জমজমের ইতিকথা

মহান আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামীন পবিত্র কোরআনের মধ্যে তাঁর কুদরতের বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন। রাসুলে করীম (সা.)-এর হাদিসের মধ্যেও রয়েছে মহান আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামীনের কুদরতের বর্ণনা।

আল্লাহর এমনই একটি কুদরত ঐতিহাসিক জমজম কূপের পানি হলো আল্লাহর কুদরতি পানি। এই পানি সম্পর্কে বর্ণিত আছে, যে কেউ যে কোনো উদ্দেশ্য নিয়ে এই পানি পান করলে আল্লাহ পাক তাঁর উদ্দেশ্যকে পূর্ণ করে দেবেন। এমনকি অসুস্থ ব্যক্তিকে এই পানি পান করালে সে সুস্থতা লাভ করবে। রাসুল করীম (সা.) নিজেই এই জমজমের পানি পান করেছেন এবং এর প্রতি উত্সাহ প্রদানও করেছেন।

এ কূপটি আল্লাহপাকের এক মহান কুদরতে গড়ে উঠেছিল ইব্রাহীম (আ.) যখন হজরত সারার পরামর্শক্রমে স্ত্রী হাজেরা ও পুত্র ইসমাইলকে নিয়ে শাম থেকে রওনা করে মরু সাহারা পাহাড়-পর্বত পাড়ি দিয়ে মক্কার শুষ্ক জনমানবশূন্য পাথরের উপত্যকায় এসে পৌঁছেন। জনমানবশূন্য এ এলাকার সঙ্গে তাদের নেই কোনো পূর্ব পরিচিত। ছিল না তাতে আগে থেকে আসা-যাওয়ার কোনো যুগসূত্র। বাহ্যত স্ত্রী-পত্রের আশা-ভরসার একমাত্র কেন্দ্রবিন্দু হলেন হজরত ইব্রাহীম (আ.)। কিন্তু মহান প্রভু আল্লাহ পাক ইচ্ছা করলে কি না পারেন। তাঁর পক্ষে তো এই জনমানবশূন্য এলাকায় একজন মহিলা ও শিশুকে অভিভাবক ছাড়া স্বাচ্ছন্দ্যের সঙ্গে প্রতিপালন করা আদৌ কঠিন বা অকল্পনীয় নয়। তাইতো আল্লাহ পাক তাঁদের ক্ষেত্রে তাঁর কুদরতের প্রকাশ ঘটালেন। নিজ দায়িত্বে খাদ্যসামগ্রীহীন জনমানবশূন্য এলাকায় পানাহারের ব্যবস্থা করে দিলেন।

হজরত ইব্রাহীম (আ.) এমন একটি উপত্যকায় স্ত্রী হাজেরা ও পুত্র ইসমাইল (আ.) রেখে বললেন, তোমরা এখানে থাক, আমি এবার চললাম। অবাক কণ্ঠে স্ত্রী প্রশ্ন করলেন, এ জনমানবশূন্য পাহাড় এলাকায় অবুঝ এই দুধের শিশুটিকে নিয়ে আমি কীভাবে থাকব? উত্তরে ইব্রাহীম (আ.) বললেন! আল্লাহ পাক তোমাদের সঙ্গে আছেন। স্ত্রী হাজেরা প্রশ্ন করলেন, একি মহান আল্লাহর হুকুম? হজরত ইব্রাহীম (আ.) উত্তর দিলেন। হ্যাঁ, অবশ্যই তা আল্লাহর হুকুম। এ কথা শুনে স্ত্রী হাজেরা মহান প্রভুর প্রতি ভরসা করে বিদায় জানালেন প্রাণপ্রিয় স্বামীকে। স্বামীকে বিদায়ান্তে সঙ্গে থাকা খাবার অল্প দিনেই ফুরিয়ে গেল। চিন্তিত হয়ে পড়লেন তাঁর এবং শিশু ইসমাইলের ভবিষ্যেক নিয়ে। কে হবে তাঁদের আগামী দিনগুলোয় আত্মরক্ষার মাধ্যমে? কী খেয়ে শিশুপুত্র ইসমাইল এবং তাঁর জীবন বাঁচবে? এমন-ই এক মুহূর্তে পানির তৃষ্ণায় কাতর হয়ে উঠলেন শিশুপুত্র ইসমাইল। শিশুর এমন অবস্থা দেখে মা হাজেরা নিরুপায় হয়ে দৌড়াতে লাগলেন নিকটবর্তী পাহাড়ের দিকে। পাহাড়ের ওপরে উঠলেন। কিন্তু পানির তো কোনো সন্ধান পেলেন না। দূর মারওয়া পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে সেখানে পানির মতো কী জানি দেখতে পেলেন। গেলেন সেখানে, কিন্তু গিয়ে দেখলেন পানির কোনো চিহ্নই নেই। আবার সাফা পাহাড়ের দিকে তাকাতেই পানির মতো দেখতে পেলেন। সঙ্গে সঙ্গে গেলেন। আবারও আগের মতো হলো। পানির কোনো চিহ্নই দেখতে পেলেন না। এরূপ করে সাফা-মারওয়াতে সাতবার দৌড়ালেন তিনি। শেষ পর্যন্ত পানি না পেয়ে পানির জন্য আল্লাহর কাছে কামনা করতে করতে প্রাণাধিক প্রিয়পুত্রের অবস্থা দেখার জন্য ছুটে এলেন। কুটিরে এসে ছেলেকে দেখতে না পেয়ে হৃদয় কেঁপে উঠল তাঁর। ভাবলেন তাহলে কোথায় আমার ইসমাইল? বাইরের দিকে তাকাতেই দেখলেন, ওই যে দেখা যায় তাঁর আদরের শিশু ইসমাইল হাত-পা নেড়ে নীরবে খেলা করছে। দৌড়ে কাছে গিয়েই অবাক হয়ে গেলেন। মহান আল্লাহর একি কুদরতের বহিঃপ্রকাশ। পাথর ভেত করে একটি ঝরনা দিয়ে পানি ওপরে উঠে আছে। যা হলো একদম স্বচ্ছ-নির্মল এবং সুশীতল। হজরত হাজেরা (আ.) নিজেও পানি পান করলেন এবং শিশু ইসমাইলকেও পান করালেন। যার ফলে প্রচণ্ড ক্ষুধা-তৃষ্ণা ও উত্কণ্ঠা নিমিষেই দূর হয়ে গেল। আল্লাহ্র কৃতজ্ঞতা আদায় করে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন হজরত হাজেরা। মহান প্রভুর প্রশংসায় মেতে উঠলেন তিনি। এ যেন আল্লাহ তাঁদের সঙ্গে সরাসরি তাঁর কুদরতের বহিঃপ্রকাশ। জমজমের পানি এ যেন পানি নয়, বরং তা আল্লাহ পাক কর্তৃক তাঁর প্রিয় বান্দাকে কেন্দ্র করে প্রবাহিত তাঁরই কুদরতের একটি ঝরনাধারা।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: