কুরআনের আলোকে জালিমের শাস্তি

আমরা অনেকেই মনে করি, জীবনে সফলতা ও কামিয়াবির উপায় হচ্ছে বস্তুগত উপায়-উপাদান, সম্পদের প্রাচুর্য, শক্তিশালী রাষ্ট্রযন্ত্রের দণ্ডমুণ্ডের কর্তৃত্ব এবং প্রবৃত্তির চাহিদা পূরণের সব সুযোগ-সুবিধা। আবার কেউ ভাবি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সর্বাধুনিক সমাহার, অর্থ, বাণিজ্য, সমরশক্তি ও অত্যাধুনিক মারণাস্ত্রের অধিপতি হয়ে সব কিছু হাতের মুঠোর মধ্যে পুরে নেয়াতেই রয়েছে মানবজীবনের চূড়ান্ত সফলতা। এ জাতীয় দর্শনে বিশ্বাসীরা যুগে যুগে তাদের উচ্চাভিলাষ পূরণের জন্য সর্বসাধারণকে জুলুম-শোষণের শিকার বানিয়েছে। কখনো তা ব্যক্তিগত পর্যায়ে হয়েছে, কখনো হয়েছে জাতিগত পর্যায়ে শক্তিশালী রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে। ছোট ছোট জাতিসত্তাকে আক্রমণ, দখল ও শোষণের শিকার বানিয়েছে সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো। কিন্তু আল্লাহর শপথ, একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত সীমালঙ্ঘন অব্যাহত রাখলেও শেষ পর্যন্ত আল্লাহর গজবে পাকড়াও হয়েছে তারা। অগাধ সহায় সম্পত্তির মালিক কারুন, যার ধনভাণ্ডার ও কোষাগারের চাবি বহন করতে কয়েকজন শক্তিশালী লোক হাঁপিয়ে উঠত; সেও শেষ নাগাদ করুণ পরিণতির শিকার হয়েছে। ফেরাউন দাবি করেছিল মিসরীয়দের কাছে­ ‘আমি হচ্ছি তোমাদের সর্বশ্রেষ্ঠ রব’। সাগরে ডুবিয়ে মেরে আল্লাহ চুরমার করে দিয়েছিলেন তার ক্ষমতার দম্ভ ও অহমিকা। পূর্বযুগের অনেক দাম্ভিক, অত্যাচারী শাসক ও জনগোষ্ঠীকে আল্লাহ চরম শিক্ষা দিয়েছেন তাদের সীমালঙ্ঘনের অপরাধে। সূরা আল ফজরে আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেছেনঃ ‘আপনি কি লক্ষ করেননি, আপনার প্রভু আ’দ জাতির ইরাম বংশের সাথে কী আচরণ করেছিলেন? যাদের দৈহিক গঠন ছিল স্তম্ভের মতো দীর্ঘ ও মজবুত। যাদের মতো দৈহিক শক্তিসম্পন্ন আর কোনো জাতি কোনো দেশে সৃষ্টি হয়নি। আর সামুদ গোত্র, যারা উপত্যকার পাথর কেটে নির্মাণ করেছিল ঘরবাড়ি। আর লৌহশলাকার অধিকারী ফেরাউন, যারা দেশে সীমালঙ্ঘন করেছিল, বাড়িয়ে দিয়েছিল অশান্তির বিভীষিকা। অতঃপর আপনার প্রভু বর্ষণ করলেন তাদের প্রতি শাস্তির কশাঘাত। নিশ্চয়ই আপনার প্রভু সদাসতর্ক দৃষ্টি নিয়ে আছেন। (আল ফজরঃ ৬-১৩) জুলুম ও সীমালঙ্ঘন সম্পর্কে কুরআনে উদ্ধৃত ইতিহাসের বিভিন্ন উদাহরণ থেকে জালিমরা কি কোনো দিন শিক্ষা গ্রহণ করেছে? সীমালঙ্ঘনকারী জালিমদের ক্ষমতার ফানুস একদিন অবশ্যই চুরমার হয়ে যাবে। আল্লাহ তায়ালার গজব যখন তাদের প্রতি নিপতিত হবে তখন তাদের শিক্ষা গ্রহণের আর সুযোগ থাকবে না। পৃথিবীর বেশির ভাগ জালিম শক্তির এমন পরিণতিই হয়ে থাকে। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, ‘যারা কাফের, তাদের কর্ম মরুভূমির মরীচিকা সদৃশ্য, যাকে পিপাসার্ত ব্যক্তি পানি মনে করে। এমনকি সে যখন তার কাছে যায়, তখন কিছুই পায় না, বরং পায় সেখানে আল্লাহ তায়ালাকে। অতঃপর আল্লাহ তার হিসাব চুকিয়ে দেন। আর আল্লাহ দ্রুত হিসাব গ্রহণকারী।’ (সূরা নূরঃ ৩৯) কাঁড়ি কাঁড়ি সম্পদ, শক্তিশালী জনবল বা রাষ্ট্রযন্ত্রের অধিকারী ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের জুলুম অত্যাচার বেশ কিছুদিন অব্যাহত থাকলে তাদের আত্মম্ভরিতা ও অহমিকা আরো বেড়ে যায়। তারা মনে করে, এ পৃথিবীতে এমন কোনো শক্তি নেই যা তাদের রুখতে পারে। তারা ধরাকে সরা মনে করে। এতে দুর্বলচিত্ত মজলুম নিষ্পেষিত সম্প্রদায় বা সর্বসাধারণের মনেও অনেক সময় ভুল ধারণা সৃষ্টি হয়ে যায় যে, এ জালিম শক্তির পতন কি আদৌ কোনো দিন হবে? যারা আল্লাহর ক্ষমতার প্রতি ঈমান পোষণ করে, মাঝে মধ্যে তাদের মনেও ওয়াসওয়াসা চলে আসে, আল্লাহ যদি জালিম শক্তিকে দমন করতে ক্ষমতা রাখেনই, তাহলে অমুক জালিম শক্তিকে এত দিন পর্যন্ত শায়েস্তা করছেন না কেন? এত সীমালঙ্ঘন সত্ত্বেও তাদের অবকাশ দিচ্ছেন কেন? এর জবাবে আল্লাহপাক পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেন, দেশে দেশে কাফেরদের বেপরোয়া চলাফেরা (হে রাসূল) আপনাকে যেন ধোঁকায় না ফেলে দেয়।
টা হচ্ছে অল্প সময়ের উপভোগ মাত্র। তাদের চূড়ান্ত ঠিকানা হচ্ছে জাহান্নাম। কত খারাপই না সে ঠিকানা।’ (আল ইমরানঃ ১৯৬-১৯৭) মানুষ হয়তো মনে করে অমুক জালিম শক্তি এত অপরাধ করছে, তার তো এক্ষুনি শাস্তি পাওয়া উচিত। তাকে আর এক দিনও সময় দেয়া ঠিক নয়। তবে আল্লাহ তায়ালার একটা নির্দিষ্ট তালিকা আছে। আর সেটি হচ্ছে, প্রত্যেকের জন্যই তিনি একটা নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দিয়েছেন। সে সময় আসা পর্যন্ত আল্লাহ অপেক্ষা করেন এবং তাদের অবকাশ দেন। আর বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই সৃষ্টির প্রতি জুলুমের কিছু পাকড়াও আল্লাহ দুনিয়াতেই করে থাকেন। কোন জালিমকে আল্লাহ কখন ধরবেন, তা দিন, তারিখ, ঘণ্টা, মিনিট এমনকি সেকেন্ডসহ তিনি নির্দিষ্ট করে রেখেছেন। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, ‘যখন তাদের নির্দিষ্ট সময় এসে যাবে, তখন না একদণ্ড পেছনে সরতে পারবে না, না সামনে ফসকাতে পারবে’ (ইউনুসঃ ৪৮)। আল্লাহর পাকড়াও থেকে ফসকানোর বা পালানোর কোনো উপায় থাকবে না। আল্লাহপাক ইরশাদ করেন, ‘অতঃপর আমি কাফেরদের সুযোগ দিয়েছিলাম, এরপর তাদের পাকড়াও করেছিলাম। অতএব কত-ই না খারাপ ছিল আমাকে অস্বীকৃতির পরিণাম! আমি কত জনপদ ধ্বংস করেছি এ অবস্থায় যে তারা ছিল জুলুম-অন্যায়ে লিপ্ত। এসব জনপদ এখন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। কত কূপ পরিত্যক্ত। ধ্বংস হয়ে গেছে কত সুদৃঢ় প্রাসাদ ও ভবন। তারা কি দেশে ভ্রমণ করে দেখে না? যাতে তাদের হৃদয়ে বোধোদয় ঘটে এবং কর্ণ দ্বারা শ্রবণ করে (যা ঘটেছিল), বস্তুত চোখ তো অন্ধ হয় না, অন্ধ হয়ে আছে তাদের বক্ষস্থিত হৃদয়গুলো। তারা আপনাকে আজাব ত্বরান্বিত করতে বলে। অথচ আল্লাহ কখনো তার ওয়াদা ভঙ্গ করেন না। আপনার প্রভুর কাছে এক দিনের পরিমাণ হচ্ছে তোমাদের গণনার এক হাজার বছর। আমি কত জনপদকে অবকাশ দিয়েছি এ অবস্থায় যে, তারা জুলুম-অন্যায়ে লিপ্ত ছিল। এরপর তাদের পাকড়াও করেছি। আর মূলত আমাদের কাছে প্রত্যাবর্তন করতে হবে।’ (সূরাঃ হজ)।

Advertisements

ডায়াবেটিস ও খাদ্য

সাধারণ স্বাস্থ্য রক্ষায় যেমন সুষম খাদ্যের প্রয়োজন, তেমনি ডায়াবেটিসের বেলায়ও এর ব্যতিক্রম হয় না। তবে এই রোগটিকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে গেলে খাদ্যের ব্যাপারে কিছু বিধিনিষেধ মেনে চলা জরুরী। তিনটি বিষয় মনে রাখতে পারলে এই রোগটিকে আয়ত্বে আনা কোন ব্যাপার নয়। প্রথমত: নিষিদ্ধ খাবার বর্জন। দ্বিতীয়ত: পরিমাণ মতো খাবার গ্রহণ। তৃতীয়ত: প্রতি ৩ ঘন্টা পর পর খাবার খেতে হবে। 

নিষিদ্ধ খাবারগুলো হলো:.

চিনি, গুড়, মধু, গ্লুকোজ, খেজুরের রস, কেক, পেস্ট্রি, জ্যাম, জেলী, সিরাপ, মিষ্টি বিস্কুট, মিষ্টি, হালুয়া, কোল্ড ড্রিংকস, আইসক্রিম, মিষ্টি দই ইত্যাদি।

পরিমাণ মতো খাবার গ্রহণ:

প্রতিটি ডায়াবেটিস রোগীর খাবারের পরিমাণ পৃথক হয়ে থাকে। পরিবারে এক জনের ডায়াবেটিস হলে তাকে যে পরিমাণ খাবার নির্ধারণ করে দেয়া হয়, সেই পরিমাণ খাবার অন্যদের জন্য নয়। কারণ যদি খাবারের পরিমাণ বেশি হয় তবে রক্তে গস্নুকোজের মাত্রা বেড়ে যাবে। আর যদি কম হয় তাহলে গস্নুকোজের মাত্রা কমে যাবে। এই কারণে যার জন্য যে পরিমাণের খাবার নির্দিষ্ট করে দেয়া হয় তাই খেতে হবে।

সময় মতো খাবার খেতে হবে:

ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে সময় ঠিক রাখা খুবই জরুরী। একেক দিন একেক সময়ে খাবার খাওয়া একেবারেই উচিত নয়। প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে খাবার খেতে হবে এবং প্রতি তিন থেকে সাড়ে তিন ঘন্টা পর পর খেতে হবে। অনেকক্ষণ না খেয়ে থাকা ডায়াবেটিসের জন্য খুবই বিপজ্জনক। এতে বিপাক ক্রিয়ায় বিঘ্ন ঘটে এক কিটোসিসের মত জটিলতা দেখা যায়। এদিকে দেড় থেকে দুই ঘন্টা পর পর খেলে রক্ত শর্করার মাত্রা কমানো যায় না।

খাবার হবে এ ধরনের:

চিনি-মিষ্টি, মধু বাদ দিতে হবে, ভাত-রুটি-আলু পরিমাণ মতো, পাতা জাতীয় ও পানসে সবজি ইচ্ছামত। টক জাতীয় ফল ইচ্ছামত। তবে ডায়াবেটিস বা রক্তশর্করা নিয়ন্ত্রণে না থাকলে মিষ্টি ফল না খাওয়াই উত্তম।

শর্করা জাতীয় খাদ্য:

অন্যান্য স্বাভাবিক লোকের মতই শর্করা জাতীয় খাবার দৈনিক ৫০-৬০ ভাগ দিতে হবে। এ ধরণের খাবার শরীরে শক্তি যোগায়। শর্করা প্রধানত: দুই প্রকার। চিনিযুক্ত শর্করা ও শ্বেতসারযুক্ত শর্করা। সকল শর্করাই শোষিত হয়ে দেহে গস্নুকোজে রূপান্তরিত হয়। তবে সহজ শর্করা যেমন- চিনি, গুড়-গস্নুকোজ এগুলো খাওয়া মাত্র সরাসরি রক্তে গস্নুকোজের মাত্রা বাড়ায় এবং শ্বেতসার জাতীয় খাদ্য ধীরে ধীরে বাড়ায়। এ কারণেই চিনি-গুড় একেবারেই নিষেধ করা হয় এবং শ্বেতসার অর্থাৎ ভাত-রুটি, শস্য জাতীয় খাবার সীমিত পরিমাণে খেতে বলা হয়।

শর্করা জাতীয় খাবার হলো:

রুটি, ভাত, আলু, বিস্কুট, নডুলস, চালের গুড়া, পরিকা, ভূট্টা, সাগু, বালি, সুজি, চিড়া, মুড়ি, খই, চিনি-গুড়, গ্লুকোজ, মধু, সেমাই ইত্যাদি।

আমিষ জাতীয় খাদ্য:

আমিষ প্রধানত: দু’ধরণের হয়ে থাকে। প্রাণীজ আমিষ ও উদ্ভিজ আমিষ। সাধারণত: প্রাণীজ আমিষের চাইতে উদ্ভিজ আমিষের গুণগত মান কম। তবে উভয় প্রকার আমিষই পরিপাক হয়ে এমাইনো এসিডরূপে রক্তে শোষিত হয়। খাদ্যের মোট ক্যালরির ২০-৩০ ভাগ আমিষ জাতীয় খাবার থেকে আসা উচিত। আমিষ শর্করার মতো রক্তে গস্নুকোজের মাত্রা বাড়ায় না এবং চর্বির মতো অধিক ক্যালরি উৎপন্ন করে না। তবে এটা শরীর গঠন, বৃদ্ধি ও ক্ষয়পূরণ করে দেহে রোগ প্রতিরোধ শক্তি বাড়িয়ে দেয়। এ কারণে ডায়াবেটিস রোগীদেরও আমিষ জাতীয় খাদ্য স্বাভাবিক লোকের মতই গ্রহণ করতে হবে। আমিষ জাতীয় খাবার হলো- ডিম, দুধ, মাছ, মাংস, ডাল, বাদাম, সীমের বিচি, সয়াবিন ইত্যাদি।

চর্বি জাতীয় খাদ্য:

সারাদিনের খাবারের মোট ক্যালরির ২০-৩০ ভাগ আসা উচিত চর্বি জাতীয় খাদ্য থেকে। তবে সম্পৃক্ত চর্বি যেমন-ঘি, ডালডা, এবং মাংসের চর্বি, যতটা সম্ভব পরিহার করা উচিত। কারণ সম্পৃক্ত চর্বিতে দেহের রক্তে কোলেস্টেরল ও ট্রাইগস্নাইসেরাইডের মাত্রা বৃদ্ধি পায়। এই জন্য ডায়াবেটিস রোগীদের সম্পৃক্ত চর্বি যতটা সম্ভব কম খাওয়া উচিত। কারণ তারা অন্যদের তুলনায় সহজেই হূদরোগে আক্রান্ত হতে পারে। রান্নায় সয়াবিন তেল, কর্ণতেল, সূর্যমুখীর তেল, জলপাইয়ের তেল ব্যবহার করাই উত্তম।

খাদ্যের আঁশ:

খাদ্যের আঁশ দেরীতে হজম হয় বলে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের সহায়ক। আবার পরিমাণের অতিরিক্ত আঁশ পেটে গ্যাসের সৃষ্টি করে। পেটে ব্যথা হয়, পেট ফেঁপে যায় ও পাতলা পায়খানা হয়। সেজন্য যাদের গ্যাসট্রাইটিসের সমস্যা আছে এবং যাদের আলসার আছে তাদের এই জাতীয় খাবার বাদ দেয়া উচিত। আঁশ জাতীয় খাবার হলো- ভূষিযুক্ত রুটি, লালচাল, আঁশযুক্ত সবজি ও খোসা সহ ফল। 

সব শেষে বলা যায়, যেহেতু ডায়াবেটিস সারা জীবনের রোগ সেজন্য প্রতিটি রোগীরই আত্মসচেতনতা প্রয়োজন। বলা হয়, একজন নিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস সম্পন্ন লোক অনেক বেশি ভাল, ডায়াবেটিস নাই এমন একজন লোকের চাইতে। কারণ তিনি শৃঙ্খলাপূর্ণ জীবন যাপন করেন। এবং সব সময় চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে থাকেন।

%d bloggers like this: