মুমিনের জীবনের সাতটি গুণ

 

প্রত্যেক মানুষ সফলতা অর্জন করতে চায়। যে যে কাজই করুক, তার ফলাফল যদি ভালো হয়, তবে সে সফলতা লাভ করল। আর যদি তার বিপরীত হয় অর্থাৎ তার কর্মফল যদি ভালো না হয়, তা হলে সে সফলতা লাভ করতে পারল না। এই দুনিয়া দুঃখ ও কষ্টের জায়গা। দুনিয়ায় পূর্ণাঙ্গ সফলতা অর্জন করা সম্ভব নয়। এমনকি নবী-রাসূলরাও নানা বিপদের সম্মুখীন হয়েছেন। পবিত্র কুরআন শরিফের সূরা আল আসর’-এ আল্লাহ বলেন­ ‘সময়ের শপথ, নিশ্চয়ই সব মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত; কিন্তু তারা নয়, যারা বিশ্বাস স্থাপন করে ও সৎকর্ম করে এবং একে অপরকে তাকিদ করে সত্যের এবং তাকিদ করে ধৈর্যের।

এ সূরাটিতে উল্লিখিত চারটি কাজ যে নিষ্ঠার সাথে পালন করবে, তাকে আল্লাহ ক্ষতি থেকে রক্ষা করবেন। আমরা সকলে পরকালের যাত্রী। পরকালীন সাফল্য লাভ করাই আমাদের একমাত্র লক্ষ্য। পূর্ণাঙ্গ সফলতা একমাত্র পরকালেই লাভ করা সম্ভব। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা দুনিয়াকে পরকালের ওপর অগ্রাধিকার দিয়ে থাকো; অথচ পরকাল উত্তম এবং চিরস্থায়ী।সুতরাং চিরস্থায়ী সাফল্য হচ্ছে জান্নাত লাভ। আল্লাহ মুমিনদেরকে সাতটি গুণ অর্জন করতে বলেছেন। আর যে মুমিন এই সাতটি গুণে গুণান্বিত হবে সে জান্নাত লাভ করবে।

প্রথম গুণঃ খুশয়ু’-এর সাথে নামাজ আদায় করা। নামাজ মুমিনের প্রথম মৌলিক ইবাদত। নামাজে খুশয়ুঅর্থ আল্লাহকে উপস্থিত ভেবে অন্তরকে স্থির রেখে সঠিকভাবে নামাজ আদায় করা। নামাজে অস্থির ও চঞ্চল হওয়া মুনাফিকের লক্ষণ। সহি আবু দাউদ শরিফে হজরত আবুজর গিফারি রাঃ থেকে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সাঃ বলেন, নামাজের সময় আল্লাহতায়ালা নামাজির প্রতি সারাক্ষণ দৃষ্টি রাখেন, যতক্ষণ না নামাজ পড়ার সময় নামাজি কোনো দিকে দৃষ্টি না দেয়। যখন সে অন্য দিকে দৃষ্টি দেয়, তখন আল্লাহতায়ালা তার দিক থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে নেন। নামাজে সিজদার জায়গার দিকে দৃষ্টি রাখতে হবে এবং ডানে-বামে তাকানো যাবে না। যদি নামাজি নামাজ আদায়ে তাড়াহুড়া করে, তাহলে খুশয়ু’-এর সাথে নামাজ আদায় হবে না এবং তার নামাজও শুদ্ধ হবে না।

দ্বিতীয় গুণঃ অনর্থক কথাবার্তা থেকে বিরত থাকা। একজন পূর্ণ ঈমানদারের বৈশিষ্ট্য হলো­ সে নিজেকে অহেতুক কথাবার্তা থেকে রক্ষা করবে। যেসব কথায় ধর্মীয় কোনো উপকার নেই, সেসব অহেতুক কথা থেকে নিজেকে দূরে রাখা অবশ্য কর্তব্য। অহেতুক কথাবার্তা বলতে গেলে গুনাহ্‌ হওয়ার আশঙ্কা বেশি। প্রয়োজনীয় কথা বলতে দোষ নেই। কিন্তু অপ্রয়োজনীয় কথা না বলে চুপ থাকা ভালো।

তৃতীয় গুণঃ জাকাত প্রদান করা। জাকাত ইসলামের পাঁচটি মৌলিক বিষয়ের একটি। জাকাত প্রদান করা ফরজ। আল্লাহতায়ালা নামাজ আদায়ের সাথে জাকাত দেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। অনেক মুমিন জাকাত প্রদান করতে গড়িমসি করে থাকেন। এটা আসলে পূর্ণ ঈমানদারের বৈশিষ্ট্য নয়। স্বতঃস্ফূর্তভাবে জাকাত আদায় করা প্রত্যেক মুমিনের অবশ্য কর্তব্য। কেউ যদি জাকাত প্রদান না করে, তা হলে কিয়ামতের দিন তার ওই সম্পদ একটি বিষধর সাপ হয়ে তাকে দংশন করতে থাকবে।

চতুর্থ গুণঃ ওই সব লোক যারা স্ত্রী ও শরিয়তসম্মত দাসী ছাড়া অন্যসব পরনারী থেকে যৌনাঙ্গকে সংযম রাখে। রাসূলুল্লাহ সাঃ বলেন, যে ব্যক্তি তার যৌনাঙ্গকে হেফাজত করবে আমি তার জন্য বেহেশতের জামিনদার হয়ে যাবো। সুতরাং একজন সত্যিকার ঈমানদার ব্যক্তি পরনারীর প্রতি দৃষ্টি দেবে না এবং সে আল্লাহর ভয়ে নিজেকে সংযত রাখবে।

পঞ্চম গুণঃ আমানত সম্পর্কে সতর্ক থাকা। বিষয়টি খুবই তাৎপর্যবহ। আমানত দুই প্রকার। প্রথমত, আল্লাহর হক সম্পর্কিত আমানত; দ্বিতীয়ত, বান্দার হক সম্পর্কিত আমানত। শরিয়ত নির্দেশিত সব ফরজ ও ওয়াজিব পালন করা এবং যাবতীয় হারাম থেকে নিজেকে রক্ষা করা হচ্ছে আল্লাহর হক সম্পর্কিত আমানত। আর বান্দার হক সম্পর্কিত আমানত হচ্ছে­ কেউ কারো কাছে ধনসম্পদ গচ্ছিত রাখলে তা যথাযথভাবে ফেরত দেয়া, কারো গোপন কথা অন্যের কাছে প্রকাশ না করা। রাষ্ট্রের কোনো গোপন তথ্য অন্য দেশের কাছে প্রকাশ না করা।

ষষ্ঠ গুণঃ ওয়াদা পূর্ণ করা। ওয়াদা পূর্ণ করা ওয়াজিব। একজন মুমিন ব্যক্তি কোনো ওয়াদা করলে সে ওয়াদা পালন করা তার জন্য ওয়াজিব হয়ে দাঁড়ায়। সেটা যেকোনো ওয়াদাই হোক না কেন। কেউ যদি ওয়াদা করে সেটা রক্ষা না করে, তাহলে সে গুনাহগার হবে। মুমিনের কথা ও কর্ম এক ও অভিন্ন থাকবে। কথা বলবে ভেবে-চিন্তে আর কর্মে থাকবে স্বচ্ছতা।

সপ্তম গুণঃ নামাজ আদায়ে অত্যন্ত যত্নবান হওয়া। নামাজে যত্নবান হওয়ার অর্থ হচ্ছে­ নিজের জন্য ভেবে নিজের জীবনে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজকে সব সময় চালু রাখা। নামাজের ব্যাপারে কখনো অবহেলা না করা। ফরজ, ওয়াজিব, সুন্নত, মুস্তাহাব ও নফল যে নামাজই হোক, সব নামাজকে একাগ্রচিত্তে যথাসময়ে আদায় করা। কখনো চিরস্থায়ী আবাসস্থল জান্নাতের অধিবাসী হতে হলে উল্লিখিত সাতটি গুণের অধিকারী হওয়া একান্ত কর্তব্য। যিনি এই গুণাবলির অধিকারী হবেন, তাকে আল্লাহতায়ালা জান্নাতুল ফেরদাউস দানের ওয়াদা করেছেন। আর আল্লাহর ওয়াদা সত্য।

Advertisements
%d bloggers like this: