রাগের আগুন বশে রাখুন

 

মানুষ কেন রাগে?

এক কথায় এর উত্তর দেয়া সম্ভব নয়। ক্রোধান্বিত হওয়ার প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ নানাবিধ কারণ রয়েছে। আনন্দ-বেদনা-হতাশার মতো নিত্যনৈমিত্তিক আবেগের কথা যদি বলি, তাহলে ক্রোধ বা রাগও তেমন একটি আবেগ। কোন ঘটনায় আমরা যেমন খুশি কিংবা মনোক্ষুণ্ন হই, তেমনি কোন কোন ঘটনায় আমরা রাগান্বিতও হই ডা· এআরএম সাইফুদ্দীন একরাম অন্যান্য আবেগের মতো রাগও একটি স্বাভাবিক মানবিক আবেগ। পৌরণিক কাহিনীগুলোতে দেবতাদের ক্রোধান্বিত হতে দেখা যায়। গ্রিক দেবতাদের মধ্যে অ্যারিস (অৎবং) রাগ বা ক্রোধের জন্য বিখ্যাত ছিলেন। অ্যারিস কখন কীভাবে কার ওপর রেগে যান এ ভয়ে তার জন্য কোন উপাসনালয় তৈরি হয়নি। হিন্দুদের দুর্বাশা মুনিও রাগের জন্য যথেষ্ট পরিচিত। অমর্তøলোকের রাগের অনুসন্ধান না করে আমাদের প্রশ্ন-  মানুষ কেন রাগে? এক কথায় এর উত্তর দেয়া সম্্‌ভব নয়। ক্রোধান্বিত হওয়ার প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ নানাবিধ কারণ রয়েছে। আনন্দ-বেদনা-হতাশার মতো নিত্যনৈমিত্তিক আবেগের কথা যদি বলি, তাহলে ক্রোধ বা রাগও তেমন একটি আবেগ। কোন ঘটনায় আমরা যেমন খুশি কিংবা মনোক্ষুণ্ন হই, তেমনি কোন কোন ঘটনায় আমরা রাগান্বিতও হই।

কখনও কখনও রাগ অন্য কারণ প্রসূত হতে পারে। অনেকে রেগে যাওয়াকে স্বাভাবিক হিসেবে মেনে নিতে প্রস্তুত; কিন্তু অন্য আবেগজনিত দুর্বলতা স্বীকার করতে চান না। যেমন কারও আচ্ররণে মানসিকভাবে আহত বোধ করলে কিংবা অস্তিত্ব বিপণ্ন হলে আমরা সরাসরি সেটার প্রতিকার করার চেষ্টা না করে ক্রোধান্বিত বোধ করি। এ পরিপ্রেক্ষিতে রেগে যাওয়া একটি গৌণ প্রতিক্রিয়া; কারণ প্রাথমিক প্রতিক্রিয়াটি আমাদের কাছে প্রীতিদায়ক নয়। একটি নির্দিষ্ট মাত্রা পর্যন্ত রাগ মেনে নেয়া গেলেও মাত্রাবিহীন রাগারাগি কারও কাম্য নয়। অতিরিক্ত ক্রোধ স্বাস্থ্য হানিকর।

রাগ কীভাবে সীমা অতিক্রম করে

এ প্রশ্নের উত্তর সহজ। ক্রোধের কারণে বন্ধুবান্ধব যদি আপনাকে এড়িয়ে চলে, চাকরি বিপণ্ন হয় কিংবা আশপাশের মানুষ যদি আপনাকে রাগী হিসেবে ভয় পেতে শুরু করে, তাহলে বুঝতে হবে আপনার ক্রোধের আগুন বশে আনা দরকার। কারণ অতি ক্রোধ স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর।

রাগারাগি করা কি শুধুই স্নায়ুবিক প্রতিক্রিয়া

রাগারাগি কি শুধুই স্নায়ুবিক প্রতিক্রিয়া নাকি এর পেছনে কোন বংশগত কারণ রয়েছে? দু’পক্ষের নানা রকম যুক্তি প্রমাণ রয়েছে। কারও বাবা-দাদা রাগী হলে তাদের উত্তরপুরুষদের মধ্যেও এর ছাপ যে পাওয়া যায় না, তা নয়। পূর্বপুরুষরা মেজাজি ছিলেন বিধায় এটাকে অনেকে সহজভাবে মেনে নেয়ার জন্য সুপারিশ করেন। কিন্তু এর পেছনে আসলেই বংশগতি বা ক্রোমোজোমের ভূমিকা আছে কি না, তা আজ পর্যন্ত জানা যায়নি। বিজ্ঞানীরা এখনও ক্রোধের জন্য দায়ী কোন জিন শনাক্ত কিংবা চিহ্নিত করেননি। তবে অনেকের মধ্যে হঠাৎ হঠাৎ প্রচণ্ড রাগে ফেটে পড়ার প্রবণতা দেখা যায়। এটাকে অনেকে ‘অকস্মাৎ ক্রোধ বিস্ফোরণ’ নামে উল্লেখ করে থাকেন। এ ধরনের প্রচণ্ড রাগের প্রকাশ হিসেবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি আশপাশের মূল্যবান জিনিসপত্র ভাঙচুর করেন; এমনকি অন্যদের ওপর শারীরিক আক্রমণও করতে পারেন। এটাকে রোগ হিসেবে গণ্য করলেও এর কোন কারণ উদ্ধার করা সম্্‌ভব হয়নি।

একই ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি দু’জন ব্যক্তির মধ্যে একজন রেগে যান; অথচ অপর জন কেন ক্রোধান্বিত হন না? অন্যান্য সাধারণ অনুভূতির মতো এখানে একই ঘটনা ঘটে। একটি ঘটনা কার মনে কীরকম প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে, সেটাই রেগে যাওয়া কিংবা না যাওয়ার নিয়ামক। ঘটনাটি যদি ব্যক্তিকে আহত করে কিংবা বেদনার্ত করে তোলে, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রতিক্রিয়া প্রকাশিত হয় রাগের মাধ্যমে। কিন্তু একই ঘটনা আরেকজনের মনে কোন রেখাপাত করে না কিংবা কোন রকম অনুভুতির সৃষ্টি করে না। তিনি থাকেন নির্বিকার, সুতুরাং তার কোন রাগ হয় না।

ক্রোধান্বিত ব্যক্তি কি অন্যদের জন্য বিপজ্জনক এটা কি পারস্পরিক সম্পর্ককে বিনষ্ট করে? অবশ্যই ক্রোধান্বিত ব্যক্তি অপরের জন্য বিপজ্জনক হতে পারেন এবং ক্রোধের আগুনে প্রজ্জ্বলিত ব্যক্তির সঙ্গে অন্যদের সম্পর্কের টানাপোড়েন সৃষ্টি হয়। আজকাল যত নারী কিংবা শিশু নির্যাতনের ঘটনা আমরা দেখতে পাই, তার অধিকাংশের মূলেই রয়েছে ক্রোধ কিংবা রাগ। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এ ক্রোধ কিংবা আক্রোশ পুরুষের। অবশ্য কোথাও কোথাও মহিলাদের চণ্ডমূর্তি দেখা যায়। সব সময় ক্রোধে ফুঁসতে থাকা ব্যক্তির সঙ্গে অন্যদের সম্পর্কের অবনতি ঘটে। কারণ রাগী ব্যক্তির সামনে কেউ মুখ খোলে না; কিংবা যুক্তি তর্কে লিপ্ত হতে চায় না। এটা পারস্পরিক সম্পর্কের জন্য ইতিবাচক নয়।

রাগারাগি করা কি পুরুষের একচেটিয়া অধিকার

কখনোই তা সঠিক নয়। আমাদের সমাজে একজন পুরুষের রেগে যাওয়াকে যত সহজে মেনে নেয়া হয়, একজন মহিলার ক্রোধান্বিত হওয়া অত সহজভাবে নেয়া হয় না ; বলা হয়, ‘মেয়ে মানুষের এত রাগ ভালো না’। প্রেমিকার কপট রাগ প্রেমিকের কাছে মধুর মনে হলেও সাধারণভাবে এটা গ্রহণযোগ্য নয়। কিন্তু নারী-পুরুষ উভয়েই রাগ করে, ক্রোধান্বিত হয়, ছেলেরা রাগে আক্রোশে বিস্ফোরিত হয়, মেয়েরা ভেতরে ভেতরে ফঁুসতে থাকে। মেয়েদের রাগের প্রকাশ অনেক সময় তাদের অস্বাভাবিক কাজকর্মের মাধ্যমে প্রকাশিত হয় এবং সেগুলো যে রাগের কারণে করা হচ্ছে, তা নিকটজন ছাড়া অন্যজন বুঝতে পারেন না।

রাগ এবং ক্রোধ থেকে শারীরিক অসুস্থতা রাগ ও ক্রোধ মাত্রাভেদে অনেকের শারীরিক অসুস্থতা সৃষ্টি করতে পারে। অল্প-অল্প রাগারাগিতে হয়তো কোন ক্ষতি হয় না। কিন্তু অতিরিক্ত রেগে গেলে রক্তচাপ বেড়ে যায়। যাদের হৃদযন্ত্র দুর্বল তাদের হার্ট অ্যাটাক কিংবা অনেক সময় মস্তিষ্ড়্গের রক্তক্ষরণ হয়ে পক্ষাঘাত বা স্ট্রোক হয়ে যায়। এর ফলে মৃতুø ঘটাও বিচিত্র নয়।

রাগ কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়

এর কোন সহজ সমাধান নেই। আপনাকে রাগের মাথায় উত্তেজনা বশত কিছু না করে ঠাণ্ডা মাথায় চিন্তা করতে হবে। রাগের যথার্থ কারণ আছে কি না তা ভাবতে হবে এবং বিষয়টির ঠিক-বেঠিক দিক নিয়ে বিশ্লেষণ করতে হবে। ক্রোধান্বিত মস্তিষ্ড়্গে এত কিছু ভাবা যায় না। অতএব সমাধান হচ্ছে-  সময় নেয়া। মনে রাখতে হবে আজকে আপনি রাগ করছেন, আগামীকাল আপনার রাগ থাকবে না। কিন্তু রাগের মাথায় যে মানসিক কিংবা শারীরিক আঘাত অপরকে করা হয় সেটা কিন্তু তার পক্ষে ভুলে যাওয়া কঠিন। এজন্য রাগের প্রতিক্রিয়া প্রদর্শন করার পরিবর্তে ঘটনাস্থল ত্যাগ করে নিরিবিলি কোথাও ঘটনার বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করাই সর্বোত্তম ।

যদি এমন করা সম্্‌ভব না হয় তাহলে রাগের প্রতিক্রিয়া কোন ভঙ্গুর বস্তুর উপরে প্রক্ষেপ করা যায়। যেমন রাগ কমানোর জন্য অনেককে দেয়ালে মুষ্ঠাঘাত করতে দেখা যায়, কেউ কেউ থালা-বাসন কিংবা ফুলদানি ভাঙেন। কিন্তু এমন প্রতিক্রিয়াও অনেক সময় আশপাশের মানুষের জন্য ভীতি সৃষ্টি করে। এজন্য বলা হয় রেগে গেলে খেলতে চলে যান, দৌড়াতে পারেন কিংবা টিভি দেখতে পারেন। এ ধরনের ক্রিয়াকলাপের মাধ্যমে খুব সুন্দরভাবে রাগ কমানো যায়।

রেগে যাওয়া স্বাভাবিক আবেগ

রাগার অধিকার সবারই আছে, কিন্তু রাগের বশে কাউকে আঘাত করার অধিকার কারও নেই।

অনেক সময় না রাগার জন্য হরেকরকম কসরৎ করেও আমরা ক্রোধ সংবরণ করতে পারি না। এমন পরিস্থিতির উদ্‌ভব হয় যে আমরা রেগে যেতে বাধ্য হই এবং হতাশ হয়ে পড়ি। এ রকম পরিস্থিতিতে আমাদের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন আত্মবিশ্লেষণ। রাগের কারণে হতাশা আসলে ক্রোধ আরও বেড়ে যায়। অতএব হতাশা গ্রাস করার আগেই রাগের কারণ বিশ্লেষণ করে পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। অনেকের রেগে যাওয়া একটি অভ্যাসে পরিণত হয়, বলা যায় রেগে যাওয়া একটি নেশা হয়ে যায়। রাগলে তাদের মস্তিষ্ড়্গে স্বস্তিদায়ক এন্ডোর্ফিন নিঃসরিত হয়। এজন্য তারা রেগে যাওয়ার অভ্যাস পরিত্যাগ করতে পারেন না। কিন্তু আমাদের সব সময় মনে রাখতে হবে, রাগের মাথায় কিছু করলে তার ফল কখনই ভালো হয় না। অতএব রাগের আগুন বশে রাখুন।

Advertisements

কুরআনঃ নারী উন্নয়ন

বর্তমানে পৃথিবীর সর্বত্র নারীরা যে রূপ নিষ্ঠুরভাবে নির্যাতিত হচ্ছে, সে ক্ষেত্রে নারী উন্নয়নে অবশ্য শতভাগ সমর্থন সবারই থাকা উচিত। তাই বলে মুসলিম প্রধান বাংলাদেশে আল্লাহ সুবহানাল্লাহু তায়ালার আইন উল্টে ফেলে নয়। ১৯৯৫ সালে চীনের বেইজিংয়ে বিশ্ব নারী সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। কোটি কোটি ডলার খরচ হয়। বিশ্বের নারী সংগঠনগুলো কোটি কোটি টাকা পানিতে ফেলে কত কী না দাবি পাস করে আনল, কিন্তু পারল কি নারী নির্যাতন বন্ধ করতে? যতই দিন যাচ্ছে ততই নারীরা হয়ে উঠছে বাজারের পণ্য এবং মারাত্মক নির্যাতনের শিকার। নারীরা নিগৃহীত হচ্ছেই। আল্লাহর দেয়া সুস্পষ্ট বিধান লঙ্ঘন না করে যদি ইসলামের উত্তরাধিকার আইন এবং ভরণ-পোষণ আইন এ ক্ষেত্রে বিবেচনায় আনা যায়, তাহলে দেখা যাবে নারীর সামগ্রিক আর্থিক অবস্থান পুরুষের তুলনায় অনেক ভালো। আল্লাহর ভয়, ভালো-মন্দ কাজের প্রতিফল প্রতিটি নারী-পুরুষকে অবশ্যই পেতে হবে­ যত দিন এ বিশ্বাস মানুষের মনে বদ্ধমূল করা না যাবে, তত দিন কোনো সংস্থা, কোনো সরকার নারীর মর্যাদা ও অধিকার দিতে পারবে না। দিতে পারে না। আল্লাহর ভয় ও আখিরাতে বিশ্বাস সমাজে ইনসাফ ও সুবিচার প্রতিষ্ঠা করতে পারে। তখন নারীরা পাবে অধিকার ও মর্যাদা। নারী অধিকার বঞ্চিত করা হলে আল্লাহর কাছে একদিন জবাবদিহি করতেই হবে, এ শিক্ষা এখন প্রয়োজন।

উল্লেখ্য, গত তত্ত্বাবধায়ক সরকার নারীর সম-অধিকারের নামে নারী উত্তরাধিকার সংশোধন নীতিমালা ২০০৮ প্রণয়ন করে, যদিও তা পরে ইসলামি সংগঠনগুলোর আন্দোলনের মুখে বাতিল করা হয়। বর্তমানেও বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় নারীর সম-অধিকার দাবি নিয়ে এ দেশের আলেমসমাজের সাক্ষাৎকার, বক্তব্য, আল্লাহর আইন পরিবর্তনে এর পরিণতি ইত্যাদি নিয়ে আলোচনা বরাবরের মতো দেখা যাচ্ছে।

সূরা বাকারায় ২৪ নম্বর আয়াতে আল্লাহ পাক বলেছেন, ‘কুরআন প্রত্যাখ্যানকারীরা কাফির, তাদের জন্য রয়েছে দোজখের শাস্তি। তারা হবে দোজখের আগুনের ইন্ধন। পুরো কুরআন বা কুরআনের কিছু অংশ প্রত্যাখ্যান করা একই রকম অপরাধ। এখানে উল্লেখ্য, ইবলিস একজন বড়মাপের আলিম ও আবিদ (জ্ঞানী ও ইবাদতকারী) জিন ফেরেশতার মর্যাদায় ভূষিত ছিল। কিন্তু আদম (আঃ)-কে অভিবাদন না জানিয়ে আল্লাহর নির্দেশটি প্রকাশ্য অমান্য করে আল্লাহর লানতে পরিণত হয় অর্থাৎ শয়তান হয়ে যায়।

সূরা আল বাকারার ৮৫ নম্বর আয়াতে একই রকম ঘোষণা আছে, ‘তবে কি তোমরা কুরআনের কিছু অংশের ওপর ঈমান আনো আর কিছু অংশ প্রত্যাখ্যান করো? সুতরাং তোমাদের মধ্যে যারাই এরূপ করবে, তাদের লাঞ্ছনা ছাড়া আর কিছু নেই। আখিরাতের দিন তারা কঠিন শাস্তিতে নিক্ষিপ্ত হবে।’

বর্তমান সমাজে আমরা অনেকেই এই অপরাধে অপরাধী। নামাজ, রোজা, হজ, জাকাতের মতো আনুষ্ঠানিক ইবাদতগুলো মেনে নিই কিন্তু অর্থনীতিসহ অন্যান্য সামাজিক বিধিবিধান মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানাই। মনে রাখা প্রয়োজন মুসলমান হতে হলে পূর্ণাঙ্গ ঈমান ও পূর্ণাঙ্গ ইসলাম গ্রহণ করতে হবে। ইসলামি জীবনবিধানের কিছু অংশ স্বীকার করা ও কিছু অংশ প্রত্যাখ্যান করা যাবে না। যেমন দেশের কোনো নাগরিক যদি দেশের কোনো আইন মান্য করে এবং বাকি আইন প্রত্যাখ্যান করে, সে হবে দেশদ্রোহী, তেমনি কেউ যদি আল্লাহর কিছু আইন মান্য করে ও কিছু আইন প্রত্যাখ্যান করে, সে ইসলামের গণ্ডি থেকে বেরিয়ে যায়।

ইসলাম একটি সৌহার্দøপূর্ণ শান্তির সমাজ গঠন করতে চায়। অতএব ব্যক্তি, সমাজ ও দেশের শান্তি, মঙ্গল ও কল্যাণের জন্য সামগ্রিকভাবে ইসলামি বিধান গ্রহণ করতে হবে। অন্যথায় আংশিকভাবে আনুগত্য করে কেউ যদি কুরআনের বাকি অংশ প্রত্যাখ্যান করে সে কাফির হয়ে যায়। তবে কেউ যদি কুরআনের সবটুকুর ওপর ঈমান আনে কোনো অংশ প্রত্যাখ্যান না করে, কিন্তু ইসলামি সমাজ ব্যবস্থা না থাকায় কিংবা ঈমানি দুর্বলতার কারণে সবটুকু পালনে সমর্থ না হয়, তাহলে সে কাফির হবে না। সে হবে পাপী ও অপরাধী।

সূরা নিসায় ১১ নম্বর আয়াতে আল্লাহ পাক বলেছেন, ‘তোমাদের সন্তানদের ব্যাপারে আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন পুরুষের অংশ দুটি মেয়ের সমান।’ এর বিরোধিতা করলে আল্লাহর নির্দেশ সরাসরি লঙ্ঘন করা হবে। উল্লেখ্য, যদিও মেয়েরা পিতার সম্পত্তিতে অর্ধেক পায়, কিন্তু স্বামীর সম্পত্তির অধিকার মোহরানা সব মিলিয়ে সে অনেক বেশি পায়। উপরন্তু স্বামীর ওপর স্ত্রীর ভরণ-পোষণের দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছে। অপর দিকে স্বেচ্ছায় দান করা ছাড়া স্ত্রীর উপার্জনে স্বামীর কোনো অধিকার নেই। মোট কথা ইসলামি জীবনব্যবস্থায় আল্লাহ পাক নারীর কোনো ব্যয়ের খাত রাখেননি। অর্থাৎ কারো ভরণ-পোষণের দায়িত্ব বহন করতে বাধ্য নয়। উপরন্তু সূরা আন নিসার ৪ নম্বর আয়াতের নির্দেশ নারীদের তাদের মোহরানা আবশ্যিকভাবে দিয়ে দাও।

ইসলাম একমাত্র জীবনবিধান যেখানে নারী ও পুরুষের অধিকার সর্বোত্তমভাবে সংরক্ষণ করা হয়েছে। মহান আল্লাহ মানুষের জন্য যে জীবনবিধান দিয়েছেন, তা পুরো সামঞ্জস্যপূর্ণ। অতএব আল্লাহর বিধানের সরাসরি প্রত্যাখ্যান করার মতো ধৃষ্টতা না দেখিয়ে, আল্লাহর পক্ষ থেকে সম্পত্তি বণ্টনের কম-বেশি বিষয়টির যৌক্তিক কৌতূহল মেটানোর জন্য সূরা মোহাম্মদের ২৪ নম্বর আয়াতের তাৎপর্য উদঘাটনের আহ্বান জানাচ্ছি। আল্লাহ পাক বলেছেন, ‘ তারা কি কুরআন সম্পর্কে চিন্তা-গবেষণা করেনি? না, তাদের দিলসমূহে তালা পড়ে গেছে?’ এতে আল্লাহর ওপর নিজেকে সম্পূর্ণরূপে সমর্থন করার মানসিকতা সৃষ্টি হবে এবং কুরআন চর্চা গবেষণা না করার দরুন, কুরআনিক জ্ঞানের অজ্ঞতার দরুন আমাদের মধ্যে যারা কুরআনিক আইন উল্টে ফেলে আল্লাহর সরাসরি নির্দেশ লঙ্ঘন করে কাফির হতে চলেছেন, তারাও কাফির হওয়া থেকে বেঁচে যাবেন এবং ধর্মবিশ্বাসী, ধর্মপ্রাণ কোটি কোটি মুসলমানও কুফরি আইন মানতে বাধ্য হওয়া থেকে বেঁচে যাবেন। উল্লেখ্য, কাফির আরবি শব্দ, যা কুফর থেকে এসেছে। কুফর মানে অস্বীকার করা। কাফির মানে অস্বীকারকারী। মোট কথা আমরা মুসলমান হয়েও কুফরি নীতি অবলম্বন করতে মোটেও দ্বিধা করছি না। সমাজে এ দুরবস্থা কেবল মানুষ কুরআন থেকে দূরে সরে যাওয়ার জন্য।

এমনিতে দেশ ও জনগণ ক্ষুধা, সন্ত্রাস, মাদকাসক্ত, খুনখারাবি, ধর্ষণ, নির্যাতনের বিড়ম্বনায় জর্জরিত। যেখানে কুরআনের ধারক-বাহক মুসলমান, আমরা সেখানে কুরআনিক আইন পরিবর্তন করে আল্লাহর আইন লঙ্ঘনের মতো গজব কেন ডেকে আনছি? কুরআনিক আইন নারীদের মহা সম্মান ও মহা মর্যাদা দিয়েছে কন্যা হিসেবে, স্ত্রী হিসেবে, মা হিসেবে। যদি দুনিয়ার মানুষের গড়া বিভিন্ন পথ, মত ও ব্যবস্থাপনা নারীকে সে সম্মান না দেয়, নারীকে অধিকারবঞ্চিত করে, সে জন্য তো কুরআনিক আইন দায়ী নয়। দায়ী আমাদের কুরআনিক জ্ঞানের ব্যাপকতার অভাব। কুরআন চর্চা, গবেষণা ও এর বাস্তবায়নের অভাব।

অতএব আসুন, আমরা আল্লাহ তায়ালার বিধানের বিরোধিতা না করে কুরআন পড়ি, কুরআন বুঝি এবং কুরআনের বক্তব্য থেকে সঠিক শিক্ষা গ্রহণ করে সে অনুসারে জীবন গড়ি, এতেই নারীর অধিকার ও পূর্ণ মর্যাদা অর্জিত হবে। গড়ে উঠবে ক্ষুধামুক্ত, সন্ত্রাসমুক্ত সবধরনের যন্ত্রণামুক্ত, ফুলে-ফলে প্রাচুর্যে ভরা সুন্দর এক বাংলাদেশ।

%d bloggers like this: