হজরত শাহজালাল রঃ-এর জীবন ও কর্ম

হজরত শাহজালাল রঃ-এর জীবন ও কর্ম


হজরত রাসূলে করিম সাঃ এরশাদ করেছেন, ‘আমি ইয়েমেনের দিক থেকে আল্লাহর সুগন্ধি পাইতেছি। প্রখ্যাত তাবেঈন হজরত ওয়ায়েস আল করনি রঃ ইয়েমেনের অধিবাসী। বাংলার ওলিকুল শিরোমণি মহান সুফি সাধক হজরত মাওলানা শাহজালাল রঃ ৫৯৬/৫৯৮ হিজরি সনে ইয়েমেনে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম মুহাম্মদ তাবরিজি। পিতা ও মুর্শিদের তাবরিজি উপাধী নিজ নামের সাথে ধারণ করে হজরত শাজালাল রঃ শায়খ জালালউদ্দীন তাবরিজি রঃ নামে বিশ্বে জনপ্রিয়। বিখ্যাত পর্যটক ইবনে বতুতা, হজরত কুতুবউদ্দীন বখতিয়ার কাকি রঃ ও হজরত ফরিদউদ্দীন গঞ্জেশকর রঃ-সহ বিভিন্ন মনীষী তাকে শায়খ জালালউদ্দীন তাবরিজি রঃ নামে উল্লেখ করেছেন। সুলতান ইলতুৎমিশের আমলে হজরত শাহজালাল রঃ সর্বপ্রথম পাক-ভারত উপমহাদেশ সফর করেন। এই শক্তিপ্রবর তাপসের আগমনের খবর পেয়ে সুলতান তার সভাসদদের নিয়ে জাঁকজমকভাবে যথাযথ সম্মান প্রর্দশন করে দিল্লিতে নিয়ে এলেন। হজরত শাহজালাল ইয়েমেনি রঃ-এর প্রতি সুলতানের এ রকম সম্মান দেখে শায়খুল ইসলাম নাজমুদ্দিন সুগরা ঈর্ষান্তিত হলেন। সুগরা সুলতান ইলতুৎমিশকে পরামর্শ দিলেন যেন হজরত শাহজালাল রঃ-কে বায়তুল জিনে থাকতে দেয়া হয়। বায়তুল জিন এমন একটি স্থান যেখানে দিনের বেলাতেও কেউ জিনের ভয়ে যাতায়াত করে না। হজরত শাহজালাল রঃ তার সঙ্গী দরবেশ হজরত আবু তোরাবের হাতে চাবি দিয়ে বললেন, তালা খুলে ঘরে প্রবেশ করে উচ্চৈঃস্বরে জিনদের উদ্দেশ্যে বলবে শায়খ জালালউদ্দীন তাবরিজি এখানে এসেছেন। তোমরা অনেক দিন এখানে ছিলে,এখন তিনি এখানে অবস্থান করবেন। সুতরাং তোমরা অন্যত্র চলে যাও। এ কথা বলে তুমি আমার কাপড়খানা ঝুলিয়ে দিও। হজরত শাহজালাল রঃ-এর ইচ্ছা এবং আদেশে জিন সম্প্‌্রদায় অন্যত্র চলে গেল। এরপর সুগরা তৎপর হয়ে চক্রান্ত করতে লাগলেন। কিন্তু যিনি আল্লাহর হয়ে গেছেন এবং আল্লাহ যার হয়ে গেছেন কোনো চক্রান্তই তাকে কিছু করতে পারে না।

প্রখ্যাত পর্যটক ইবনে বতুতা তার সফরনামায় লিখেছেন, সদকওয়ান হয়ে আমি কামরূপ পাহাড়ের দিকে রওনা হলাম। আমার এ দেশে যাওয়ার উদ্দেশ্য ছিল বিখ্যাত আউলিয়া শায়খ জালালউদ্দীন তাবরিজি রঃ-এর সাথে সাক্ষাৎ করা। তিনি চল্লিশ বছর বরাবর রোজা রাখতেন এবং প্রতি দশ দিন পরপর ইফতার করতেন। তার হাতে অধিকাংশ লোক ইসলাম গ্রহণ করে বাইয়াত গ্রহণ করেছেন। যখন আমি হজরত শাহজালাল তাবরিজি রঃ সাক্ষাতে তার হুজরার সামনে গেলাম, সেখানে চারজন লোকের সাথে দেখা হলে তারা বললেন শায়খ সাহেব আমাদের বলেছেন- একজন মরক্কোবাসী পর্যটক আমার এখানে আসছেন তোমরা তাকে নিয়ে আসো। আমি তার সঙ্গীদের সাথে হজরতের খেদমতে হাজির হলাম। তিনি গলায় গলা মিলিয়ে বুকে বুক মিলিয়ে আমার বাড়ি ও সবার কথা জিজ্ঞেস করলেন। হযরত শাহজালাল উদ্দীন তাবরিজি রঃ বললেন, আপনি বিখ্যাত ভ্রমণকারী। শায়খ সাহেব তার সঙ্গীদের বললেন, আরব ও আজমের মুসাফিরকে তোমরা সম্মান করো। আমি তিন দিন সেখানে অবস্থান করলাম। যখন আমি হজরত শাহজালাল রঃ-কে প্রথম দেখি তখন তার পরনে একটি উলের চোঘা ছিল। আমি মনে মনে ভাবলাম যদি তিনি এটা আমাকে দান করেন।

আমার ইচ্ছা তিনি ঐশ্বরিক ক্ষমতা দ্বারা বুঝে ফেললেন। বিদায়ের সময় হজরত শায়খ জালালউদ্দীন তাবরিজি গুহার এক প্রান্তে নিজের শরীর থেকে তা খুলে আমাকে পরিয়ে দিলেন। নিজের মাথার টুপি খুলে আমায় পরালেন। তার সঙ্গীরা বললেন, চোঘা পরিধানে হজরতের ইচ্ছা নেই। আপনার আগমনের খবর পেয়ে তিনি তা পরে ছিলেন। তিনি আমাদের বলেছেন, মরক্কোবাসী এক ভ্রমণকারীকে আমি এই চোঘাটি দেবো। ওই ভ্রমণকারী থেকে তা এক কাফের রাজা কেড়ে নেবে। সেই রাজা আমার ধর্মভাই বুরহান উদ্দীনকে তা দেবে। ইবনে বতুতা বললেন, আমি হজরত জালালউদ্দীন তাবরিজি রঃ এই ভবিষ্যৎ শুনে পণ করলাম কোনো অনুষ্ঠানে এই চোঘা পরে মুসলমান বা কাফের রাজার সামনে যাবো না। দীর্ঘদিন পর আমার চীন দেশে সফর করার সময় হলো। এক উজির আমার সাথে কুশলবিনিময় করার পর বললেন তুমি এটা খুলে দাও। আমাকে তার হুকুম মানতে হলো। এর পরিবর্তে রাজা আমাকে অর্থ ও সাজ-সরঞ্জাম উপহার দিলেন। আমার হৃদয়ে অনেক দুঃখ ভর করল। শায়খ সাহেবের উক্তি স্মরণ হলো। এরপর ঘটনাক্রমে আমি হজরত বুরহান উদ্দীন সাগরজির খানকায় প্রবেশ করে দেখি তিনি কিতাব পড়ছেন সেই চোঘা পরে। আমি আশ্চর্য হয়ে সে চোঘাটি দেখলাম। তিনি বললেন, তুমি কেন এটা দেখছ? তুমি এটা চিন? আমি বললাম, এটা আমার কাছ থেকে রাজা কেড়ে নিয়েছেন। শায়খ বললেন, হজরত জালালউদ্দীন ইয়েমেনি রঃ এটা আমার জন্য রেখেছিলেন। আমাকে পত্র লিখেছেন যে, অমুক লোকের দ্বারা চোঘা তোমার কাছে পৌঁছবে। আমাকে সেই চিঠি দেখালেন। আমি তা পড়ে শায়খ সাহেবের ভবিষ্যৎ জ্ঞানের কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলাম। হজরত বুরহান উদ্দীন সাগরজি বললেন, ‘আমার ভাই শায়খ জালালউদ্দীনের চেয়ে অনেক উচ্চ তাঁর স্থান।

ইসলাম প্রচার ও মানুষকে হেদায়েতের আলো দ্বারা আলোকিত করার মাধ্যমে হজরত শাহজালাল রঃ স্রষ্টাপ্রদত্ত সব প্রকার দায়িত্ব সুচারুরূপে পরিপূর্ণভাবে পালন করার পর ঐশ্বরিক ক্ষমতাসম্পন্ন এ মহাপুরুষের পৃথিবী থেকে বিদায়লগ্নটি ছিল অত্যন্ত মহিমান্বিত ও পবিত্রতম।

জড় জগৎ থেকে প্রস্থানের একদিন আগে তিনি তার ভক্ত মুরিদদের প্রতি উপদেশ প্রদান করলেন তোমরা আল্লাহপাকের প্রতি ঈমান রাখবে এবং আল্লাহকে ভয় করবে। আল্লাহর হুকুমে কাল আমি তোমাদের থেকে বিদায় নেব। পরদিন তিনি জোহরের নামাজের পর সিজদারত অবস্থায় পরম প্রেমময় স্রষ্টার সান্নিধ্যে গমন করেন। হজরত শাহজালাল রঃ-এর হুজরার পাশে অলৌকিকভাবে একটি কবর খোদিত অবস্থায় ছিল এবং সেখানে কাফন, আতর খুশবু ইত্যাদি মজুদ অবস্থায় পাওয়া যায়। প্রতি বছরের ১৯ জিলকদ বাংলার ওলিকুল শ্রেষ্ঠ হজরত মাওলানা শাহজালাল মুজার্রদ ইয়েমেনি রঃ সিলেট শরিফের দরগাহ প্রাঙ্গণে ওরস মোবারক অনুষ্ঠিত হয়। পাক-ভারত উপমহাদেশের হাজার হাজার ভক্ত তার ওরস শরিফে অংশ গ্রহণ করতে দরগাহ প্রাঙ্গণে হাজির হয়। আল্লাহপাক তার এ মহান বন্ধুর অছিলায় আমাদের দেশের ওপর সার্বিক রহমত ও বরকত দান করুন, আমিন।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: