জমজমের ইতিকথা

মহান আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামীন পবিত্র কোরআনের মধ্যে তাঁর কুদরতের বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন। রাসুলে করীম (সা.)-এর হাদিসের মধ্যেও রয়েছে মহান আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামীনের কুদরতের বর্ণনা।

আল্লাহর এমনই একটি কুদরত ঐতিহাসিক জমজম কূপের পানি হলো আল্লাহর কুদরতি পানি। এই পানি সম্পর্কে বর্ণিত আছে, যে কেউ যে কোনো উদ্দেশ্য নিয়ে এই পানি পান করলে আল্লাহ পাক তাঁর উদ্দেশ্যকে পূর্ণ করে দেবেন। এমনকি অসুস্থ ব্যক্তিকে এই পানি পান করালে সে সুস্থতা লাভ করবে। রাসুল করীম (সা.) নিজেই এই জমজমের পানি পান করেছেন এবং এর প্রতি উত্সাহ প্রদানও করেছেন।

এ কূপটি আল্লাহপাকের এক মহান কুদরতে গড়ে উঠেছিল ইব্রাহীম (আ.) যখন হজরত সারার পরামর্শক্রমে স্ত্রী হাজেরা ও পুত্র ইসমাইলকে নিয়ে শাম থেকে রওনা করে মরু সাহারা পাহাড়-পর্বত পাড়ি দিয়ে মক্কার শুষ্ক জনমানবশূন্য পাথরের উপত্যকায় এসে পৌঁছেন। জনমানবশূন্য এ এলাকার সঙ্গে তাদের নেই কোনো পূর্ব পরিচিত। ছিল না তাতে আগে থেকে আসা-যাওয়ার কোনো যুগসূত্র। বাহ্যত স্ত্রী-পত্রের আশা-ভরসার একমাত্র কেন্দ্রবিন্দু হলেন হজরত ইব্রাহীম (আ.)। কিন্তু মহান প্রভু আল্লাহ পাক ইচ্ছা করলে কি না পারেন। তাঁর পক্ষে তো এই জনমানবশূন্য এলাকায় একজন মহিলা ও শিশুকে অভিভাবক ছাড়া স্বাচ্ছন্দ্যের সঙ্গে প্রতিপালন করা আদৌ কঠিন বা অকল্পনীয় নয়। তাইতো আল্লাহ পাক তাঁদের ক্ষেত্রে তাঁর কুদরতের প্রকাশ ঘটালেন। নিজ দায়িত্বে খাদ্যসামগ্রীহীন জনমানবশূন্য এলাকায় পানাহারের ব্যবস্থা করে দিলেন।

হজরত ইব্রাহীম (আ.) এমন একটি উপত্যকায় স্ত্রী হাজেরা ও পুত্র ইসমাইল (আ.) রেখে বললেন, তোমরা এখানে থাক, আমি এবার চললাম। অবাক কণ্ঠে স্ত্রী প্রশ্ন করলেন, এ জনমানবশূন্য পাহাড় এলাকায় অবুঝ এই দুধের শিশুটিকে নিয়ে আমি কীভাবে থাকব? উত্তরে ইব্রাহীম (আ.) বললেন! আল্লাহ পাক তোমাদের সঙ্গে আছেন। স্ত্রী হাজেরা প্রশ্ন করলেন, একি মহান আল্লাহর হুকুম? হজরত ইব্রাহীম (আ.) উত্তর দিলেন। হ্যাঁ, অবশ্যই তা আল্লাহর হুকুম। এ কথা শুনে স্ত্রী হাজেরা মহান প্রভুর প্রতি ভরসা করে বিদায় জানালেন প্রাণপ্রিয় স্বামীকে। স্বামীকে বিদায়ান্তে সঙ্গে থাকা খাবার অল্প দিনেই ফুরিয়ে গেল। চিন্তিত হয়ে পড়লেন তাঁর এবং শিশু ইসমাইলের ভবিষ্যেক নিয়ে। কে হবে তাঁদের আগামী দিনগুলোয় আত্মরক্ষার মাধ্যমে? কী খেয়ে শিশুপুত্র ইসমাইল এবং তাঁর জীবন বাঁচবে? এমন-ই এক মুহূর্তে পানির তৃষ্ণায় কাতর হয়ে উঠলেন শিশুপুত্র ইসমাইল। শিশুর এমন অবস্থা দেখে মা হাজেরা নিরুপায় হয়ে দৌড়াতে লাগলেন নিকটবর্তী পাহাড়ের দিকে। পাহাড়ের ওপরে উঠলেন। কিন্তু পানির তো কোনো সন্ধান পেলেন না। দূর মারওয়া পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে সেখানে পানির মতো কী জানি দেখতে পেলেন। গেলেন সেখানে, কিন্তু গিয়ে দেখলেন পানির কোনো চিহ্নই নেই। আবার সাফা পাহাড়ের দিকে তাকাতেই পানির মতো দেখতে পেলেন। সঙ্গে সঙ্গে গেলেন। আবারও আগের মতো হলো। পানির কোনো চিহ্নই দেখতে পেলেন না। এরূপ করে সাফা-মারওয়াতে সাতবার দৌড়ালেন তিনি। শেষ পর্যন্ত পানি না পেয়ে পানির জন্য আল্লাহর কাছে কামনা করতে করতে প্রাণাধিক প্রিয়পুত্রের অবস্থা দেখার জন্য ছুটে এলেন। কুটিরে এসে ছেলেকে দেখতে না পেয়ে হৃদয় কেঁপে উঠল তাঁর। ভাবলেন তাহলে কোথায় আমার ইসমাইল? বাইরের দিকে তাকাতেই দেখলেন, ওই যে দেখা যায় তাঁর আদরের শিশু ইসমাইল হাত-পা নেড়ে নীরবে খেলা করছে। দৌড়ে কাছে গিয়েই অবাক হয়ে গেলেন। মহান আল্লাহর একি কুদরতের বহিঃপ্রকাশ। পাথর ভেত করে একটি ঝরনা দিয়ে পানি ওপরে উঠে আছে। যা হলো একদম স্বচ্ছ-নির্মল এবং সুশীতল। হজরত হাজেরা (আ.) নিজেও পানি পান করলেন এবং শিশু ইসমাইলকেও পান করালেন। যার ফলে প্রচণ্ড ক্ষুধা-তৃষ্ণা ও উত্কণ্ঠা নিমিষেই দূর হয়ে গেল। আল্লাহ্র কৃতজ্ঞতা আদায় করে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন হজরত হাজেরা। মহান প্রভুর প্রশংসায় মেতে উঠলেন তিনি। এ যেন আল্লাহ তাঁদের সঙ্গে সরাসরি তাঁর কুদরতের বহিঃপ্রকাশ। জমজমের পানি এ যেন পানি নয়, বরং তা আল্লাহ পাক কর্তৃক তাঁর প্রিয় বান্দাকে কেন্দ্র করে প্রবাহিত তাঁরই কুদরতের একটি ঝরনাধারা।

Advertisements

মেদ ভুঁড়ি প্রতিরোধে করণীয়

অতিরিক্ত চর্বি জমে আমাদের শরীরের ওজন স্বাভাবিকের চেয়ে শতকরা দশভাগ বেড়ে গেলে তাকে আমরা মুটিয়ে যাওয়া বলে থাকি। সাধারণত, মাঝ বয়সে পৌঁছানোর পরপরই শরীরে অতিরিক্ত চর্বি জমা শুরু হয়। তবে কিছু কিছু কারণে যে কোনো বয়সেই একজন মানুষ মুটিয়ে যেতে পারে। প্রয়োজনের তুলনায় অধিক পরিমাণে খাদ্য গ্রহণ এবং কম শারীরিক পরিশ্রমই এর প্রধান কারণ। এছাড়া কিছু হরমোন জাতীয় রোগ, পারিবারিক প্রবণতা এবং কোনো কোনো ওষুধও এর জন্য দায়ী। মহিলাদের মধ্যে মুটিয়ে যাওয়ার প্রবণতা পুরুষদের চেয়ে বেশি। উন্নত বিশ্বের বয়স্কদের মধ্যে শতকরা ২০ থেকে ৪০ ভাগ এবং শিশু-কিশোরদের মধ্যে শতকরা ১০ থেকে ২০ ভাগ মুটিয়ে যাওয়া সমস্যায় আক্রান্ত। আমাদের দারিদ্র্যপীড়িত বাংলাদেশের কোটি কোটি ভগ্নস্বাস্থ্য মানুষের পাশাপাশি কারও কারও দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে উঠেছে অতিরিক্ত ওজন কিংবা মেদভুঁড়ি।
মানসিক দুশ্চিন্তা ছাড়াও মোটা মানুষের ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, স্ট্রোক, ক্যান্সার, পিত্তথলির পাথর, অস্টিওআর্থাইটিস, বন্ধ্যত্ব, ঘুমের মধ্যে শ্বাস বন্ধ হওয়া বা স্লিপ এপনিয়া, ভেরিকস ভেইন, হার্নিয়া প্রভৃতি রোগ হওয়ার প্রবণতা বেশি দেখা যায়। এসব মারাত্মক রোগের ঝুঁকি থেকে মুক্ত হতে আপনার অস্বস্তিকর মেদভুঁড়ি কমিয়ে

সুন্দর-সুঠাম শরীরের অধিকারী হওয়ার জন্য নিচের টিপসগুলো মেনে চলা প্রয়োজন :

১. তিনটি বিষয়কে বিবেচনায় আনুন : পরিমিত খাদ্য গ্রহণ, অধিক মাত্রায় শারীরিক পরিশ্রম এবং লাইফ স্টাইল বা জীবন যাত্রা ও আচরণের পরিবর্তন।

২. আপনার ওজন কমানোর ইচ্ছাটাকে দৃঢ়ভাবে মনে-প্রাণে ধারণ করুন।

৩. আপনার প্রয়োজন অনুযায়ী পরিমিত সুষম খাবার গ্রহণ করুন।

৪. অতিরিক্ত লবণ, মিষ্টি ও চর্বি জাতীয় খাবার যথাসম্ভব পরিহার করুন। প্রতিদিন কিছু পরিমাণ শাক-সবজি ও ফলমূল খান।

৫. ফাস্ট-ফুড এবং কোল্ড-ড্রিঙ্কস্ পরিহার করুন। প্রতিদিন পর্যাপ্ত পরিমাণ বিশুদ্ধ পানি পান করুন।

৬. বিভিন্ন আচার অনুষ্ঠানে পরিবেশিত রিচ ফুড যথাসম্ভব পরিহার করুন।
৭. মেদভুঁড়ি কমানোর চমত্কার একটি উপায় হচ্ছে হাঁটা। তাই কম দূরত্বের জায়গাগুলোতে হেঁটে চলাচল করুন।

৮. লিফেটর বদলে সিঁড়ি ব্যবহার করুন।

৯. একটানা অধিক সময় বসে কাজ করবেন না। কাজের ফাঁকে উঠে দাঁড়ান। একটু পায়চারি করুন।

১০. অলসতা দূর করতে সংসারের টুকিটাকি কাজ নিজেই করুন। সুযোগ থাকলে বাগান করুন, খেলাধুলা করুন। সাঁতার কাটুন।

১১. সপ্তাহে তিন/চার দিন কিছু সময় ফ্রি-হ্যান্ড (যন্ত্র ছাড়া) ব্যায়াম করুন। প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ অনুযায়ী আপনার উপযুক্ত ব্যায়াম নির্বাচন করুন। কারণ, সব ব্যায়াম সবার জন্য উপযুক্ত নয়। ব্যায়াম করছেন এ ধারণা মাথায় রেখে অতিরিক্ত খাদ্য গ্রহণ করবেন না।

১২. কোমড়ে চওড়া বেল্ট ব্যবহার করতে পারেন। এতে মেদ দ্রুত বাড়তে পারবে না।
১৩. ওজন কমে স্বাভাবিক হয়ে আসলেও আগে উল্লিখিত অভ্যাসগুলোকে ধরে রাখতে হবে। তা না পারলে পুনরায় ওজন বেড়ে যাবে।

১৪. নিজে নিজে শুধু ওষুধ সেবন করে ওজন কমাতে যাবেন না। ওষুধ ব্যবহার করতে চাইলে তা অবশ্যই করতে হবে বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকের পরামর্শমত। ওষুধের পাশাপাশি আগে বর্ণিত টিপসগুলো মেনে চলতে হবে।

১৫. প্রচলিত বিজ্ঞাপনের চমকে আকৃষ্ট হয়ে দ্রুত চিকন হওয়ার ওষুধ বা যন্ত্র ব্যবহার করতে যাবেন না। এতে আপনার অমঙ্গলের আশঙ্কাই বেশি।

১৬. প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞের পরামর্শমত আপনার মুটিয়ে যাওয়ার মাত্রা নির্ণয় করে বয়সানুসারে সুষম খাদ্যের তালিকা তৈরি করুন এবং তার বিজ্ঞানসম্মত নির্দেশনা মেনে চলুন।

ঘুষ ও দুর্নীতি দমনে মহানবী (স.) প্রণীত পদক্ষেপসমূহ

ঘুষ ও দুর্নীতি দমনে মহানবী (স.) প্রণীত পদক্ষেপসমূহ


তোমরা অন্যায়ভাবে একে অপরের সম্পদ গ্রাস করোনা এবং মানুষের ধন-সম্পত্তির কিছু অংশ জেনে শুনে অন্যায় পন্থায় আত্মসাৎ করার উদ্দেশ্যে শাসনকর্তা বা বিচারকদের হাতে উৎকোচ (ঘুষ) তুলে দিওনা (সুরা বাকারা-১৮৮ আয়াত)। আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন এখানে ঘুষের প্রতি নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন। এবং বিচারকদের হাতে ঘুষ দিয়ে রায় নিজের পক্ষে নিতেও বারণ করা হয়েছে। বাংলাদেশসহ বিশ্ব প্রেক্ষাপটে বিষয়টি যেন হালাল হিসেবে পরিলক্ষিত হয়ে আসছে। কারণ সরকারী-বেসরকারী প্রায় সকল অফিসেই ঘুষের বিনিময়েই বেশির ভাগ কাজ সুরাহা করা হয়। ঘুষের অংক যত বেশি হয় ফাইল ততো দ্রুতগতিতে দেঁৗড়াতে শুরু করে। আর ঘুষ ছাড়া কোন ফাইলই যেন নড়াচড়া করে না। সমাজের অসহায় এবং ক্ষমতাহীন মানুষেরা তাদের হূত অধিকার কিংবা অন্যের অধিকারকে করায়ত্ব করার লক্ষ্যে ধূর্ত দুনর্ীতিপরায়ণ কর্তা বা দায়িত্বশীল ব্যক্তিকে অবৈধ অর্থ কিংবা পণ্যসামগ্রী পর্দার অন্তরালে প্রদান করে স্বার্থ হাছিল করার নিমিত্তে উৎকোচ প্রদান করে থাকে। যা মানব বিধ্বংসী গুরুতর অপরাধ। এর মাধ্যমে হাক্কুল ইবাদ বান্দার হক বা অধিকারও ক্ষুণ্ন হয়। যে অপরাধ ক্ষমা করা না করার বিষয়টি স্বয়ং আল্লাহতায়ালা বান্দার হাতে ছেড়ে দিয়েছেন। বান্দা ক্ষমা না করলে আলস্নাহতায়ালা এই অপরাধ কখনোই ক্ষমা করবেন না।

ঘুষ গ্রহণ করা নিন্দনীয় ও গুনাহের কাজ বলে রসুল (সঃ) তার হাদীসেও উলেস্নখ করেছেন। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) হতে বর্ণিত রসুল (সঃ) বলেন, ঘুষ দাতা ও ঘুষ গ্রহীতা উভয়ই জাহান্নামে যাবে (তাবারাণী)। হযরত ইবনে ওমর (রা.) বর্ণিত অন্য হাদীসে আছে যে ঘুষদাতা ও ঘুষ গ্রহীতা উভয়কেই রসুল (সঃ) লানত করেছেন (আবু দাউদ)। হযরত ছাওবান (রা.) হতে বর্ণিত আছে যে, রসুল (সঃ) ঘুষ দাতা ও গ্রহীতা এবং ঘুষের দালাল সকলের উপর লানত করেছেন (আহমদ তাবারাণী)। এই পৃথিবীতে মান-মর্যাদা ও সম্মান-প্রতিপত্তির অধিকারী হওয়ার মাঝেই সার্থকতা রয়েছে। বিত্ত-বৈভবের প্রাচুর্য-এর তুলনায় মানুষ মান-সম্মান অর্জনের জন্যই দেদারছে সম্পদ ব্যয় করে। অন্য বিষয়ে ব্যয়ের সীমাবদ্ধতা থাকলেও এই খাতে তার ব্যয়ের সীমা পরিসীমা থাকে না। সম্পদের একটা উলেস্নখযোগ্য অংশ মানুষ তার মান-সম্মান ও প্রভাব-প্রতিপত্তি অর্জনের পিছনে ব্যয় করে থাকে। মানব জীবনের প্রকৃত সার্থকতা হলো মান-মর্যাদা অর্জন।

আর এর মোকাবেলায় অর্থ-বিত্ত একেবারেই মূল্যহীন বস্তু। তাই যখন কেউ ঘুষ গ্রহণ করে তখন তার মানসম্মান ধুলোয় মিশে যায়। ঘুষ গ্রহীতা দুর্নীতিবাজগণ গভীরভাবে ভেবে দেখুন যে, এটা আপনাদের আত্মমর্যাদা বিনাশের এক বিরাট আত্মঘাতী পদক্ষেপ এবং বংশ মর্যাদার জন্য এক অশুভ লক্ষণ। আলস্নাহ্র ভয়ে মানুষ যে কোন ধরনের অন্যায় কাজ হতে দূরে থাকে। কিন্তু ঘুষ-মানুষের অন্তর থেকে আল্লাহ্ভীতি দূর করে দেয়। ঘুষের কারণে মানবিক আচরণ চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মুহূর্তেই মানুষ অমানুষে পরিণত হয়। পরম সহিষ্ণুতার, অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীলতা, সততা, কর্তব্য নিষ্ঠা, লজ্জাশীলতা, ন্যায়পরায়ণতা, অন্যায় প্রতিরোধের স্পৃহা এবং আত্মসম্মানবোধের মতো মানবিক সুকুমার বৃত্তিগুলি ঘুষের প্রভাবে মানুষ হারিয়ে ফেলে। ঘুষ কুরআন হাদীস স্বীকৃত নিষিদ্ধ বিষয়। সুরা বাকারার ১৬৮ আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন, হে মানবজাতি। জমিনের মধ্যে যা কিছু রয়েছে, তা থেকে তোমরা হালাল ও পবিত্র বস্তুসমূহ খাও। আর শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করোনা, কেন না সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু। অনুরূপভাবে সুরা নাহলে বলা হয়েছে তোমাদেরকে আল্লাহ তায়ালা যে পবিত্র ও হালাল রুজি দান করেছেন তা থেকে তোমরা খাও এবং আলস্নাহর নেয়ামতসমূহের শুকরিয়া আদায় করো, যদি তোমরা তাঁরই উপাসক হয়ে থাকো। পৃথিবীতে জীবন পরিচালনা করতে অর্থের প্রয়োজনীয়তা এবং অপরিহার্যতা সম্পর্কে যেমন সবাই একমত, তেমনি অর্থ-সম্পদ অর্জনের ক্ষেত্রেও ভাল ও মন্দ তথা বৈধ-অবৈধ দু’টি ব্যবস্থার ব্যাপারেও দুনিয়ার সবাই একমত। দুনিয়ার সবাই মন্দ বলে মনে করে থাকে চুরি, ডাকাতি, ধোকা, ঘুষ, জুয়া প্রভৃতি কাজকে। এই পন্থাগুলোর মধ্যে বৈধ ও অবৈধ নির্ধারণের কোনো মানদণ্ড সাধারণ মানুষের কাছে নেই। এ বিষয়গুলো নির্ধারণ করেছেন স্বয়ং আলস্নাহতায়ালা ও তাঁর প্রিয় হাবিব হযরত মুহাম্মদ (সঃ) যা দেশ-কাল ও গোত্র গোষ্ঠী নির্বিশেষে সকলের নিকটই সমভাবে গ্রহণযোগ্য এবং শান্তি ও সমৃদ্ধি অর্জনের ক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্য রক্ষাকবচ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। মূলতঃ ঘুষ হারাম করার পিছনে কারণ হলো এই যে, এতে জনসাধারণের অধিকার ক্ষুণ্ন হয়ে থাকে। এর ফলে কতিপয় ব্যক্তি ফুলে ফেপে বড় লোক বনে যায় আর বৃহত্তর অংশ দারিদ্র্য কবলিত হয়ে পড়ে। ঘুষ চার প্রকার (১) ক্ষমতাসীন হওয়ার জন্য নেতৃত্ব ও পদবী লাভের জন্য, নিজের সপক্ষে রায় দেয়ার জন্য উচ্চ পর্যায়ের বা নিম্ন পর্যায়ের লোকদেরকে যা দেয়া হয় তা ঘুষ (২) ন্যায়কে অন্যায় ও অন্যায়কে ন্যায় বানানোর জন্যে যা ব্যয় করা হয় তাও ঘুষ। উক্ত দুই প্রকারের ঘুষদাতা, ঘুষখোর ও ঘুষের দালাল রসুল (সঃ) এর হাদীস অনুযায়ী অভিশাপ প্রাপ্ত ও জাহান্নামী (৩) নিজের প্রকৃত হক উদ্ধারের জন্য কর্মকর্তা বা তার নিকট সুপারিশকারীকে কিছু দেয়া। (৪) কোন অত্যাচারী জালিম ব্যক্তি হতে বা তার জুলুম থেকে নিজের এবং পরিবার পরিজনের জান-মাল, ইজ্জত-আব্রু রক্ষার সম্ভব হচ্ছে না। সেই ক্ষেত্রে অসহায় ও নিরুপায় অবস্থায় ঘুষ দেয়ার বিষয়ে কিছুটা অবকাশ দেয়া হয়েছে। কিন্তু গ্রহীতার ক্ষেত্রে সকল অবস্থায় ঘুষ নেয়া হারাম এবং হাদীসের ভাষায় সে অভিষপ্ত ও জাহান্নামী। হযরত আবু উমামা (রা.) হতে বর্ণিত। রসুল (সঃ) বলেন, যে ব্যক্তি কারো জন্য কোনো সুপারিশ করলো আর এজন্য সুপারিশ প্রাপ্ত ব্যক্তি তাকে কোনো হাদিয়া দিল এবং সে তা গ্রহণ করলো তবে নিঃসন্দেহে সে ঘুষের দরজাসমূহের মধ্য হতে একটি বড় দরজা দিয়ে প্রবেশ করলো (আবু দাউদ) আমাদের সমাজে যারা পৈত্রিক সূত্রে মুসলমান তারা এ সমস্ত বিষয়গুলো নিয়ে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে না। যার ফলে এ সমস্ত অন্যায়গুলো সমাজ জীবন হতে নিমর্ূল হয় না। রসুল (সঃ) এর অন্য একটি হাদীসে আরো পরিষ্কার করে বলা হয়েছে যে, সামাজিক বিশৃঙ্খলা, সন্ত্রাস ও নৈরাজ্য কি কারণে সৃষ্টি হয় হযরত আমর
বনে আস (রা.) হতে বর্ণিত আছে। তিনি বলেন, আমি রসুল (সঃ) কে বলতে শুনেছি, যে সমাজে যেনা-ব্যভিচার সুদ-ঘুষ, দুর্নীতি ছড়িয়ে পড়ে অথচ এর কোন বিচার হয় না। সেই সমাজ দারিদ্র্য ও দুর্ভিক্ষের করাল গ্রাসে নিপতিত না হয়ে পারে না। আর যে সমাজে ঘুষের কারবার ছড়িয়ে পড়ে সে সমাজে ভীতি ও সন্ত্রাস সৃষ্টি না হয়ে পারে না (মুসনাদে আহমদ) এই হাদীস থেকে সন্ত্রাস সৃষ্টির কারণ ও মূল উৎস কোথায় তা জানা সহজ হলো।

অন্য একটি হাদীসে বলা হয়েছে কোন কাজ উদ্ধার করার জন্য যা কিছু দেয়া হয় তা সবই ঘুষের পর্যায়ে পড়ে। যেমন হযরত আনাস (রা.) হতে বর্ণিত তিনি বলেন, রসুল (সঃ) বলেছেন, তোমাদের কেউ যখন কাউকে ঋণ দেয় আর ঋণ গ্রহীতা যদি তাকে কোন হাদীয়া দেয় কিংবা তার যানবাহনে বিনা ভাড়ায় চড়তে বলে তখন যেন সে তার হাদিয়া বা উপটৌকন গ্রহণ না করে এবং বিনা ভাড়ায় তার যানবাহনেও না চড়ে। অবশ্য পূর্ব থেকেই যদি তাদের উভয়ের মধ্যে এরূপ লেন-দেনের ধারা চলে আসে তবে তা ভিন্ন কথা (ইবনে মাজাহ) সুতরাং যারা মুসলিম বলে দাবি করেন ও ইসলামী অনুশাসনে নিজেদের জীবনকে ঢেলে সাজাতে চায় তারা অবশ্যই এ সমস্ত সামান্য ব্যাপারেও সতকর্তা অবলম্বন করবে। তা নাহলে সব আমল বিনষ্ট হয়ে যাবে ও তার পরিণতি হবে খুবই ভয়াবহ। আলস্নাহ্র রসুল (সঃ) এ প্রসঙ্গে বলেন, “আর রাশি অল মুরতাশি কিলাহুমা ফিন নার” ঘুষ দাতা, ঘুষ গ্রহীতা এবং ঘুষের লেনদেনে সহযোগিতাকারীগণ সকলেই অভিষপ্ত ও জাহান্নামী।

আমাদের বুঝতে হবে যে, পৃথিবীর জীবন আসল জীবন নয়। এটি একটি পরীক্ষার ক্ষেত্র। প্রকৃত জীবন হলো পরকালের জীবন। যে জীবনের কোনো শেষ নেই। সেই জীবনে সুখী হওয়াই প্রকৃত সুখ। নশ্বর এই দুনিয়ায় সামান্য কয়টা দিন সুখী হওয়ার জন্য লোভ লালসার বশবর্তী হয়ে সুদ, ঘুষ, দুর্নীতিতে জড়ালে তা হবে নিজেই নিজেকে ধ্বংসস্তুপে নিক্ষেপের নামান্তর। আমাদের মধ্যে যারা এ সমস্ত কাজে জড়িত তাদের সকলকে এই পাপের ভয়াবহতা সম্পর্কে অবহিত হয়ে সত্য-ন্যায়ের পথে হালাল জীবিকা নির্বাহ করে জীবন-যাপন করার তাওফিক আল্লাহ্তায়ালা দান করুন, আমীন।

%d bloggers like this: