যৌতুক একটি মহাপাপ

যৌতুক একটি মহাপাপ


বাংলাদেশের সমাজব্যবস্থায় চরম অভিশাপের গ্লানিময় দিক হলো যৌতুক প্রথা। কোন সুদূর অতীতে এই নির্লজ্জ প্রথাটির সূচনাহয়েছিল তা সঠিকভাবে নির্ণয় করা না গেলেও এটি যে মানব সভ্যতার ইতিহাসে একটি লজ্জাকর কলঙ্কের অধ্যায়, তাতে কোনোসন্দেহ নেই। এই লজ্জাজনক প্রথার কাছে কত অসহায় মানুষকে আত্মবিসর্জন দিতে হয়েছে তার কোনো সীমা-পরিসীমা নেই। কতঅসহায় নারীকে মুখ বুজে সহ্য করতে হয়েছে লাঞ্ছনা ও গঞ্জনা, তার কোনো হিসাব নেই। মনুষ্যত্বের এই অবমাননা আরমানবসমাজের এই নির্লজ্জ ক্ষোভ ও পঙ্কিলতা বর্তমান সমাজব্যবস্থার উন্নয়নকে করেছে বাধাগ্রস্ত। সমাজ উন্নয়নকে করেছে ব্যাহত।কারণ বর্তমানে সামাজিক রীতি বা রেওয়াজ হিসেবে এর প্রচলন সাধারণ নিয়মে পরিণত হয়েছে।

যৌতুকের সংজ্ঞাঃ যৌতুক বাংলা শব্দ। এটির প্রতিশব্দ হচ্ছে পণ। যৌতুক ও পণ শব্দ দু’টি একই অর্থ বহন করে এবং এ দু’টি শব্দইবাংলা ভাষায় সংস্কৃত থেকে এসেছে। ব্যাপক অর্থে বিয়ের সময় কনের অভিভাবক এবং পরিবার মেয়ের ভবিষ্যৎ জীবনেরসুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের কথা ভেবে পাত্রপক্ষকে যে অর্থ, সম্পদ, অলঙ্কার, আসবাবপত্র, ইলেকট্রনিকস দ্রব্যাদি প্রদান করে থাকে তাকে যৌতুকবলে। মেয়েকে ভালো পাত্রের হাতে তুলে দেয়ার অভিলাষে অর্থাৎ ভালো পাত্রের অভিভাবকদের সন্তুষ্টি বিধানের জন্য বস্তুত কনেপক্ষযৌতুক দিয়ে থাকে।

যৌতুক প্রথা মুসলিম অধুøষিত নারীসমাজের জন্য মারাত্মক বিপর্যয় ডেকে এনেছে। আমাদের সমাজে যৌতুকের কারণে অসংখ্যদরিদ্র পরিবারের মেয়েদের বিয়ে হচ্ছে না। ফলে প্রাপ্তবয়স্ক যুবতী পিতা-মাতার গলগ্রহ হয়ে আছে। এ সুযোগে কিছু লোক নারী ব্যবসাচাঙ্গা করে তুলেছে। যার ফলস্বরূপ শহরে, গ্রামে সর্বত্র দ্রুত বেগে বাড়ছে নারী নির্যাতন, অপহরণ, হত্যা, ধর্ষণ প্রভৃতি। যৌতুক প্রথাযেহেতু ইসলামসিদ্ধ নয়, সেহেতু এর ধর্মীয় কুফল তো রয়েছে, সাথে সামাজিক কুফলও রয়েছে প্রচুর। কুফলগুলোর অন্যতম হলোঃ

ভবিষ্যতে যৌতুকের ভয়ে মানুষ কন্যাসন্তানকে প্রসন্ন মনে (আনন্দের সাথে) গ্রহণ করতে পারবে না এবং তার লালন-পালনেও খুবএকটা যত্নবান হতে পারবে না। কন্যাসন্তানকে বোঝা মনে করা হয়, যার ফলে তাকে সযত্নে লালন-পালন করার প্রতিফলস্বরূপরাসূলুল্লাহ সাঃ যে ফজিলতের ঘোষণা দিয়েছেন, সেই স্থায়ী সৌভাগ্য থেকে সে বঞ্চিত হবে। কন্যাসন্তানের লালন-পালনের ফজিলতসম্পর্কে রাসূলে করিম সাঃ বলেন, ‘যে ব্যক্তির তিনটি কন্যাসন্তান হবে এবং তাদের আদব-কায়দা শিক্ষা দেবে, তাদের প্রতি ভালোব্যবহার করবে তার জন্য জান্নাত অবধারিত হবে।’

সব ধর্মের বিধিবিধান, আচার-অনুষ্ঠান নির্ধারিত হয়েছে মানুষের কল্যাণের জন্য, মানুষের মুক্তির পথ প্রদর্শনের জন্য। ইসলামেরআবির্ভাবের পর থেকে ইসলাম ধর্মের দৃষ্টিকোণে দেখা যায় বিয়ে বা বিয়ে-উত্তর লেনদেনের ব্যাপারে কখনো যৌতুককে প্রশ্রয় দেয়াহয়নি। যৌতুক নারীত্বের অবমাননা। মেয়ের অভিভাবকের দুঃখ-দুর্দশা সামাজিক অবক্ষয় আর অন্তহীন লোভলালসার জন্ম দেয়।যৌতুক বিষয়ে কুরআন-হাদিসের কোনো সমর্থনও নেই, বরং উল্টোটা বলা হয়েছে। ইসলামে নারীদের দিয়েছে মর্যাদা। পিতারসম্পত্তিতে অংশীদারিত্ব। মুসলিম পারিবারিক আইন ইসলামী শরিয়াহ তথা ইসলাম ধর্ম দ্বারা সমর্থিত। পবিত্র কুরআন ও রাসূলুল্লাহসাঃ-এর হাদিসে বর্ণিত রয়েছে প্রতিটি মুসলিম নর-নারীর জীবনযাপনের পূর্ণাঙ্গ বিধান।

ইসলামী শরিয়াহ অনুযায়ী পাত্রের সামর্থø, পাত্রীর সৌন্দর্য, গুণ, বংশমর্যাদা প্রভৃতির ওপর ভিত্তি করে পাত্র কর্তৃক দেনমোহর প্রদানেরকথা বলা হয়েছে। এই দেনমোহর স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি বা নগদ অর্থের মাধ্যমে নির্ধারণ করার কথা বলা হয়েছে। পবিত্র কুরআনে এপ্রসঙ্গে বলা হয়েছে, ‘আর তোমাদের স্ত্রীদেরকে তাদের দেনমোহর দিয়ে দিয়ো খুশি মনে’। সুতরাং ইসলাম ধর্মের দৃষ্টিকোণ থেকেযৌতুক প্রদান ও গ্রহণ সম্পূর্ণরূপে অমানবিক একটি ঘৃণিত কাজ হিসেবে বিবেচিত। ইসলাম ধর্মে আরো বলা হয়েছে, স্ত্রীর সাথেমেলামেশার আগেই তার দেনমোহর পরিশোধ করতে হবে।

যৌতুক নিয়ে কেউ কোনো দিন বড়লোক হতে পারেনি। সে দাম্পত্য জীবনে সুখী হয়নি। কারণ বিয়ে একটি পবিত্র সম্পর্ক, যা একটিবাক্য দিয়ে গড়া তার মধ্যে এই বিদয়াত সম্পৃক্ত হলে বরকত উঠে যায়। কারণ বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায়, যৌতুক না দেয়ার জন্যনয়, আরো বেশি কেন দেয়া হলো না, সে জন্যই দাম্পত্য কলহ লেগে থাকে।

যৌতুকের কারণ হচ্ছে আমরা নারীকে সস্তা পণ্য বানিয়ে ফেলেছি। নারী যদি সমাজে তার মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করতে পারে তাহলে অন্যান্যমুসলিম দেশের মতো আমাদের দেশেও যৌতুক থাকবে না। মূলত এই যৌতুকটা এ দেশে সংক্রমিত হয়েছে সহাবস্থানকারী হিন্দুধর্মথেকে। হিন্দু কন্যাসন্তান বাবার সম্পত্তিতে প্রাপ্য ভাগ পায় না। তাই যা দেয়ার বিয়ের সময় দিয়ে দেয়। ঘটিবাটি, আয়না-চিরুনিকোনো কিছু বাদ যায় না। এ জন্যই অভিধানে উড়ৎিু বলতেই হিন্দু কন্যার সহযোগী-সহযাত্রী সম্পর্কে বোঝায়। কিন্তু ইসলামী সমাজেকন্যাসন্তানও মাতা-পিতার সম্পত্তিতে ন্যায্য হিস্যা পায়। কাজেই এখানে যৌতুক না থাকাই ছিল স্বাভাবিক। যৌতুক নেয়া সুস্পষ্টজুলুম। আল্লাহ অত্যাচারীদের ভালোবাসেন না। এটি একটি সামাজিক অনাচার।

রাসূলে করিম সাঃ বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি সম্মান লাভের জন্য কোনো মহিলাকে বিয়ে করে, আল্লাহ তার অপদস্থতাই বাড়িয়ে দেন। আরযে তাকে সম্পদ লাভের আশায় বিয়ে করে আল্লাহ তার দরিদ্রতাই বৃদ্ধি করেন। আর যে তাকে বংশ গৌরব লাভের আশায় বিয়ে করেতাকে আল্লাহ অসম্মান বাড়িয়ে দেন। আর যে তাকে দৃষ্টি অবনমিত রাখতে অথবা নৈতিক চরিত্র ঠিক রাখতে অথবা আত্মীয়তারসম্পর্ক বজায় রাখতে বিয়ে করে আল্লাহ তাকে সেই স্ত্রীতে বরকত দেবেন আর স্ত্রীর জন্যও তাকে বরকতময় বানিয়ে দেবেন। অর্থাৎসব দিক থেকেই এ বিয়ে বরকতময় হবে।’

ওপরের আলোচনা থেকে এটাই সুস্পষ্ট হয়, ইসলাম ধর্ম যৌতুক প্রথা আদৌ স্বীকার করে না। এ কারণে বিয়ের সময় যৌতুকের শর্তআরোপ করা, বিয়ের পর যৌতুক দাবি করা এবং যৌতুক আদায়ে ব্যর্থ হয়ে স্ত্রীর ওপর নানা ধরনের নির্যাতন চালানো ইসলামেরদৃষ্টিতে অন্যায়। আর্থিক সামর্থø না থাকা সত্ত্বেও যৌতুকের লোভে বিয়ে করা। এমনকি স্ত্রীর ভরণপোষণের দায়িত্ব ইসলাম স্বামীরওপর ন্যস্ত করায় স্ত্রীর পিতামাতা এবং অভিভাবকের কাছ থেকে যৌতুক আদায় করে সংসারের ব্যয় নির্বাহ করা ইসলামী বিধানেরসুস্পষ্ট লঙ্ঘন।

বিয়ের সময় প্রদত্ত অর্থসম্পদ যৌতুক হিসেবে বিবেচনা করতে গেলে দু’টি শর্ত পূরণ করা অবশ্যক। প্রথমত, পাত্রপক্ষের দাবিরপরিপ্রেক্ষিতে অর্থ বা সম্পত্তি এবং দ্বিতীয়ত, বিয়ের অত্যাবশ্যকীয় শর্ত বা প্রতিদান হিসেবে প্রদান। যা হোক সর্বশেষ আমরা এ কথাবলতে পারি যে, দাবি করে যৌতুক নেয়ার প্রথা কুরআন, সুন্নাহ বা ইসলামী পণ্ডিতদের কোনো লেখায় উল্লেখ নেই।

যৌতুকের মতো সামাজিক ব্যাধিটির শিকড় আমাদের সমাজ থেকে মূলোৎপাটন করতে চাইলে আরো জোরদার পদক্ষেপ দরকার। এজন্য জাগ্রত করতে হবে জাতির বিবেককে। এ দায়িত্ব আজ আমাদের কবি-সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী, লেখক, প্রবন্ধকার,ওলামা-মাশায়েখ, প্রচারমাধ্যম, পত্রপত্রিকা, রেডিও, টেলিভিশন, সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তা, কর্মচারী, শিক্ষক, জনতা সবার।সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সম্ভব এ জাতীয় অভিশাপ থেকে জাতিকে মুক্তি দেয়া। কাজেই সংশ্লিষ্ট সবার ঐক্যবদ্ধ ও অব্যাহত প্রয়াসেযৌতুকবিরোধী আন্দোলন সফল হোক, বাংলাদেশের সমাজ থেকে গ্লানিকর যৌতুক প্রথা দূরীভূত হোক; এটিই আমাদের কাম্য।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: