রাগের আগুন বশে রাখুন

 

মানুষ কেন রাগে?

এক কথায় এর উত্তর দেয়া সম্ভব নয়। ক্রোধান্বিত হওয়ার প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ নানাবিধ কারণ রয়েছে। আনন্দ-বেদনা-হতাশার মতো নিত্যনৈমিত্তিক আবেগের কথা যদি বলি, তাহলে ক্রোধ বা রাগও তেমন একটি আবেগ। কোন ঘটনায় আমরা যেমন খুশি কিংবা মনোক্ষুণ্ন হই, তেমনি কোন কোন ঘটনায় আমরা রাগান্বিতও হই ডা· এআরএম সাইফুদ্দীন একরাম অন্যান্য আবেগের মতো রাগও একটি স্বাভাবিক মানবিক আবেগ। পৌরণিক কাহিনীগুলোতে দেবতাদের ক্রোধান্বিত হতে দেখা যায়। গ্রিক দেবতাদের মধ্যে অ্যারিস (অৎবং) রাগ বা ক্রোধের জন্য বিখ্যাত ছিলেন। অ্যারিস কখন কীভাবে কার ওপর রেগে যান এ ভয়ে তার জন্য কোন উপাসনালয় তৈরি হয়নি। হিন্দুদের দুর্বাশা মুনিও রাগের জন্য যথেষ্ট পরিচিত। অমর্তøলোকের রাগের অনুসন্ধান না করে আমাদের প্রশ্ন-  মানুষ কেন রাগে? এক কথায় এর উত্তর দেয়া সম্্‌ভব নয়। ক্রোধান্বিত হওয়ার প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ নানাবিধ কারণ রয়েছে। আনন্দ-বেদনা-হতাশার মতো নিত্যনৈমিত্তিক আবেগের কথা যদি বলি, তাহলে ক্রোধ বা রাগও তেমন একটি আবেগ। কোন ঘটনায় আমরা যেমন খুশি কিংবা মনোক্ষুণ্ন হই, তেমনি কোন কোন ঘটনায় আমরা রাগান্বিতও হই।

কখনও কখনও রাগ অন্য কারণ প্রসূত হতে পারে। অনেকে রেগে যাওয়াকে স্বাভাবিক হিসেবে মেনে নিতে প্রস্তুত; কিন্তু অন্য আবেগজনিত দুর্বলতা স্বীকার করতে চান না। যেমন কারও আচ্ররণে মানসিকভাবে আহত বোধ করলে কিংবা অস্তিত্ব বিপণ্ন হলে আমরা সরাসরি সেটার প্রতিকার করার চেষ্টা না করে ক্রোধান্বিত বোধ করি। এ পরিপ্রেক্ষিতে রেগে যাওয়া একটি গৌণ প্রতিক্রিয়া; কারণ প্রাথমিক প্রতিক্রিয়াটি আমাদের কাছে প্রীতিদায়ক নয়। একটি নির্দিষ্ট মাত্রা পর্যন্ত রাগ মেনে নেয়া গেলেও মাত্রাবিহীন রাগারাগি কারও কাম্য নয়। অতিরিক্ত ক্রোধ স্বাস্থ্য হানিকর।

রাগ কীভাবে সীমা অতিক্রম করে

এ প্রশ্নের উত্তর সহজ। ক্রোধের কারণে বন্ধুবান্ধব যদি আপনাকে এড়িয়ে চলে, চাকরি বিপণ্ন হয় কিংবা আশপাশের মানুষ যদি আপনাকে রাগী হিসেবে ভয় পেতে শুরু করে, তাহলে বুঝতে হবে আপনার ক্রোধের আগুন বশে আনা দরকার। কারণ অতি ক্রোধ স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর।

রাগারাগি করা কি শুধুই স্নায়ুবিক প্রতিক্রিয়া

রাগারাগি কি শুধুই স্নায়ুবিক প্রতিক্রিয়া নাকি এর পেছনে কোন বংশগত কারণ রয়েছে? দু’পক্ষের নানা রকম যুক্তি প্রমাণ রয়েছে। কারও বাবা-দাদা রাগী হলে তাদের উত্তরপুরুষদের মধ্যেও এর ছাপ যে পাওয়া যায় না, তা নয়। পূর্বপুরুষরা মেজাজি ছিলেন বিধায় এটাকে অনেকে সহজভাবে মেনে নেয়ার জন্য সুপারিশ করেন। কিন্তু এর পেছনে আসলেই বংশগতি বা ক্রোমোজোমের ভূমিকা আছে কি না, তা আজ পর্যন্ত জানা যায়নি। বিজ্ঞানীরা এখনও ক্রোধের জন্য দায়ী কোন জিন শনাক্ত কিংবা চিহ্নিত করেননি। তবে অনেকের মধ্যে হঠাৎ হঠাৎ প্রচণ্ড রাগে ফেটে পড়ার প্রবণতা দেখা যায়। এটাকে অনেকে ‘অকস্মাৎ ক্রোধ বিস্ফোরণ’ নামে উল্লেখ করে থাকেন। এ ধরনের প্রচণ্ড রাগের প্রকাশ হিসেবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি আশপাশের মূল্যবান জিনিসপত্র ভাঙচুর করেন; এমনকি অন্যদের ওপর শারীরিক আক্রমণও করতে পারেন। এটাকে রোগ হিসেবে গণ্য করলেও এর কোন কারণ উদ্ধার করা সম্্‌ভব হয়নি।

একই ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি দু’জন ব্যক্তির মধ্যে একজন রেগে যান; অথচ অপর জন কেন ক্রোধান্বিত হন না? অন্যান্য সাধারণ অনুভূতির মতো এখানে একই ঘটনা ঘটে। একটি ঘটনা কার মনে কীরকম প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে, সেটাই রেগে যাওয়া কিংবা না যাওয়ার নিয়ামক। ঘটনাটি যদি ব্যক্তিকে আহত করে কিংবা বেদনার্ত করে তোলে, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রতিক্রিয়া প্রকাশিত হয় রাগের মাধ্যমে। কিন্তু একই ঘটনা আরেকজনের মনে কোন রেখাপাত করে না কিংবা কোন রকম অনুভুতির সৃষ্টি করে না। তিনি থাকেন নির্বিকার, সুতুরাং তার কোন রাগ হয় না।

ক্রোধান্বিত ব্যক্তি কি অন্যদের জন্য বিপজ্জনক এটা কি পারস্পরিক সম্পর্ককে বিনষ্ট করে? অবশ্যই ক্রোধান্বিত ব্যক্তি অপরের জন্য বিপজ্জনক হতে পারেন এবং ক্রোধের আগুনে প্রজ্জ্বলিত ব্যক্তির সঙ্গে অন্যদের সম্পর্কের টানাপোড়েন সৃষ্টি হয়। আজকাল যত নারী কিংবা শিশু নির্যাতনের ঘটনা আমরা দেখতে পাই, তার অধিকাংশের মূলেই রয়েছে ক্রোধ কিংবা রাগ। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এ ক্রোধ কিংবা আক্রোশ পুরুষের। অবশ্য কোথাও কোথাও মহিলাদের চণ্ডমূর্তি দেখা যায়। সব সময় ক্রোধে ফুঁসতে থাকা ব্যক্তির সঙ্গে অন্যদের সম্পর্কের অবনতি ঘটে। কারণ রাগী ব্যক্তির সামনে কেউ মুখ খোলে না; কিংবা যুক্তি তর্কে লিপ্ত হতে চায় না। এটা পারস্পরিক সম্পর্কের জন্য ইতিবাচক নয়।

রাগারাগি করা কি পুরুষের একচেটিয়া অধিকার

কখনোই তা সঠিক নয়। আমাদের সমাজে একজন পুরুষের রেগে যাওয়াকে যত সহজে মেনে নেয়া হয়, একজন মহিলার ক্রোধান্বিত হওয়া অত সহজভাবে নেয়া হয় না ; বলা হয়, ‘মেয়ে মানুষের এত রাগ ভালো না’। প্রেমিকার কপট রাগ প্রেমিকের কাছে মধুর মনে হলেও সাধারণভাবে এটা গ্রহণযোগ্য নয়। কিন্তু নারী-পুরুষ উভয়েই রাগ করে, ক্রোধান্বিত হয়, ছেলেরা রাগে আক্রোশে বিস্ফোরিত হয়, মেয়েরা ভেতরে ভেতরে ফঁুসতে থাকে। মেয়েদের রাগের প্রকাশ অনেক সময় তাদের অস্বাভাবিক কাজকর্মের মাধ্যমে প্রকাশিত হয় এবং সেগুলো যে রাগের কারণে করা হচ্ছে, তা নিকটজন ছাড়া অন্যজন বুঝতে পারেন না।

রাগ এবং ক্রোধ থেকে শারীরিক অসুস্থতা রাগ ও ক্রোধ মাত্রাভেদে অনেকের শারীরিক অসুস্থতা সৃষ্টি করতে পারে। অল্প-অল্প রাগারাগিতে হয়তো কোন ক্ষতি হয় না। কিন্তু অতিরিক্ত রেগে গেলে রক্তচাপ বেড়ে যায়। যাদের হৃদযন্ত্র দুর্বল তাদের হার্ট অ্যাটাক কিংবা অনেক সময় মস্তিষ্ড়্গের রক্তক্ষরণ হয়ে পক্ষাঘাত বা স্ট্রোক হয়ে যায়। এর ফলে মৃতুø ঘটাও বিচিত্র নয়।

রাগ কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়

এর কোন সহজ সমাধান নেই। আপনাকে রাগের মাথায় উত্তেজনা বশত কিছু না করে ঠাণ্ডা মাথায় চিন্তা করতে হবে। রাগের যথার্থ কারণ আছে কি না তা ভাবতে হবে এবং বিষয়টির ঠিক-বেঠিক দিক নিয়ে বিশ্লেষণ করতে হবে। ক্রোধান্বিত মস্তিষ্ড়্গে এত কিছু ভাবা যায় না। অতএব সমাধান হচ্ছে-  সময় নেয়া। মনে রাখতে হবে আজকে আপনি রাগ করছেন, আগামীকাল আপনার রাগ থাকবে না। কিন্তু রাগের মাথায় যে মানসিক কিংবা শারীরিক আঘাত অপরকে করা হয় সেটা কিন্তু তার পক্ষে ভুলে যাওয়া কঠিন। এজন্য রাগের প্রতিক্রিয়া প্রদর্শন করার পরিবর্তে ঘটনাস্থল ত্যাগ করে নিরিবিলি কোথাও ঘটনার বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করাই সর্বোত্তম ।

যদি এমন করা সম্্‌ভব না হয় তাহলে রাগের প্রতিক্রিয়া কোন ভঙ্গুর বস্তুর উপরে প্রক্ষেপ করা যায়। যেমন রাগ কমানোর জন্য অনেককে দেয়ালে মুষ্ঠাঘাত করতে দেখা যায়, কেউ কেউ থালা-বাসন কিংবা ফুলদানি ভাঙেন। কিন্তু এমন প্রতিক্রিয়াও অনেক সময় আশপাশের মানুষের জন্য ভীতি সৃষ্টি করে। এজন্য বলা হয় রেগে গেলে খেলতে চলে যান, দৌড়াতে পারেন কিংবা টিভি দেখতে পারেন। এ ধরনের ক্রিয়াকলাপের মাধ্যমে খুব সুন্দরভাবে রাগ কমানো যায়।

রেগে যাওয়া স্বাভাবিক আবেগ

রাগার অধিকার সবারই আছে, কিন্তু রাগের বশে কাউকে আঘাত করার অধিকার কারও নেই।

অনেক সময় না রাগার জন্য হরেকরকম কসরৎ করেও আমরা ক্রোধ সংবরণ করতে পারি না। এমন পরিস্থিতির উদ্‌ভব হয় যে আমরা রেগে যেতে বাধ্য হই এবং হতাশ হয়ে পড়ি। এ রকম পরিস্থিতিতে আমাদের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন আত্মবিশ্লেষণ। রাগের কারণে হতাশা আসলে ক্রোধ আরও বেড়ে যায়। অতএব হতাশা গ্রাস করার আগেই রাগের কারণ বিশ্লেষণ করে পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। অনেকের রেগে যাওয়া একটি অভ্যাসে পরিণত হয়, বলা যায় রেগে যাওয়া একটি নেশা হয়ে যায়। রাগলে তাদের মস্তিষ্ড়্গে স্বস্তিদায়ক এন্ডোর্ফিন নিঃসরিত হয়। এজন্য তারা রেগে যাওয়ার অভ্যাস পরিত্যাগ করতে পারেন না। কিন্তু আমাদের সব সময় মনে রাখতে হবে, রাগের মাথায় কিছু করলে তার ফল কখনই ভালো হয় না। অতএব রাগের আগুন বশে রাখুন।

Advertisements

কুরআনঃ নারী উন্নয়ন

বর্তমানে পৃথিবীর সর্বত্র নারীরা যে রূপ নিষ্ঠুরভাবে নির্যাতিত হচ্ছে, সে ক্ষেত্রে নারী উন্নয়নে অবশ্য শতভাগ সমর্থন সবারই থাকা উচিত। তাই বলে মুসলিম প্রধান বাংলাদেশে আল্লাহ সুবহানাল্লাহু তায়ালার আইন উল্টে ফেলে নয়। ১৯৯৫ সালে চীনের বেইজিংয়ে বিশ্ব নারী সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। কোটি কোটি ডলার খরচ হয়। বিশ্বের নারী সংগঠনগুলো কোটি কোটি টাকা পানিতে ফেলে কত কী না দাবি পাস করে আনল, কিন্তু পারল কি নারী নির্যাতন বন্ধ করতে? যতই দিন যাচ্ছে ততই নারীরা হয়ে উঠছে বাজারের পণ্য এবং মারাত্মক নির্যাতনের শিকার। নারীরা নিগৃহীত হচ্ছেই। আল্লাহর দেয়া সুস্পষ্ট বিধান লঙ্ঘন না করে যদি ইসলামের উত্তরাধিকার আইন এবং ভরণ-পোষণ আইন এ ক্ষেত্রে বিবেচনায় আনা যায়, তাহলে দেখা যাবে নারীর সামগ্রিক আর্থিক অবস্থান পুরুষের তুলনায় অনেক ভালো। আল্লাহর ভয়, ভালো-মন্দ কাজের প্রতিফল প্রতিটি নারী-পুরুষকে অবশ্যই পেতে হবে­ যত দিন এ বিশ্বাস মানুষের মনে বদ্ধমূল করা না যাবে, তত দিন কোনো সংস্থা, কোনো সরকার নারীর মর্যাদা ও অধিকার দিতে পারবে না। দিতে পারে না। আল্লাহর ভয় ও আখিরাতে বিশ্বাস সমাজে ইনসাফ ও সুবিচার প্রতিষ্ঠা করতে পারে। তখন নারীরা পাবে অধিকার ও মর্যাদা। নারী অধিকার বঞ্চিত করা হলে আল্লাহর কাছে একদিন জবাবদিহি করতেই হবে, এ শিক্ষা এখন প্রয়োজন।

উল্লেখ্য, গত তত্ত্বাবধায়ক সরকার নারীর সম-অধিকারের নামে নারী উত্তরাধিকার সংশোধন নীতিমালা ২০০৮ প্রণয়ন করে, যদিও তা পরে ইসলামি সংগঠনগুলোর আন্দোলনের মুখে বাতিল করা হয়। বর্তমানেও বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় নারীর সম-অধিকার দাবি নিয়ে এ দেশের আলেমসমাজের সাক্ষাৎকার, বক্তব্য, আল্লাহর আইন পরিবর্তনে এর পরিণতি ইত্যাদি নিয়ে আলোচনা বরাবরের মতো দেখা যাচ্ছে।

সূরা বাকারায় ২৪ নম্বর আয়াতে আল্লাহ পাক বলেছেন, ‘কুরআন প্রত্যাখ্যানকারীরা কাফির, তাদের জন্য রয়েছে দোজখের শাস্তি। তারা হবে দোজখের আগুনের ইন্ধন। পুরো কুরআন বা কুরআনের কিছু অংশ প্রত্যাখ্যান করা একই রকম অপরাধ। এখানে উল্লেখ্য, ইবলিস একজন বড়মাপের আলিম ও আবিদ (জ্ঞানী ও ইবাদতকারী) জিন ফেরেশতার মর্যাদায় ভূষিত ছিল। কিন্তু আদম (আঃ)-কে অভিবাদন না জানিয়ে আল্লাহর নির্দেশটি প্রকাশ্য অমান্য করে আল্লাহর লানতে পরিণত হয় অর্থাৎ শয়তান হয়ে যায়।

সূরা আল বাকারার ৮৫ নম্বর আয়াতে একই রকম ঘোষণা আছে, ‘তবে কি তোমরা কুরআনের কিছু অংশের ওপর ঈমান আনো আর কিছু অংশ প্রত্যাখ্যান করো? সুতরাং তোমাদের মধ্যে যারাই এরূপ করবে, তাদের লাঞ্ছনা ছাড়া আর কিছু নেই। আখিরাতের দিন তারা কঠিন শাস্তিতে নিক্ষিপ্ত হবে।’

বর্তমান সমাজে আমরা অনেকেই এই অপরাধে অপরাধী। নামাজ, রোজা, হজ, জাকাতের মতো আনুষ্ঠানিক ইবাদতগুলো মেনে নিই কিন্তু অর্থনীতিসহ অন্যান্য সামাজিক বিধিবিধান মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানাই। মনে রাখা প্রয়োজন মুসলমান হতে হলে পূর্ণাঙ্গ ঈমান ও পূর্ণাঙ্গ ইসলাম গ্রহণ করতে হবে। ইসলামি জীবনবিধানের কিছু অংশ স্বীকার করা ও কিছু অংশ প্রত্যাখ্যান করা যাবে না। যেমন দেশের কোনো নাগরিক যদি দেশের কোনো আইন মান্য করে এবং বাকি আইন প্রত্যাখ্যান করে, সে হবে দেশদ্রোহী, তেমনি কেউ যদি আল্লাহর কিছু আইন মান্য করে ও কিছু আইন প্রত্যাখ্যান করে, সে ইসলামের গণ্ডি থেকে বেরিয়ে যায়।

ইসলাম একটি সৌহার্দøপূর্ণ শান্তির সমাজ গঠন করতে চায়। অতএব ব্যক্তি, সমাজ ও দেশের শান্তি, মঙ্গল ও কল্যাণের জন্য সামগ্রিকভাবে ইসলামি বিধান গ্রহণ করতে হবে। অন্যথায় আংশিকভাবে আনুগত্য করে কেউ যদি কুরআনের বাকি অংশ প্রত্যাখ্যান করে সে কাফির হয়ে যায়। তবে কেউ যদি কুরআনের সবটুকুর ওপর ঈমান আনে কোনো অংশ প্রত্যাখ্যান না করে, কিন্তু ইসলামি সমাজ ব্যবস্থা না থাকায় কিংবা ঈমানি দুর্বলতার কারণে সবটুকু পালনে সমর্থ না হয়, তাহলে সে কাফির হবে না। সে হবে পাপী ও অপরাধী।

সূরা নিসায় ১১ নম্বর আয়াতে আল্লাহ পাক বলেছেন, ‘তোমাদের সন্তানদের ব্যাপারে আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন পুরুষের অংশ দুটি মেয়ের সমান।’ এর বিরোধিতা করলে আল্লাহর নির্দেশ সরাসরি লঙ্ঘন করা হবে। উল্লেখ্য, যদিও মেয়েরা পিতার সম্পত্তিতে অর্ধেক পায়, কিন্তু স্বামীর সম্পত্তির অধিকার মোহরানা সব মিলিয়ে সে অনেক বেশি পায়। উপরন্তু স্বামীর ওপর স্ত্রীর ভরণ-পোষণের দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছে। অপর দিকে স্বেচ্ছায় দান করা ছাড়া স্ত্রীর উপার্জনে স্বামীর কোনো অধিকার নেই। মোট কথা ইসলামি জীবনব্যবস্থায় আল্লাহ পাক নারীর কোনো ব্যয়ের খাত রাখেননি। অর্থাৎ কারো ভরণ-পোষণের দায়িত্ব বহন করতে বাধ্য নয়। উপরন্তু সূরা আন নিসার ৪ নম্বর আয়াতের নির্দেশ নারীদের তাদের মোহরানা আবশ্যিকভাবে দিয়ে দাও।

ইসলাম একমাত্র জীবনবিধান যেখানে নারী ও পুরুষের অধিকার সর্বোত্তমভাবে সংরক্ষণ করা হয়েছে। মহান আল্লাহ মানুষের জন্য যে জীবনবিধান দিয়েছেন, তা পুরো সামঞ্জস্যপূর্ণ। অতএব আল্লাহর বিধানের সরাসরি প্রত্যাখ্যান করার মতো ধৃষ্টতা না দেখিয়ে, আল্লাহর পক্ষ থেকে সম্পত্তি বণ্টনের কম-বেশি বিষয়টির যৌক্তিক কৌতূহল মেটানোর জন্য সূরা মোহাম্মদের ২৪ নম্বর আয়াতের তাৎপর্য উদঘাটনের আহ্বান জানাচ্ছি। আল্লাহ পাক বলেছেন, ‘ তারা কি কুরআন সম্পর্কে চিন্তা-গবেষণা করেনি? না, তাদের দিলসমূহে তালা পড়ে গেছে?’ এতে আল্লাহর ওপর নিজেকে সম্পূর্ণরূপে সমর্থন করার মানসিকতা সৃষ্টি হবে এবং কুরআন চর্চা গবেষণা না করার দরুন, কুরআনিক জ্ঞানের অজ্ঞতার দরুন আমাদের মধ্যে যারা কুরআনিক আইন উল্টে ফেলে আল্লাহর সরাসরি নির্দেশ লঙ্ঘন করে কাফির হতে চলেছেন, তারাও কাফির হওয়া থেকে বেঁচে যাবেন এবং ধর্মবিশ্বাসী, ধর্মপ্রাণ কোটি কোটি মুসলমানও কুফরি আইন মানতে বাধ্য হওয়া থেকে বেঁচে যাবেন। উল্লেখ্য, কাফির আরবি শব্দ, যা কুফর থেকে এসেছে। কুফর মানে অস্বীকার করা। কাফির মানে অস্বীকারকারী। মোট কথা আমরা মুসলমান হয়েও কুফরি নীতি অবলম্বন করতে মোটেও দ্বিধা করছি না। সমাজে এ দুরবস্থা কেবল মানুষ কুরআন থেকে দূরে সরে যাওয়ার জন্য।

এমনিতে দেশ ও জনগণ ক্ষুধা, সন্ত্রাস, মাদকাসক্ত, খুনখারাবি, ধর্ষণ, নির্যাতনের বিড়ম্বনায় জর্জরিত। যেখানে কুরআনের ধারক-বাহক মুসলমান, আমরা সেখানে কুরআনিক আইন পরিবর্তন করে আল্লাহর আইন লঙ্ঘনের মতো গজব কেন ডেকে আনছি? কুরআনিক আইন নারীদের মহা সম্মান ও মহা মর্যাদা দিয়েছে কন্যা হিসেবে, স্ত্রী হিসেবে, মা হিসেবে। যদি দুনিয়ার মানুষের গড়া বিভিন্ন পথ, মত ও ব্যবস্থাপনা নারীকে সে সম্মান না দেয়, নারীকে অধিকারবঞ্চিত করে, সে জন্য তো কুরআনিক আইন দায়ী নয়। দায়ী আমাদের কুরআনিক জ্ঞানের ব্যাপকতার অভাব। কুরআন চর্চা, গবেষণা ও এর বাস্তবায়নের অভাব।

অতএব আসুন, আমরা আল্লাহ তায়ালার বিধানের বিরোধিতা না করে কুরআন পড়ি, কুরআন বুঝি এবং কুরআনের বক্তব্য থেকে সঠিক শিক্ষা গ্রহণ করে সে অনুসারে জীবন গড়ি, এতেই নারীর অধিকার ও পূর্ণ মর্যাদা অর্জিত হবে। গড়ে উঠবে ক্ষুধামুক্ত, সন্ত্রাসমুক্ত সবধরনের যন্ত্রণামুক্ত, ফুলে-ফলে প্রাচুর্যে ভরা সুন্দর এক বাংলাদেশ।

অতিথি সেবা

মানুষ সামাজিক জীব। কারো পক্ষেই এই পৃথিবীতে একা বেঁচে থাকা সম্ভব নয়। তাই এ ধরা বুকে বেঁচে থাকতে মানুষ একে অন্যের সাহায্য নেয়। কাছে আসে বিপদে-আপদে। আর এই কাছে আসার মধ্য দিয়েই মানুষের মধ্যে গড়ে ওঠে হৃদয়ের এক গভীর ভালোবাসা ও টান। আর এমনই এক ভালোবাসা ও টান থেকেই মানুষ আবদ্ধ হয়ে পড়ে আত্মীয়তার বন্ধনে। এসব মিলিয়েই মানুষের একে অন্যের কাছে যাওয়া-আসা করতেই হয়। আর এই সূত্রেই মানুষকে অহরহ একে অন্যের ঘরে মেহমান হতে হয়। এ ক্ষেত্রে প্রয়োজন হয় মেজবানের মানবীয় গুণ আন্তরিকতা ভালোবাস এবং আপ্যায়নের। মেহমানের আপ্যায়নে যেন কোনো মেজবানের মনে সঙ্কীর্ণতা না আসে। সে জন্য মেহমানদারির প্রতি অনেক গুরুত্ব দিয়েছেন প্রিয় নবীজী। সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব রূপে এ ধরা বুকে আগমনকারী হজরত মুহাম্মদ সাঃ উম্মতকে তাদের জীবনের প্রতিটি বিষয় সম্পর্কে শিক্ষা দিয়েছেন। মানবতার উচ্চতর শিক্ষায় শিক্ষিত করেছেন তিনি তার সাহাবিদের, যারা ছিলেন পরবর্তী উম্মতের জন্য অনুসরণীয় ব্যক্তিত্ব। মেহমানের সেবা করা যে কত উত্তম আমল তাও শিক্ষা দিয়েছিলেন রাসূল সাঃ তাঁর সাহাবিদের, যা আজ আমাদের সামনে রাসূল সাঃ-এর হাদিসের ভাণ্ডারে বিদ্যমান। এ মর্মে রাসূল সাঃ ইরশাদ করেন, ‘যে আল্লাহ এবং পরকালের ওপর ঈমান আনে সে যেন মেহমানের সেবা করে।’

ওই হাদিসের আলোকে এ কথা স্পষ্ট বুঝে আসে যে, মেহমানের সম্মান করা একজন মুমিনের কর্তব্য। এ রকম অসংখ্য হাদিস দ্বারা রাসূল সাঃ উম্মতকে অতিথিপরায়ণ হতে উৎসাহিত করেছেন। ইতিহাস সাক্ষী, রাসূল সাঃ শুধু উৎসাহিত করেই ক্ষান্ত ছিলেন না, বরং সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ অতিথিপরায়ণ ছিলেন হজরত মুহাম্মদ সাঃ। তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হলো রাসূল সাঃ কর্তৃক বাদশাহ নাজ্জাশির দূতের সম্মান করা। আরব মরুভূমির একটি অঞ্চলকে ‘হাবশা’ বলে ডাকা হতো। রাসূল সাঃ-এর প্রাণপ্রিয় সাহাবায়ে কেরাম মক্কার কাফিরদের অমানবিক নির্যাতনে যেখানে হিজরত করে আশ্রয় গ্রহণ করেছিলেন। সেই হাবশা দেশের বাদশাহর নাম হলো বাদশা নাজ্জাশি। তিনি একবার মদিনায় রাসূল সাঃ-এর খেদমতে একজন দূত পাঠালেন। নবীকুলের বাদশাহ হজরত মুহাম্মদ সাঃ বাদশাহর প্রেরিত দূতকে পেয়ে তিনি তাকে মেহমান বানালেন। মেহমান হিসেবে তার যথাযথ আপ্যায়নও করলেন। নিজের হাতে করলেন তার সেবাযত্ন। রাসূল সাঃ-এর এমন আচরণ দেখে সাহাবায়ে কেরাম এসে বললেন, ‘ইয়া রাসূলুল্লাহ! আপনি আরাম করুন। আমরা মেহমানের সেবাযত্ন করব।’ তখন রাসূল সাঃ বললেন, ‘আমার সাহাবারা মক্কার কাফিরদের অমানবিক অত্যাচারে দিশেহারা হয়ে হাবশায় হিজরত করেছিলেন। আর হাবশার বাদশাহ তাদেরকে সম্মানের সাথে আশ্রয় দিয়েছিলেন। তাই আমার কর্তব্য হলো, নিজ হাতে হাবশার মেহমানের সেবাযত্ন করা।’

মেহমানের প্রতি এমনই সম্মানজনক আচরণ করতেন হজরত মুহাম্মদ সাঃ। নিজের সব স্বার্থ বিলিয়ে দিয়ে হলেও যেন মেহমানের মন রক্ষা করা যায়­ এমন মানসিকতাই ছিল সব সময় রাসূল সাঃ-এর। তাই তো নিজে না খেয়ে সপরিবারে অনাহারে থেকে মেহমানকে পেটভরে খাওয়ানোর মতো অনেক ঘটনা রয়েছে প্রিয় নবীজীর জীবনে। বনু গিফার গোত্রের একজন লোক একদা রাসূল সাঃ-এর মেহমান হলেন। ঘটনাচক্রে ওই রাতে রাসূল সাঃ-এর ঘরে শুধু বকরির দুধ ছাড়া আর কিছুই ছিল না। এ দিকে আবার এর আগের দিনও প্রিয় নবীজীর অনাহারে কেটেছে। দুই দিনের অনাহারী হওয়া সত্ত্বেও মেহমানের সম্মানার্থে অতিথিপরায়ণ প্রিয় নবীজী সবটুকু দুধ মেহমানকে খাওয়ালেন এবং নিজে ক্ষুধার্তই রয়ে গেলেন। আবার মেহমানকে বুঝতেও দিলেন না তিনি ক্ষুধার্ত। রাসূল সাঃ মেহমানদারির এমন বিরল দৃষ্টান্ত আজো উম্মতের সামনে চিরস্মরণীয় হয়ে আছে, যা মেহমানদারির প্রেরণা জোগায় তার লাখো কোটি উম্মতের অন্তরে। সেই প্রেরণায় অনুপ্রাণিত হয়ে আজো মানুষ মেহমানদারি করে উজাড় মনে। ইতিহাসের পাতা খুঁজলে রাসূল সাঃ-এর এমন আতিথেয়তার অনেক ঘটনা পাওয়া যায়।

একবার এক কাফির রাসূল সাঃ-কে কষ্ট দেয়ার উদ্দেশ্যে তাঁর ঘরে মেহমান হলো। রাত্রিবেলা তার সামনে খাবার দেয়া হলে ধীরে ধীরে সে রাসূল সাঃ-এর ঘরে বিদ্যমান সব খানাটুকুই খেয়ে ফেলল। খাবারান্তে রাসূল সাঃ তাকে সুন্দর বিছানা বিছিয়ে দিলে অত্যন্ত আরামের সাথেই সেই বিছানায় সে ঘুমিয়ে পড়ল। অধিক ভক্ষণের কারণে রাতে তার খুবই বেহালদশা হলো। একপর্যায়ে সে রাসূলের মোবারক হাতে তাকে বিছিয়ে দেয়া বিছানাটা পর্যন্ত সম্পূর্ণ নষ্ট করে ফেলল। এবং শেষ রাতে রাসূল সাঃ-এর অজান্তেই চুপিসারে সে পালিয়ে গেল। তবে পালিয়ে যাওয়ার সময় তার মূল্যবান তলোয়ারটি সে ভুলে ফেলে গেল। ভোরে নবীজী মেহমানের খোঁজ নিতে এসে দেখেন মেহমান উধাও। আবার বিছানার করুণ অবস্থা। এমন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে রাসূল সাঃ-এর মনে কষ্ট অনুভব হলো! আহ, রাতে বেচারা মেহমানের কত কষ্টই না হয়েছে। অথচ আমি তার কোনো প্রকার খোঁজখবর নিতে পারিনি। এমন ভাবনা ভাবতে ভাবতে রাসূল সাঃ মেহমানের নষ্ট করে যাওয়া বিছানা পরিষ্কারের কাজে লিপ্ত হলেন। এ দিকে ফেলে যাওয়া তলোয়ারের খোঁজে এসে সেই কাফির দেখতে পেল রাসূল সাঃ তার ময়লা করে যাওয়া বিছানা পরিষ্কারের কাজে ব্যস্ত। কাফির চিন্তায় পড়ে গেল। না জানি কী প্রতিশোধ নেন রাসূল সাঃ তার থেকে। এই ভেবে তলোয়ারটি নেয়ার জন্য একবার সে রাসূল সাঃ-এর সামনে এলো। তাকে দেখে রাসূল সাঃ সুন্দর ভাষায় বললেন, ‘কী খবর? রাতে তোমার অনেক কষ্ট হয়েছে মনে হয়। আমাকে ডাকলে না কেন? তোমার তলোয়ার তো ফেলে গেছো। এই নাও তোমার তলোয়ারটি।’ রাসূল সাঃ-এর এমন আচরণ দেখে সেই কাফির তো হতবাক। মানুষ কি এমন হতে পারে? কোথায় ভর্ৎসনা, কোথায় তিরস্কার! ইসলামের নবীর এ কী অমায়িক ব্যবহার! কোনো মানুষ কি এত উত্তম চরিত্রের অধিকারী হতে পারে? মেহমানকে কি কেউ এমন সম্মান করতে পারে? লজ্জায় অনুশোচনায় কাফির যারপরনাই অনুতপ্ত হলো। রাসূল সাঃ-এর এমন মধুর ব্যবহারে তার হৃদয়ে রাসূল সাঃ-এর প্রতি সৃষ্টি হলো গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা। রাসূলের দু’টি হাত ধরে কালেমা পাঠ করে ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আশ্রয় নিয়ে সাহাবায়ে রাসূল হওয়ার সৌভাগ্য লাভ করল।

কিডনি রোগীর খাদ্য তালিকা

কিডনি রোগের নাম শুনলেই আমরা আঁৎকে উঠি। ভাবতে থাকি জীবন সায়াহ্নে পৌঁছে গেছি। শুরু হয় বিদেশে উন্নত চিকিৎসার জন্য ছোটাছুটি।

আমাদের দেশে কিডনি রোগীর সংখ্যা আশংকাজনক হারে বাড়ছে। কিছু কিডনি রোগ আছে যার সময়মতো উপযুক্ত চিকিৎসা না হলে কিডনি ফেইলুর হয়ে যায়। কিডনি ফেইলুরের অন্যতম কারণ হল অনিয়ন্ত্রিত উচ্চরক্তচাপ এবং ডায়াবেটিস রোগ। তবে কিডনি ফেইলুর হলেও ঘাবড়ে যাওয়ার কারণ নেই। বর্তমানে দেশে ও বিদেশে এর আধুনিক চিকিৎসা বিদ্যমান। মেডিসিন ও অন্য চিকিৎসার পাশাপাশি কিডনি ফেইলুরে উরবঃধৎু সড়ফরভরপধঃরড়হ-এর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। কিডনি ফাংশন ও ফেইলুরের ধাপ এবং অন্যান্য অঙ্গের ফাংশন নিরূপণ করে উপযুক্ত খাদ্যতালিকা তৈরি করে সুষম খাবার খেলে রোগী প্রায় স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন।

ডায়েটের উদ্দেশ্য হল

(১) সঠিক পুষ্টিমান বজায় রাখা

(২) কিডনিজনিত বিষক্রিয়া কমিয়ে রাখা

(৩) শরীরে প্রয়োজনীয় প্রোটিন ভেঙে যেতে বাধা দেয়া

(৪) রোগীর শরীর ভালো লাগা এবং কিডনি ফেইলুরের বর্তমান অবস্থা থেকে যেন আর খারাপ না হয়

(৫) ডায়ালাইসিসের প্রয়োজনীয়তা কমিয়ে আনা। চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা একমত হয়েছেন, কিডনি রোগীকে প্রয়োজনীয় প্রোটিন (অসরহড় ধপরফ ড়ভ যরময নরড়ষড়মরপধষ াধষঁব) দিতে হবে। যেমন- ডিম ও দুধ। অন্যান্য প্রোটিনও সীমিত করতে হবে। কারণ ওইসব প্রোটিন শরীরে জমা হয়ে ইউরিয়া ও নাইট্রোজেন তৈরি করে। পাশাপাশি পর্যাপ্ত পরিমাণে অপ্রোটিন জাতীয় ক্যালরি দিতে হবে প্রোটিনের যথাযথ ব্যবহারের জন্য।

খাদ্যশক্তি

এ রোগীকে পর্যান্ত পরিমাণ ক্যালরি দিতে হবে। পর্যাপ্ত ক্যালরি না দিলে শরীরের টিসুø ভেঙে রক্তে ইউরিয়া এবং পটাশিয়ামের মাত্রা বাড়িয়ে দিলে কিডনির পক্ষে এগুলো অপসারণ করা দুঃসাধ্য হয়। প্রাপ্তবয়স্ড়্গদের দিতে হবে ৩৫-৪০ কিলোক্যালরি শরীরের প্রতি কেজি আদর্শ ওজনের জন্য অথবা ২০০০-৩০০০ কিলোক্যালরি প্রতিদিন, যারা নিয়মিত হিমোডায়ালাইসিস/পেরিটনিয়েল ডায়ালাইসিস করেন। যেসব রোগী অনবরত পেরিটনিয়েল ডায়ালাইসিস গ্রহণ করেন তারা ডায়ালাইসেট থেকে গ্লুকোজ শোষণ করে এবং তাদের অতিরিক্ত ওজন বাড়ে। শ্বেতসারই ক্যালরির প্রধান উৎস এবং প্রোটিনের সঙ্গে একসঙ্গে খেতে হবে। সুতরাং খাদ্যশক্তির জন্য প্রোটিন ব্যবহৃত হবে না। অতিরিক্ত প্রোটিনমুক্ত শ্বেতসার এবং কম ইলেকট্রোলাইট সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করলে বেশি পরিমাণে খাদ্যশক্তি বাড়ে।

প্রোটিন

প্রোটিন ০·৬ গ্রাম শরীরের প্রতি কেজি আদর্শ ওজনের জন্য দিলে নাইট্রোজেন ব্যালেন্স ভালো হয় এবং যাদের ডায়ালাইসিস হয়নি তারা এর থেকে বেশি নিয়ন্ত্রণ করলে শরীর শুকিয়ে যায়। কম প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার (২৫ গ্রামের কম) যুক্ত এসেনশিয়াল এমাইনো এসিড এবং কিটো এসিড দিলে কিডনি ফেইলুর রোগীদের নাইট্রোজেন ব্যালেন্স ভালো হয়। হিমোডায়ালাইসিসের রোগীকে ১·০ গ্রাম প্রোটিন প্রতি কেজি শরীরের ওজনের জন্য দিতে হবে, হিমোডায়ালাইসিসে ক্ষতি হওয়া প্রোটিন মেটানোর জন্য।

তেল

ক্রনিক কিডনি ফেইলুরে সাধারণত লিপিড প্রোফাইল বাড়ে সুতরাং ট্রাইগ্লিসারাইড ও কোলেস্টেরল কম রাখতে হবে এবং পলিআনস্যাচুরেটেড তেল বেশি দিতে হবে।

পটাশিয়াম

অতিরিক্ত বা কম পটাশিয়াম দুটিই রোগীর জন্য খারাপ। ক্রনিক কিডনি ফেইলুরে সাধারণত পটাশিয়াম বৃদ্ধি হয়। রোগীর রক্তে এবং প্রশ্রাবে পটাশিয়ামের মাত্রা দেখে ডায়ালাইসিটের মাত্রা নির্ধারণ করতে হবে। ডায়ালাইসিস হয়নি এমন রোগীদেও ১৫০০ মিলিগ্রাম থেকে ২০০০ মিলিগ্রাম পটাশিয়াম দিতে হবে। হিমোডায়ালাইসিস রোগীকে দিতে হবে ২৭০০ মিলিগ্রাম এবং পেরিটনিয়েল ডায়ালাইসিস হলে ৩০০০ থেকে ৩৫০০ মিলিগ্রাম। প্রাণিজ প্রোটিন, অনেক ফল এবং শাকসবজিতে পটাশিয়াম বেশি থাকে। সুতরাং এগুলো বাদ দিতে হবে। অনবরত চলমান পেরিটনিয়েল ডায়ালাইসিস রোগীদের পটাশিয়াম সীমিত করার প্রয়োজন নেই।

সোডিয়াম

শরীরে রস, উচ্চরক্তচাপ এবং হার্ট ফেইলুরের কারণে লবণ নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। ডায়ালাইসিস হয়নি এমন উচ্চ রক্তচাপসম্পন্ন রোগীকে এক গ্রাম সোডিয়াম দৈনিক দেয়া যেতে পারে। তবে সোডিয়ামের অভাব থাকলে দুই গ্রাম দৈনিক দিতে হবে। হিমোডায়ালাইসিস চলছে এমন রোগীদের দৈনিক দিতে হবে ১·০ থেকে ১·৫ গ্রাম। পেরিটনিয়েল ডায়ালাইসিস রোগীদের ২·০ থেকে ৩·০ গ্রাম। অনবরত চলমান পেরিটনিয়েল ডায়ালাইসিস রোগীদের সোডিয়াম নিয়ন্ত্রণ করার দরকার নেই। তবে রক্তচাপ কম হলে সোডিয়াম দিতে হবে।

ফসফরাস

ইউরিয়া বেশি রোগীদের ক্রমান্বয়ে ফসফরাস লেভেল সেরামে বাড়তে থাকে এবং রোগীর এসিডোসিস হয়। ফসফরাস লেবেল নিয়ন্ত্রণ করার জন্য দিনে ৬০০ থেকে ১২০০ মিলিগ্রাম ফসফরাস খাদ্যে দিতে হবে। ডেইরির উৎপাদিত খাবার সীমিত করতে হবে যেহেতু তাদের মধ্যে বেশি ফসফরাস থাকে এবং তাতে ক্যালসিয়ামের মাত্রা কমবে। অ্যালুমিনিয়াম হাইড্রোঅক্সাইড জেল প্রায়ই দেয়া হয় অন্ত্রে ফসফেটকে বন্ধন করার জন্য।

ক্যালসিয়াম

কিডনি ফেইলুরে সাধারণত ক্যালসিয়ামের মাত্রা কমে যায় এবং কিডনির ক্ষতি হয়। সাধারণত প্রোটিন ও ফসফরাস সমৃদ্ধ খাবার সীমিত করার কারণে ক্যালসিয়ামও কমে যায়। সেরাম ক্যালসিয়াম লেভেল নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে এবং এটি সাপ্লিমেন্ট করতে হবে ও স্বাভাবিক মাত্রায় আনতে হবে। ক্রনিক ইউরেমিক রোগীকে দিনে ১·২ থেকে ১·৬ গ্রাম এবং ডায়ালাইসিস রোগীকে ১·০ গ্রাম দিতে হবে।

খনিজ

শুধু খাদ্য আয়রন এবং ট্রেস মিনারেলসের চাহিদা মেটাতে পারে না। সুতরাং খনিজ সাপ্লিমেন্ট করতে হবে। কিডনি ফেইলুরে খাওয়ার অরুচি হয়। সেক্ষেত্রে জিংক সাপ্লিমেন্ট করলে রুচির পরিবর্তন ঘটে।

ভিটামিন

ডায়ালাইসিসের সময় ভিটামিন সি এবং বি শরীর থেকে বের হয়ে যায়। এই ভিটামিনগুলো কম খাওয়া হয়। কারণ কাঁচা শাকসবজি সীমিত করা হয় এবং খাদ্য অনেক পানির মধ্যে রান্না করা হয় পটাশিয়ামের মাত্রা কমানোর জন্য। ফলিক এসিড এবং এসময়ে পাইরিডক্সিনের প্রয়োজন ও এটি প্রয়োজন হয় অন্যান্য ওষুধের বিপরীত কার্যকারিতার জন্য। ভিটামিন ডি’র বিপাক ক্রিয়ায় ব্যাঘাত ঘটে। কারণ ফেইলুর হওয়া কিডনি ভিটামিন ডি-কে অ্যাকটিভ ফর্মে নিতে পারে না। সুতরাং সব ভিটামিনস সাপ্লিমেন্ট করতে হয়।

পানি

ক্রনিক কিডনি ফেইলুরে পানি গ্রহণ নিবিড়ভাবে মনিটর করতে হবে। যদি উচ্চরক্তচাপ বা ইডিমা না থাকে, তবে দৈনিক ৫০০ মিলিলিটার যোগ করে যে পরিমাণ প্রশ্রাব হয় তা দিতে হবে। দেড় থেকে তিন লিটার পর্যন্ত দেয়া যেতে পারে। যদি প্রশ্রাব একেবারেই না হয় বা কম হয় তাহলে পানি দেড় লিটারের নিচে সীমিত রাখতে হবে। ডায়ালাইসিস হওয়া রোগীর ওজন দৈনিক এক পাউন্ড পর্যন্ত বাড়তে দেয়া যেতে পারে। অনবরত পেরিটোনিয়েল ডায়ালাইসিস নেয়া রোগীর পানি সীমিত করার প্রয়োজন নেই, কারণ তারা পানির পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে ডায়ালাইসেট থেকে।

নিজের প্রয়োজনে গুগল সার্চ

যে কোনো তথ্য-উপাত্ত বা সাহায্য-সহযোগিতা, সবকিছুতেই গুগল আপনাকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিচ্ছে। এক কথায় যদি কাউকে একটা প্লাটফর্ম ভাবা যায়, তবে এখন পর্যন্ত গুগল সেই ভূমিকায় সর্বসেরা। কী নেই তাদের সেবায়, সর্বশ্রেষ্ঠ সার্চ ইঞ্জিন, সিউকিউরড মেইল সার্ভিস, ইউটিউব ভিডিও, ওয়ার্ল্ডওয়াইড গুগল ম্যাপ, অরকুট, বাজ, ব্লগারসসহ আরও অনেক অনেক উপকারী সেবা।

গুগলকে ব্যবহার করে কীভাবে যেকোন তথ্য বের করে আনা যায়, সেটা গুগলের থেকেই হোক বা অন্য কোনো সাইট থেকেই হোক। আবহাওয়া
গুগলের মাধ্যমে যেকোনো শহরের আবহাওয়া জানতে ‘weather’ লিখে স্পেস দিয়ে শহরের নাম এবং অতঃপর দেশের কোড নেম লিখতে পারেন। যেমন বাংলাদেশের ক্ষেত্রে weatherdhaka,bd লিখে সার্চ দিন। পেয়ে যাবেন আপনার কাঙ্ক্ষিত আবহাওয়ার সংবাদ।

সময়
বিশ্বের বিভিন্ন স্থানের এখন সময় জানতে আপনি দেখতে পারেন গুগলের টাইম সার্চ ফিচারটি। এক্ষেত্রে আপনাকে টাইপ করতে হবে ‘time’ এবং শহরের নাম বা দেশের নাম। যেমন : ime uae লিখে সার্চ দিলে আপনি বাংলাদেশের সময় থেকে ২ ঘণ্টা সময় পেছনে পাবেন এবং সময় অবশ্যই ২৪ ঘণ্টা ফরমেটে পাবেন।

সূর্যোদয় বা সূর্যাস্ত
বিভিন্ন দেশের বা শহরের সূর্যাস্ত বা সূর্যোদয় জানতে টাইপ করুন ‘sunrise’ অথবা ‘sunset’, তারপর শহরের নাম লিখুন। সার্চ দিন আপনার সামনে হাজির হয়ে যাবে সঙ্গে সঙ্গে। এর সঙ্গে আরও জানবেন সেই সময় থেকে আপনার আর কত সময় হাতে আছে।

পরিমাপের পরিবর্তন
আপনি চাইলে গুগলের কনভার্টারকে ব্যবহার করতে পারেন। যেমন ধরুন আপনাকে ইঞ্চি থেকে সেন্টিমিটারে কনভার্ট করতে হলে আপনাকে লিখতে হবে ১ রহপয রহ পস, যেখানে আপনি ১ ইঞ্চিকে সেন্টিতে পরিণত করার জন্য বুঝিয়েছেন। তাহলে গুগলই আপনাকে মুহূর্তের মধ্যে জানিয়ে দেবে যে, ২.৫৪ সেন্টিতে ১ ইঞ্চি। এছাড়াও আপনি যেকোন পরিমাপের কনভার্ট করতে গুগলকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারেন।

জনসাধারণের তথ্য
জনসংখ্যা থেকে শুরু করে যেকোন হালনাগাদকৃত তথ্য পেতে গুগল আরও এক ধাপ এগিয়ে। যেমন আপনি এখন বাংলাদেশের সর্বশেষ গণনাকৃত জনসংখ্যা জানতে চাইছেন, শুধু ‘population’ লিখে দেশের নাম বাংলাদেশ লিখুন সার্চ বক্সে এবং এন্টার চাপুন সঙ্গে সঙ্গেই পেয়ে যাবেন প্রায় ১৬ কোটি ২২ লাখ ২০ হাজার ৭৬২ জন, যা ২০০৯ সালে গণনা করা হয়েছিল। এছাড়াও জানতে পারেন বেকার জনসংখ্যা ও তা জানতে পারেন ‘nemployment rate’ তারপর দেশের নাম লিখে।

হারানো মানুষকে খুঁজুন
আপনার ছোট বেলার কোন বন্ধুকে খুঁজে পেলেও পেতে পারেন এই গুগলের মাধ্যমে। যেমন কোনো নাম লিখে সার্চ দিলে একটা লিস্ট আসবে। এভাবে প্রোফাইল ইনফো পেয়েও যেতে পারেন।

একই বিভাগের অন্যান্য সাইট
‘related:’ লিখে আপনি যেই সাইটের মতো আরও সাইট খুঁজছেন, তা লিখে সার্চবক্সে গিয়ে এন্টার দিন। যেমন related:amardeshonline.com লিখে সার্চ দিলে টিটির মতো আরও একই টাইপের সাইটগুলোকে পেয়ে যাবেন।
এছাড়াও যেকোন তথ্য খুঁজে পেতে পারেন আপনার বুদ্ধিমত্তাকে কাজে লাগিয়ে।

শীতের শাকসবজি ও ফলমূলের ঔষধি গুণ

প্রকৃতিই হলো আমাদের জ্ঞান-বিজ্ঞানের মূল আধার। সৃষ্টিকর্তা অপরূপ সৌন্দর্যে নিখুঁতভাবে সৃষ্টি করেছেন এই প্রকৃতি। প্রকৃতিকে যিনি যত বেশি ভালোভাবে অনুধাবন করতে পেরেছেন, যিনি প্রকৃতিকে বোঝার জন্য যত বেশি চেষ্টা করেছেন তিনিই নিজেকে একজন আদর্শ ব্যক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছেন। অ্যান্টিবায়োটিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের এক অসাধারণ আবিষ্কার। আর এই আবিষ্কারের পেছনেও রয়েছে প্রকৃতির দেয়া তথ্য অনুধাবন করা। পেনিসিলিন নামক অ্যান্টিবায়োটিক আবিষ্কারের ইতিহাস আমরা সবাই জানি। বিজ্ঞানী আলেকজান্ডার ফ্লেমিং গবেষণাগারে ছোট ছোট কাচের পাত্রে ব্যাকটেরিয়ার কালচার (চাষ বা বংশ বৃদ্ধি) করতেন। একদিন তিনি দেখলেন যে, তার কালচার করা একটি পাত্রের এক পাশে এক প্রকার ছত্রাক জন্ম দিয়েছে, যা এর আশপাশের সব ব্যাকটেরিয়া মেরে ফেলেছে। তিনি প্রকৃতির এই ভাষা বোঝার জন্য আত্মনিয়োগ করলেন। তিনি গবেষণা করে বুঝতে পারলেন যে,্‌ এটি ছিল পেনিসিলিয়ান জাতীয় ছত্রাক এবং এর রয়েছে ব্যাকটেলিয়া ধ্বংসকারী ক্ষমতা। আর এই ছত্রাক থেকে তিনি প্রস্তুত করেন পেনিসিলিন নামক অ্যান্টিবায়োটিক। প্রকৃতির না বলা নিশ্চুপ ভাষা বুঝতে পারার ফলে তিনি সফল হয়েছিলেন পেনিসিলিন নামক অ্যান্টিবায়োটিক আবিষ্কার করতে।

ওপরের এই ঘটনা প্রকৃতির ভাষা অনুধাবন করা ও নিজেকে সফল বিজ্ঞানী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার এক আদর্শ উদাহরণ। বর্তমানে আমাদের মাঝে প্রকৃতি নিয়ন্ত্রণের ব্যাপক প্রচেষ্টা চলছে। আমাদের মাঝে শীতের সবজি (যেমন-টমেটো) গ্রীষ্মে এবং গ্রীষ্মের ফল (আম, তরমুজ) শীতে ফলানোর এক অসুস্থ প্রবণতা জন্ম নিয়েছে এবং ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে। কিন্তু আমরা ভেবে দেখি না, গ্রীষ্মের ফলগুলো আমাদের শীতের দিনে গ্রহণের কোনো প্রয়োজন নেই। গরমের দিন আমরা সাধারণত একটু বেশি ঘামি। ফলে দেহ থেকে বেশি পরিমাণ লবণ ও পানি বের হয়ে যায়। আর এই লবণপানির ঘাটতি পূরণ ও ভারসাম্য রক্ষার জন্য সৃষ্টিকর্তা তখন প্রকৃতিতে ফলান অসংখ্য রসাল ফল। শীতের দিনে যেগুলো গ্রহণ বিলাসিতা ও অপচয় ছাড়া কিছু নয়। কারণ গ্রীষ্মের ফলের সে টাকায় আমরা প্রায় তিন গুণ পরিমাণ শীতের সবজি কিনতে পারব, যা নিশ্চিত করবে আমাদের সুস্বাস্থ্য, মেটাবে পুষ্টি ঘাটতি। শীতের দিনের কিছু শাকসবজি ও ফলমূলের ঔষধি গুণ নিয়েই তৈরি করা হয়েছে এই প্রবন্ধ।

টমেটোঃ টমেটো শীতের দিনের এক অসাধারণ সবজি, যা সবার নজর কাড়ে এবং স্বাদেও অতুলনীয়। টমেটোর এত সুন্দর বর্ণ তাতে থাকা লাইকোপেনের জন্য হয়ে থাকে। লাইকোপেন টমেটোর মূল কার্যকর রাসায়নিক উপাদান এবং অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট গুণসম্পন্ন। তাই টমেটো ক্ষতিকর এলডিএল’র অক্সিডেশন প্রতিরোধ করে আমাদের হৃৎপিণ্ডকে সুস্থ ও সবল রাখে। তা ছাড়া টিউমার ও ক্যান্সার প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণেও টমেটো সহায়তা করে।

বাঁধাকপি, ফুলকপি, ব্রকলি ও মুলাঃ সবই শীতের খুবই সুস্বাদু সবজি। এ সবজিগুলোতে রয়েছে সালফোর্যাফেন ও ইনডোল-৩ কার্বিনল, যা ক্যান্সার প্রতিরোধে এবং ক্যান্সার কোষ ধ্বংসে কার্যকর। এ সবজিগুলোর মধ্যে মুলাকে আমরা অনেকেই হেয় করে থাকি এবং নিুমানের সবজি মনে করি। অথচ এই মুলা ক্যান্সার প্রতিরোধের পাশাপাশি পেটের সমস্যা ও প্রস্রাবের সমস্যা নিরসনে সহায়তা করে। তাই শীতে এই সবজিগুলো আমাদের বেশি বেশি গ্রহণ করা উচিত।

গাজরঃ গাজর শীতের আরেক আকর্ষণীয় সবজি। এর রঙ আমাদের সবাইকে আকর্ষণ করে। আর এই সুন্দর বর্ণের মধ্যে রয়েছে এর ঔষধি গুণ। গাজরের এই রঙের কারণ হলো এতে থাকা বিটাক্যারোটিন। বিটাক্যারোটিন আমাদের দেহের ভেতরে রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে রেটিনল বা ভিটামিন-এ তে পরিণত হয়। আর এই ভিটামিন-এ আমাদের দৃষ্টিশক্তি স্বাভাবিক রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। শুধু তাই নয়, চোখের পাশাপাশি গাজর আমাদের ত্বকের সুরক্ষাও প্রদান করে। গাজরের বিটাক্যারোটিন আমাদের ত্বককে সূর্যের অতি বেগুনি রশ্মির হাত থেকে সুরক্ষা দেয় এবং ত্বককে ক্যান্সারের হাত থেকে রক্ষা করে।

পালংশাকঃ শীতের সবজিগুলোর মধ্যে আরেকটি পুষ্টিকর সবজি হলো পালংশাক। এতে রয়েছে ভিটামিন, এ, সি, ই-সহ আরো অনেক ভিটামিন ও খনিজ। তাই আমাদের দেহের পরিপূর্ণ পুষ্টি ও সুস্বাস্থ্য রক্ষার জন্য পালংশাক খুবই প্রয়োজনীয়।

আঙুরঃ শীতের ফলের মধ্যে আঙুর অন্যতম। আঙুরে রয়েছে রেসভেরাট্রল ও প্রোএন্থোসায়ানিডিন নামক অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট। তাই আঙুর ক্যান্সার প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে কার্যকর। এ ছাড়া অকালবার্ধক্য প্রতিরোধে আঙুর অদ্বিতীয়।

আমলকীঃ শীতের ফলগুলোর মধ্যে আমলকী আরেকটি সুস্বাদু ফল। আমলকীকে বল হয় ভিটামিন ‘সি’ এর রাজা। আর এই ভিটামিন ‘সি’ আমাদের ত্বকের সুরক্ষা, মাঢ়ি মজবুত করতে এবং ক্যান্সার প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা পালন করে।

কমলালেবুঃ কমলালেবু ভিটামিন ‘সি’ সমৃদ্ধ এক অনন্য ফল। কমলালেবু আমাদের ত্বককে সুরক্ষা করতে সহায়তা করে। আমরা সবাই কমলালেবুর শুধু ভেতরের রসাল অংশ খেয়ে থাকি এবং এর বাকল ফেলে দিই। অথচ এই বাকলে রয়েছে প্রচুর পেকটিন, যা আমাদের পরিপাকতন্ত্রের ক্যান্সার প্রতিরোধে সহায়তা করে। তাই কমলা বাকলসহ জুস করে খাওয়া অধিক স্বাস্থ্যসম্মত, পুষ্টিকর ও ঔষধি গুণসম্পন্ন।

আমাদের সবারই সব ঋতুর সব ফল ও সবজি অন্তত একবার গ্রহণ করা উচিত। কারণ প্রতিটি ফল ও সবজির রয়েছে আলাদা আলাদা ঔষধি ও পুষ্টিগুণ। তাই আসুন আমরা আমাদের চার পাশের শাকসবজি ও ফলমূলের ঔষধি পুষ্টিগুণ জানি এবং এগুলো গ্রহণের মাধ্যমে সুস্থ ও সুন্দর জীবন লাভ করি।

 

বাংলা ও আরবি ভাষার সম্পর্ক নিবিড়

আমাদের মায়ের ভাষা বাংলা। এ ভাষায় আমরা মনের ভাব প্রকাশ করি। এ ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য হয়েছে রক্তস্রাত সংগ্রাম। অন্যদিকে মুসলিম হিসেবে আমাদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ আল কোরআন এবং প্রিয় নবী হজরত মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ভাষা আরবি। একটি ভাষার সঙ্গে আমাদের জন্মগত সম্পর্ক, অন্যটির সঙ্গে ধর্মগত সম্পর্ক। কিন্তু এই দুই ভাষার মাঝে কি কোনো সম্পর্ক রয়েছে? থাকলে সে সম্পর্কের স্বরূপ কী—এটি জানতেই ৮ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় গিয়েছিলাম অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান মোল্লার কাছে। ‘বাংলা ও আরবি ভাষার ভাষাতাত্ত্বিক সম্পর্ক’ শিরোনামে সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি থিসিস সম্পন্ন করে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেছেন।

আলোচনায় তার থিসিসের নানা অনুষঙ্গ, দুই ভাষার সম্পর্কের নানা দিক উঠে এসেছে। তার পরিষ্কার কথা—বাংলা ও আরবি ভাষা হিসেবে ভিন্ন গোত্রীয় দু’টি ভাষা নয়, বরং ভাষা দুটি একই গোত্রের। উত্পত্তি, বর্ণ, শব্দ ও প্রয়োগরীতি— সম্পর্কের সব সূত্র থেকেই আরবি ও বাংলার সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর ও নিবিড়। এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি জানান, চট্টগ্রাম অঞ্চলের আদিভাষার ৭০ শতাংশ শব্দ, বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলের আদিভাষার ৬০ শতাংশ শব্দ এবং গোটা বাংলাদেশের প্রায় সব এলাকার দৈনন্দিন ভাষার প্রায় ৫০ শতাংশ শব্দ (প্রকৃত ও রূপান্তরিত উচ্চারণে) আরবি থেকে নেয়া। তবে বর্তমানে কথিত শিক্ষিত শ্রেণীর মুখের ভাষায় আরবি শব্দগুলোর পরিবর্তে ইংরেজি শব্দের ব্যবহার হচ্ছে বেশি। অবশ্য বাংলাভাষী জনতার ভাষায় এখনও আরবি শব্দের প্রাচুর্য ও মাধুর্যপূর্ণ ব্যবহার ব্যাপক।
সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজে আরবি ও ইসলামিক স্টাডিজের সহকারী অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান মোল্লা প্রায় ১২ বছর সময় ব্যয় করেছেন এ থিসিস সম্পন্ন করতে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগের সাবেক বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক আ ত ম মুছলেহুদ্দীনের তত্ত্বাবধানে তার এ থিসিস তৈরিতে সহকারী তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন আরবি বিভাগের বর্তমান চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. ছিদ্দীকুর রহমান নিজামী। ড. মোল্লা ২০০৮ সালে এওয়ার্ড লাভ করেন। প্রায় ৬০০ পৃষ্ঠা সংবলিত তার থিসিসের অধ্যায় ছয়টি। ১. ভাষাতত্ত্ব, ২. ভাষার উত্পত্তি (বাংলা ও আরবি), ৩. বর্ণ, ৪. লিপি, ৫. শব্দ এবং ৬. বাক্য বা প্রয়োগরীতি। তার থিসিসের পরীক্ষক ছিলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. এএমএম শরফুদ্দীন। দু’জনই আরবির শিক্ষক।
অন্য এক প্রশ্নের জবাবে ড. মোল্লা বলেন, তার থিসিসে তিনি বাংলা ভাষার উত্পত্তি নিয়ে ড. সুনীতি কুমার, ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ও ড. এনামুল হকের বক্তব্য ও বিশ্লেষণ তুলে ধরেছেন। তাদের বর্ণিত নীতি অনুসরণ করে পরিচালিত তার গবেষণাকর্মে সাব্যস্ত হয়েছে যে, ভাষা হিসেবে বাংলার উত্পত্তি ও প্রধান ঋণ আরবি ভাষা থেকে, আরবি ভাষার প্রতি সংস্কৃত থেকে নয় এবং সংস্কৃতের প্রতি নয়। তার মতে, সংস্কৃত কখনও মানুষের ভাষা ছিল না, ছিল সীমিত ধর্মীয় পরিমণ্ডলের মাঝে আবদ্ধ। সংস্কৃতের স্বতন্ত্র কোনো লিপিও নেই, সে ভাষার লিপি হচ্ছে ব্রাহ্মী লিপি। কিন্তু সংস্কৃত থেকে বাংলায় যে শব্দভাণ্ডার এসে যুক্ত হয়েছে, তা হয়েছে অনেক পর। বাংলা অন্যতম প্রাচীন ভাষা। পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাচীন ভাষা আরবি থেকেই বাংলা ভাষার বিপুল সমৃদ্ধি ঘটছে।
তবে তিনি এও বলেন, ভাষা হচ্ছে বহমান নদীর মতো। চলমান-প্রবহমান। বাংলা ভাষার বর্তমান রূপটির মাধুর্য প্রশ্নতীত। উত্পত্তিগতভাবে আরবি থেকে রূপান্তর, সমৃদ্ধি সবই যেমন ঘটেছে তেমনি স্বাভাবিক ধারায় চলতে চলতে বাংলা ভাষা এখন যে জায়গায় এসেছে সে দিকটি অবশ্যই আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ।
ড. মোল্লার থিসিস ও আলোচনায় যে বাস্তবতা ফুটে ওঠেছে সেটি হচ্ছে, বাংলা ভাষার সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক কেবলই জন্মগত নয়, ধর্মগতও। নতুনভাবে তুলে ধরা বিশেষত্বের এ দিকটিও আমাদের মাতৃভাষার একটি অনন্য মর্যাদাকে চিহ্নিত করে।

%d bloggers like this: