ব্যবসা-বাণিজ্যে নৈতিকতা

ব্যবসা-বাণিজ্যে নৈতিকতা


ইংরেজি শব্দ ethics গ্রিক ethos শব্দ থেকে এসেছে, যা বলতে চরিত্র, ব্যবহার, আচরণ ইত্যাদি অর্থ বুঝায়। নৈতিকতা (ইথিকস) ও সদাচরণ (মরালিটি) পরস্পর কাছাকাছি সম্পর্কযুক্ত। moral শব্দটি এসেছে ল্যাটিন শব্দ morosথেকে।

এর অর্থ নীতি বা সদাচরণের নীতিগুলো। তাই ইথিকস বলতে সার্বিকভাবে নৈতিক দর্শন এবং নৈতিকতার শিক্ষা নির্দেশ করে। ইংরেজি অক্সফোর্ড ডিকশনারিতে ethics বলতে নৈতিক বিধিমালাকে বোঝানো হয়েছে, যা মানুষের আচরণ বা ব্যবহারকে নিয়ন্ত্রণ এবং প্রভাবিত করে। সার্বিকভাবে ইথিকস মানে সমন্বিত মানদণ্ডসম্মত অধিকার, সুষমা,সততার গুণ, আনুগত্য এবং করুণা, যা সামাজিক সুবিধা নিশ্চিত করে। অন্য দিকে, ইথিকস বলতে ওই সব নীতিমালাকেও বোঝায় যা থেকে মানুষকে বিরত থাকতে হয়। যেমন ধর্ষণ, খুন, চুরি, ডাকাতি, অপমান করা, প্রতারণা ও প্রবঞ্চনা ইতাদি। পরিশেষে বলা যায়, ইথিকস হলো ওই সব নৈতিক নীতিমালা যার মাধ্যমে কোনটি ভালো এবং কোনটি খারাপ তা নির্ণয় করা যায়।

ইসলামে নৈতিকতাঃ ইসলাম পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান। মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহতায়ালা প্রদত্ত এ জীবনবিধান মানবতার কল্যাণ ও চলার একমাত্র পথ হিসেবে বিবেচিত। তাই ইসলাম মানব জীবনের সব পর্যায়ে নৈতিকতার বিধানকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছে। নৈতিকতাই মানুষের জীবনের সব দিক ও বিভাগকে নিয়ন্ত্রণ করে।

মহাগ্রন্থ আল কুরআন ও মহানবী সাঃ বর্ণিত হাদিসে নৈতিকতার বিধানগুলো সর্বাঙ্গীণ সুন্দরভাবে বিধৃত আছে। মানুষকে যে ভালো কাজের আদেশ এবং মন্দ কাজে বিরত রাখার জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে সে সম্পর্কে আল কুরআনে যে নির্দেশ এসেছে তা এ রকম, ‘তোমরাই শ্রেষ্ঠ উম্মত, মানবজাতির জন্য তোমাদের আবির্ভাব হয়েছে, তোমরা সৎকাজের নির্দেশ দান করো, অসৎ কাজে নিষেধ করো এবং আল্লাহর ওপর বিশ্বাস স্থাপন করো।’ (সূরা আল ইমরান,আয়াতঃ ১১০)।

মানবতার সামনে নীতি ও নৈতিকতার উন্নত আদর্শ হিসেবে আল্লাহপাক শেষ নবী হজরত মুহাম্মদ সাঃকে দুনিয়ায় পাঠিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে আল্লাহপাক বলেন, ‘তাদের জন্য তো রাসূলুল্লাহর মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ।’ (সূরা আহজাব,আয়াতঃ ২১)।

উন্নত নৈতিকতা ও উত্তম আদর্শের প্রতীক হিসেবে আল্লাহর নবী যে আগমন করেছেন তা তিনি নিজেই বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, ‘নিশ্চয়ই আমাকে উন্নত নৈতিকতার মর্যাদা সহকারে প্রেরণ করা হয়েছে।মহানবী সাঃ নৈতিকতার মহিমা তুলে ধরতে গিয়ে তিরমিজি শরিফে বর্ণিত এক হাদিসে বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে আমার নিকট অধিক প্রিয় এবং কিয়ামতের দিন মর্যাদার দিক থেকে অধিক নিকটবর্তী সেই-ই, যে তোমাদের মধ্যে আখলাক ও নৈতিক চরিত্রের দিক দিয়ে উত্তম।

ইসলামে ব্যবসার গুরুত্বঃ মহানবী হজরত মুহাম্মদ সাঃ একজন উত্তম ও আদর্শবান মানুষ। তিনি একাধারে একজন শিক্ষক, ধর্ম প্রচারক, পথ প্রদর্শক, আদর্শ রাষ্ট্রনায়ক, আইন প্রণেতা, ন্যায়বান বিচারক, দক্ষ কূটনীতিক ও সমরনায়ক,আদর্শ স্বামী, প্রিয়তম পিতা, দরদি প্রতিবেশী, মানুষের ঘনিষ্ঠ বন্ধু এবং সফল ব্যবসায়ী। তিনি ৪০ বছর বয়সে নবুয়ত লাভ করেন।

নবুয়ত লাভের আগে তিনি ছিলেন একজন সফল ব্যবসায়ী। মুহাম্মদ সাঃ ব্যবসার কাজে বিভিন্ন সময় সিরিয়া, ইরাক,ইয়েমেন, বাহরাইন ও ইথিওপিয়াসহ আরবের বিস্তৃত অঞ্চল ঘুরে বেড়িয়েছেন। কখনো আরবের ব্যবসায়ী কাফেলার সাথী হয়ে, আবার কখনো বা চাচা আবু তালিবের সাথে দেশ থেকে দেশান্তরে ছুটেছেন আল্লাহর নবী। অতি অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি বিশ্বস্ত ব্যবসায়ী হিসেবে আরবে পরিচিতি লাভ করেন। তাঁর সততা, কর্মনিষ্ঠা ও সফলতার কথা মক্কার অলিগলিতে ছড়িয়ে পড়ে। তখন মক্কায় খাদিজা রাঃ ধনশালী ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তিনি তার বিশাল ব্যবসার তদারকি করার জন্য একজন সৎ ও যোগ্য লোকের সন্ধান করছিলেন। তখন মুহাম্মদ সাঃ-এর সুনামের কথা তার কানে গেল। তাঁর ওপর খাদিজার ব্যবসার গুরু দায়িত্ব অর্পিত হলে মুহাম্মদ সাঃ সততা ও নিষ্ঠার সাথে তা পরিচালনা করলেন এবং এতে খাদিজার ব্যবসায় অভাবনীয় সফলতা এলো। মহানবী সাঃ ব্যবসায় সততার যে উত্তম আদর্শ স্থাপন করলেন, তা আগামী দিনের মানুষের পথনির্দেশিকা হয়ে থাকল। ব্যবসা-বাণিজ্যের মাধ্যমে আয়রোজগারকে মহানবী সাঃ মহিমান্বিত করে গেছেন। তিনি শুধু নিজেই ব্যবসায় সফল ছিলেন না, ইসলামে ব্যবসার যে কী গুরুত্ব তাও তিনি মানবতার সামনে তুলে ধরেছেন। ব্যবসার মাধ্যমে হালাল জীবিকা অর্জনকে তিনি উৎসাহিত করেছেন।

ব্যবসার মাধ্যমে অর্জিত আয়কে উৎকৃষ্ট হিসেবে ঘোষণা করে তিনি বললেন, ‘ব্যবসায়ীদের উপার্জন সর্বাপেক্ষা হালাল। ব্যবসার ক্ষেত্রে যদি সে শরিয়তের বিধান অনুসরণ করে।এ প্রসঙ্গে তিনি আরো বলেন, ‘তোমরা বাণিজ্য করো। কেননা, তোমাদের জীবিকা ১০ ভাগে বিভক্ত এবং উহার ৯ ভাগই রয়েছে বাণিজ্যের মধ্যে।আল্লাহর নবী হজরত মুহাম্মদ সাঃ ব্যবসাকে উৎকৃষ্ট ঘোষণা করেই ক্ষান্ত হননি, তিনি ব্যবসায়ীদের মর্যাদাকে সমুন্নত করতে গিয়ে বলেন, ‘কিয়ামতের দিন সৎ ব্যবসায়ীরা সিদ্দিক ও শহীদদের সাথে উঠবেন।

ইসলামে ব্যবসায় নৈতিকতাঃ ইসলামে ব্যবসায় ও নৈতিকতা পারস্পরিক সম্পর্কযুক্ত। একজন মুসলমান হিসেবে নৈতিকতা কেবল আমাদের ব্যবসায়ী জীবনেই পরিব্যপ্ত নয়, আমাদের গোটা জীবনের সর্বক্ষেত্রেই এর নিগূঢ় কার্যকারিতা রয়েছে। ব্যবসায় নৈতিকতা বলতে আমরা যে বিষয়টি বুঝি তা হলো, ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনার ভালো ও কল্যাণকর নীতি, যা মানুষের অভীষ্ট অধিকারকে নিশ্চিত করবে এবং অকল্যাণকর যাবতীয় বিষয় থেকে মানুষের স্বার্থ রক্ষা করবে। ইসলাম ব্যবসা-বাণিজ্যের বেলায় কতগুলো শুভ নৈতিক বিষয়কে প্রতিষ্ঠিত করতে এবং অশুভ ও অনৈতিক কাজকে পরিহার করতে উৎসাহ দিয়েছে এবং এর মধ্যে দুনিয়া ও আখেরাতের কল্যাণ ও মুক্তি নিহিত বলে উল্লেখ করেছে।

ব্যবসায় স্বচ্ছতা ও হারাম পরিহারঃ মানবতার মহান নেতা আল্লাহর নবী মুহাম্মদ সাঃ সুস্পষ্টভাবে বলেছেন,ব্যবসায়ীকে অবশ্যই সৎ এবং নীতিবান হতে হবে। একজন ভালো ব্যবসায়ী তার কাজে হবেন সৎ, ন্যায়বান ও ওয়াদা পালনকারী। তিনি প্রতারণা, প্রবঞ্চনার ঊর্ধ্বে উঠে সৎভাবে আয়রোজগার করবেন এবং ব্যবসায় পরিচালনায় সব অসৎ ও অন্যায় কাজ থেকে মুক্ত থাকবেন। কেননা ইসলাম ন্যায়-অন্যায়ের ব্যবধান নির্দেশ করে দিয়েছে এবং অন্যায়ভাবে অর্থ উপার্জনকে নিষিদ্ধ করেছে। আল কুরআনে সূরা বাকারার ১৮৮ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘তোমরা নিজেদের মধ্যে একে অন্যের অর্থসম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না এবং মানুষের ধনসম্পত্তির কিয়দংশ জেনেশুনে অন্যায়ভাবে গ্রাস করার উদ্দেশ্যে উহা বিচারকগণের কাছে পেশ করো না।একই বিষয়ে সূরা নিসার ২৯ নম্বর আয়াতে আল্লাহপাক বলেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা একে অপরের সম্পত্তি অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না। কিন্তু তোমাদের পরস্পরে রাজি হয়ে ব্যবসায় করা বৈধ।মহানবী হজরত মুহাম্মদ সাঃ পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে ব্যবসা করাকে বৈধ বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি তিরমিজি শরিফে বর্ণিত ২১৭৬ নম্বর হাদিসে বলেন, ‘পরস্পরের সম্মতির ভিত্তিতে যে বিক্রি হবে তা বৈধ।

ব্যবসায়ে সততাঃ সততার আদর্শ মুসলিম জীবনের অপরিহার্য অঙ্গ। ইসলামে ব্যবসাকে হালাল করার সাথে সাথে এ ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সততার নীতি অবলম্বন করার তাগিদ দেয়া হয়েছে। ব্যবসায়ীকে অবশ্যই সৎ হতে হবে এবং যাবতীয় মিথ্যা কথা ও কাজ পরিহার করতে হবে। তাই আল্লাহপাক সূরা তাওবার ১১৯ নম্বর আয়াতে বলেছেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমারা আল্লাহকে ভয় করো এবং সত্যবাদীদের সাথী হয়ে যাও।’ একইভাবে ব্যবসায় মিথ্যাকে ত্যাগ করার জন্য আল্লাহ তাগিদ দিয়েছেন। সূরা হাজের ৩০ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেন, ‘মিথ্যা কথাবার্তা পরিহার করো।’ অসততার নীতিতে ব্যবসা করা এবং মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে বেচাকেনা করাকে নিষিদ্ধ করেছেন মহানবী সাঃ। তিনি বলেন, ‘কোনো লেনেদেনে যারা মিথ্যা বলবে এবং কিছু লুকাবে, তাদের লেনদেনের বরকত নিঃশেষ হয়ে যাবে।’

ব্যবসায় বিশ্বস্ততার নীতিঃ বিশ্বস্ততা লেনদেনের নৈতিক নীতিমালার অন্যতম উপাদান। বিশ্বস্ততা রক্ষা করে চলা এবং বিশেষ করে ব্যবসার বেলায় বিশ্বস্ত হওয়া ব্যবসায়ীর জন্য অপরিহার্য। আল কুরআন এবং রাসূল সাঃ-এর হাদিসের অনেক স্থানে ব্যবসায় বিশ্বস্ততা রক্ষার তাগিদ দেয়া হয়েছে। সূরা আনফালের ২৭ নম্বর আয়াতে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘হে মুমিনগণ! জেনেশুনে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সাথে বিশ্বাস ভঙ্গ করবে না এবং তোমাদের পরস্পরের আমানত সম্পর্কেও বিশ্বাস ভঙ্গ করবে না।সূরা মায়িদার ১ নম্বর আয়াতে আল্লাহপাক আরো ঘোষণা করেছেন, ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা তোমাদের কৃত চুক্তি বা অঙ্গীকার পূরণ করো।বিশ্বস্ততা ভঙ্গকে মুনাফিকের চরিত্র উল্লেখ করে মহানবী সাঃ বলেন, যার মধ্যে নিচের চারটি লক্ষণ পাওয়া যাবে সে মুনাফিক। সে আমানতের খিয়ানত করে, কথায় কথায় মিথ্যা বলে, ওয়াদা বা চুক্তি ভঙ্গ করে এবং ঝগড়ায় অশ্লীল বাক্য ব্যবহার করে। (বুখারি ও মুসলিম)।

ব্যবসায় প্রতিশ্রুতি রক্ষা করাঃ ইসলামে অঙ্গীকার রক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম। অঙ্গীকার রক্ষা একজন সৎ ব্যবসায়ীর অন্যতম কর্তব্য। একজন ভালো ব্যবসায়ী কখনোই তার প্রতিশ্রুতি থেকে ফিরে আসবে না। অঙ্গীকার রক্ষার ব্যাপারে কুরআন ও হাদিসে যথেষ্ট তাগিদ দেয়া হয়েছে। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন সূরা মায়িদার ১ নম্বর আয়াতে অঙ্গীকার পূরণের বিষয়ে বলেছেন, ‘ হে মুমিনগণ! তোমরা অঙ্গীকার পূর্ণ করবে।সূরা বনি ইসরাইলের ৩৪ নম্বর আয়াতে একই বিষয়ে আল্লাহ বলেছেন, ‘তোমরা অঙ্গীকার পূর্ণ করবে। নিশ্চয়ই অঙ্গীকার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে।এ প্রসঙ্গে মহানবী হজরত মুহাম্মদ সাঃ বলেছেন, ‘যে প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করে না, দ্বীন ইসলামে তার কোনো অংশ নেই।’ (বুখারি ও মুসলিম)।

শ্রমিকের সাথে ভালো ব্যবহারঃ শ্রমিক আমাদের ব্যবসা-বাণিজ্যের অন্যতম অংশীদার। তারা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে আমাদের ব্যবসা-বাণিজ্যের চাকাকে সচল রাখে। কিন্তু ব্যবসায়ীরা প্রায়ই শ্রমিকের সাথে ভালো ব্যবহার করেন না এবং তাদের প্রাপ্য অধিকার রক্ষা করার ব্যাপারে সচেতন থাকেন না। বরং প্রায়ই শ্রমিকরা মালিকের পক্ষ থেকে বৈষম্যের শিকার হন। কিন্তু আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূল সাঃ শ্রমিকের সাথে এ ধরনের আচরণকে কঠোর ভাষায় নিষিদ্ধ করেছেন এবং শ্রমিকের অধিকার ও মর্যাদার বিষয়ে সচেতন থাকতে নির্দেশ দিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে মহানবী সাঃ বলেন, ‘তারা তোমাদের ভাই। আল্লাহতায়ালা তাদেরকে তোমাদের অধীনস্থ করে দিয়েছেন। তোমরা যা খাবে তা থেকে তাদেরকে খাওয়াবে এবং যা পরিধান করবে তা তাকে পরিধান করতে দেবে।তিনি আরো বলেন, ‘মহান আল্লাহপাক পরিশ্রম করে উপার্জনকারী (শ্রমিককে) মুমিনকে ভালোবাসেন।অন্য এক হাদিসে মহানবী সাঃ বলেন, ‘শ্রমিকের মজুরি তার গায়ের ঘাম শুকানোর আগেই পরিশোধ করবে।

হারাম ব্যবসায় নিষিদ্ধঃ এমন অনেক বস্তু আছে, যার ব্যবসা করাকে ইসলাম বৈধ মনে করে না। যেমন মৃত প্রাণীর ব্যবসা, শূকর বেচাকেনা, নেশাজাতীয় বস্তু, মূর্তি ইত্যাদি। একজন মুসলিম ব্যবসায়ী অবৈধ জিনিসের ব্যবসায় জড়িত হতে পারবে না। এ প্রসঙ্গে আল্লাহপাক পবিত্র কুরআনের সূরা মায়িদার ৯০ নম্বর আয়াতে বলেন, ‘হে মুমিনগণ! মদ,জুয়া, মূর্তিপূজার বেদি ও ভাগ্য নির্ণায়ক শর, ঘৃণ্য বস্তু শয়তানের কাজ। সুতরাং তোমরা তা বর্জন করো, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পারো।রাসূল সাঃ এক হাদিসে উল্লেখ করেন, ‘আল্লাহ ও তাঁর রাসূল অ্যালকোহল, মৃত প্রাণীর গোশত, মূর্তি ও শূকরের বেচাকেনা অবৈধ করেছেন।

মজুদদারি করাঃ খাদ্যদ্রব্য মজুদ করা অথবা তা বাজার থেকে তুলে নিয়ে দাম বাড়ানো এবং অধিক মুনাফার প্রত্যাশা করাকে ইসলাম অবৈধ করেছে। এর ফলে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পায় এবং অনেক মানুষ দুর্গতির মধ্যে পতিত হয়। এ ধরনেরকাজ মানুষের কষ্টকে বাড়িয়ে দেয়। তাই ইসলাম এ প্রচার কাজকে হারাম ঘোষণা করেছে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহর রাসূল মুহাম্মদ সাঃ বলেন, ‘যে ব্যক্তি ৪০ দিন খাদ্যশস্য মজুদ রাখে, আল্লাহপাক তার প্রতি অসন্তুষ্ট এবং সে আল্লাহতায়ালার ওপর অসন্তুষ্ট।রাসূল সাঃ অন্য এক হাদিসে আরো বলেন, ‘যে ব্যক্তি ৪০ দিন খাদ্যশস্য মজুদ রাখে, তার হৃদয় আলোহীন হয়ে যায়।

প্রতারণা ও প্রবঞ্চনাঃ এমন অনেক ব্যবসায়ী আছে, যারা বেশি মুনাফার আশায় অথবা তার খারাপ মাল বিক্রির জন্য ক্রেতার সাথে প্রতারণার আশ্রয় নেয়। ইসলাম প্রতারণা করে কোনো কিছু বিক্রি করাকে অবৈধ করেছে। আল্লাহর নবী হজরত মুহাম্মদ সাঃ বলেন, ‘যখন কোনো বেচাকেনা হবে, তখন প্রতারণা করো না।রাসূল সাঃ অন্যত্র বলেন, যে প্রতারণা করে সে আমাদের দলভুক্ত নয়। প্রতারণা ও কপটতা মানুষকে জাহান্নামে ধাবিত করে।রাসূলে করিম সাঃ আরো বলেন, ‘একজনের দামের ওপর দাম বলো না।’ (বুখারি ও মুসলিম)।

ওজন ও মাপে কম দেয়াঃ ব্যবসার লেনদেনে ওজনে ও মাপে কম দেয়া সম্পূর্ণভাবে অবৈধ। কোনো ভালো ব্যবসায়ী কখনো এ কাজ করতে পারে না। এ প্রসঙ্গে আল্লাহপাক সূরা বনি ইসরাইলের ৩৫ নম্বর আয়াতে বলেন, ‘যারা মেপে দেয়ার সময় পূর্ণ মাপে দেবে এবং ওজন করবে সঠিক দাঁড়িপাল্লায়, ইহাই উত্তম এবং পরিণামে উৎকৃষ্ট।

বেচাকেনায় অতিরিক্ত শপথ করাঃ অসৎ ব্যবসায়ী তার খারাপ দ্রব্য বা পণ্যকে ভালো বোঝানোর জন্য শপথ কাটা অথবা পণ্য বেশি পরিমাণ বিক্রির জন্য ক্রেতার কাছে তার জিনিসের অতিরিক্ত মূল্য বা উৎকৃষ্ট হওয়ার গুণগান করা ইসলাম অপছন্দ করেছে। এ বিষয়ে রাসূল সাঃ বলেন, ‘ তোমরা বেচাকেনার সময় অতিরিক্ত শপথ বা হলফ করা থেকে বিরত হও।তিনি আরো বলেন, ‘অধিক শপথে হয়তো বেশি পণ্য বিক্রি হতে পারে, কিন্তু তা উপার্জনের বরকত নষ্ট করে দেয়।

শেষ কথাঃ বর্তমান যুগ বিশ্বায়নের যুগ। উন্নত প্রযুক্তির কারণে গোটা বিশ্ব এখন একটি গ্রাম বা অঞ্চলে পরিণত হয়েছে। ব্যবসা-বাণিজ্যে বেড়েছে প্রতিযোগিতা। তার সাথে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে অনৈতিক কর্মকাণ্ডও। ব্যবসায় সততা,স্বচ্ছতা এবং নৈতিকতার এখন বড় অভাব। একজন ভালো মানুষ বা নীতিবান ব্যবসায়ীর জন্য ব্যবসায় নৈতিকতার মানদণ্ড সমুন্নত রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। তার পরও মানুষ চায় স্বচ্ছতা এবং সৎভাবে বেঁচে থাকার আশ্রয়। একমাত্র ইসলামই নীতি আদর্শের এ পথ দেখাতে পারে। আমরা যদি ওপরে উল্লিখিত বিষয়গুলো মেনে চলতে পারি তা হলেই কেবল আখেরাতে সফলতা লাভ করা সম্ভব। এ জন্য ব্যবসায়ের নীতিগুলো ভালোভাবে বুঝতে হবে এবং তা মেনে চলার প্রয়াস চালাতে হবে।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: