অতিথি সেবা

মানুষ সামাজিক জীব। কারো পক্ষেই এই পৃথিবীতে একা বেঁচে থাকা সম্ভব নয়। তাই এ ধরা বুকে বেঁচে থাকতে মানুষ একে অন্যের সাহায্য নেয়। কাছে আসে বিপদে-আপদে। আর এই কাছে আসার মধ্য দিয়েই মানুষের মধ্যে গড়ে ওঠে হৃদয়ের এক গভীর ভালোবাসা ও টান। আর এমনই এক ভালোবাসা ও টান থেকেই মানুষ আবদ্ধ হয়ে পড়ে আত্মীয়তার বন্ধনে। এসব মিলিয়েই মানুষের একে অন্যের কাছে যাওয়া-আসা করতেই হয়। আর এই সূত্রেই মানুষকে অহরহ একে অন্যের ঘরে মেহমান হতে হয়। এ ক্ষেত্রে প্রয়োজন হয় মেজবানের মানবীয় গুণ আন্তরিকতা ভালোবাস এবং আপ্যায়নের। মেহমানের আপ্যায়নে যেন কোনো মেজবানের মনে সঙ্কীর্ণতা না আসে। সে জন্য মেহমানদারির প্রতি অনেক গুরুত্ব দিয়েছেন প্রিয় নবীজী। সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব রূপে এ ধরা বুকে আগমনকারী হজরত মুহাম্মদ সাঃ উম্মতকে তাদের জীবনের প্রতিটি বিষয় সম্পর্কে শিক্ষা দিয়েছেন। মানবতার উচ্চতর শিক্ষায় শিক্ষিত করেছেন তিনি তার সাহাবিদের, যারা ছিলেন পরবর্তী উম্মতের জন্য অনুসরণীয় ব্যক্তিত্ব। মেহমানের সেবা করা যে কত উত্তম আমল তাও শিক্ষা দিয়েছিলেন রাসূল সাঃ তাঁর সাহাবিদের, যা আজ আমাদের সামনে রাসূল সাঃ-এর হাদিসের ভাণ্ডারে বিদ্যমান। এ মর্মে রাসূল সাঃ ইরশাদ করেন, ‘যে আল্লাহ এবং পরকালের ওপর ঈমান আনে সে যেন মেহমানের সেবা করে।’

ওই হাদিসের আলোকে এ কথা স্পষ্ট বুঝে আসে যে, মেহমানের সম্মান করা একজন মুমিনের কর্তব্য। এ রকম অসংখ্য হাদিস দ্বারা রাসূল সাঃ উম্মতকে অতিথিপরায়ণ হতে উৎসাহিত করেছেন। ইতিহাস সাক্ষী, রাসূল সাঃ শুধু উৎসাহিত করেই ক্ষান্ত ছিলেন না, বরং সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ অতিথিপরায়ণ ছিলেন হজরত মুহাম্মদ সাঃ। তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হলো রাসূল সাঃ কর্তৃক বাদশাহ নাজ্জাশির দূতের সম্মান করা। আরব মরুভূমির একটি অঞ্চলকে ‘হাবশা’ বলে ডাকা হতো। রাসূল সাঃ-এর প্রাণপ্রিয় সাহাবায়ে কেরাম মক্কার কাফিরদের অমানবিক নির্যাতনে যেখানে হিজরত করে আশ্রয় গ্রহণ করেছিলেন। সেই হাবশা দেশের বাদশাহর নাম হলো বাদশা নাজ্জাশি। তিনি একবার মদিনায় রাসূল সাঃ-এর খেদমতে একজন দূত পাঠালেন। নবীকুলের বাদশাহ হজরত মুহাম্মদ সাঃ বাদশাহর প্রেরিত দূতকে পেয়ে তিনি তাকে মেহমান বানালেন। মেহমান হিসেবে তার যথাযথ আপ্যায়নও করলেন। নিজের হাতে করলেন তার সেবাযত্ন। রাসূল সাঃ-এর এমন আচরণ দেখে সাহাবায়ে কেরাম এসে বললেন, ‘ইয়া রাসূলুল্লাহ! আপনি আরাম করুন। আমরা মেহমানের সেবাযত্ন করব।’ তখন রাসূল সাঃ বললেন, ‘আমার সাহাবারা মক্কার কাফিরদের অমানবিক অত্যাচারে দিশেহারা হয়ে হাবশায় হিজরত করেছিলেন। আর হাবশার বাদশাহ তাদেরকে সম্মানের সাথে আশ্রয় দিয়েছিলেন। তাই আমার কর্তব্য হলো, নিজ হাতে হাবশার মেহমানের সেবাযত্ন করা।’

মেহমানের প্রতি এমনই সম্মানজনক আচরণ করতেন হজরত মুহাম্মদ সাঃ। নিজের সব স্বার্থ বিলিয়ে দিয়ে হলেও যেন মেহমানের মন রক্ষা করা যায়­ এমন মানসিকতাই ছিল সব সময় রাসূল সাঃ-এর। তাই তো নিজে না খেয়ে সপরিবারে অনাহারে থেকে মেহমানকে পেটভরে খাওয়ানোর মতো অনেক ঘটনা রয়েছে প্রিয় নবীজীর জীবনে। বনু গিফার গোত্রের একজন লোক একদা রাসূল সাঃ-এর মেহমান হলেন। ঘটনাচক্রে ওই রাতে রাসূল সাঃ-এর ঘরে শুধু বকরির দুধ ছাড়া আর কিছুই ছিল না। এ দিকে আবার এর আগের দিনও প্রিয় নবীজীর অনাহারে কেটেছে। দুই দিনের অনাহারী হওয়া সত্ত্বেও মেহমানের সম্মানার্থে অতিথিপরায়ণ প্রিয় নবীজী সবটুকু দুধ মেহমানকে খাওয়ালেন এবং নিজে ক্ষুধার্তই রয়ে গেলেন। আবার মেহমানকে বুঝতেও দিলেন না তিনি ক্ষুধার্ত। রাসূল সাঃ মেহমানদারির এমন বিরল দৃষ্টান্ত আজো উম্মতের সামনে চিরস্মরণীয় হয়ে আছে, যা মেহমানদারির প্রেরণা জোগায় তার লাখো কোটি উম্মতের অন্তরে। সেই প্রেরণায় অনুপ্রাণিত হয়ে আজো মানুষ মেহমানদারি করে উজাড় মনে। ইতিহাসের পাতা খুঁজলে রাসূল সাঃ-এর এমন আতিথেয়তার অনেক ঘটনা পাওয়া যায়।

একবার এক কাফির রাসূল সাঃ-কে কষ্ট দেয়ার উদ্দেশ্যে তাঁর ঘরে মেহমান হলো। রাত্রিবেলা তার সামনে খাবার দেয়া হলে ধীরে ধীরে সে রাসূল সাঃ-এর ঘরে বিদ্যমান সব খানাটুকুই খেয়ে ফেলল। খাবারান্তে রাসূল সাঃ তাকে সুন্দর বিছানা বিছিয়ে দিলে অত্যন্ত আরামের সাথেই সেই বিছানায় সে ঘুমিয়ে পড়ল। অধিক ভক্ষণের কারণে রাতে তার খুবই বেহালদশা হলো। একপর্যায়ে সে রাসূলের মোবারক হাতে তাকে বিছিয়ে দেয়া বিছানাটা পর্যন্ত সম্পূর্ণ নষ্ট করে ফেলল। এবং শেষ রাতে রাসূল সাঃ-এর অজান্তেই চুপিসারে সে পালিয়ে গেল। তবে পালিয়ে যাওয়ার সময় তার মূল্যবান তলোয়ারটি সে ভুলে ফেলে গেল। ভোরে নবীজী মেহমানের খোঁজ নিতে এসে দেখেন মেহমান উধাও। আবার বিছানার করুণ অবস্থা। এমন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে রাসূল সাঃ-এর মনে কষ্ট অনুভব হলো! আহ, রাতে বেচারা মেহমানের কত কষ্টই না হয়েছে। অথচ আমি তার কোনো প্রকার খোঁজখবর নিতে পারিনি। এমন ভাবনা ভাবতে ভাবতে রাসূল সাঃ মেহমানের নষ্ট করে যাওয়া বিছানা পরিষ্কারের কাজে লিপ্ত হলেন। এ দিকে ফেলে যাওয়া তলোয়ারের খোঁজে এসে সেই কাফির দেখতে পেল রাসূল সাঃ তার ময়লা করে যাওয়া বিছানা পরিষ্কারের কাজে ব্যস্ত। কাফির চিন্তায় পড়ে গেল। না জানি কী প্রতিশোধ নেন রাসূল সাঃ তার থেকে। এই ভেবে তলোয়ারটি নেয়ার জন্য একবার সে রাসূল সাঃ-এর সামনে এলো। তাকে দেখে রাসূল সাঃ সুন্দর ভাষায় বললেন, ‘কী খবর? রাতে তোমার অনেক কষ্ট হয়েছে মনে হয়। আমাকে ডাকলে না কেন? তোমার তলোয়ার তো ফেলে গেছো। এই নাও তোমার তলোয়ারটি।’ রাসূল সাঃ-এর এমন আচরণ দেখে সেই কাফির তো হতবাক। মানুষ কি এমন হতে পারে? কোথায় ভর্ৎসনা, কোথায় তিরস্কার! ইসলামের নবীর এ কী অমায়িক ব্যবহার! কোনো মানুষ কি এত উত্তম চরিত্রের অধিকারী হতে পারে? মেহমানকে কি কেউ এমন সম্মান করতে পারে? লজ্জায় অনুশোচনায় কাফির যারপরনাই অনুতপ্ত হলো। রাসূল সাঃ-এর এমন মধুর ব্যবহারে তার হৃদয়ে রাসূল সাঃ-এর প্রতি সৃষ্টি হলো গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা। রাসূলের দু’টি হাত ধরে কালেমা পাঠ করে ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আশ্রয় নিয়ে সাহাবায়ে রাসূল হওয়ার সৌভাগ্য লাভ করল।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: