নিজের প্রয়োজনে গুগল সার্চ

যে কোনো তথ্য-উপাত্ত বা সাহায্য-সহযোগিতা, সবকিছুতেই গুগল আপনাকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিচ্ছে। এক কথায় যদি কাউকে একটা প্লাটফর্ম ভাবা যায়, তবে এখন পর্যন্ত গুগল সেই ভূমিকায় সর্বসেরা। কী নেই তাদের সেবায়, সর্বশ্রেষ্ঠ সার্চ ইঞ্জিন, সিউকিউরড মেইল সার্ভিস, ইউটিউব ভিডিও, ওয়ার্ল্ডওয়াইড গুগল ম্যাপ, অরকুট, বাজ, ব্লগারসসহ আরও অনেক অনেক উপকারী সেবা।

গুগলকে ব্যবহার করে কীভাবে যেকোন তথ্য বের করে আনা যায়, সেটা গুগলের থেকেই হোক বা অন্য কোনো সাইট থেকেই হোক। আবহাওয়া
গুগলের মাধ্যমে যেকোনো শহরের আবহাওয়া জানতে ‘weather’ লিখে স্পেস দিয়ে শহরের নাম এবং অতঃপর দেশের কোড নেম লিখতে পারেন। যেমন বাংলাদেশের ক্ষেত্রে weatherdhaka,bd লিখে সার্চ দিন। পেয়ে যাবেন আপনার কাঙ্ক্ষিত আবহাওয়ার সংবাদ।

সময়
বিশ্বের বিভিন্ন স্থানের এখন সময় জানতে আপনি দেখতে পারেন গুগলের টাইম সার্চ ফিচারটি। এক্ষেত্রে আপনাকে টাইপ করতে হবে ‘time’ এবং শহরের নাম বা দেশের নাম। যেমন : ime uae লিখে সার্চ দিলে আপনি বাংলাদেশের সময় থেকে ২ ঘণ্টা সময় পেছনে পাবেন এবং সময় অবশ্যই ২৪ ঘণ্টা ফরমেটে পাবেন।

সূর্যোদয় বা সূর্যাস্ত
বিভিন্ন দেশের বা শহরের সূর্যাস্ত বা সূর্যোদয় জানতে টাইপ করুন ‘sunrise’ অথবা ‘sunset’, তারপর শহরের নাম লিখুন। সার্চ দিন আপনার সামনে হাজির হয়ে যাবে সঙ্গে সঙ্গে। এর সঙ্গে আরও জানবেন সেই সময় থেকে আপনার আর কত সময় হাতে আছে।

পরিমাপের পরিবর্তন
আপনি চাইলে গুগলের কনভার্টারকে ব্যবহার করতে পারেন। যেমন ধরুন আপনাকে ইঞ্চি থেকে সেন্টিমিটারে কনভার্ট করতে হলে আপনাকে লিখতে হবে ১ রহপয রহ পস, যেখানে আপনি ১ ইঞ্চিকে সেন্টিতে পরিণত করার জন্য বুঝিয়েছেন। তাহলে গুগলই আপনাকে মুহূর্তের মধ্যে জানিয়ে দেবে যে, ২.৫৪ সেন্টিতে ১ ইঞ্চি। এছাড়াও আপনি যেকোন পরিমাপের কনভার্ট করতে গুগলকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারেন।

জনসাধারণের তথ্য
জনসংখ্যা থেকে শুরু করে যেকোন হালনাগাদকৃত তথ্য পেতে গুগল আরও এক ধাপ এগিয়ে। যেমন আপনি এখন বাংলাদেশের সর্বশেষ গণনাকৃত জনসংখ্যা জানতে চাইছেন, শুধু ‘population’ লিখে দেশের নাম বাংলাদেশ লিখুন সার্চ বক্সে এবং এন্টার চাপুন সঙ্গে সঙ্গেই পেয়ে যাবেন প্রায় ১৬ কোটি ২২ লাখ ২০ হাজার ৭৬২ জন, যা ২০০৯ সালে গণনা করা হয়েছিল। এছাড়াও জানতে পারেন বেকার জনসংখ্যা ও তা জানতে পারেন ‘nemployment rate’ তারপর দেশের নাম লিখে।

হারানো মানুষকে খুঁজুন
আপনার ছোট বেলার কোন বন্ধুকে খুঁজে পেলেও পেতে পারেন এই গুগলের মাধ্যমে। যেমন কোনো নাম লিখে সার্চ দিলে একটা লিস্ট আসবে। এভাবে প্রোফাইল ইনফো পেয়েও যেতে পারেন।

একই বিভাগের অন্যান্য সাইট
‘related:’ লিখে আপনি যেই সাইটের মতো আরও সাইট খুঁজছেন, তা লিখে সার্চবক্সে গিয়ে এন্টার দিন। যেমন related:amardeshonline.com লিখে সার্চ দিলে টিটির মতো আরও একই টাইপের সাইটগুলোকে পেয়ে যাবেন।
এছাড়াও যেকোন তথ্য খুঁজে পেতে পারেন আপনার বুদ্ধিমত্তাকে কাজে লাগিয়ে।

শীতের শাকসবজি ও ফলমূলের ঔষধি গুণ

প্রকৃতিই হলো আমাদের জ্ঞান-বিজ্ঞানের মূল আধার। সৃষ্টিকর্তা অপরূপ সৌন্দর্যে নিখুঁতভাবে সৃষ্টি করেছেন এই প্রকৃতি। প্রকৃতিকে যিনি যত বেশি ভালোভাবে অনুধাবন করতে পেরেছেন, যিনি প্রকৃতিকে বোঝার জন্য যত বেশি চেষ্টা করেছেন তিনিই নিজেকে একজন আদর্শ ব্যক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছেন। অ্যান্টিবায়োটিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের এক অসাধারণ আবিষ্কার। আর এই আবিষ্কারের পেছনেও রয়েছে প্রকৃতির দেয়া তথ্য অনুধাবন করা। পেনিসিলিন নামক অ্যান্টিবায়োটিক আবিষ্কারের ইতিহাস আমরা সবাই জানি। বিজ্ঞানী আলেকজান্ডার ফ্লেমিং গবেষণাগারে ছোট ছোট কাচের পাত্রে ব্যাকটেরিয়ার কালচার (চাষ বা বংশ বৃদ্ধি) করতেন। একদিন তিনি দেখলেন যে, তার কালচার করা একটি পাত্রের এক পাশে এক প্রকার ছত্রাক জন্ম দিয়েছে, যা এর আশপাশের সব ব্যাকটেরিয়া মেরে ফেলেছে। তিনি প্রকৃতির এই ভাষা বোঝার জন্য আত্মনিয়োগ করলেন। তিনি গবেষণা করে বুঝতে পারলেন যে,্‌ এটি ছিল পেনিসিলিয়ান জাতীয় ছত্রাক এবং এর রয়েছে ব্যাকটেলিয়া ধ্বংসকারী ক্ষমতা। আর এই ছত্রাক থেকে তিনি প্রস্তুত করেন পেনিসিলিন নামক অ্যান্টিবায়োটিক। প্রকৃতির না বলা নিশ্চুপ ভাষা বুঝতে পারার ফলে তিনি সফল হয়েছিলেন পেনিসিলিন নামক অ্যান্টিবায়োটিক আবিষ্কার করতে।

ওপরের এই ঘটনা প্রকৃতির ভাষা অনুধাবন করা ও নিজেকে সফল বিজ্ঞানী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার এক আদর্শ উদাহরণ। বর্তমানে আমাদের মাঝে প্রকৃতি নিয়ন্ত্রণের ব্যাপক প্রচেষ্টা চলছে। আমাদের মাঝে শীতের সবজি (যেমন-টমেটো) গ্রীষ্মে এবং গ্রীষ্মের ফল (আম, তরমুজ) শীতে ফলানোর এক অসুস্থ প্রবণতা জন্ম নিয়েছে এবং ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে। কিন্তু আমরা ভেবে দেখি না, গ্রীষ্মের ফলগুলো আমাদের শীতের দিনে গ্রহণের কোনো প্রয়োজন নেই। গরমের দিন আমরা সাধারণত একটু বেশি ঘামি। ফলে দেহ থেকে বেশি পরিমাণ লবণ ও পানি বের হয়ে যায়। আর এই লবণপানির ঘাটতি পূরণ ও ভারসাম্য রক্ষার জন্য সৃষ্টিকর্তা তখন প্রকৃতিতে ফলান অসংখ্য রসাল ফল। শীতের দিনে যেগুলো গ্রহণ বিলাসিতা ও অপচয় ছাড়া কিছু নয়। কারণ গ্রীষ্মের ফলের সে টাকায় আমরা প্রায় তিন গুণ পরিমাণ শীতের সবজি কিনতে পারব, যা নিশ্চিত করবে আমাদের সুস্বাস্থ্য, মেটাবে পুষ্টি ঘাটতি। শীতের দিনের কিছু শাকসবজি ও ফলমূলের ঔষধি গুণ নিয়েই তৈরি করা হয়েছে এই প্রবন্ধ।

টমেটোঃ টমেটো শীতের দিনের এক অসাধারণ সবজি, যা সবার নজর কাড়ে এবং স্বাদেও অতুলনীয়। টমেটোর এত সুন্দর বর্ণ তাতে থাকা লাইকোপেনের জন্য হয়ে থাকে। লাইকোপেন টমেটোর মূল কার্যকর রাসায়নিক উপাদান এবং অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট গুণসম্পন্ন। তাই টমেটো ক্ষতিকর এলডিএল’র অক্সিডেশন প্রতিরোধ করে আমাদের হৃৎপিণ্ডকে সুস্থ ও সবল রাখে। তা ছাড়া টিউমার ও ক্যান্সার প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণেও টমেটো সহায়তা করে।

বাঁধাকপি, ফুলকপি, ব্রকলি ও মুলাঃ সবই শীতের খুবই সুস্বাদু সবজি। এ সবজিগুলোতে রয়েছে সালফোর্যাফেন ও ইনডোল-৩ কার্বিনল, যা ক্যান্সার প্রতিরোধে এবং ক্যান্সার কোষ ধ্বংসে কার্যকর। এ সবজিগুলোর মধ্যে মুলাকে আমরা অনেকেই হেয় করে থাকি এবং নিুমানের সবজি মনে করি। অথচ এই মুলা ক্যান্সার প্রতিরোধের পাশাপাশি পেটের সমস্যা ও প্রস্রাবের সমস্যা নিরসনে সহায়তা করে। তাই শীতে এই সবজিগুলো আমাদের বেশি বেশি গ্রহণ করা উচিত।

গাজরঃ গাজর শীতের আরেক আকর্ষণীয় সবজি। এর রঙ আমাদের সবাইকে আকর্ষণ করে। আর এই সুন্দর বর্ণের মধ্যে রয়েছে এর ঔষধি গুণ। গাজরের এই রঙের কারণ হলো এতে থাকা বিটাক্যারোটিন। বিটাক্যারোটিন আমাদের দেহের ভেতরে রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে রেটিনল বা ভিটামিন-এ তে পরিণত হয়। আর এই ভিটামিন-এ আমাদের দৃষ্টিশক্তি স্বাভাবিক রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। শুধু তাই নয়, চোখের পাশাপাশি গাজর আমাদের ত্বকের সুরক্ষাও প্রদান করে। গাজরের বিটাক্যারোটিন আমাদের ত্বককে সূর্যের অতি বেগুনি রশ্মির হাত থেকে সুরক্ষা দেয় এবং ত্বককে ক্যান্সারের হাত থেকে রক্ষা করে।

পালংশাকঃ শীতের সবজিগুলোর মধ্যে আরেকটি পুষ্টিকর সবজি হলো পালংশাক। এতে রয়েছে ভিটামিন, এ, সি, ই-সহ আরো অনেক ভিটামিন ও খনিজ। তাই আমাদের দেহের পরিপূর্ণ পুষ্টি ও সুস্বাস্থ্য রক্ষার জন্য পালংশাক খুবই প্রয়োজনীয়।

আঙুরঃ শীতের ফলের মধ্যে আঙুর অন্যতম। আঙুরে রয়েছে রেসভেরাট্রল ও প্রোএন্থোসায়ানিডিন নামক অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট। তাই আঙুর ক্যান্সার প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে কার্যকর। এ ছাড়া অকালবার্ধক্য প্রতিরোধে আঙুর অদ্বিতীয়।

আমলকীঃ শীতের ফলগুলোর মধ্যে আমলকী আরেকটি সুস্বাদু ফল। আমলকীকে বল হয় ভিটামিন ‘সি’ এর রাজা। আর এই ভিটামিন ‘সি’ আমাদের ত্বকের সুরক্ষা, মাঢ়ি মজবুত করতে এবং ক্যান্সার প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা পালন করে।

কমলালেবুঃ কমলালেবু ভিটামিন ‘সি’ সমৃদ্ধ এক অনন্য ফল। কমলালেবু আমাদের ত্বককে সুরক্ষা করতে সহায়তা করে। আমরা সবাই কমলালেবুর শুধু ভেতরের রসাল অংশ খেয়ে থাকি এবং এর বাকল ফেলে দিই। অথচ এই বাকলে রয়েছে প্রচুর পেকটিন, যা আমাদের পরিপাকতন্ত্রের ক্যান্সার প্রতিরোধে সহায়তা করে। তাই কমলা বাকলসহ জুস করে খাওয়া অধিক স্বাস্থ্যসম্মত, পুষ্টিকর ও ঔষধি গুণসম্পন্ন।

আমাদের সবারই সব ঋতুর সব ফল ও সবজি অন্তত একবার গ্রহণ করা উচিত। কারণ প্রতিটি ফল ও সবজির রয়েছে আলাদা আলাদা ঔষধি ও পুষ্টিগুণ। তাই আসুন আমরা আমাদের চার পাশের শাকসবজি ও ফলমূলের ঔষধি পুষ্টিগুণ জানি এবং এগুলো গ্রহণের মাধ্যমে সুস্থ ও সুন্দর জীবন লাভ করি।

 

বাংলা ও আরবি ভাষার সম্পর্ক নিবিড়

আমাদের মায়ের ভাষা বাংলা। এ ভাষায় আমরা মনের ভাব প্রকাশ করি। এ ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য হয়েছে রক্তস্রাত সংগ্রাম। অন্যদিকে মুসলিম হিসেবে আমাদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ আল কোরআন এবং প্রিয় নবী হজরত মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ভাষা আরবি। একটি ভাষার সঙ্গে আমাদের জন্মগত সম্পর্ক, অন্যটির সঙ্গে ধর্মগত সম্পর্ক। কিন্তু এই দুই ভাষার মাঝে কি কোনো সম্পর্ক রয়েছে? থাকলে সে সম্পর্কের স্বরূপ কী—এটি জানতেই ৮ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় গিয়েছিলাম অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান মোল্লার কাছে। ‘বাংলা ও আরবি ভাষার ভাষাতাত্ত্বিক সম্পর্ক’ শিরোনামে সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি থিসিস সম্পন্ন করে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেছেন।

আলোচনায় তার থিসিসের নানা অনুষঙ্গ, দুই ভাষার সম্পর্কের নানা দিক উঠে এসেছে। তার পরিষ্কার কথা—বাংলা ও আরবি ভাষা হিসেবে ভিন্ন গোত্রীয় দু’টি ভাষা নয়, বরং ভাষা দুটি একই গোত্রের। উত্পত্তি, বর্ণ, শব্দ ও প্রয়োগরীতি— সম্পর্কের সব সূত্র থেকেই আরবি ও বাংলার সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর ও নিবিড়। এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি জানান, চট্টগ্রাম অঞ্চলের আদিভাষার ৭০ শতাংশ শব্দ, বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলের আদিভাষার ৬০ শতাংশ শব্দ এবং গোটা বাংলাদেশের প্রায় সব এলাকার দৈনন্দিন ভাষার প্রায় ৫০ শতাংশ শব্দ (প্রকৃত ও রূপান্তরিত উচ্চারণে) আরবি থেকে নেয়া। তবে বর্তমানে কথিত শিক্ষিত শ্রেণীর মুখের ভাষায় আরবি শব্দগুলোর পরিবর্তে ইংরেজি শব্দের ব্যবহার হচ্ছে বেশি। অবশ্য বাংলাভাষী জনতার ভাষায় এখনও আরবি শব্দের প্রাচুর্য ও মাধুর্যপূর্ণ ব্যবহার ব্যাপক।
সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজে আরবি ও ইসলামিক স্টাডিজের সহকারী অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান মোল্লা প্রায় ১২ বছর সময় ব্যয় করেছেন এ থিসিস সম্পন্ন করতে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগের সাবেক বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক আ ত ম মুছলেহুদ্দীনের তত্ত্বাবধানে তার এ থিসিস তৈরিতে সহকারী তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন আরবি বিভাগের বর্তমান চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. ছিদ্দীকুর রহমান নিজামী। ড. মোল্লা ২০০৮ সালে এওয়ার্ড লাভ করেন। প্রায় ৬০০ পৃষ্ঠা সংবলিত তার থিসিসের অধ্যায় ছয়টি। ১. ভাষাতত্ত্ব, ২. ভাষার উত্পত্তি (বাংলা ও আরবি), ৩. বর্ণ, ৪. লিপি, ৫. শব্দ এবং ৬. বাক্য বা প্রয়োগরীতি। তার থিসিসের পরীক্ষক ছিলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. এএমএম শরফুদ্দীন। দু’জনই আরবির শিক্ষক।
অন্য এক প্রশ্নের জবাবে ড. মোল্লা বলেন, তার থিসিসে তিনি বাংলা ভাষার উত্পত্তি নিয়ে ড. সুনীতি কুমার, ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ও ড. এনামুল হকের বক্তব্য ও বিশ্লেষণ তুলে ধরেছেন। তাদের বর্ণিত নীতি অনুসরণ করে পরিচালিত তার গবেষণাকর্মে সাব্যস্ত হয়েছে যে, ভাষা হিসেবে বাংলার উত্পত্তি ও প্রধান ঋণ আরবি ভাষা থেকে, আরবি ভাষার প্রতি সংস্কৃত থেকে নয় এবং সংস্কৃতের প্রতি নয়। তার মতে, সংস্কৃত কখনও মানুষের ভাষা ছিল না, ছিল সীমিত ধর্মীয় পরিমণ্ডলের মাঝে আবদ্ধ। সংস্কৃতের স্বতন্ত্র কোনো লিপিও নেই, সে ভাষার লিপি হচ্ছে ব্রাহ্মী লিপি। কিন্তু সংস্কৃত থেকে বাংলায় যে শব্দভাণ্ডার এসে যুক্ত হয়েছে, তা হয়েছে অনেক পর। বাংলা অন্যতম প্রাচীন ভাষা। পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাচীন ভাষা আরবি থেকেই বাংলা ভাষার বিপুল সমৃদ্ধি ঘটছে।
তবে তিনি এও বলেন, ভাষা হচ্ছে বহমান নদীর মতো। চলমান-প্রবহমান। বাংলা ভাষার বর্তমান রূপটির মাধুর্য প্রশ্নতীত। উত্পত্তিগতভাবে আরবি থেকে রূপান্তর, সমৃদ্ধি সবই যেমন ঘটেছে তেমনি স্বাভাবিক ধারায় চলতে চলতে বাংলা ভাষা এখন যে জায়গায় এসেছে সে দিকটি অবশ্যই আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ।
ড. মোল্লার থিসিস ও আলোচনায় যে বাস্তবতা ফুটে ওঠেছে সেটি হচ্ছে, বাংলা ভাষার সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক কেবলই জন্মগত নয়, ধর্মগতও। নতুনভাবে তুলে ধরা বিশেষত্বের এ দিকটিও আমাদের মাতৃভাষার একটি অনন্য মর্যাদাকে চিহ্নিত করে।

ক্যান্সারও প্রতিরোধযোগ্য

‘ক্যান্সার নেই অ্যান্সার’— এ কথাটির এক সময় খুব চল ছিল। ইদানীং অবশ্য তেমন জোরেশোরে একথা আর বলা হচ্ছে না। এর কারণ হচ্ছে, সব ক্ষেত্রে না হলেও অনেক ক্ষেত্রেই উত্তর কিন্তু মিলেছে। ক্যান্সারের প্রতিরোধ ও প্রতিকার সম্ভব হচ্ছে। কিন্তু ক্যান্সার কেন হচ্ছে এটা এখনও ভালোভাবে জানা যায়নি। এ বিষয়ে নিরন্তর গবেষণা চললেও বিষয়টি এখনও পরিষ্কার নয়। সুনির্দিষ্টভাবে কারণ জানা গেলে একদিন হয়তো ক্যান্সারের পুরো অ্যানসারই আমাদের আয়ত্তে চলে আসবে।

কী এই ক্যান্সার?
সাধারণভাবে আমরা জানি যে, আমাদের শরীর অসংখ্য কোষ দিয়ে তৈরি। একটা দালান তৈরিতে যেমন অসংখ্য ইট প্রয়োজন, তেমনি শরীরটাও লক্ষ-কোটি কোষের সমন্বয়ে তৈরি। পার্থক্য এই যে, ইট ও ইটের দালান জড়, শরীর ও এর কোষগুলো জীবিত। জীবন যার আছে তার মৃত্যুও আছে। তাই প্রতিদিন আমাদের শরীরে অনেক কোষ মরে যায়, আর তাদের জায়গা নেয় নতুন নতুন কোষ। নতুন কোষগুলো কিন্তু তৈরি হয় একটি কোষ ভেঙে দুটি এই প্রক্রিয়ায়। এই কোষ বিভাজন প্রক্রিয়া শরীরে প্রতিদিন প্রতিক্ষণ একটি সুনির্দিষ্ট নিয়মে নিয়ন্ত্রিতভাবে ঘটে যাচ্ছে। যার ফলে যেখানে যখন যেমন ধরনের কোষ প্রয়োজন তাই তৈরি হচ্ছে। প্রতিদিন লক্ষ-কোটি কোষ বিভাজনের সময় নিয়ম মেনে শুধু সুস্থ স্বাভাবিক কোষ তৈরি হচ্ছে, এমনটা বলা যাবে না। কোটি কোটি বার একই কাজ করতে গেলে ভুলের সম্ভাবনা সামান্য হলেও থাকে এবং কোষ বিভাজনের সময়ও সেটা ঘটতে পারে। এভাবেই আমাদের শরীরে কখনও কখনও অস্বাভাবিক বা অপ্রয়োজনীয় কোষের সৃষ্টি হতে পারে। কিন্তু শরীরে রয়েছে অস্বাভাবিক কোষ শনাক্ত করে তাকে ধ্বংস করে দেয়ার ক্ষমতা, যা স্বাভাবিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতারই অংশ। কোনো কারণে কোনো অস্বাভাবিক কোষ যদি শনাক্ত না হয় বা নষ্ট না হয়ে বেঁচে যায় তাহলে তা এক নতুন ধারার কোষের জন্ম দেয়, যা স্বাভাবিক নিয়ম না মেনে বিভাজন প্রক্রিয়ায় শুধু বাড়তেই থাকে। এ কোষগুলোর বেঁচে থাকা বা মৃত্যু অথবা বিভাজন সব কিছুই অনিয়ন্ত্রিত। স্বাভাবিক নিয়ম এখানে কাজ করে না, আর এভাবেই অনিয়ন্ত্রিত কোষ বৃদ্ধি ক্যান্সারের জন্ম দেয়।প্রতিরোধ গড়ে তুললে প্রতিকার সম্ভব
এই প্রক্রিয়ার ফলে যে কোনো সময় আমরা যে কেউ ক্যান্সারের ঝুঁকিতে থাকছি। তারপরও আমরা অনেকেই সুস্থ থাকছি কিন্তু কেউ কেউ থাকছি না। সঠিক কারণ জানা না থাকলেও ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয় এমন কিছু অবস্থার কথা আমরা জানি। যেমন আমাদের দৈনন্দিন চলাফেরা, আচার-আচরণ, খাদ্যাভ্যাস, ধূমপান ও তামাকের ব্যবহার, বিয়ে ও বাচ্চা নেয়ার সঠিক বয়স, বাচ্চাকে বুকের দুধ খাওয়ানো, শিল্প-কলকারখানা এবং পরিবেশগত কিছু কারণ, অন্যান্য কিছু রোগ, ভাইরাস, জীবাণু এগুলোর সঙ্গে অনেক ক্যান্সারের খুবই সম্পর্ক রয়েছে। আবার কিছু ক্যান্সার আছে যা বংশগত, জন্মগত কারণে হয়ে থাকে। বাকি ক্যান্সারগুলো কীভাবে হচ্ছে তার হদিস করা সম্ভব হয়নি। যেসব ঝুঁকিগুলোর কথা আমরা বললাম সেগুলো থেকে দূরে থাকতে পারলে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ক্যান্সার থেকে দূরে থাকা সম্ভব হবে। অর্থাত্ এক-তৃতীয়াংশ ক্যান্সার সম্পূূর্ণ প্রতিরোধযোগ্য। বাকি দুই-তৃতীয়াংশ ক্যান্সার সরাসরি প্রতিরোধ সম্ভব না হলেও তার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলে প্রতিকার করা সম্ভব।

যেভাবে প্রতিরোধ করা যায়
এ ক্ষেত্রে যা দরকার তা হলো নিজের শরীর স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতন থাকা। নিজেকে নিজে যদি আমরা নিয়মিত, এই ধরুন মাসে একবার পরীক্ষা করি তাহলে যে কোনো অস্বাভাবিকতা ছোট অবস্থায়ই চোখে বা হাতে ধরা পড়বে। শরীরের বাইরের অংশগুলো, যেমন ত্বক, হাত-পা, স্তন, মুখের ভেতর—এগুলো জায়গা নিজেরাই খেয়াল রাখা যায়। অস্বাভাবিকতা বলতে আকার আকৃতি বা রংয়ের পরিবর্তন, কোনো ক্ষত বা ঘা, কোনো পিণ্ড বা চাকা ইত্যাদি বোঝায়। এছাড়াও যে কোনো ধরনের শারীরিক কষ্ট বা লক্ষণ যদি দু’সপ্তাহের বেশি স্থায়ী হয় তাহলে সেটা পরীক্ষা করে দেখা উচিত। এভাবে সচেতন থাকলে সাধারণ সব লক্ষণের আড়ালে লুকিয়ে থাকা ক্যান্সারও শুরুতেই ধরে ফেলা সম্ভব। ‘শুরুতেই পড়লে ধরা, ক্যান্সার রোগ যায় যে সারা’ বাংলাদেশ ক্যান্সার সোসাইটির স্লোগানটি সত্য বলে প্রমাণিত হবে। অর্থাত্ রোগের শুরুতে সঠিক চিকিত্সা করে ভালো হয়ে যাবার সুযোগ থাকবে। এক্ষেত্রে প্রয়োজন ক্যান্সার বিষয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধি। ক্যান্সার কী ধরনের রোগ, কী কী কারণে ঝুঁকি বাড়ে, প্রতিরোধে কী করণীয়, প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ নির্ণয়ে আমাদের কী ভূমিকা, সরকারি বা বেসরকারি পর্যায়ে চিকিত্সক বা চিকিত্সা কর্মীদের কী ভুমিকা ইত্যাদি বিষয়কে একটি নিদিষ্ট নিয়মে নিয়ে আসা এবং সেই লক্ষ্যে যার যার অবস্থানে থেকে কাজ করে যাওয়া, আর এভাবেই ক্যান্সারের বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তোলা সম্ভব।
আসুন ক্যান্সারের বিরুদ্ধে লড়াই করি
ক্যান্সার চিকিত্সা জটিল ও ব্যয়বহুল, যা বিলম্ব হলে তেমন কার্যকরী হয় না। বাংলাদেশের মতো গরিব দেশের জন্য তাই লক্ষ্য হবে প্রতিকার নয়, এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা। ৪ ফেব্রুয়ারি প্রতিবছর ‘বিশ্ব ক্যান্সার দিবস’ পালিত হয়। ক্যান্সারের বিরুদ্ধে লড়ে যাওয়ার জন্য আন্তর্জাতিক সংগঠন ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন এগেইনস্ট ক্যান্সার (ইউআইসিসি)-র প্রতিনিধি বাংলাদেশ ক্যান্সার সোসাইটি। ৪ ফেব্রুয়ারি বিশ্ব ক্যান্সার দিবস উপলক্ষে আসুন আমরা ক্যান্সারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের সর্বাত্মক প্রচেষ্টা নেয়ার অঙ্গীকার করি এবং বিশ্বাস করতে শুরু করি যে, ‘ক্যান্সারও প্রতিরোধযোগ্য’।

%d bloggers like this: