মজলুমের দোয়া কবুল হয়

মজলুমের দোয়া কবুল হয়


জুলুম আরবি শব্দ। এর আভিধানিক অর্থ অত্যাচার, সীমালঙ্ঘন, নিষ্পেষণ বা অবিচার ইত্যাদি। আরবি ভাষায় কোনো বস্তুকে তার প্রকৃত স্থলে প্রয়োগ না করে অন্যত্র প্রয়োগ করা বা যথাযথ প্রাপ্য না দেয়া বা কম দেয়া বোঝাতে জুলুম শব্দটি ব্যবহার করা হয়। ইসলামি শরিয়তের পরিভাষায় সত্যের সীমা লঙ্ঘন করে অন্যায়ের প্রতি ঝুঁকে যাওয়াকে জুলুম বা অত্যাচার বলা হয়।মুফাসসিররা বলেন, ‘জুলুম হলো অন্যের অধিকারে হস্তক্ষেপ করা এবং আল্লাহর আইনের সীমা অতিক্রম করা।কেউ কেউ বলেন, ‘মিথ্যা অভিযোগে কাউকে দোষারোপ করা এবং তার ওপর ভিত্তি করে সাজা প্রদান বড় রকমের জুলুম।পবিত্র কুরআনের অসংখ্য আয়াতে মহান আল্লাহতায়ালা জুলুম থেকে মুমিনদের বিরত থাকার জন্য সতর্ক করে দিয়েছেন। জুলুম থেকে জালিম ও মজলুম শব্দ দুটির উৎপত্তি। ইসলামের দৃষ্টিতে জালিম বা অত্যাচারী সেই ব্যক্তি, যে অন্যকে তার প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত করে। আর মজলুম বা অত্যাচারিত সেই ব্যক্তি, যে জালিমের দ্বারা জুলুম বা অত্যাচারের শিকার হয়ে থাকে। অতএব যে ব্যক্তি অন্যের সম্পদে হস্তক্ষেপ করে সে জালিম। যে শাসক জনগণের প্রাপ্য আদায় করে না সে জালিম। যে বিচারক তার রায়ে সত্যের সীমা অতিক্রম করে সে জালিম। আর যে অংশীদার অন্য অংশীদারের খেয়ানত করে সে জালিম। যে স্বামী তার স্ত্রীর ওপর অন্যায়-অবিচার করে সে জালিম। আর যে স্ত্রী তার স্বামীর হকের প্রতি লক্ষ রাখে না এবং সন্তানদের সৎ আচার-ব্যবহার শিক্ষা দেয় না সে-ও জালিম। মোটকথা, এ রকম প্রতিটি ব্যাপার বা কাজকে জুলুম বলা হয় যা দ্বারা অন্যের প্রাপ্য নষ্ট হয় এবং অন্যের ওপর অবিচার করা হয়।

পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহতায়ালা জালিমের পরিচয় তুলে ধরে ঘোষণা করছেন, ‘যারা আল্লাহর বিধান অনুযায়ী বিচার ফয়সালা করে না তারাই জালিম।’ [মায়িদাঃ ৪৫]। এ আয়াতের ব্যাখ্যায় মুফাসসিররা বলেন, দুনিয়ায় যারা কুরআন ও সুন্নাহ অনুযায়ী শাসনকার্য পরিচালনা করে না এবং বিচারব্যবস্থায় আল্লাহ ও তাঁর সিদ্ধান্তকে চূড়ান্ত মানদণ্ড হিসেবে গ্রহণ করে না তারাই জালিম। [মারিফুল কুরআন]। অন্য আয়াতে আল্লাহতায়ালা এরশাদ করেন, ‘যারা আল্লাহর বিধানের সীমারেখা অতিক্রম করে তারাই জালিম।’ [বাকারাঃ ২২৯]।

ইসলামে সব ধরনের জুলুম বা অত্যাচারকে সম্পূর্ণ রূপে হারাম ঘোষণা করা হয়েছে। ব্যক্তি যেমন নিজের ওপর জুলুম করা থেকে সর্বদা বিরত থাকবে তেমনি অন্যের ওপর জুলুম করা থেকেও সর্বদা বিরত থাকবে। হাদিসে কুদসিতে মহানবী সাঃ আল্লাহর পক্ষ থেকে এরশাদ করেন, ‘হে আমার বান্দারা! আমি আমার নিজের ওপর জুলুমকে হারাম করে দিয়েছি আর তোমাদের জন্যও তা হারাম করেছি। অতএব তোমরা একে অন্যের ওপর জুলুম করো না।’ [মুসলিম]।

জুলুম একটি মারাত্মক ব্যাধি। অতএব সমাজ বা রাষ্ট্রে তা প্রকাশ মাত্র এর মূলোৎপাটন করা অপরিহার্য। না হয় তার বিপদ সমাজ বা রাষ্ট্রের সবাইকে ভোগ করতে হবে। জালিমদের পক্ষ অবলম্বন, তাদের কাজে সন্তুষ্টি জ্ঞাপন এবং তাদেরকে সহযোগিতা করতে নিষেধ করা হয়েছে। জালিম এবং তার কাজে সহযোগিতা প্রদানকারী একই পরিণতি ভোগ করবে মর্মে পবিত্র কুরআনে আল্লাহতায়ালা এরশাদ করেন, ‘যারা জালিম তাদের প্রতি তোমরা ঝুঁকে পড়ো না,তাহলে তোমাদেরও অগ্নি স্পর্শ করবে।’ [হুদঃ ১৩] অন্যত্র আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘জালিমদের জন্য কেউ দরদি হবে না,আর না এমন শাফায়াতকারী হবে না।’ [হজ্জঃ ৭৯]।

কোনো জাতি বা রাষ্ট্রের সর্বত্র যখন জুলুমের বিস্তার ঘটে তখন এর ফলস্বরূপ নিকৃষ্ট সব লোক ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়। ফলে ওই জাতির সাধারণ লোকদের জালিমদের অত্যাচারে ফল ভোগ করতে হয় এবং তাদের মন্দকাজের স্বাদ আস্বাদন করতে হয়। আল্লাহায়ালা পবিত্র কুরআনে এ বিষয়ের প্রতি ইঙ্গিত করে এরশাদ করেন, ‘এ রূপে আমি তাদের কৃতকর্মের জন্য জালিমের এক দলকে অন্য দলের ওপর প্রবল করে থাকি।’ [আনআমঃ ১২৯]।

জালিমরা যে সমাজ বা রাষ্ট্রে নেতৃত্ব দেয় সে সমাজ বা রাষ্ট্রের ওপর থেকে আল্লাহর রহমতের দৃষ্টি উঠে যায়।

উপরন্তু সেই সমাজ বা রাষ্ট্র অভিসম্পাতের উপযুক্ত হয়, ইহকাল ও পরকাল ধ্বংসের সম্মুখীন হয়ে পড়ে। আল্লাহতায়ালা এ মর্মে এরশাদ করেন, ‘ওই সব জনপদ যাদের আমি ধ্বংস করেছিলাম তাদের জুলুমের দরুন এবং তাদের ধ্বংসের জন্য আমি নির্ধারিত করেছিলাম একটি নির্দিষ্ট ক্ষণ।’ [কাহাফঃ ৫৯]।

পবিত্র কুরআনের ঘোষণা অনুযায়ী জালিমদের চূড়ান্ত পরিণতি হলো জাহান্নামের নিকৃষ্টতম আবাসস্থল। যারা অন্যায়ভাবে কোনো মানুষের ওপর জুলুম করে তাদের মহান আল্লাহতায়ালা পরকালে কঠিন আজাবের সম্মুখীন করবেন। এরশাদ হচ্ছে, ‘সে দিন জালিমদের সম্পত্তি কোনো কাজে আসবে না। তাদের জন্য রয়েছে অভিশাপ এবং তাদের জন্য রয়েছে নিকৃষ্ট আবাস।’ [মুমিনঃ ৫২]।

আপাতদৃষ্টিতে জালিমদের জুলুমের প্রোপাগান্ডা দেখে মানব মনে এ প্রশ্ন জাগতে পারে যে, মহান আল্লাহ কি তার বান্দাদের এ দুর্দশা অবলোকন করেন না? বস্তুত আল্লাহতায়ালা জালিমদের সব জুলুম সম্পর্কে সবিশেষ অবহিত আছেন। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলছেন, ‘তুমি কখনো মনে করো না যে জালিমরা যা করে, আল্লাহ সে বিষয়ে অনবহিত। আসলে আল্লাহ তাদেরকে ওই দিনের জন্য অবকাশ দিচ্ছেন, যে দিন তাদের চক্ষু স্থির হয়ে যাবে এবং তারা মাথা উঁচু করে দৌড়াতে থাকবে।’ [ইব্রাহিমঃ ৪২]। এ সম্পর্কিত একটি হাদিস হজরত আবু মুসা রাঃ থেকে বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেন, রাসূল সাঃ বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ জালিমকে অবকাশ দিয়ে থাকেন। কিন্তু যখন তিনি তাকে গ্রেফতার করেন তখন আর ছাড়েন না। অতঃপর তিনি এ আয়াত পাঠ করেন, ‘আর তোমার রব যখন কোনো জালিম জনবসতিকে পাকড়াও করেন, তখন তার পাকড়াও এমনই হয়ে থাকে। তার পাকড়াও বড়ই কঠিন, নির্মম ও পীড়াদায়ক।’ [হুদঃ ১০২], [বুখারি]।

জালিমের জুলুমের পরিণতি সম্পর্কে মহানবী সাঃ আরো বলেন, ‘যে ব্যক্তি এক বিঘত পরিমাণ জমিতে জুলুম করল কেয়ামতের দিন সাত তবক পরিমাণ জমিন তার গলায় লটকে দেয়া হবে।’ [বুখারি ও মুসলিম]।

জালিমদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে মহানবী সাঃ মুসলমানদের নির্দেশ প্রদান করেছেন। হাদিসে এসেছে এক ব্যক্তি মহানবী সাঃ-কে জিজ্ঞেস করল, হে আল্লাহর রাসূল! একজন মুসলিমের পরিচয় কী? রাসূলুল্লাহ সাঃ বললেন, ‘যে নিজে জুলুম করে না এবং অন্যের জুলুমেরও শিকার হয় না।’ [বুখারি]। অন্য হাদিসে এসেছে মহানবী সাঃ বলেন, ‘জালিম ও মজলুম উভয় অবস্থায় তুমি তোমার ভাইকে সাহায্য করো। এক ব্যক্তি বলল, হে আল্লাহর রাসূল! যদি ওই ব্যক্তি মজলুম হয় তবে তো তাকে সাহায্য করা যায়, কিন্তু জালিম হলে সাহায্য করব কিভাবে? তিনি বললেন,তাকে বাধা দাও এবং জুলুম থেকে বিরত রাখো, এটাই তার সাহায্য।’ [বুখারি ও মুসলিম]।

হাদিস শরিফে মজলুম ব্যক্তির দোয়াকে ভয় করতে বলা হয়েছে। হজরত ইবনে আবাস রাঃ বলেন, নবী করিম সাঃ মুয়াজ ইবনে জাবাল রাঃ-কে ইয়েমেনে পাঠানোর কালে বললেন, ‘হে মুয়াজ! মজলুমের বদদোয়াকে ভয় করো, কেননা তার বদদোয়া ও আল্লাহর মাঝে কোনো পার্থক্য নেই।’ [বুখারি]। হজরত আবু হুরায়রা রাঃ বলেন, রাসূল সাঃ এরশাদ করেন, ‘যে ব্যক্তি তার অপর ভাইয়ের ইজ্জত-সম্মান বিনষ্ট করে কিংবা কোনো বিষয়ে জুলুম করে, সে যেন আজই তার কাছে কৃত জুলুমের জন্য ক্ষমা চেয়ে নেয় সে দিন আসার আগে, যে দিন তার কোনো অর্থসম্পদ থাকবে না। সে দিন তার কোনো নেক আমল থাকলে তা থেকে জুলুমের দায় পরিমাণ নেক আমল কেটে নেয়া হবে। আর যদি তার কোনো নেক আমল না থাকে তাহলে তার প্রতিপক্ষের পাপ থেকে সমপরিমাণ পাপ তার ওপর চাপিয়ে দেয়া হবে।’ [বুখারি]।

পবিত্র কুরআন ও হাদিসের উপরিউক্ত ঘোষণার পরিপ্রেক্ষিতে এ কথা অত্যন্ত স্পষ্ট হয়ে যায় যে, জুলুমের পরিণাম দুনিয়া ও আখেরাত কোনো কালেই সুখকর নয়। ব্যক্তিস্বার্থ কিংবা গোষ্ঠীগত কোনো স্বার্থোদ্ধারের জন্য অন্যের ওপর জুলুমের পরিণতি অত্যন্ত ভয়াবহ হবে। আল্লাহতায়ালা আমাদের সবাইকে অন্যের ওপর জুলুম করা থেকে হেফাজত করুন।

সবশেষে একজন বিখ্যাত কবির নিØোক্ত উপদেশ স্মরণের মাধ্যমে শেষ করতে চাইঃ তোমার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও কারো ওপর জুলুম করো না। কেননা জুলুমের শেষ ফল বড়ই লজ্জাজনক। তুমি তো নিদ্রায় বিভোর থাকো, কিন্তু মজলুম ব্যক্তি বিনিদ্র রজনী যাপন করে তোমার জন্য বদদোয়া করতে থাকে। আল্লাহ সদা জাগ্রত।



Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: