পর্দা করা ফরজ

 

হিজাব হলো প্রাপ্তবয়স্ক মুসলিম নারীদের ঘরে কিংবা ঘরের বাইরে যেকোনো কারণে ১৪ জন মুহরিম ব্যক্তি ছাড়া অন্য যেকোনো পুরুষের সাথে কথা বলা, দেখা করা অথবা যেকোনো প্রয়োজনীয় কাজকর্ম সম্পাদনের সময় ধর্মীয় বিধান অনুযায়ী পোশাকে নিজেকে আবৃত করে রাখা। এ ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে উল্লেখ আছে­ ‘হে নবী! আপনি আপনার স্ত্রীগণকে, কন্যাগণকে ও মুমিনদিগের নারীগণকে বলেন, তারা যেন তাদের চাদরের কিয়দংশ নিজেদের ওপর টেনে দেয়। এতে তাদেরকে চেনা সহজতর হবে; ফলে তাদেরকে উত্ত্যক্ত করা হবে না। আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’ (সূরা আল আহজাব, আয়াত ৫৯)। ইসলামের আবির্ভাবের পর রাসূল সাঃ কর্তৃক মুসলিম পুরুষ ও নারীদের পোশাক-আশাকের ক্ষেত্রে এসেছিল সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা, যা আজো মুসলমান সমাজে প্রচলিত রয়েছে এবং থাকবে। শুধু তাই নয়, পৃথিবীর প্রত্যেক জাতি ও দেশে এর প্রভাব ছড়িয়ে রয়েছে। আরবীয় মহিলাদের ছিল ফুলহাতা জামা, কোমর থেকে পা পর্যন্ত পাজামা কিংবা সায়ার মতো পোশাক, মাথার চুল ও বক্ষ আচ্ছাদনের জন্য অস্বচ্ছ কাপড়ের ওড়না আর পুরুষদের জন্য ছিল নিুাঙ্গে লুঙ্গি বা পাজামার মতো পোশাক, আর ঊর্ধ্বাঙ্গে ছিল পাঞ্জাবি, পিরহান বা কামিজ, মাথায় ছিল টুপি এবং তার ওপর পাগড়ি। স্ত্রী, পুরুষ উভয়েই পায়ে পরতেন চামড়ার মোজা, তার ওপর চামড়ার জুতা। এ ব্যাপারে আরো বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে পবিত্র কুরআনের সূরা আন-নূর ও সূরা আল আহজাবের মধ্যে।

হিজাবের ব্যাপারে শুধু নারীদের জন্যই নয়, পুরুষদের জন্যও রয়েছে কঠোর নির্দেশনা। সুনির্দিষ্টভাবে মুসলিম সমাজে এক সময় বোরকার প্রচলন ছিল না। ঐতিহাসিকদের মতে, বোরকা পরার রেওয়াজ ছিল সিরিয়ার মেস্টারিয়াক খ্রিষ্টানদের মধ্যে। তা থেকে আব্বাসীয় খলিফাদের সময় এই প্রথার বিস্তার ঘটে মুসলিম সমাজে। ক্যাথলিক মেয়েদের এখনো গির্জায় ঢোকার সময় চোখের ওপর পর্যন্ত ঢেকে নিতে হয় জাল দিয়ে। এভাবে সব ধর্মের মানুষেরই পোশাক-আশাকের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা থাকার কথা। হিজাব ব্যবহার করার জন্য মুসলিম নারীদের পবিত্র কুরআনে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। তাই এটা তাদের জন্য ফরজ। এ ফরজ কাজটি করার জন্য কাউকে বাধ্য করা যাবে কি যাবে না, এ ব্যাপারে বিধিনিষেধ জারি করার ক্ষেত্রে পৃথিবীর কোনো আদালতের এখতিয়ার আছে কি না সেটাই আগে ভেবে দেখা দরকার। একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশের একজন সুস্থ বিবেকবান নাগরিকের সে দেশের আইন ও আদালতের প্রতি আনুগত্য এবং শ্রদ্ধাশীল থাকার বিকল্প নেই। যেহেতু আমার প্রথম পরিচয় আমি একজন মুসলমান, সেহেতু আমি আমার মুসলমান সত্তাকে টিকিয়ে রাখতে পৃথিবীর অন্য কোনো কিছুর সাথে আপস কিংবা বিশুদ্ধতা যাচাইয়ের বাজি ধরা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। সে ক্ষেত্রে একজন প্রকৃত মুসলমানের কাজ হলো­ আল্লাহর বিধান অনুসারে নামাজ পড়া, রোজা রাখা, জাকাত ও হজ আদায় করা (সামর্থøবানদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য)। হিন্দুরা তাদের ধর্মীয় বিধান অনুসারে পূজাপার্বণের অনুষ্ঠানগুলো পালন করবে। খ্রিষ্টানরা বড়দিনের অনুষ্ঠান আর বৌদ্ধরা মাঘী পূর্ণিমা পালন করবে তাদের ধর্মীয় রীতি-নীতি অনুসারে, এটাই স্বাভাবিক। ধর্মীয় এই অনুষ্ঠানগুলো পালনের ক্ষেত্রে কাউকে জোর করা যাবে কি যাবে না এ বিষয়ে আগবাড়িয়ে কোনো বিধিনিষেধ বা রুলনিশি জারি করা কতখানি যুক্তিসঙ্গত, এটাও ভেবে দেখতে হবে। কেউ নামাজ পড়বে কি পড়বে না, অথবা কেউ পূজা দেবে কি দেবে না এ বিষয়ে আদালত কী বললেন অথবা কী বললেন না তা যেকোনো ধর্মবিশ্বাসীর ভাবার বিষয় নয় বলেই দাবি করেন নানা ধর্মের ধর্মপ্রাণ মানুষ। কারণ ধর্মকে ঘিরেই আদালত পরিচালিত হতে পারে এবং বিশ্বের বহু দেশে পরিচালিত হচ্ছেও, কিন্তু আদালতকে ঘিরে ধর্ম পরিচালিত হওয়ার কোনো নজির কিংবা নিয়ম এখনো কোথাও দেখা যায়নি। এই স্পর্শকাতর বিষয়গুলো নিয়ে আদালত আর ধর্মীয় বিশ্বাসকে অহেতুক মুখোমুখি দাঁড় করানোর কোনো যুক্তি আছে বলে মনে হয় না। ঠিক হিজাবের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম নেই। তাই যারা আদালতকে এই হীন কাজে ব্যবহার করে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানার মাধ্যমে এ দেশের জনসাধারণের আশা-ভরসার শেষ আশ্রয়স্থল আদালতের ভাবমর্যাদা ক্ষুণ্ন করে আদালত ও মুসলমানদের মুখোমুখি দাঁড় করানোর চেষ্টা করে যাচ্ছেন, বিষয়টি তাদেরকেই ভেবে দেখতে হবে। কারণ মুসলমানরা যেমন অতিতেও দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে আইন-আদালত সর্বোপরি দেশের স্বার্থে নিজেদেরকে উৎসর্গ করতে কখনো পিছপা হয়নি। একইভাবে ধর্মীয় স্বার্থেও নিজেদেরকে উৎসর্গ করতে কখনো কুণ্ঠাবোধ করেনি এবং ভবিষ্যতেও করবে না। এটা নীতিনির্ধারক মহলকে মনে রেখে দেশ পরিচালনা করতে হবে। অন্যথায় সরকার ও জনগণকে এই ভুলের মাশুল নানাভাবে দিতে হবে।

হিজাবের ব্যাপারে আদালত থেকে বিধিনিষেধ এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে পরিপত্র জারি হওয়ার পর থেকে আশঙ্কাজনকভাবে ইভটিজিং (যৌন সন্ত্রাস) বেড়ে গেছে। এর বিশ্লেষণও নানাভাবে করা যায়। প্রথমত, আল্লাহর দুনিয়ায় আল্লাহর আইনের বিরুদ্ধে দুনিয়ার আদালতের বিধিনিষেধের কারণে, এটা একটি আসমানী গজব হতে পারে। দ্বিতীয়ত, আদালতের রুলনিশি ও শিক্ষা মন্ত্রণালয় কর্তৃক পরিপত্র জারি করার কারণে মেয়েদের মধ্যে ধর্মীয় অনুশাসন হিজাব করা এখন অনেকটা মাই উইসব্যাপার হয়ে দাঁড়িছে। আর অভিভাবকদের মধ্যেও একটা হতাশা ও আতঙ্ক বিরাজ করছে। কারণ তারা এখন উভয় সঙ্কটের মধ্যে রয়েছে। এক দিকে ধর্মীয় অনুশাসন, অপর দিকে মানব রচিত আইনের শাসন। তারা এখন কোনটি পালন করবে? ধর্মীয় অনুশাসন না মানলে হবে আল্লাহ-দ্রোহিতা। এ অপরাধের দণ্ড দেবেন আল্লাহ নিজে। অন্য দিকে মানব রচিত আইনের শাসন না মানলে হবে আইন অমান্যকারী, এই অপরাধের জন্য হবে জেল-জরিমানা। যে কারণে অভিভাবকরা এখন অনেকটা কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থায় আছে। সেই সুযোগে এখন মেয়েরাও স্কুল, কলেজ, মার্কেট কিংবা রাস্তাঘাটে বের হচ্ছে নিজেদের খেয়াল-খুশিমতো। এ যুগের মেয়েদের পোশাকের ধরন এখন এমন অবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছে যে, এর বিশ্লেষণ করতেও লজ্জাবোধ হয়। এমন পিনপিনে পাতলা কাপড় দিয়ে তারা পোশাক তৈরি করে, যা গায়ে পরা আর না পরার মধ্যে তেমন কোনো ব্যবধান লক্ষ করা যায় না। ওড়না তো পেঁয়াজের খোসার চেয়েও পাতলা হওয়ার ট্রেডিশন অনেক আগে থেকেই প্রচলিত হয়েছে। বুক ও পিঠের অনেকটা জায়গা খালি রেখে পোশাক পরে একটি মেয়ে রাস্তায় বের হলে ওই মেয়ের দিকে নজর দেবে না, এমন যুবক খুঁজে পাওয়া কি সম্ভব? এ অবস্থায় ইভটিজিং (যৌন সন্ত্রাস) বাড়তে থাকলে এটা কার দোষ? এক দিকে বলবেন মেয়েদের শালীন পোশাক পরাতে জোর করা যাবে না। আবার অন্য দিকে মেয়েদের অশালীন পোশাক গায়ে পরিয়ে রাস্তায় বের করে যুবসমাজের মধ্যে যৌন সুড়সুড়ি জাগিয়ে ইভটিজিং (যৌন সন্ত্রাস) উসকে দিয়ে আবার এটাকে থামাতে অহেতুক মায়াকান্নায় বুক ভাসাবেন, এটা কেমন কথা? এটা তো স্ববিরোধী কথা। ধর্মীয় অনুশাসন অর্থাৎ হিজাবই পারে এই সামাজিক অনাচার ইভটিজিংয়ের হাত থেকে জাতিকে উদ্ধার করতে। শুধু ইভটিজিং (যৌন সন্ত্রাস) কেন, ধর্মীয় অনুশাসনের মাধ্যমেই খুঁজতে হবে জীবনের সব অশান্তি ও অনাচারের হাত থেকে উদ্ধারের পথ। হিজাবের বিরুদ্ধে আদালতের বিধিনিষেধ আর শিক্ষা মন্ত্রণালয় কর্তৃক পরিপত্র জারির বিষয়টি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি সরকারের ভেতর থেকে একটি পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র বলেই অনেকে মনে করেন। কারণ বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার আগে এ দেশের মুসলমানদের কাছে প্রতিশ্রুতি দিয়ে এসেছিলেন, তারা ক্ষমতায় গেলে ইসলাম ধর্মের বিরুদ্ধে কোনো কাজ করবেন না। তাই সরকারের ভেতর থেকেই ষড়যন্ত্র হচ্ছে তাদেরকে বেকায়দায় ফেলার। তারই অংশ হিসেবে নানা অজুহাতে মুসলমানদের আবেগ-অনুভূতিতে আঘাত হানার মাধ্যমে মুসলমান এবং বর্তমান মহাজোট সরকারকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়ার চেষ্টা চলছে। তাদেরকে মুসলমানদের কাছে ওয়াদা ভঙ্গকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করাই ষড়যন্ত্রকারীদের লক্ষ্য বলে অনেকে ধারণা করছেন।

এ দেশের মুসলমানদের আশা-আকাঙ্ক্ষা ও চাওয়া-পাওয়াকে পদদলিত করে কিংবা তাদের আবেগ-অনুভূতিতে আঘাত হেনে আজ পর্যন্ত কোনো দল কখনো সরকার গঠন করতে পারেনি এবং কোনো সরকার টিকে থাকতেও পারেনি। এ কথা যদি কেউ ভুলে যায়, তাহলে তাদের জন্য অনুশোচনা ছাড়া আর কী-ই বা থাকতে পারে। তাই সরকারকেই ভাবতে হবে বর্তমানে মুসলমানদের ধর্মীয় বিষয়গুলো নিয়ে যারা অতি বাড়াবাড়ি করছেন তাদের আসল উদ্দেশ্য কী? এই কার্যক্রম কি মুসলমানদের বিরুদ্ধে, নাকি সরকারের বিরুদ্ধে।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: