বাংলা ও আরবি ভাষার সম্পর্ক নিবিড়

আমাদের মায়ের ভাষা বাংলা। এ ভাষায় আমরা মনের ভাব প্রকাশ করি। এ ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য হয়েছে রক্তস্রাত সংগ্রাম। অন্যদিকে মুসলিম হিসেবে আমাদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ আল কোরআন এবং প্রিয় নবী হজরত মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ভাষা আরবি। একটি ভাষার সঙ্গে আমাদের জন্মগত সম্পর্ক, অন্যটির সঙ্গে ধর্মগত সম্পর্ক। কিন্তু এই দুই ভাষার মাঝে কি কোনো সম্পর্ক রয়েছে? থাকলে সে সম্পর্কের স্বরূপ কী—এটি জানতেই ৮ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় গিয়েছিলাম অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান মোল্লার কাছে। ‘বাংলা ও আরবি ভাষার ভাষাতাত্ত্বিক সম্পর্ক’ শিরোনামে সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি থিসিস সম্পন্ন করে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেছেন।

আলোচনায় তার থিসিসের নানা অনুষঙ্গ, দুই ভাষার সম্পর্কের নানা দিক উঠে এসেছে। তার পরিষ্কার কথা—বাংলা ও আরবি ভাষা হিসেবে ভিন্ন গোত্রীয় দু’টি ভাষা নয়, বরং ভাষা দুটি একই গোত্রের। উত্পত্তি, বর্ণ, শব্দ ও প্রয়োগরীতি— সম্পর্কের সব সূত্র থেকেই আরবি ও বাংলার সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর ও নিবিড়। এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি জানান, চট্টগ্রাম অঞ্চলের আদিভাষার ৭০ শতাংশ শব্দ, বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলের আদিভাষার ৬০ শতাংশ শব্দ এবং গোটা বাংলাদেশের প্রায় সব এলাকার দৈনন্দিন ভাষার প্রায় ৫০ শতাংশ শব্দ (প্রকৃত ও রূপান্তরিত উচ্চারণে) আরবি থেকে নেয়া। তবে বর্তমানে কথিত শিক্ষিত শ্রেণীর মুখের ভাষায় আরবি শব্দগুলোর পরিবর্তে ইংরেজি শব্দের ব্যবহার হচ্ছে বেশি। অবশ্য বাংলাভাষী জনতার ভাষায় এখনও আরবি শব্দের প্রাচুর্য ও মাধুর্যপূর্ণ ব্যবহার ব্যাপক।
সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজে আরবি ও ইসলামিক স্টাডিজের সহকারী অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান মোল্লা প্রায় ১২ বছর সময় ব্যয় করেছেন এ থিসিস সম্পন্ন করতে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগের সাবেক বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক আ ত ম মুছলেহুদ্দীনের তত্ত্বাবধানে তার এ থিসিস তৈরিতে সহকারী তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন আরবি বিভাগের বর্তমান চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. ছিদ্দীকুর রহমান নিজামী। ড. মোল্লা ২০০৮ সালে এওয়ার্ড লাভ করেন। প্রায় ৬০০ পৃষ্ঠা সংবলিত তার থিসিসের অধ্যায় ছয়টি। ১. ভাষাতত্ত্ব, ২. ভাষার উত্পত্তি (বাংলা ও আরবি), ৩. বর্ণ, ৪. লিপি, ৫. শব্দ এবং ৬. বাক্য বা প্রয়োগরীতি। তার থিসিসের পরীক্ষক ছিলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. এএমএম শরফুদ্দীন। দু’জনই আরবির শিক্ষক।
অন্য এক প্রশ্নের জবাবে ড. মোল্লা বলেন, তার থিসিসে তিনি বাংলা ভাষার উত্পত্তি নিয়ে ড. সুনীতি কুমার, ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ও ড. এনামুল হকের বক্তব্য ও বিশ্লেষণ তুলে ধরেছেন। তাদের বর্ণিত নীতি অনুসরণ করে পরিচালিত তার গবেষণাকর্মে সাব্যস্ত হয়েছে যে, ভাষা হিসেবে বাংলার উত্পত্তি ও প্রধান ঋণ আরবি ভাষা থেকে, আরবি ভাষার প্রতি সংস্কৃত থেকে নয় এবং সংস্কৃতের প্রতি নয়। তার মতে, সংস্কৃত কখনও মানুষের ভাষা ছিল না, ছিল সীমিত ধর্মীয় পরিমণ্ডলের মাঝে আবদ্ধ। সংস্কৃতের স্বতন্ত্র কোনো লিপিও নেই, সে ভাষার লিপি হচ্ছে ব্রাহ্মী লিপি। কিন্তু সংস্কৃত থেকে বাংলায় যে শব্দভাণ্ডার এসে যুক্ত হয়েছে, তা হয়েছে অনেক পর। বাংলা অন্যতম প্রাচীন ভাষা। পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাচীন ভাষা আরবি থেকেই বাংলা ভাষার বিপুল সমৃদ্ধি ঘটছে।
তবে তিনি এও বলেন, ভাষা হচ্ছে বহমান নদীর মতো। চলমান-প্রবহমান। বাংলা ভাষার বর্তমান রূপটির মাধুর্য প্রশ্নতীত। উত্পত্তিগতভাবে আরবি থেকে রূপান্তর, সমৃদ্ধি সবই যেমন ঘটেছে তেমনি স্বাভাবিক ধারায় চলতে চলতে বাংলা ভাষা এখন যে জায়গায় এসেছে সে দিকটি অবশ্যই আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ।
ড. মোল্লার থিসিস ও আলোচনায় যে বাস্তবতা ফুটে ওঠেছে সেটি হচ্ছে, বাংলা ভাষার সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক কেবলই জন্মগত নয়, ধর্মগতও। নতুনভাবে তুলে ধরা বিশেষত্বের এ দিকটিও আমাদের মাতৃভাষার একটি অনন্য মর্যাদাকে চিহ্নিত করে।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: