কিডনি রোগীর খাদ্য তালিকা

কিডনি রোগের নাম শুনলেই আমরা আঁৎকে উঠি। ভাবতে থাকি জীবন সায়াহ্নে পৌঁছে গেছি। শুরু হয় বিদেশে উন্নত চিকিৎসার জন্য ছোটাছুটি।

আমাদের দেশে কিডনি রোগীর সংখ্যা আশংকাজনক হারে বাড়ছে। কিছু কিডনি রোগ আছে যার সময়মতো উপযুক্ত চিকিৎসা না হলে কিডনি ফেইলুর হয়ে যায়। কিডনি ফেইলুরের অন্যতম কারণ হল অনিয়ন্ত্রিত উচ্চরক্তচাপ এবং ডায়াবেটিস রোগ। তবে কিডনি ফেইলুর হলেও ঘাবড়ে যাওয়ার কারণ নেই। বর্তমানে দেশে ও বিদেশে এর আধুনিক চিকিৎসা বিদ্যমান। মেডিসিন ও অন্য চিকিৎসার পাশাপাশি কিডনি ফেইলুরে উরবঃধৎু সড়ফরভরপধঃরড়হ-এর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। কিডনি ফাংশন ও ফেইলুরের ধাপ এবং অন্যান্য অঙ্গের ফাংশন নিরূপণ করে উপযুক্ত খাদ্যতালিকা তৈরি করে সুষম খাবার খেলে রোগী প্রায় স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন।

ডায়েটের উদ্দেশ্য হল

(১) সঠিক পুষ্টিমান বজায় রাখা

(২) কিডনিজনিত বিষক্রিয়া কমিয়ে রাখা

(৩) শরীরে প্রয়োজনীয় প্রোটিন ভেঙে যেতে বাধা দেয়া

(৪) রোগীর শরীর ভালো লাগা এবং কিডনি ফেইলুরের বর্তমান অবস্থা থেকে যেন আর খারাপ না হয়

(৫) ডায়ালাইসিসের প্রয়োজনীয়তা কমিয়ে আনা। চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা একমত হয়েছেন, কিডনি রোগীকে প্রয়োজনীয় প্রোটিন (অসরহড় ধপরফ ড়ভ যরময নরড়ষড়মরপধষ াধষঁব) দিতে হবে। যেমন- ডিম ও দুধ। অন্যান্য প্রোটিনও সীমিত করতে হবে। কারণ ওইসব প্রোটিন শরীরে জমা হয়ে ইউরিয়া ও নাইট্রোজেন তৈরি করে। পাশাপাশি পর্যাপ্ত পরিমাণে অপ্রোটিন জাতীয় ক্যালরি দিতে হবে প্রোটিনের যথাযথ ব্যবহারের জন্য।

খাদ্যশক্তি

এ রোগীকে পর্যান্ত পরিমাণ ক্যালরি দিতে হবে। পর্যাপ্ত ক্যালরি না দিলে শরীরের টিসুø ভেঙে রক্তে ইউরিয়া এবং পটাশিয়ামের মাত্রা বাড়িয়ে দিলে কিডনির পক্ষে এগুলো অপসারণ করা দুঃসাধ্য হয়। প্রাপ্তবয়স্ড়্গদের দিতে হবে ৩৫-৪০ কিলোক্যালরি শরীরের প্রতি কেজি আদর্শ ওজনের জন্য অথবা ২০০০-৩০০০ কিলোক্যালরি প্রতিদিন, যারা নিয়মিত হিমোডায়ালাইসিস/পেরিটনিয়েল ডায়ালাইসিস করেন। যেসব রোগী অনবরত পেরিটনিয়েল ডায়ালাইসিস গ্রহণ করেন তারা ডায়ালাইসেট থেকে গ্লুকোজ শোষণ করে এবং তাদের অতিরিক্ত ওজন বাড়ে। শ্বেতসারই ক্যালরির প্রধান উৎস এবং প্রোটিনের সঙ্গে একসঙ্গে খেতে হবে। সুতরাং খাদ্যশক্তির জন্য প্রোটিন ব্যবহৃত হবে না। অতিরিক্ত প্রোটিনমুক্ত শ্বেতসার এবং কম ইলেকট্রোলাইট সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করলে বেশি পরিমাণে খাদ্যশক্তি বাড়ে।

প্রোটিন

প্রোটিন ০·৬ গ্রাম শরীরের প্রতি কেজি আদর্শ ওজনের জন্য দিলে নাইট্রোজেন ব্যালেন্স ভালো হয় এবং যাদের ডায়ালাইসিস হয়নি তারা এর থেকে বেশি নিয়ন্ত্রণ করলে শরীর শুকিয়ে যায়। কম প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার (২৫ গ্রামের কম) যুক্ত এসেনশিয়াল এমাইনো এসিড এবং কিটো এসিড দিলে কিডনি ফেইলুর রোগীদের নাইট্রোজেন ব্যালেন্স ভালো হয়। হিমোডায়ালাইসিসের রোগীকে ১·০ গ্রাম প্রোটিন প্রতি কেজি শরীরের ওজনের জন্য দিতে হবে, হিমোডায়ালাইসিসে ক্ষতি হওয়া প্রোটিন মেটানোর জন্য।

তেল

ক্রনিক কিডনি ফেইলুরে সাধারণত লিপিড প্রোফাইল বাড়ে সুতরাং ট্রাইগ্লিসারাইড ও কোলেস্টেরল কম রাখতে হবে এবং পলিআনস্যাচুরেটেড তেল বেশি দিতে হবে।

পটাশিয়াম

অতিরিক্ত বা কম পটাশিয়াম দুটিই রোগীর জন্য খারাপ। ক্রনিক কিডনি ফেইলুরে সাধারণত পটাশিয়াম বৃদ্ধি হয়। রোগীর রক্তে এবং প্রশ্রাবে পটাশিয়ামের মাত্রা দেখে ডায়ালাইসিটের মাত্রা নির্ধারণ করতে হবে। ডায়ালাইসিস হয়নি এমন রোগীদেও ১৫০০ মিলিগ্রাম থেকে ২০০০ মিলিগ্রাম পটাশিয়াম দিতে হবে। হিমোডায়ালাইসিস রোগীকে দিতে হবে ২৭০০ মিলিগ্রাম এবং পেরিটনিয়েল ডায়ালাইসিস হলে ৩০০০ থেকে ৩৫০০ মিলিগ্রাম। প্রাণিজ প্রোটিন, অনেক ফল এবং শাকসবজিতে পটাশিয়াম বেশি থাকে। সুতরাং এগুলো বাদ দিতে হবে। অনবরত চলমান পেরিটনিয়েল ডায়ালাইসিস রোগীদের পটাশিয়াম সীমিত করার প্রয়োজন নেই।

সোডিয়াম

শরীরে রস, উচ্চরক্তচাপ এবং হার্ট ফেইলুরের কারণে লবণ নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। ডায়ালাইসিস হয়নি এমন উচ্চ রক্তচাপসম্পন্ন রোগীকে এক গ্রাম সোডিয়াম দৈনিক দেয়া যেতে পারে। তবে সোডিয়ামের অভাব থাকলে দুই গ্রাম দৈনিক দিতে হবে। হিমোডায়ালাইসিস চলছে এমন রোগীদের দৈনিক দিতে হবে ১·০ থেকে ১·৫ গ্রাম। পেরিটনিয়েল ডায়ালাইসিস রোগীদের ২·০ থেকে ৩·০ গ্রাম। অনবরত চলমান পেরিটনিয়েল ডায়ালাইসিস রোগীদের সোডিয়াম নিয়ন্ত্রণ করার দরকার নেই। তবে রক্তচাপ কম হলে সোডিয়াম দিতে হবে।

ফসফরাস

ইউরিয়া বেশি রোগীদের ক্রমান্বয়ে ফসফরাস লেভেল সেরামে বাড়তে থাকে এবং রোগীর এসিডোসিস হয়। ফসফরাস লেবেল নিয়ন্ত্রণ করার জন্য দিনে ৬০০ থেকে ১২০০ মিলিগ্রাম ফসফরাস খাদ্যে দিতে হবে। ডেইরির উৎপাদিত খাবার সীমিত করতে হবে যেহেতু তাদের মধ্যে বেশি ফসফরাস থাকে এবং তাতে ক্যালসিয়ামের মাত্রা কমবে। অ্যালুমিনিয়াম হাইড্রোঅক্সাইড জেল প্রায়ই দেয়া হয় অন্ত্রে ফসফেটকে বন্ধন করার জন্য।

ক্যালসিয়াম

কিডনি ফেইলুরে সাধারণত ক্যালসিয়ামের মাত্রা কমে যায় এবং কিডনির ক্ষতি হয়। সাধারণত প্রোটিন ও ফসফরাস সমৃদ্ধ খাবার সীমিত করার কারণে ক্যালসিয়ামও কমে যায়। সেরাম ক্যালসিয়াম লেভেল নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে এবং এটি সাপ্লিমেন্ট করতে হবে ও স্বাভাবিক মাত্রায় আনতে হবে। ক্রনিক ইউরেমিক রোগীকে দিনে ১·২ থেকে ১·৬ গ্রাম এবং ডায়ালাইসিস রোগীকে ১·০ গ্রাম দিতে হবে।

খনিজ

শুধু খাদ্য আয়রন এবং ট্রেস মিনারেলসের চাহিদা মেটাতে পারে না। সুতরাং খনিজ সাপ্লিমেন্ট করতে হবে। কিডনি ফেইলুরে খাওয়ার অরুচি হয়। সেক্ষেত্রে জিংক সাপ্লিমেন্ট করলে রুচির পরিবর্তন ঘটে।

ভিটামিন

ডায়ালাইসিসের সময় ভিটামিন সি এবং বি শরীর থেকে বের হয়ে যায়। এই ভিটামিনগুলো কম খাওয়া হয়। কারণ কাঁচা শাকসবজি সীমিত করা হয় এবং খাদ্য অনেক পানির মধ্যে রান্না করা হয় পটাশিয়ামের মাত্রা কমানোর জন্য। ফলিক এসিড এবং এসময়ে পাইরিডক্সিনের প্রয়োজন ও এটি প্রয়োজন হয় অন্যান্য ওষুধের বিপরীত কার্যকারিতার জন্য। ভিটামিন ডি’র বিপাক ক্রিয়ায় ব্যাঘাত ঘটে। কারণ ফেইলুর হওয়া কিডনি ভিটামিন ডি-কে অ্যাকটিভ ফর্মে নিতে পারে না। সুতরাং সব ভিটামিনস সাপ্লিমেন্ট করতে হয়।

পানি

ক্রনিক কিডনি ফেইলুরে পানি গ্রহণ নিবিড়ভাবে মনিটর করতে হবে। যদি উচ্চরক্তচাপ বা ইডিমা না থাকে, তবে দৈনিক ৫০০ মিলিলিটার যোগ করে যে পরিমাণ প্রশ্রাব হয় তা দিতে হবে। দেড় থেকে তিন লিটার পর্যন্ত দেয়া যেতে পারে। যদি প্রশ্রাব একেবারেই না হয় বা কম হয় তাহলে পানি দেড় লিটারের নিচে সীমিত রাখতে হবে। ডায়ালাইসিস হওয়া রোগীর ওজন দৈনিক এক পাউন্ড পর্যন্ত বাড়তে দেয়া যেতে পারে। অনবরত পেরিটোনিয়েল ডায়ালাইসিস নেয়া রোগীর পানি সীমিত করার প্রয়োজন নেই, কারণ তারা পানির পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে ডায়ালাইসেট থেকে।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: