কুরআন মজিদ ও মানুষের মগজ


ইনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা মানুষের মগজ সম্পর্কে লেখে যে, এই মগজের এমন বেশি সম্ভাবনা রয়েছে, যা একজন মানুষ তার জীবনভর যা ব্যবহার করতে পারবে তারও বেশি। (খণ্ড ১২, পৃষ্ঠা- ৯৯৮)। বলা হয়ে থাকে যে মানুষের মগজ জ্ঞান ও স্মৃতির যেকোনো ভার বহন করতে সক্ষম এবং তা এখন যা ব্যবহার করছে তারও বিলিয়ন গুণ বেশি! বিবর্তনের মাধ্যমেই যদি মানুষের মগজের এই অবস্থা হতো, তাহলে এই বাড়তি শক্তি আসত না; যা প্রয়োজন, যতটুকু প্রয়োজন বিবর্তনের মাধ্যমে শুধু ততটুকুই আসত। একজন গবেষক লেখেন, ‘আসলে এটা হলো একমাত্র এমন একটি অংশ যা মানুষ জানে না কিভাবে সম্পূর্ণ ব্যবহার করতে হয়, এটাকে আমরা কিভাবে বিবর্তনবাদের সেই মতবাদের সাথে খাপ খাওয়াব, যাতে বলা হয়েছে যে, প্রাকৃতিক নির্বাচন ছোট ছোট ধাপে অগ্রসর হয়, যা এর বহনকারীকে প্রদান করা হয় কম কম করে; তবে প্রয়োজনীয় সুবিধাসহ মানুষের মগজের গঠন এখনো বিবর্তনের সবচেয়ে বড় অজ্ঞেয় বিষয়।’ (দ্য ব্রেনঃ দ্য লাস্ট ফ্রন্টিয়ার, পৃষ্ঠা-৫৯, ৬৯)। বিবর্তন পদ্ধতি কোনো সময়ই মানুষের মগজের বাড়তি ক্ষমতা তৈরি করবে না ও বংশপরম্পরায় সামনে নিয়ে যাবে না।

বৈজ্ঞানিক কার্ল সাগান আশ্চর্য হয়ে বলেছেন, মানুষের মগজে বিশ মিলিয়ন (দুই কোটি) গ্রন্থের তথ্য ভর্তি হতে পারে। তিনি বলেন, ‘মগজ হলো ছোট স্থানে বিরাট এলাকা।’ (কসমস, পৃষ্ঠা ২৭৮)। আর এই ছোট্ট স্থানে কী যে হয় তা আশ্চর্য ব্যাপার। ধরুন, একজন যোগ্য কারি কুরআন মজিদের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ তেলাওয়াত করছেন মাহফিলে। ধরুন, তা হলো সূরা আর রাহমান। এ সময় তার মগজে কুরআনের শব্দ, সঠিক উচ্চারণ, সুর, ধ্বনি, অর্থ সব তার মনে এসে ভিড় করছে। তার গলার ওঠানামার জন্য শ্রুতিমধুর হয়ে পড়ছে কেরাআত। কারির মন-মগজকে সব দিকে খেয়াল রাখতে হচ্ছে। তার মগজের ভেতরে নানারকম অ্যাকশনচলছে। যদি কোনো শব্দ উচ্চারণে সামান্যতম অশুদ্ধ হচ্ছে, মগজ তাকে হুঁশিয়ারি সঙ্কেত প্রদান করছে। কোথায় স্বর উঁচু, স্বর নিচু করতে হবে, কোথায় বিরতি হবে তা মগজ তাকে অলক্ষে জানিয়ে দিচ্ছে। এই যে কারিয়ানা কৃতিত্ব, তা কারির বহু বছরের চেষ্টায় তার মগজে কম্পিউটারের প্রোগ্রামের মতো আবদ্ধ হয়ে গেছে। আর এসব এই জন্য সম্ভব ছিল যে, তাকে আল্লাহ যে মগজ দিয়েছেন, অর্থাৎ মানুষকে যে মগজ তিনি দিয়েছেন তার যোগ্যতা রয়েছে কুরআন মজিদের আয়াতগুলোকে কারিয়ানা স্টাইলে সুললিত কণ্ঠে উচ্চারণ করার। মানুষের মগজের মৌলিক বৈশিষ্ট্যের জন্যই এটি সম্ভব হয়েছে। এই কাজ কি বানরের মগজ, শিম্পাঞ্জির মগজ বা গাধার মগজ দ্বারা সম্পন্ন করা সম্ভব? হঁ্যা, তবে যে মানুষ তার মগজের এই সুপ্ত প্রতিভাকে ব্যবহার করে না, সে গাধা না হলেও গাধার মতো। কুরআন বলে, ‘নিশ্চয় আল্লাহর কাছে নিকৃষ্ট জীব বধির ও মূক যারা কিছুই বোঝে না।’ (৮ সূরা আনফালঃ ২২ আয়াত)।

তাদের (পাপীদের) হৃদয় আছে, কিন্তু তা দিয়ে তারা দেখে না এবং তাদের কান আছে, কিন্তু তা দিয়ে তারা শুনে না এরা পশুর মতো, বরং তার চেয়েও পথভ্রষ্ট।’ (৭ সূরা আরাফঃ ১৭৯ আয়াত)।

মানুষ ছাড়া অন্যান্য জীবের মগজে মানুষের মগজের মতো দক্ষতা নেই। বিবর্তনবাদীদের কাছে এই পার্থক্যের কোনো সুব্যাখ্যা নেই। কোনো কোনো প্রাণী বেশ কিছু আশ্চর্যজনক কাজ করতে পারে, তবে সেই পর্যন্ত। মানুষের মগজের অপরিমিত সম্ভাবনা রয়েছে, পশুর তা নেই। মানুষ তার মগজের দ্বারা অর্জিত জ্ঞানরাশিকে সঞ্চিত করে একে পিরামিডের মতো উঁচু করতে সক্ষম। অন্য জন্তুতে এটি নেই। জন্তুর জীবনে তার সব যোগ্যতা, প্রবৃত্তি, কর্মদক্ষতা আল্লাহ কর্তৃক সুনির্দিষ্ট। মানুষের রয়েছে কিছু পরিমাণ সুনির্দিষ্ট গুণাবলি, তবে তার সাথে আল্লাহ অপরিমিত সম্ভাবনা যোগ করে দিয়ে মানুষকে মহাবিশ্বে তার প্রতিনিধি হিসেবে ঘোষণা দিয়েছেন। ফেরেশতারাও আল্লাহর প্রতিনিধি নন, শুধু কর্মচারী, দাস মাত্র। মানুষ দাস ও প্রতিনিধি দুই-ই।

মানুষের ভেতর রয়েছে স্বার্থহীন কর্মের প্রবৃত্তি- অন্যের জন্য মঙ্গল চিন্তা। একজন বিবর্তনবাদী বলেন, যা প্রাকৃতিক নির্বাচন (ন্যাচারাল সিলেকশন) দ্বারা এসেছে তা হবে স্বার্থপর। তিনি আরো বলেন, ‘তবু মানুষের একটি বৈশিষ্ট্য যে তার রয়েছে প্রকৃত, স্বার্থহীন পরোপকারী গুণ।’ (ঞভপ ঝপলফমঢ়ভ এপষপ দী জমধভথড়দ উথারমষঢ়, ১৯৭৬, চ-৪, ২১৫). আর একজন বৈজ্ঞানিক বলেন, ‘মানুষের ভেতর রয়েছে নিঃস্বার্থ পরোপকারী গুণ (থলয়ড়ৎমঢ়শ)… (কসমস, পৃষ্ঠা-৩৩০)। মানুষের ভেতর স্বার্থপর গুণও রয়েছে, তবে স্বার্থহীনতাও রয়েছে। নিজের ক্ষতি জেনেও বহু মানুষ নিঃস্বার্থ কর্ম করে। ইমাম হোসেন (রাঃ) জানতেন তিনি স্বল্পসংখ্যক সাথী নিয়ে জালেম শাহীর বিরুদ্ধে জয়ী হবেন না। তবুও দৃষ্টান্ত স্থাপনে তিনি নিঃস্বার্থতার প্রমাণ দিলেন­ জীবন বিসর্জন দিলেন। মানুষ ও পশুতে কি কোনো পার্থক্য নেই?

মানুষ অনন্তকাল সম্পর্কে চিন্তাভাবনা করে। সে ভাবে সে কোথায়, কোথায় তার গন্তব্য। সে বুঝতে চেষ্টা করে সব কিছু্‌। অন্য জীব-জানোয়ারের তো এমন ভাবনা নেই। থাকলে তার চিহ্ন পাওয়া যেত, সে সব জানোয়ারের সভ্যতার, উন্নতির, প্রত্নতাত্ত্বিক, আধুনিক চিহ্নগুলো আমাদের সামনে থাকত। মানুষ জানতে আগ্রহী কেন, কোথায়, কিভাবে, কখন? এসব কিছু। এই জন্য মানুষের আল্লাহ্‌ এমন মগজ, এমন যোগ্যতা দিয়েছেন যা অন্য সৃষ্টিকে স্রষ্টা প্রদান করেননি। আল্লাহ্‌ যখন আদমকে সৃষ্টি করেন তখনই তিনি এই ক্ষমতা আদমের মগজে প্রোগ্রামকরে দেন। কুরআন বলে যে আল্লাহ্‌ মানুষকে শিক্ষা দিয়েছিলেন, আর আল্লাহর শিক্ষা তো ছাত্র যেভাবে শিক্ষকের কাছে বসে শিখে সেভাবে নয়। আল্লাহ মানুষের মন-মগজে সে শিক্ষা প্রদান করে দেন। কুরআন বলে, ‘আর তিনি (আল্লাহ) আদমকে যাবতীয় নাম শিক্ষা দিলেন। তারপর তিনি সেগুলো পেশ করলেন ফেরেশতাদের সামনে এবং বললেন, যদি তোমাদের ধারণা সঠিক হয় (অর্থাৎ কোনো প্রতিনিধি পৃথিবীতে নিযুক্ত করলে ব্যবস্থাপনা বিপর্যস্ত হবে) তাহলে একটু বলো তো দেখি এই জিনিসগুলোর নাম? তারা বললঃ ত্রুটিমুক্ত তো একমাত্র আপনারই সত্তা, আমরা তো মাত্র ততটুকুন জ্ঞান রাখি, যতটুকু আপনি আমাদের দিয়েছেন। প্রকৃতপক্ষে আপনি ছাড়া আর এমন কোনো সত্তা নেই, যিনি সব কিছু জানেন ও সব কিছু বোঝেন।তখন আল্লাহ আদমকে বললেন, ‘তুমি ওদেরকে এই জিনিসগুলোর নাম বলে দাও।তখন সে তাদের সেসবের নাম জানিয়ে দিলো। তখন আল্লাহ বললেন, ‘আমি না তোমাদের বলেছিলাম, আমি আকাশ ও পৃথিবীর এমন সমস্ত নিগূঢ় তত্ত্ব জানি যা তোমাদের অগোচরে রয়ে গেছে? যা কিছু তোমরা প্রকাশ করে থাকো তা আমি জানি এবং যা কিছু তোমরা গোপন করো তাও আমি জানি।’ (২ সূরা বাকারাহঃ ৩১-৩৩ আয়াত)।

আল্লাহ মানুষের মগজের ভেতর এমন কিছু দিয়েছেন, যা অন্য সৃষ্টি এমনকি ফেরেশতার মধ্যেও নেই। এই মগজের সম্ভাবনা অপার। এদিকে মানুষ চিন্তাশক্তির দ্বারা অনুশীলন গবেষণা করতে সক্ষম, ভালোমন্দ বুঝতে সক্ষম, ন্যায়-অন্যায় অনুধাবনে সক্ষম। হজরত ইব্রাহিম (আঃ)-এর জীবনে এটির বাস্তব নমুনা আমরা লক্ষ করি। কিভাবে তিনি নিজের স্বাভাবিক মগজ শক্তি দ্বারা প্রকৃত প্রভুর সন্ধান পাচ্ছেন, তার চমৎকার উদাহরণ কুরআনে রয়েছে। কুরআন তাঁর সম্পর্কে বলেন, অতঃপর যখন রাত আচ্ছন্ন করল তখন একটি নক্ষত্র দেখে সে বললঃ এ আমার রব, কিন্তু যখন তা ডুবে গেল, সে বললঃ যারা ডুবে যায় আমি তো তাদের ভক্ত নই। তারপর যখন চাঁদকে আলো বিকীরণ করতে দেখল, বললঃ এ আমার রব। কিন্তু যখন তাও ডুবে গেল তখন বলল, আমার রব যদি আমাকে পথ না দেখাতেন তাহলে আমি পথভ্রষ্টদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যেতাম। এরপর যখন সূর্যকে দীপ্তিমান দেখল তখন বললঃ এ আমার রব, এটি সবচেয়ে বড়। কিন্তু তাও যখন ডুবে গেল তখন ইব্রাহিম চিৎকার করে বলে উঠলঃ হে আমার সম্প্রদায়ের লোকেরা! তোমরা যাদের আল্লাহর সাথে শরিক করো তাদের সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নেই। আমি তো একনিষ্ঠভাবে নিজের মুখ সেই সত্তার দিকে ফিরিয়ে নিয়েছি, যিনি জমিন ও আসমান সৃষ্টি করেছেন এবং আমি কখনো মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত নই।

উপরিউক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় মওলানা মওদূদী লেখেন, ‘নবুওয়াতের দায়িত্বে সমাসীন হওয়ার আগে হজরত ইব্রাহিম আলাইহিস সালাম যে প্রাথমিক চিন্তাধারার সাহায্যে মহাসত্যে পৌঁছে গিয়েছিলেন এখানে তার অবস্থা বর্ণনা করা হয়েছে। এখানে বলা হয়েছে সুস্থ মস্তিষ্ক, নির্ভুল চিন্তা ও স্বচ্ছ দৃষ্টিশক্তির অধিকারী এক ব্যক্তি যখন এমন এক পরিবেশে চোখ মেললেন, যেখানে চার দিকে শিরকের ছড়াছড়ি, কোথাও থেকে তাওহিদের শিক্ষা লাভ করার মতো অবস্থা তার নেই, তখন তিনি কিভাবে বিশ্ব প্রকৃতির নিদর্শনগুলো পর্যবেক্ষণ এবং সেগুলোর মধ্যে গভীরভাবে চিন্তাভাবনা করে তা থেকে সঠিক ও নির্ভুল যুক্তি-প্রমাণ সংগ্রহের মাধ্যমে প্রকৃত সত্যে উপনীত হতে সক্ষম হলেন।

১৯১২ সালে এক ঘটনা ঘটল। ইংল্যান্ডে প্রাপ্ত প্রাচীন মাথার খুলি হাজির করা হলো। একে বলা হলো পিল্ট ডাউন ম্যান। এই খুলি নাকি আকারে বড়, এর মগজও বেশি ছিল। ফলে তত্ত্ব দাঁড় করানো হলো ব্রিটিশদের মাথা ও মগজ বড়, বুদ্ধি বেশি। তাই সর্বত্র ব্রিটিশ শ্রেষ্ঠত্ব। ইংরেজি ভাষাও তাই বিশ্বব্যাপী।

১৯৫৩ সালে সব গোমর ফাঁক হলো। দেখা গেল, এই তথাকথিত বড় খুলি একটি জালিয়াতি। আধুনিক টেকনিক দ্বারা ধরা পড়ল যে, মানুষ ও বানরের হাড় এক করে কৃত্রিমভাবে এর বয়স নির্ধারণ করা হয়। মানুষের খুলির সাথে ওরাংওটাং বানরের চোয়াল যুক্ত করে এই জালিয়াতি প্রায় চল্লিশ বছর চালিয়ে ব্রিটিশ মগজের শ্রেষ্ঠত্ব জাহির করা হয়। এই জালিয়াতি স্কাল ডজারি’ (খুলি জালিয়াতি) নামে পরিচিত। প্রাচীন খুলি নিয়ে যা কিছু করা হচ্ছে তা হয় জালিয়াতি, না হয় ভুল ব্যাখ্যা প্রদান। পিল্ট ডাউন ম্যানহলো এর জ্বলন্ত প্রমাণ। তথাকথিত পিল্ট ডাউন ম্যানমতবাদ ব্রিটিশদের বিগার ম্যানবলে দেখানো মতবাদ। আর এতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী নীতি পেল উৎসাহ।

জার্মানির এডলফ হিটলার তার নাজি মতবাদের প্রেরণা পান ডারউইনের বিবর্তনবাদে। হিটলার ছিলেন উচ্চাভিলাষী ও উগ্রপন্থী। তিনি জার্মান তথা আর্য রক্তের শ্রেষ্ঠত্বে বিশ্বাস করতেন। তিনি এই দর্শনের ভিত্তিতে এমন একটি সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠিত করতে চান, যা হাজার বছর চালু থাকবে। জার্মানির রেসিস্ট ইতিহাসবেত্তাগণ হিটলারকে তাত্ত্বিক সহযোগিতা প্রদান করেন। তারা সবাই ডারউইনের স্ট্রাগল’ (সঙ্ঘাত)-কে নিজেদের মতবাদে ঢুকালেন। হিটলারের লেখা মেন কেম্ফ’ (আমার স্ট্রাগল) ডারউইনের আর এক স্ট্রাগলের ছবি। ডারউইন প্রকৃতিতে যে স্ট্রাগলদেখেছেন, হিটলার তাই জাতিতে জাতিতে দেখেন।

জার্মানিতে এ সময় ইউজেনিকসমতবাদও সহায়ক মতবাদ হিসেবে এলো। এরা বলল যে, মানুষের জাতিকে দুর্বলদের সরিয়ে শক্তিশালী করা উচিত। হেকেল নামের এক জার্মান পণ্ডিত আর এক জালিয়াতির আশ্রয় নিলেন। তিনি জালিয়াতি করে দেখালেন যে, জীব-জানোয়ার মানুষ সবার এমব্রায়ো’ (ভ্রূণ) একই প্রকারের। তিনি তার দেখানো ছবিগুলোর কিছু কিছু পরিবর্তন করে সবার ভ্রূণকে একই রকম দেখালেন এটা প্রমাণ করতে যে সবই এক। মানুষ যে পশু থেকে আলাদা নয়, তাই বলা হলো। তাহলে পশু যেমনি প্রজননের মাধ্যমে উন্নত জাতে পরিণত করা সম্ভব, মানুষেরও তাই সম্ভব। তাই এ ধরনের মতবাদের পরিণতিতে জার্মানির নাজি সমাজতত্ত্ববিদরা দুর্বল, অসুস্থ, বিকলাঙ্গ ও মানসিক প্রতিবন্ধীদের হত্যা করার পক্ষপাতী। এটা না করলে নাকি উন্নত মানুষের আগমন শ্লথ হয়ে পড়বে।

হেকেলের মতো হিটলারও ইউজেনিকসনীতি গ্রহণ করেন। ফলে জার্মানিতে অমানবিক ্লটার হাউজগড়ে ওঠে গোপনে। দুর্বল ও অসুস্থদের প্যারাসাইট’ (পরজীবী) গণ্য করে এসব কেন্দ্রে তাদের নিশ্চিহ্ন করা হতো। এসব পরজীবীকে উন্নত জার্মান রেসের শত্রু মনে করা হতো।

এর সাথে এলো সুঠাম দেহের যুবক-যুবতীদের যৌন সম্পর্ক স্থাপনের উৎসাহ প্রদান। বিয়ে হোক বা না হোক উন্নত মানব প্রজনন অর্থাৎ জার্মান প্রজনন উৎসাহিত হলো। যৌনকার্যে উৎসাহ প্রদান করা হলো প্রজননে। এ কতকটা উন্নত জাতের গবাদিপশু প্রজননের মতো। উন্নত জার্মান, উন্নত আর্য তৈরি করার ্লোগান এসে গেল। জার্মান রেস উন্নত, এটা প্রমাণ করতে জার্মান নাগরিকদের শরীরের মাপজোক নেয়া হতে লাগল। জার্মান মানুষের সব কিছু উন্নত, চোখ, মাথা, দেহ সবই। এ ধরনের একটি ব্যাধি ইংল্যান্ডেও তথাকথিত পিল্ট ডাউন ম্যান’-এর জালিয়াতির সময় পেয়ে বসেছিল। তবে জার্মানিতে এ ব্যাধি প্রকট আকার নেয়। ডারউইনের বিবর্তনবাদ মানুষকে জন্তুর চেয়ে বেশি কিছু ভাবল না। ডারউইনের ভাবশিষ্য হিটলার খ্রিষ্টধর্মকেও এড়িয়ে গেলেন। তিনি প্রাচীন প্যাগানমূর্তি পূজা ধর্মের স্বস্তিকার চিহ্নকে জাতীয় প্রতীক বানালেন। স্বস্তিকা একটি প্যাগান কালচার। আসলে ডারউইনের মতবাদ প্যাগানিজম ও নাৎসি মতবাদ একই সূত্রে গাঁথা।

২৫ জুন ২০০১ ইন্ডাস ভিশন টিভি চ্যানেল বলে যে, কোনো কোনো জীবের শরীরের বিভিন্ন অংশ সম্মিলিতভাবে কাজ করে। কাজেই বিবর্তনের মাধ্যমে বহু বছর পরে সেই প্রজাতির নানা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ শরীরে যোগ হয়েছে, তা ঠিক নয়। এইসব জীব কমপ্লিটজীবন হিসেবেই এসেছে, অসম্পূর্ণ জীব হিসেবে নয়। পূর্ণভাবে সৃষ্ট না হলে এইসব জীবন কার্যক্ষমই নয়।

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর রিচার্ড ডকিন বলেন, একটি ঘড়ির জন্ম হঠাৎ বিভিন্ন অংশের মিলনের ফল নয়।

২২ জুলাই ২০০১ ডিসকভারি টিভি চ্যানেলে এক প্রোগ্রামে বলা হয়, আইনস্টাইন স্বীকার করতে বাধ্য হন যে, তার কসমোলজিক্যাল কনসট্যান্ট’ (মহাজাগতিক ধ্রুবক) তত্ত্ব সঠিক নয়, হাবল যখন প্রমাণ করলেন যে, মহাবিশ্ব সম্প্রসারিত হচ্ছে। এদিকে ব্ল্যাকহোল’ (কৃষ্ণগহ্বর) তত্ত্বও প্রতিষ্ঠিত হলো তখন স্টিডি স্টেট থিওরি’ (স্থিরাবস্থাতত্ত্ব) পরিত্যক্ত হলো। এমনিভাবে বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের পরিবর্তন হচ্ছে ।

Advertisements

দেশ পরিচিতি নাইজার

আফ্রিকার পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত সম্পূর্ণ স্থল বেষ্টিত রাষ্ট্রটি নাইজার। দেশটির শতকরা ৮০ ভাগ এলাকা জুড়ে রয়েছে সাহারা মরুভূমি।

ঐতিহাসিক পটভূমি

নাইজারের পলীয় যুগের সন্ধান পাওয়া গেছে। উপনিবেশকারীদের আগমনের পূর্বে এখানে অনেক রাজত্বের পত্তন হয়েছিল। ইউরোপীয়রা সর্বপ্রথম আসে ১৮ শতকের শেষ দিকে। ১৮৮৩ থেকে ১৮৯৯ সাল পর্যন্ত দেশটি ফ্রান্সের দখলে ছিল। ১৯০১ সালে নাইজার একটি সামরিক এলাকায় পরিণত হয় এবং ১৯০৪ সালে ফরাসি পশ্চিম আফ্রিকার একটি অংশ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। নাইজার ১৯৫৮ সালের ১৮ ডিসেম্বর ফ্রান্সের একটি স্বায়ত্বশাসিত প্রজাতন্ত্র হিসেবে স্বীকৃতি পায়; ১৯৬০ সালের আনস্ট পুন স্বাধীনতা পায়। ১৯৭৪ সালের ১৫ এপ্রিল নাইজারের প্রথম প্রেসিডেন্ট হামানি দিওরি এক সামরিক অভু্যত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতাচু্যত হন। অভু্যত্থানের নেতা লে. মিনি কাউচি সংবিধান বাতিল ঘোষণা করেন, সংসদ ভেঙে দেন ও রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করেন। পরে ১৯৯৩ সালে নাইজারে প্রথম অবাধ নির্বাচন হয়।

অবস্থান ও আয়তন

এটি ১৬০০র্০ উত্তর অক্ষাংশ এবং ৮০০র্০ পূর্ব দ্রাঘিমার মধ্যে অবস্থিত। নাইজারের উত্তরে আলজেরিয়া ও লিবিয়া, দক্ষিণে নাইজেরিয়া ও বেনিন, পূর্বে চাঁদ এবং পশ্চিমে বুরকিনা ফাসো ও মালি।
দেশটির আয়তন প্রায় ১২,৬৭,০০০ বর্গকিলোমিটার। আয়তনের দিক থেকে এটি বিশ্বের ২২তম বৃহত্তম দেশ।

প্রশাসনিক ব্যবস্থা

নাইজারে ৭টি বিভাগ ও ৩৬টি ডিপার্টমেন্ট আছে।

উচ্চতম ও নিম্নতম স্থান

দেশটির উচ্চতম স্থান হচ্ছে মাউন্ট গ্রিবাউন, যা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৬,৩৭৮ ফুট উঁচুতে অবস্থিত এবং নিম্নতম স্থান হচ্ছে নাইজার নদীর সীমান্তে ও সেনেগাল নদীর শুরুতে। যা সমুদ্রপৃষ্ঠ হতে ৪৯০ ফুট উঁচু।

জলবায়ু
অধিক বৃষ্টিপাতের কারণে নাইজারের দক্ষিণাঞ্চল কৃষি সমৃদ্ধ। বৃষ্টি না হওয়ায় দেশটির উত্তরাঞ্চল মরুভূমিময়। এখানে তীব্র পানি সংকট রয়েছে। তবে দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলীয় জেলাগুলোতে নাইজার নদী থেকে পানি সরবরাহ করা হয়। দক্ষিণাঞ্চালে বার্ষিক গড় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ৫৫৪ মিলিমিটার।

প্রধান নদী

নাইজার

প্রাকৃতিক সম্পদ

ইউরোনিয়াম, আকরিক লৌগ, কয়লা, টিন, ফসফেট।

এক নজরে

রাষ্ট্রীয় নাম : রিপাবলিক অব নাইজার

রাজধানী : নিয়ামি

জাতীয়তা : নাইজোরিয়ান

আয়তন : ১২,৬৭,০০০ বর্গ কিমি।

আন্তর্জাতিক সীমান্ত : স্থল সীমান্ত ৫,৬৯৭ কিমি এবং কোনো সমুদ্র উপকূলীয় ভূমি নেই, কারণ দেশটি স্থল বেষ্টিত।
জনসংখ্যা : ১,৫৩,০৬,২৫২ জন (২০০৯)

ধর্ম : মুসলমান ৮০%, আদিধর্মে বিশ্বাসী ও খ্রিস্টান ২০%।

মুদ্রা : কমিউনেট ফিনানসিয়ার আফ্রিকান ফ্রাঙ্ক (ঢঙঋ)

স্বাধীনতা লাভ : ৩ আগস্ট ১৯৬০ (ফ্রান্স হতে)

জাতিসংঘের সদস্যপদ লাভ : ২০ সেপ্টেম্বর ১৯৬০

জাতীয় দিবস : ৩ আগস্ট

ভাষা : ফ্রেঞ্চ, হাউসা

সরকার পদ্ধতি : রাষ্ট্রপতি শাসিত

সরকার প্রধান : রাষ্ট্রপতি।

ইসলামে দাওয়াতের গুরুত্ব

মুসলিম জাতির আগে পৃথিবীর বুকে ইহুদি জাতির আবির্ভাব ঘটে নবী ইব্রাহিম আঃ-এর তৃতীয় পুরুষ (নাতি) হজরত ইয়াকুব আঃ-এর সময় থেকে। তিনি কেনানে বসবাস করতেন, পরে পুত্র ইউসুফ আঃ-এর সান্নিধ্যে মিসরে চলে যান। এ জাতি সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে বর্ণিত হয়েছে, মুসা বলল তবে কি আমি তোমাদের জন্য আল্লাহকে ছাড়া অন্য উপাস্য খঁুজব? অথচ তিনি তোমাদের সারা জাহানের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন (৭ঃ১৪০)? আমি তো বনি ইসরাইলকে দান করেছিলাম কিতাব, প্রজ্ঞা ও নবুওয়াত। তাদের দিয়েছিলাম উত্তম বস্তু থেকে জীবনোপকরণ এবং তাদের শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছিলাম বিশ্ববাসীর ওপর (৪৫ঃ১৬)। এ কথার ধারাবাহিকতা ধরে হজরত মুসা আঃ-এর ওপর তওরাত, হজরত দাউদ আঃ-এর ওপর জবুর এবং হজরত ঈসা আঃ-এর ওপর ইঞ্জিল কিতাব অবতীর্ণ হয়েছিল। এসব নবী সবাই ছিলেন ইহুদি বংশজাত। এরা ছাড়াও অসংখ্য নবী-রাসূল এ বংশে প্রেরিত হয়েছেন এবং তাদের ওপর ছহিফা (ছোট কিতাব) নাজিল হয়েছে। তাদের ওপর যে গুরু দায়িত্ব ছিল সে জাতি সেটা সঠিকভাবে পালন করেনি, ফলে তাদের মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব দেয়া হয়েছিল সেটা তারা ধরে রাখতে পারেনি। তারা আল্লাহর বাণী অন্যদের কাছে পৌঁছানোর প্রচেষ্টা তো করেইনি, বরং ক্রমধারা স্রোতে পরে যেসব নবী আঃ তাদের মধ্যে এসেছেন, তাদের অনেককেই এরা হত্যা করেছে, কারো প্রতি অপবাদ দিয়েছে, কোনো কোনো নবীকে দেশ ছাড়া করেছে। নবী ঈসা আঃ-কেও ওরা শূলে চড়িয়ে হত্যা করার দাবি করে থাকে।

বনি ইসরাইলিদের ব্যর্থতা ও বিমুখতার কারণে আল্লাহ নবী ইব্রাহিম আঃ-এর অপর পুত্র হজরত ইসমাইল আঃ ইনি নবী ও রাসূল, তার বংশে সর্বশেষ নবী হজরত মুহাম্মদ সাঃ-কে পাঠালেন এবং তাঁর ওপর অবতীর্ণ করলেন পবিত্র কুরআন। কিছু দিন পর ওহির মাধ্যমে নবী সাঃ-কে জানিয়ে দিলেন, আপনি আপনার উম্মতদের বলে দিন, আমি তাদের সম্মানিত করেছি এবং তাদেরকে অন্যদের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব প্রদান করেছি। কথাটা কুরআনে এভাবে এসেছে­ ‘কুনতুম খায়রা উম্মাতুন, উখরিজাতুন নাস; তা-মারুবিল মারুফ, অতানহাওনা আনিল মুনকারঅর্থ হচ্ছেঃ তোমরাই শ্রেষ্ঠ উম্মত, তোমাদের উদ্ভব ঘটানো হয়েছে এ জন্য যে, তোমরা সৎ কাজে আদেশ করবে আর অসৎ কাজে নিষেধ করবে (৩ঃ১১০)। আরবি শব্দ উখরিজাতের অর্থ বের করা বা উদ্ভব ঘটানো। এখানে আগে যেটা ছিল সেটাকে বাতিল করে নতুন একটা কিছু করা হলো এটাই শব্দের মর্মার্থ। এ আয়াত প্রমাণ করে শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট এবার মুসলিমদের মাথায় পড়ানো হলো এবং তাদের দায়িত্ব সুনির্দিষ্ট করে দেয়া হয়েছে। বাস্তব জীবনে ঘটনার সংশ্লিষ্টতায় লক্ষণীয় যে, যিনি যতবড় দায়িত্বপূর্ণ কাজে নিয়োজিত থাকেন তার মর্যাদা সমাজে তত বেশি। কলেজের একজন অধ্যক্ষকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করতে হয়। সমাজের চোখে ওই কলেজের অন্যান্য অধ্যাপক, প্রভাষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীর চেয়ে অধ্যক্ষ মহোদয়ের মর্যাদা ও সম্মান সবচেয়ে বেশি। মুসলিম জাতির ওপর আল্লাহ যে দায়িত্ব অর্পণ করেছেন ওই দায়িত্বের কারণেই তারা আল্লাহর কাছে সম্মানিত। তারা যদি সে দায়িত্ব যথাযথ পালন না করে তবে সূরা মুহাম্মদের আটত্রিশ নম্বর আয়াত অনুযায়ী দেয়া মর্যাদা প্রত্যাহার করে নেয়া হবে (যেমনটি ইহুদিদের কাছে থেকে ছিনিয়ে নেয়া হয়েছে) এবং এ জাতি সীমা লঙ্ঘন করতে থাকলে সূরা যুখরুফের পাঁচ নম্বর আয়াতের সতর্কবাণী অনুযায়ী যে পবিত্র গ্রন্থ তাদের দেয়া হয়েছে সেটা তাদের কাছ থেকে তুলে নেয়া হবে।

মানুষ কার প্রতিনিধিঃ পৃথিবীর প্রত্যেক মানুষ তার জীবদ্দশা পর্যন্ত আল্লাহর প্রতিনিধি। রাজা-বাদশার প্রতিনিধি থাকে, প্রধানমন্ত্রীর প্রতিনিধি থাকে, থাকে চেয়ারম্যান-প্রেসিডেন্টেরও প্রতিনিধি। মানুষ যে আল্লাহর প্রতিনিধি সে বিষয়ে তিনি কুরআনে এভাবে বলছেন­ স্মরণ করুন, আপনার পালনকর্তা যখন ফেরেশতাদের ডেকে বললেন,- আমি পৃথিবীতে একজন প্রতিনিধি সৃষ্টি করতে যাচ্ছি। তখন তারা বলল, আপনি সেথায় এমন কাউকে সৃষ্টি করবেন যারা অশান্তি ঘটাবে (২ঃ৩০)? আর তিনিই (আল্লাহ) তোমাদের পৃথিবীতে প্রতিনিধি করেছেন এবং কতককে মর্যাদায় অপরের ওপর উন্নত করেছেন, যাতে তিনি তোমাদের যা দিয়েছেন সে বিষয়ে তোমাদের পরীক্ষা করেন (৬ঃ১৬৫)। অতঃপর আমি তোমাদের প্রতিনিধি করেছি পৃথিবীতে তাদের স্থলে (ইহুদিদের) যেন আমি দেখে নিই তোমরা কিরূপ কাজ করো (১০ঃ১৪)। তিনি তোমাদের জমিনে প্রতিনিধি করেছেন। সুতরাং যে ব্যক্তি কুফরি (অস্বীকার) করবে তার প্রতিফল তার ওপরেই বর্তাবে (৩৫ঃ৩৯)। তিনি তোমাদের পরীক্ষা করতে চান যে, তোমাদের মধ্যে কে সবচেয়ে ভালো কাজ করে (১১ঃ৭), (৭৬ঃ২)? প্রতিনিধি বিষয়টি কী? প্রচলিত অর্থে এর ইংরেজি হলো­ রিপ্রেজেনটেটিভ আর আরবি হলো খলিফা। বাংলায় আরো বলা যায়, স্থলাভিষিক্ত, দূত, উত্তরাধিকারী, আদর্শস্বরূপ, কারো নিদর্শনস্বরূপ ইত্যাদি। কোনো ক্ষমতাধর যখন তার ক্ষমতার বা দায়িত্বের আংশিক বা সম্পূর্ণ অপর কাউকে অর্পণ করেন, অর্পিত ব্যক্তি তখন হয়ে যান ওই ক্ষমতাধরের (অর্পণকারীর) প্রতিনিধি বা স্থলাভিষিক্ত। ক্ষমতাপ্রাপ্ত ব্যক্তি তদানুযায়ী ক্ষমতা চর্চা করে থাকেন। মুসলমানরা কুরআনের এই আয়াতগুলো অনুযায়ী নির্দিষ্ট কিছু কাজের ব্যাপারে আল্লাহর প্রতিনিধি।

প্রতিনিধির দায়িত্বঃ প্রতিনিধি হিসেবে মানুষের ওপর নির্দিষ্ট কিছু দায়িত্ব অর্পিত হয়েছে। সবচেয়ে বুদ্ধিমান প্রাণী ও জ্ঞানার্জন সক্ষম সৃষ্টি বিধায় দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়েছে। অন্য কোনো প্রাণিকুলের এ সৌভাগ্য হয়নি। আল্লাহ বলছেন, আর তার কথার চেয়ে অধিক উত্তম কথা কার হবে, যে মানুষকে আল্লাহর পথে (হকের পথে) ডাকে, আর নিজেও সৎ কাজ করে এবং বলে আমি মুসলিম (আত্মসমর্পণকারী) (৪১ঃ৩৩)। আমি রাসূল প্রেরণ করেছিলাম, তার সাথে অবতীর্ণ করেছিলাম কিতাব, কিতাবে ন্যায়নীতির কথা বর্ণনা করেছিলাম, যাতে মানুষ ইনসাফ কায়েম করে (৫৭ঃ২৫)। তোমাদের মধ্যে এমন একদল মুসলিম থাকা আবশ্যক যারা মানুষকে কল্যাণের দিকে আহ্বান করবে এবং আদেশ করবে ভালো কাজের আর নিষেধ করবে তাদের মন্দ কাজের প্রতি; এরাই সফলকাম (৩ঃ১০৪)। মানুষকে আল্লাহর পথে ডাকা, তাদের কল্যাণের পথে ডাকা, মানুষের মধ্যে ইনসাফ কায়েম করা সর্বোত্তম কাজ। অপর সূরায় বলা হয়েছে­ মানুষ ক্ষতির মধ্যে নিমজ্জিত আছে, তবে তারা ছাড়া, যারা চারটি কাজ সম্পাদন করেছে। শ্রদ্ধেয় ইমাম শাফি রহঃ বলেছেন, কোনো বান্দার জান্নাতে প্রবেশের জন্য এ কাজ চারটি ন্যূনতম শর্ত। যেকোনো একটা পালনে ব্যর্থ হলে তার ধ্বংস অনিবার্য, তবে আল্লাহ যদি তাকে মাফ করে দেন সে কথা স্বতন্ত্র। সূরা আসরে কাজগুলোর কথা বলা হয়েছে। সেগুলো হলো­ ১. ঈমান আনতে হবে ২. ভালো কাজ বা সৎ কাজ করতে হবে ৩. হক বা সত্যের প্রচার করতে হবে ৪. মানুষকে বিপদের সময় ধৈর্য ধরার উপদেশ দিতে হবে (১০৩ঃ২-৩)। এসব বাণী স্বয়ংক্রিয়ভাবে ঘোষণা করে যে, প্রতিনিধি হিসেবে সত্যের প্রচার করা প্রত্যেক ঈমানদারের অবশ্য কর্তব্য। প্রসঙ্গক্রমে যে কথা এসেছে সেটা হলো হক বা সত্য কিভাবে সংজ্ঞায়িত হবে? এর সাথে পরিচয় হওয়াই এখন মুখ্য বিষয়। এ সম্পর্কে আল্লাহ বলেছেন, সত্য তোমাদের রবের পক্ষ থেকে এসে গেছে, অতএব, যার ইচ্ছা হয় এর ওপর ঈমান আনুক, যার ইচ্ছা হয় কুফরি করুক (১৮ঃ২০), (৮০ঃ১২)। হে মানুষ! তোমাদের কাছে এসেছে তোমাদের রবের তরফ থেকে সত্য বাণী (১০ঃ১০৮)। বলুন! সত্য এসে গেছে মিথ্যা অপসৃত হয়েছে, সে তো নির্মূল হবেই (৩৪ঃ৩৯), (১৭ঃ৮১)। আমার পালনকর্তা সত্য দ্বীন অবতীর্ণ করেছেন, তিনি আলিমুল গায়েব (৩৪ঃ৪৭)। তিনি তার রাসূলকে পথ নির্দেশনা ও সত্য ধর্মসহ প্রেরণ করেছেন (৯ঃ৩৩), (৬১ঃ৯)। আমি সত্যসহ কুরআন নাজিল করেছি ও সত্যসহ তা নাজিল হয়েছে (১৭ঃ১০৫)। অসংখ্য এরূপ আয়াতের মধ্য থেকে কয়েকটা মাত্র উল্লেখ করা হলো­ আয়াতগুলো পর্যবেক্ষণান্তে নিঃসঙ্কোচে যে বিষয়টি সামনে চলে আসে সেটা হলো আল্লাহ যে বাণী মানুষের জন্য প্রেরণ করেছেন সেগুলোই হলো হক; সেটাই সত্য। হকের সমন্বিত সমষ্টি হলো পবিত্র কুরআন, যা প্রচার করার জন্যই মানুষ পৃথিবীতে আল্লাহর প্রতিনিধি। মৃতুøর সাথে সাথে এ মর্যাদা আর থাকে না।

হাদিসের আলোকেঃ দশম হিজরি সনে বিদায় হজের দিন নবী সাঃ লক্ষাধিক সাহাবি রাঃ-এর সামনে যে ঐতিহাসিক ভাষণ দেন, ইতিহাসবিদরা তা প্রকাশ করেছেন হাদিসবিদরা তা লিপিবদ্ধ করেছেন। সেদিন তিনি বলেছিলেন, হে লোক সকল! আজকের দিন সম্মানিত। আমার আজকের কথাগুলো তোমরা অনুপস্থিত ব্যক্তির কাছে পৌঁছে দেবে। কেননা উপস্থিত ব্যক্তি হয়তো এমন ব্যক্তির কাছে পৌঁছাবে, যে একথাগুলো উপস্থিত ব্যক্তির চেয়ে বেশি স্মরণ রাখতে পারবে (বুখারি)। হজরত জারির ইবনে আব্দুল্লাহ (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী করিম সাঃ-এর কাছে আমি নামাজ কায়েম, জাকাত প্রদান ও প্রত্যেক মুসলিমকে নসিহত করার জন্য বাইয়াত (ওয়াদাবদ্ধ) গ্রহণ করেছি (বুখারি)। অনেক সাহাবি রাঃ এ বিষয়ের ওপর বাইয়াত নিয়েছেন। সাহাবিরা পরস্পর দেখা হলে ধর্মের কথাই বেশি আলোচনা করতেন এবং এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট থাকতে পছন্দ করতেন। তখনো ইসলাম নিয়ে সমস্যা ছিল, আজো ইসলামে সমস্যা ও সঙ্কট রয়েছে। অনুসারীরা নিরুদ্বিগ্ন বলেই প্রতীয়মান। অপর হাদিসে বর্ণিত, কুরআনের কোনো আয়াত গোপনকারীকে আল্লাহ অভিসম্পাত করেন (মুসলিম)। আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রাঃ কর্তৃক বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী সাঃ বলেছেন­ বাল্লিগু আন্নি ওলাও আয়াহ্‌, অর্থঃ আমার পক্ষ থেকে যদি একটি আয়াতও হয় তা তোমরা লোকদের কাছে পৌঁছে দাও (বুখারি)। নিঃসন্দেহে এসব হাদিস মুসলিমদের উৎসাহিত করে, উদ্বুদ্ধ করে আল্লাহর কথা, কুরআনের কথা, নবী সাঃ-এর কথা সমাজের সর্বস্তরে পৌঁছে দেয়ার কাজে নিয়োজিত হতে।

উপসংহারঃ আল্লাহর নির্দেশে হজরত জিব্রাইল

আঃ পবিত্র কুরআনের যে কয়টা আয়াত (বাণী) সর্বপ্রথম হেরা পাহাড়ের গুহায় নবী সাঃ-এর ওপর অবতীর্ণ করেছিলেন তা হলো সূরা আল-আলাকের প্রথম পাঁচটি আয়াত। এ পাহাড়ে অবস্থানকালে আল্লাহর নূর নাজিল হওয়ায় পাহাড়টি পরে জাবালে নূর নামকরণ হয়েছে। গভীর রাতে অবতীর্ণ এ আয়াতগুলোর মধ্যে পড়ো’ (পাঠ করো) শব্দটি দুবার এবং কলমশব্দটি একবার উল্লেখ করা হয়েছে। মহান রব প্রথম বার্তাতেই তার বান্দাদের পড়তে ও লিখতে অনুপ্রাণিত করেছেন। ঘটনাটাই মুসলিম সমাজের সদস্যদের কাছে লেখাপড়ার গুরুত্ব যে কতখানি তা অনুধাবন করার জন্য যথেষ্ট। নামাজ-রোজা, হজ, জাকাতসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ইবাদতের কথা বাদ রেখে প্রথমেই বলা হচ্ছে­ ‘পড়ো। ওই সব ইবাদতের কথা এসেছে পরে, পর্যায়ক্রমে। ওহি প্রাপ্তির পর নবী সাঃ প্রচার করে দিলেন, প্রতি মুসলিমের জন্য বিদ্যা শিক্ষা করা ফরজ। এবং তিনি কাবা শরিফের অদূরে সাফা পর্বতের পাদদেশে হজরত আরকাস ইবনে আবুল আরকাস রাঃ-এর গৃহে মাদরাসা স্থাপন করে সাহাবিগণকে অনুশীলন শিক্ষা দিতে লাগলেন। ইতিহাস সাক্ষী তার জীবদ্দশায় শত শত সাহাবি রাঃ কুরআনে হাফেজ হয়েছিলেন।

ইসলামকে জানা, মানা ও প্রচার করতে যতটুকু বিদ্যা অর্জন করা প্রয়োজন ন্যূনতম ততটুকু অর্জন করা ফরজ। নিতান্তই যদি কারো পক্ষে অনুরূপ প্রজ্ঞা অর্জন করা সম্ভব না হয় এরূপ ব্যক্তিকে যিনি জানেন তাকে জিজ্ঞেস করে জেনে নিতে হবে (১৬ঃ৪৩), (২১ঃ৭)। এটাই মহান রবের নির্দেশ। ইসলাম প্রচারের জন্য কাজ করা প্রতি মুসলিমের ওপর ফরজ, এ দায়িত্ব থেকে অব্যাহতির অবকাশ নেই।

দ্বিতীয় খলিফা হজরত ওমর রাঃ তার প্রজাদের উদ্দেশে বলেছিলেন, কেবল কুরআন, কেবল কুরআনের প্রভাবেই পারস্য ও রোমের মতো বৃহৎ শক্তি আজ মুসলিমদের পদতলে! তোমাদের জন্য দ্বীনের ক্ষেত্রে আল্লাহ সে পথই নির্ধারণ করেছেন (যে আদেশ অন্য নবীদেরও দিয়েছিলেন) যে, তোমরা দ্বীনকে প্রতিষ্ঠিত করো এবং তাতে অনৈক্য সৃষ্টি কোরো না (৪২ঃ১৩)।

রাষ্ট্রের প্রকৃত স্বাধীনতা

আজাদি একটি বিশাল নিয়ামত এবং জীবনের অনিবার্য প্রয়োজন। এর জন্য যে ত্যাগ-তিতিক্ষা স্বীকার করা হবে সেটাও ব্যাপক সমাদৃত। আমাদের ওইসব পথপ্রদর্শকেরও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করা উচিত, যারা স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে দেশ স্বাধীন করেছেন। কিন্তু আমি পরিষ্কারভাবে এ কথা আরজ করতে চাই, যে সিদ্ধান্ত ও শক্তির বদৌলতে আমরা গোলামির অভিশাপ থেকে মুক্তি পেয়েছি, সেই সিদ্ধান্ত এবং শক্তিকে যদি এর চেয়েও বাস্তবিক ও পূর্ণাঙ্গ আজাদি অর্থাত্ মানবিকতা গঠন ও উন্নয়ন এবং মানুষকে মানুষ বানানোর কাজে ব্যয় করি, তবে এটি হবে দুনিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ, সমস্যা এবং সঙ্কটের চিরস্থায়ী সমাধান।
আমি আজাদি আন্দোলনের প্রতি অবজ্ঞা বা না-শোকরি করছি না, তবে এটা না বলেও পারছি না যে, দুনিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ এবং মানবতার সবচেয়ে বড় খেদমত হচ্ছে, মানুষ প্রকৃত মানুষ হয়ে যাওয়া। এছাড়া স্বাধীনতা ও স্বাধিকারের পরও জীবনের প্রকৃত তাত্পর্য, প্রশস্তি এবং স্বচ্ছন্দ হাসিল হয় না। বিক্ষিপ্ততা, টানাপড়েন এবং অস্বস্তি দূর হয় না। বিপদাপদ, ব্যতিব্যস্ততা ও অপমান শুধু অন্যের আকৃতিতেই আসে না, কখনও নিজের থেকেই এর স্ফুরণ ঘটে। জুুলুম-নির্যাতন ও লুটতরাজের জন্য ভিনদেশি হওয়া শর্ত নয়। একই দেশে অবস্থানকারী দ্বারা কখনও এ কাজ সংঘটিত হতে পারে। গোলামির প্রতি ঘৃণা আমারও কম নয়। কিন্তু আবেগ ও মোহ থেকে আলাদা হয়ে একটু চিন্তা করুন! আমরা ইংরেজদের কেন শত্রু মনে করতাম? গোলামির প্রতি আমাদের ঘৃণা কেন ছিল? এজন্য যে, জীবনের প্রকৃত তাত্পর্য আমাদের সহায়ক ছিল না। আমাদের কোনো স্বস্তি ছিল না। জীবনের প্রয়োজন পূরণ সহজসাধ্য ছিল না। আমরা সহমর্মিতা, একনিষ্ঠতা, সহযোগিতাবোধ এবং প্রেম-ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত ছিলাম, যাতে অতীত জীবন হয় তিক্ত এবং এ দুনিয়ার জেলখানাসদৃশ। মনে করুন! যদি বাইরের গোলামির অবসান ঘটে কিন্তু আমাদের নিজেদের মধ্যেই একে অপরকে গোলাম বানানোর প্রবণতা চালু হয়ে গেল। আমাদের পরস্পরে জুলুমের স্বাদ অনুভূত হতে লাগল। আমরাও একে অন্যের অপরিচিত, অজ্ঞাত। সহযোগিতা ও সহমর্মিতা থেকে অনেক দূরে। এক শহরের লোক অন্য শহরের লোকের সঙ্গে এমন আচরণ করতেই উদ্বুদ্ধ হচ্ছি, শুধু সুযোগের প্রত্যাশায় আছি, যা বিজয়ী গোলামের সঙ্গে এবং শত্রুর সঙ্গে করে। আমরা আমাদের সঞ্চিত সম্পদে অন্যের অপরিহার্য প্রয়োজনীয় সম্পদটুকু ঢুকিয়ে দেয়ার পাঁয়তারায় লিপ্ত। এ ধরনের মানসিকতা দেশে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ছে। কোরআনে কারিম এটাকে একটি ঘটনার দ্বারা বিবৃত করেছে। কোরআনে বর্ণিত হয়েছে, হজরত দাউদের (আ.) কাছে দুপক্ষ মোকদ্দমা নিয়ে এলো। একজনে বলল, হে আল্লাহর নবী! হে বাদশা! আপনি অনুগ্রহ করে আমাদের প্রতি একটু ইনসাফ করুন। আমার এ ভাইয়ের কাছে ৯৯টি ভেড়া আছে, আমার আছে মাত্র একটি ভেড়া। কিন্তু এই জালেম বলছে, আমি যেন তাকে আমার ভেড়াটিও দিয়ে দিই, তবে তার শত পুরো হবে। আমি আপনার কাছে জানতে চাই, যদি কোনো রাষ্ট্রে বা শহরে এ ধরনের মনোভাবের প্রসার ঘটে, তবে কি স্বাধীনতার প্রকৃত সম্পদ সেখানে বাস্তবে রক্ষিত আছে? বিষয়টি কি এমন নয় যে, উপনিবেশগোষ্ঠী যে আচরণ করত সেটাই স্বজাতি, প্রতিবেশীর দ্বারা করা হচ্ছে। পরাধীনতার সব শৃঙ্খলই কি এখানে কোনো না কোনোভাবে বিদ্যমান নয়? এসব কিছু এজন্য যে, দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের জন্য প্রাণপণে লড়াই করে দেশের স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে। কিন্তু মানুষের মন-মগজ এবং তার আত্মার প্রশস্ত
র জন্য কোনো চেষ্টা করা হয়নি। ফলে সেগুলো যথারীতি গোলামই রয়ে গেছে। দেশ থেকে জালেম বিতাড়িত করা হয়েছে, কিন্তু দিল থেকে জুলুমের বাসনা নির্মূল করা হয়নি। সেটি বহাল আছে এবং নিজের কাজ করে যাচ্ছে।
নবী-রাসুলরা আল্লাহপ্রদত্ত সব শক্তি এবং নিজেদের পুরো মনোযোগ ব্যয় করেছেন প্রকৃত অর্থে পূর্ণাঙ্গ মানুষ তৈরির কাজে। তারা শুধু রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতাকে নিজেদের দৃষ্টিভূত করেননি। বরং অনুভূতির জ্বলন তৈরি, ঈমান-আকিদাকে মন-মগজে সুদৃঢ়করণ এবং ওই আখলাক সৃষ্টির প্রতি গভীর মনোযোগ দিয়েছেন, যাতে উপনিবেশ ও অভ্যন্তরীণ কোনো দাসত্বেরই সুযোগ ছিল না। যার কারণে মানুষ অন্যের গোলামিও বরদাশত করত না এবং অন্যের ওপর নিজের গোলাম আরোপ করার মনোবাসনাও পোষণ করত না, যার ফলে অন্যের শিকারেও পরিণত হতো না আবার অন্যকেও নিজেদের শিকারে পরিণত করত না। মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহের (সা.) দৃষ্টান্ত দেখুন! তাঁর পাশে আত্মত্যাগী, উত্সর্গকারী যে বিশাল জামাত জড়ো হয়েছিলেন তাদের দ্বারা তিনি যে কোনো কাজ আঞ্জাম দিতে পারতেন। কিন্তু তিনি তাদের চারিত্রিক উত্কর্ষ ও মানবিকতা উন্নয়নে তাঁর সব সামর্থ্য ব্যয় করেছেন। তিনি মানবতাকে এমন কোনো চোখ ধাঁধানো আবিষ্কার কিংবা তথ্যপ্রযুক্তি দেননি ইউরোপের বিজ্ঞানীরা, যা এ যুগে দিয়েছেন। কিন্তু তিনি আবু বকর, ওমর, উসমান, আলী [রাজিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম আজমাঈন]-এর মতো কিছু মানুষ তৈরি করে গেছেন যারা মানবতার জন্য রহমত ও বরকতের ভাণ্ডার হিসেবে প্রমাণিত হয়েছেন। আজও যদি মানবতাকে প্রশ্ন করা হয়, তারা শাসনকর্তৃত্ব ও নেতৃত্বের জন্য আবু বকরের (রা.) মতো মানুষ চায় নাকি সর্বাধুনিক আবিষ্কারগুলো হাতের নাগালে চায়। নিশ্চয় তাদের কাছ থেকে উত্তর আসবেআবু বকরের (রা.) মতো মানুষই তাদের বেশি প্রয়োজন। কেননা তারা আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি এবং আবিষ্কারগুলো ভালোভাবেই পর্যবেক্ষণ করে দেখছে, প্রকৃত মানুষের অবর্তমানে এসব দুনিয়ার জন্য মসিবত ও ধ্বংসের বার্তাবাহক।
আমি বারবার বলেছি এবং বলব, সবচেয়ে অগ্রগণ্য ও গুরুত্বপূর্ণ কাজ হচ্ছে, মানুষকে প্রকৃত অর্থে মানুষ বানাতে হবে। তখন তার মধ্যে গোনাহ ও জুলুমের বাসনা নির্মূল হবে, নেক ও খেদমতের জযবা সৃষ্টি হবে। মানুষের জীবনধারায় হাজারো প্রতিকূলতা সৃষ্টি হয়, মানবিক জীবনে অসংখ্য সমস্যা ও সঙ্কট দেখা দেয়, ভারি ভারি তালা পড়ে, আর এসব সঙ্কট ও তালা খোলার একটি মাত্র চাবি, এটাকে মুক্তির মহাতন্ত্র, মূল চাবিকাঠি (গধংঃবত্ শবু) হিসেবে আখ্যায়িত করা যায়। এ চাবিকাঠি আল্লাহর প্রেরিত নবী-রাসুলদের কাছে ছিল। একমাত্র তাদের সঙ্গে সম্পর্ক কায়েমের মাধ্যমেই এটা অর্জিত হয়। এই চাবিকাঠি হচ্ছে, আল্লাহর মহান সত্তার প্রতি নিটোল বিশ্বাস এবং তাঁর ভয়। এই চাবিকাঠি দ্বারাই মানবিক জীবনের সব সমস্যা ও সঙ্কট অতি সহজে দূরীভূত হয় এবং জীবনের সব আবিলতা মুক্ত হয়। মনে করুন, পয়গাম্বরদের হাত বৈদ্যুতিক সুইচের ওপর। তারা ওই সুইচে টিপ দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে পুরো ঘর আলোকিত হয়ে গেল। যাদের আঙুল ওই সুইচ পর্যন্ত পৌঁছবে না তারা ঘর আলোকিত করতে পারবে না।এদেশ স্বাধীন করতে আপনারা সর্বাত্মক চেষ্টা-সাধনা করেছেন, ত্যাগের পরাকাষ্ঠা দেখিয়েছেন, নেতাদের দেখানো পথে গমন করেছেন। ফলে কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা আপনাদের অর্জিত হয়েছে। এখন মানুষের মধ্যে মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা করার জন্য নতুন করে আপনাদের চেষ্টা-সাধনা করতে হবে। প্রকৃত স্বাধীনতা অর্জনের এটাই একমাত্র পথ। আর এটা ওই পথ যে পথের নির্দেশ করেছেন আল্লাহর প্রেরিত নবী-রাসুলরা, যে পথে গমন করে গন্তব্যে পৌঁছতে সক্ষম হয়েছেন অনুসারীরা। তারা দুনিয়াতে প্রকৃত মানুষের নমুনা প্রদর্শন করেছেন। এ পথের পাথেয় হচ্ছে ঈমান, একিন এবং খোদভীতি। প্রকৃত খোদাভীতি, তাজা ঈমান এবং জাগ্রত কলব নবী-রাসুলদের ছাড়া আর কোথাও মিলবে না। এটাই তাদের ভাণ্ডার, এ ভাণ্ডার থেকে প্রয়োজনীয় অংশগ্রহণ করতে আমাদের কোনো লজ্জা-সংকোচ থাকা উচিত নয়। আজ যদি এসব গুণ অর্জন এবং প্রচার-প্রসারে আজাদি সংগ্রামের মতো ত্যাগ-তিতিক্ষার সূচনা হয়, উপনিবেশ বিতাড়নে যে সাধনা করা হয়েছে সে সাধনা যদি করা হয়, তবে দেশের চেহারাই ভিন্নরূপ ধারণ করবে। অর্জিত হবে প্রকৃত অর্থে শান্তি ও নিরাপত্তা। বন্ধ হবে দাসত্বের চলমান ধারা। দেশের প্রকৃত স্বাধীনতা এবং জীবনের প্রকৃত স্বাদ তখনই হাসিল হবে।

%d bloggers like this: