হতে দেখা যায়। গ্রিক দেবতাদের মধ্যে অ্যারিস (অৎবং) রাগ বা ক্রোধের জন্য বিখ্যাত ছিলেন। অ্যারিস কখন কীভাবে কার ওপর রেগে যান এ ভয়ে তার জন্য কোন উপাসনালয় তৈরি হয়নি। হিন্দুদের দুর্বাশা মুনিও রাগের জন্য যথেষ্ট পরিচিত। অমর্তøলোকের রাগের অনুসন্ধান না করে আমাদের প্রশ্ন-  মানুষ কেন রাগে? এক কথায় এর উত্তর দেয়া সম্্‌ভব নয়। ক্রোধান্বিত হওয়ার প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ নানাবিধ কারণ রয়েছে। আনন্দ-বেদনা-হতাশার মতো নিত্যনৈমিত্তিক আবেগের কথা যদি বলি, তাহলে ক্রোধ বা রাগও তেমন একটি আবেগ। কোন ঘটনায় আমরা যেমন খুশি কিংবা মনোক্ষুণ্ন হই, তেমনি কোন কোন ঘটনায় আমরা রাগান্বিতও হই।

কখনও কখনও রাগ অন্য কারণ প্রসূত হতে পারে। অনেকে রেগে যাওয়াকে স্বাভাবিক হিসেবে মেনে নিতে প্রস্তুত; কিন্তু অন্য আবেগজনিত দুর্বলতা স্বীকার করতে চান না। যেমন কারও আচ্ররণে মানসিকভাবে আহত বোধ করলে কিংবা অস্তিত্ব বিপণ্ন হলে আমরা সরাসরি সেটার প্রতিকার করার চেষ্টা না করে ক্রোধান্বিত বোধ করি। এ পরিপ্রেক্ষিতে রেগে যাওয়া একটি গৌণ প্রতিক্রিয়া; কারণ প্রাথমিক প্রতিক্রিয়াটি আমাদের কাছে প্রীতিদায়ক নয়। একটি নির্দিষ্ট মাত্রা পর্যন্ত রাগ মেনে নেয়া গেলেও মাত্রাবিহীন রাগারাগি কারও কাম্য নয়। অতিরিক্ত ক্রোধ স্বাস্থ্য হানিকর।

রাগ কীভাবে সীমা অতিক্রম করে

এ প্রশ্নের উত্তর সহজ। ক্রোধের কারণে বন্ধুবান্ধব যদি আপনাকে এড়িয়ে চলে, চাকরি বিপণ্ন হয় কিংবা আশপাশের মানুষ যদি আপনাকে রাগী হিসেবে ভয় পেতে শুরু করে, তাহলে বুঝতে হবে আপনার ক্রোধের আগুন বশে আনা দরকার। কারণ অতি ক্রোধ স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর।

রাগারাগি করা কি শুধুই স্নায়ুবিক প্রতিক্রিয়া

রাগারাগি কি শুধুই স্নায়ুবিক প্রতিক্রিয়া নাকি এর পেছনে কোন বংশগত কারণ রয়েছে? দু’পক্ষের নানা রকম যুক্তি প্রমাণ রয়েছে। কারও বাবা-দাদা রাগী হলে তাদের উত্তরপুরুষদের মধ্যেও এর ছাপ যে পাওয়া যায় না, তা নয়। পূর্বপুরুষরা মেজাজি ছিলেন বিধায় এটাকে অনেকে সহজভাবে মেনে নেয়ার জন্য সুপারিশ করেন। কিন্তু এর পেছনে আসলেই বংশগতি বা ক্রোমোজোমের ভূমিকা আছে কি না, তা আজ পর্যন্ত জানা যায়নি। বিজ্ঞানীরা এখনও ক্রোধের জন্য দায়ী কোন জিন শনাক্ত কিংবা চিহ্নিত করেননি। তবে অনেকের মধ্যে হঠাৎ হঠাৎ প্রচণ্ড রাগে ফেটে পড়ার প্রবণতা দেখা যায়। এটাকে অনেকে ‘অকস্মাৎ ক্রোধ বিস্ফোরণ’ নামে উল্লেখ করে থাকেন। এ ধরনের প্রচণ্ড রাগের প্রকাশ হিসেবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি আশপাশের মূল্যবান জিনিসপত্র ভাঙচুর করেন; এমনকি অন্যদের ওপর শারীরিক আক্রমণও করতে পারেন। এটাকে রোগ হিসেবে গণ্য করলেও এর কোন কারণ উদ্ধার করা সম্্‌ভব হয়নি।

একই ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি দু’জন ব্যক্তির মধ্যে একজন রেগে যান; অথচ অপর জন কেন ক্রোধান্বিত হন না? অন্যান্য সাধারণ অনুভূতির মতো এখানে একই ঘটনা ঘটে। একটি ঘটনা কার মনে কীরকম প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে, সেটাই রেগে যাওয়া কিংবা না যাওয়ার নিয়ামক। ঘটনাটি যদি ব্যক্তিকে আহত করে কিংবা বেদনার্ত করে তোলে, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রতিক্রিয়া প্রকাশিত হয় রাগের মাধ্যমে। কিন্তু একই ঘটনা আরেকজনের মনে কোন রেখাপাত করে না কিংবা কোন রকম অনুভুতির সৃষ্টি করে না। তিনি থাকেন নির্বিকার, সুতুরাং তার কোন রাগ হয় না।

ক্রোধান্বিত ব্যক্তি কি অন্যদের জন্য বিপজ্জনক এটা কি পারস্পরিক সম্পর্ককে বিনষ্ট করে? অবশ্যই ক্রোধান্বিত ব্যক্তি অপরের জন্য বিপজ্জনক হতে পারেন এবং ক্রোধের আগুনে প্রজ্জ্বলিত ব্যক্তির সঙ্গে অন্যদের সম্পর্কের টানাপোড়েন সৃষ্টি হয়। আজকাল যত নারী কিংবা শিশু নির্যাতনের ঘটনা আমরা দেখতে পাই, তার অধিকাংশের মূলেই রয়েছে ক্রোধ কিংবা রাগ। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এ ক্রোধ কিংবা আক্রোশ পুরুষের। অবশ্য কোথাও কোথাও মহিলাদের চণ্ডমূর্তি দেখা যায়। সব সময় ক্রোধে ফুঁসতে থাকা ব্যক্তির সঙ্গে অন্যদের সম্পর্কের অবনতি ঘটে। কারণ রাগী ব্যক্তির সামনে কেউ মুখ খোলে না; কিংবা যুক্তি তর্কে লিপ্ত হতে চায় না। এটা পারস্পরিক সম্পর্কের জন্য ইতিবাচক নয়।

রাগারাগি করা কি পুরুষের একচেটিয়া অধিকার

কখনোই তা সঠিক নয়। আমাদের সমাজে একজন পুরুষের রেগে যাওয়াকে যত সহজে মেনে নেয়া হয়, একজন মহিলার ক্রোধান্বিত হওয়া অত সহজভাবে নেয়া হয় না ; বলা হয়, ‘মেয়ে মানুষের এত রাগ ভালো না’। প্রেমিকার কপট রাগ প্রেমিকের কাছে মধুর মনে হলেও সাধারণভাবে এটা গ্রহণযোগ্য নয়। কিন্তু নারী-পুরুষ উভয়েই রাগ করে, ক্রোধান্বিত হয়, ছেলেরা রাগে আক্রোশে বিস্ফোরিত হয়, মেয়েরা ভেতরে ভেতরে ফঁুসতে থাকে। মেয়েদের রাগের প্রকাশ অনেক সময় তাদের অস্বাভাবিক কাজকর্মের মাধ্যমে প্রকাশিত হয় এবং সেগুলো যে রাগের কারণে করা হচ্ছে, তা নিকটজন ছাড়া অন্যজন বুঝতে পারেন না।

রাগ এবং ক্রোধ থেকে শারীরিক অসুস্থতা রাগ ও ক্রোধ মাত্রাভেদে অনেকের শারীরিক অসুস্থতা সৃষ্টি করতে পারে। অল্প-অল্প রাগারাগিতে হয়তো কোন ক্ষতি হয় না। কিন্তু অতিরিক্ত রেগে গেলে রক্তচাপ বেড়ে যায়। যাদের হৃদযন্ত্র দুর্বল তাদের হার্ট অ্যাটাক কিংবা অনেক সময় মস্তিষ্ড়্গের রক্তক্ষরণ হয়ে পক্ষাঘাত বা স্ট্রোক হয়ে যায়। এর ফলে মৃতুø ঘটাও বিচিত্র নয়।

রাগ কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়

এর কোন সহজ সমাধান নেই। আপনাকে রাগের মাথায় উত্তেজনা বশত কিছু না করে ঠাণ্ডা মাথায় চিন্তা করতে হবে। রাগের যথার্থ কারণ আছে কি না তা ভাবতে হবে এবং বিষয়টির ঠিক-বেঠিক দিক নিয়ে বিশ্লেষণ করতে হবে। ক্রোধান্বিত মস্তিষ্ড়্গে এত কিছু ভাবা যায় না। অতএব সমাধান হচ্ছে-  সময় নেয়া। মনে রাখতে হবে আজকে আপনি রাগ করছেন, আগামীকাল আপনার রাগ থাকবে না। কিন্তু রাগের মাথায় যে মানসিক কিংবা শারীরিক আঘাত অপরকে করা হয় সেটা কিন্তু তার পক্ষে ভুলে যাওয়া কঠিন। এজন্য রাগের প্রতিক্রিয়া প্রদর্শন করার পরিবর্তে ঘটনাস্থল ত্যাগ করে নিরিবিলি কোথাও ঘটনার বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করাই সর্বোত্তম ।

যদি এমন করা সম্্‌ভব না হয় তাহলে রাগের প্রতিক্রিয়া কোন ভঙ্গুর বস্তুর উপরে প্রক্ষেপ করা যায়। যেমন রাগ কমানোর জন্য অনেককে দেয়ালে মুষ্ঠাঘাত করতে দেখা যায়, কেউ কেউ থালা-বাসন কিংবা ফুলদানি ভাঙেন। কিন্তু এমন প্রতিক্রিয়াও অনেক সময় আশপাশের মানুষের জন্য ভীতি সৃষ্টি করে। এজন্য বলা হয় রেগে গেলে খেলতে চলে যান, দৌড়াতে পারেন কিংবা টিভি দেখতে পারেন। এ ধরনের ক্রিয়াকলাপের মাধ্যমে খুব সুন্দরভাবে রাগ কমানো যায়।

রেগে যাওয়া স্বাভাবিক আবেগ

রাগার অধিকার সবারই আছে, কিন্তু রাগের বশে কাউকে আঘাত করার অধিকার কারও নেই।

অনেক সময় না রাগার জন্য হরেকরকম কসরৎ করেও আমরা ক্রোধ সংবরণ করতে পারি না। এমন পরিস্থিতির উদ্‌ভব হয় যে আমরা রেগে যেতে বাধ্য হই এবং হতাশ হয়ে পড়ি। এ রকম পরিস্থিতিতে আমাদের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন আত্মবিশ্লেষণ। রাগের কারণে হতাশা আসলে ক্রোধ আরও বেড়ে যায়। অতএব হতাশা গ্রাস করার আগেই রাগের কারণ বিশ্লেষণ করে পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। অনেকের রেগে যাওয়া একটি অভ্যাসে পরিণত হয়, বলা যায় রেগে যাওয়া একটি নেশা হয়ে যায়। রাগলে তাদের মস্তিষ্ড়্গে স্বস্তিদায়ক এন্ডোর্ফিন নিঃসরিত হয়। এজন্য তারা রেগে যাওয়ার অভ্যাস পরিত্যাগ করতে পারেন না। কিন্তু আমাদের সব সময় মনে রাখতে হবে, রাগের মাথায় কিছু করলে তার ফল কখনই ভালো হয় না। অতএব রাগের আগুন বশে রাখুন।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: