ব্যাংক চেক ডিস্অনার ও শাস্তি

ব্যাংক চেক ডিস্অনার ও শাস্তি


যে ক্ষেত্রে কোনো লোক তার দ্বারা পরিচালিত কোনো ব্যাংক একাউন্ট থেকে অন্য কোনো লোককে যেকোনো পরিমাণ অর্থ পরিশোধের জন্য কোনো চেক দেয় এবং ওই একাউন্টে যদি চেক কাটা টাকার পরিমাণের চেয়ে কম টাকা থাকে এবং চেকটি যদি ব্যাংক অপরিশোধিত অবস্থায় ফেরত দেয় তাহলে চেকদাতা একটি অপরাধ সংঘটিত করেছে বলে গণ্য হবে এবং তিনি এক বছর মেয়াদ পর্যন্ত দণ্ডে দণ্ডিত অথবা চেকে বর্ণিত অর্থের তিনগুণ পরিমাণ অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হবে অথবা উভয়দণ্ডে দণ্ডিত হবে। তহবিল অপর্যাপ্ততার কারণে ব্যাংকের চেক প্রত্যাখ্যাত হওয়া একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্ট অ্যাক্টের (এনআই অ্যাক্ট) ১৩৮, ১৪০ ও ১৪১ ধারায় তহবিল অপর্যাপ্ততার কারণে ব্যাংকের চেক প্রত্যাখ্যাত হওয়ার অপরাধের জন্য আইনি প্রতিকারের বিধান রাখা হয়েছে।

নগদ টাকার পরিবর্তে চেকের মাধ্যমে ঋণ অথবা অন্য কোনো দায় পরিশোধকে উত্সাহিত করার লক্ষ্যে এ আইন করা হয়েছে। নগদ লেনদেনে রয়েছে ঝুঁকি। তা সত্ত্বেও আমাদের দেশের নগদ লেনদেনের প্রতি মানুষের ঝোঁক বেশি।চেকের মাধ্যমে লেনদেনে ঝুঁকি কম। তবে চেক প্রত্যাখ্যাত হওয়ার ঝুঁকি আছে। বিদেশে চেক অথবা ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমেই অধিকাংশ দেনা পরিশোধ করা হয়।
বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো চেকের মাধ্যমে লেনদেন এখনও আমাদের দেশে ততটা জনপ্রিয় হয়ে ওঠেনি। তবেক্রমান্বয়ে চেক জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।

ধরা যাক ‘ক’ এর কাছে ‘খ’ দুই লাখ টাকা পাবে। ‘ক’ টাকা পরিশোধের উদ্দেশে ‘খ’কে জনতা ব্যাংকের একটি চেক দিল। চেকে টাকার পরিমাণও ছিল দুই লাখ। ‘খ’ টাকা উত্তোলনের জন্য যথাসময়ে চেকটি জনতা ব্যাংকে জমা দেওয়ার পর জনতা ব্যাংক জানিয়ে দিল ‘ক’ এর ব্যাংক হিসেবে পর্যাপ্ত টাকা নেই। তহবিল অপর্যাপ্ততার কারণে ‘ক’অপরাধ করেছে।
তহবিল অপর্যাপ্ততার কারণে ব্যাংকের চেক প্রত্যাখ্যাত হওয়ার অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ এক বছরের কারাদণ্ড অথবা চেকে উল্লিখিত অর্থের সর্বোচ্চ তিনগুণ পরিমাণ অর্থ অথবা উভয় ধরনের দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে এনআইঅ্যাক্টের ১৩৮ নম্বর ধারায়।

তবে আইনের এ বিধানাবলি কার্যকর করতে কতিপয় শর্ত পূরণ করতে হবে।

চেক প্রাপকের পালনীয় কর্তব্যগুলো

ক. চেকটি প্রস্তুত হওয়ার তারিখ থেকে ছয় মাসের মধ্যে অথবা চেকটি বৈধ থাকাকালীন যেটি আগে হয় সেই সময়সীমার মধ্যে ব্যাংককে উপস্থাপন করতে হবে।

খ. চেকটির প্রাপক অথবা যথানিয়মে ধারক যেই হোন না কেন ব্যাংক কর্তৃক চেকটি ফেরত কিংবা ডিসঅনার হয়েছে, তা অবগত হওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে চেকে বর্ণিত টাকা পরিশোধের দাবি জানিয়ে চেক প্রদানকারীকে লিখিত নোটিশ প্রদান করবেন।

গ. উক্ত নোটিশ প্রাপ্তির ৩০ দিনের মধ্যে চেক প্রদানকারী চেকের প্রাপককে অথবা যথানিয়মে ধারকের বরাবর উল্লেখিত পরিমাণ টাকা পরিশোধে ব্যর্থ হলে মামলার কারণ উদ্ভব হবে।

ঘ. মামলার কারণ উদ্ভব হওয়ার তারিখ থেকে এক মাসের মধ্যে মামলা দায়ের করতে হবে।
চেকটির প্রেরক যদি কোনো কোনো রেজিস্টার্ড কোম্পানি হয় : কোম্পানির ক্ষেত্রেও এ আইন প্রযোজ্য হবে। এনআই অ্যাক্টের ধারা ১৩৮-এ বর্ণিত অপরাধ সংঘটনকারী যদি একটি কোম্পানি হয় এবং ওই কোম্পানি যদি সংঘটিত অপরাধের জন্য দায়ী বলে প্রমাণিত হয়, তাহলে ওই অপরাধ সংঘটনের সময় দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সংঘটিত অপরাধের জন্য দায়ী হবেন এবং আইন অনুযায়ী দণ্ডিত হবেন।

নোটিশ জারির নিয়মাবলী: চেক ইস্যুকারীকে তিনভাবে উপরোক্ত নোটিশ প্রদান করা যায়। প্রথমত, নোটিশ গ্রহীতার হাতে নোটিশ পৌঁছে দেয়া, অথবা প্রাপ্ত স্বীকারপত্রসহ রেজিস্টার্ড ডাকযোগে বাংলাদেশে তার জ্ঞাত ঠিকানায়নোটিশ প্রেরণ করা; অথবা বহুল প্রচারিত কোনো বাংলা জাতীয় দৈনিকে নোটিশ প্রকাশ করে।

যেসব কারণে চেকের অমর্যাদা হতে পারে সেগুলো হচ্ছে

১. চেক মেয়াদোত্তীর্ণ হলে

২. যথাযথভাবে চেক পূরণ করা না হলে

৩. চেকে ড্রয়ারে স্বাক্ষর না হলে

৪. চেক পোস্ট ডেটেড অর্থাত্ পর-তারিখের হলে

৫. চেকে স্বাক্ষরের সঙ্গে ব্যাংকে রক্ষিত গ্রাহকের নমুনা স্বাক্ষরে অমিল হলে

৬. চেকে উল্লিখিত টাকার পরিমাণ অংকে ও কথায় অমিল হলে

৭. হিসাবে পর্যাপ্ত স্থিতি না থাকলে

৮. চেকে ঘষামাজা থাকলে

৯. চেকে কাটাকাটি থাকলে পূর্ণ স্বাক্ষর দিয়ে তা সত্যকরণ না করা হলে

১০. ব্যাংকিং সময়ের পর চেক উপস্থাপন করা হলে

এ ছাড়া আরও অনেক কারণে চেক প্রত্যাখ্যাত (বাউন্স) হতে পারে। যেসব কারণে চেক প্রত্যাখ্যাত হতে পারে তার একটি ছাপানো রশিদ প্রতিটি ব্যাংকে থাকে। যে কারণে চেকটি প্রত্যাখ্যাত হলো তা চিহ্নিত করে ওই স্লিপসহ চেকটি প্রাপকের কাছে ব্যাংক ফেরত পাঠায়। উল্লেখ্য, শুধু তহবিল অপর্যাপ্ততার কারণে চেক প্রত্যাখ্যাত হলে তা এ আইনের আওতায় পড়ে।
আপিল দায়ের: তহবিল অপর্যাপ্ততার কারণে ব্যাংক চেক প্রত্যাখ্যাত হওয়ার অপরাধে আদালত কাউকে কারাদণ্ড প্রদান করলে তার বিরুদ্ধে আপিল করতে হলে প্রত্যাখ্যাত চেকের মূল্যের কমপক্ষে ৫০ শতাংশ অর্থ সংশ্লিষ্ট আদালতে জমা দিতে হবে।

অপরাধের শাস্তি: এক বছর মেয়াদ পর্যন্ত কারাদণ্ডে দণ্ডিত অথবা চেকে বর্ণিত অর্থের তিনগুণ পরিমাণ অর্থ দণ্ড অথবা উভয়দণ্ডে দণ্ডিত হবে।

এনআই অ্যাক্টের এই সংশোধনীর ফলে ব্যাংকগুলো ঋণের জামানত হিসেবে পণ্য বন্ধকীর পরিবর্তে পোস্ট ডেটেড অর্থাত্ পর-তারিখের চেক গ্রহণে উত্সাহী হয়ে উঠেছে। তহবিল অপর্যাপ্ততার কারণে চেকের অমর্যাদা করা হলে ব্যাংক আইনি প্রতিকার চেয়ে আদালতের শরণাপন্ন হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে ব্যাংকের দাবি প্রতিষ্ঠা করা সহজতর হয়েছে।জেল-জরিমানার ভয়ে ঋণগ্রহীতারা অনেক ক্ষেত্রেই ঋণ পরিশোধে এগিয়ে আসছেন।

কাজেই ঋণ অথবা অন্য কোনো দায় পরিশোধের জন্য চেক ইস্যু করার আগে এ ব্যাপারে নিশ্চিত হতে হবে যে,ব্যাংক হিসাবে পর্যাপ্ত স্থিতি রয়েছে।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: