পাশ্চাত্যের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভিত্তি মাদ্রাসা

পাশ্চাত্যের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভিত্তি মাদ্রাসা

পাশ্চাত্যের খ্রিস্টান-ইহুদিরা যখন মাদ্রাসা নিয়ে সমালোচনা করে তখন কিছুটা বোধগম্য, কিন্তু তথাকথিত মুসলমানরা যখন করে তখন দুঃখ হয়। তবে এরা ইসলাম ও মুসলিম সভ্যতার সবকিছু নিয়েই নাক সিটকায়। শরিয়াহ্, কোরআন, হাদিস, ফিকহ, বোরকা, হিজাব, পর্দা, ফতোয়া, মোল্লা (তবে প িত, আচার্য, পুরোহিত, পাদ্রী, ভিক্ষুতে নাক সিটকায় না), পীর, তরিকা, তাছাউফ, খানকা, মাদ্রাসা, তবলিগ, দাওয়া, হজ-হাজী, টুপি-পাগড়ি, তসবিহ, আজান, মিনার, জিহাদ (তবে ক্রুসেড চলবে), যাকাত, ফিতরা, কাফফারা, কোরবানি, ওয়াকফ, হেরেম, আরব, হারাম-হালাল, গুনাহ-সওয়াব ইত্যাদি ইসলামী পরিভাষা উচ্চারিত হলে কোনো কোনো আধুনিক মুসলমানকে নাক সিটকাতে দেখা যায়। যারা এসব উচ্চারণ করে বা পালন করে, তারা যেন মানুষই নয়। এ কোন মানসিকতা? সেক্যুলার বা সমাজতন্ত্রী হলেই কি মুসলমান হয়েও মুসলমানী সংস্কৃতি ও তত্সংশ্লিষ্ট পরিভাষাকে ঘৃণা করতে হবে?

আসলে মুসলমানদের ভেতরের সেক্যুলাররা ‘মোর ক্যাথলিক দ্যান দি পোপ’। এই মনোভাবের জন্য সেক্যুলার মুসলমানরা পশ্চিমের প্ররোচনায় মাদ্রাসার মতো প্রতিষ্ঠানকে ব্যঙ্গ করছেন। অথচ তাদের ভেবে দেখা উচিত, সাদ্দাম হোসেনের মতো সেক্যুলারকে পাশ্চাত্য এত পায়রবি করা সত্ত্বেও ধ্বংস করেছে। মুসলমান নিজের ধর্ম ও সংস্কৃতিকে ব্যঙ্গ করে পাশ্চাত্যের কাছে সাময়িকভাবে প্রিয় হলেও পরিণতি সাদ্দাম হোসেনের মতো হওয়া অবশ্যম্ভাবী।

কথা হলো, মাদ্রাসা নিয়ে ব্যঙ্গ করা হচ্ছে পাশ্চাত্য ও তাদের এদেশি মিত্র সেক্যুলারদের দ্বারা। অথচ আমরা বহু ঐতিহাসিক বইয়ে পড়েছি, মাদ্রাসাকে কপি করে পাশ্চাত্যে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গড়ে ওঠে। মাদ্রাসা এসেছে আগে, আর পশ্চিমা কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলো পরে।

অস্ট্রেলিয়া সফরে সেখানকার বইয়ের দোকান ও পাঠাগারগুলোতে বই নিয়ে প্রচুর ঘাঁটাঘাঁটি করেছি। একটা চমত্কার বই হাতে এলো, ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের সোশ্যাল এনথ্রপলজির এমেরিটাস প্রফেসর জ্যাক গুডির লেখা ‘দি থেফ্ট্ অব হিসটোরি’। ২০০৬ সালে ক্যামব্রিজ ইউনিভার্সিটি প্রেস কর্তৃক প্রকাশিত। প্রায় সাড়ে তিনশ’ পৃষ্ঠার এই চমত্কার বইটিতে প্রফেসর জ্যাক গুডি বিস্তারিতভাবে প্রমাণ করেছেন, মদ্রাসার কারিকুলাম ও ব্যবস্থাপনার ওপর ভিত্তি করেই ইউরোপের কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে উঠেছে। আর যারা বলতে চান যে প্রাচ্যের কোনো অবদান নেই ইউরোপের কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় সৃষ্টিতে, তারা ইতিহাস ‘চুরি’ করেছেন। বইটির একটি চমত্কার পরিচ্ছেদ হলো ‘দি থেফ্ট্ অব ইনস্টিটিউশনস, টাউনস অ্যান্ড ইউনিভার্সিটিজ’।
প্রফেসর জ্যাক গুডি লিখেন, ‘ইউরোপে রেনেসাঁর আগে বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে ওঠে মাদ্রাসার মতো উচ্চ শিক্ষার প্রতিষ্ঠানগুলো এবং তাদের কারিকুলামের আদলে। যদিও সেসব প্রতিষ্ঠানে ধর্ম প্রাধান্য বিস্তার করত, অন্য বহু বিষয়ও তাতে অন্তর্ভুক্ত থাকত।’ (পৃ. ১২৯)। রেনেসাঁ সম্পর্কে ইলাসট্রেটেড অক্সফোর্ড ডিকশনারি বর্ণনা করেছে—‘(ইউরোপে) চৌদ্দ থেকে ষোল শতকে কলা ও সাহিত্যের পুনর্জন্ম’ (পৃ. ৬৯৫) আমলে রেনেসাঁর আগেই পশ্চিম ইউরোপে মাদ্রাসার অনুকরণে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে উঠেছে। প্রেরণা এসেছে মুসলিম স্পেন-পর্তুগাল-সিসিলি থেকে, মধ্যপ্রাচ্য থেকে ক্রুসেডারদের মাধ্যমে। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় গড়ার পর পশ্চিম ইউরোপে রেনেসাঁ এসেছে।

প্রফেসর জ্যাক গুডি বলেন, এই যে বিশ্ববিদ্যালয়ের সূচনা হলো, এর সঙ্গে হয়েছিল ১১০০-১২০০ সালে লেখাপড়ার পুনঃপ্রবর্তন, যা এসেছিল মুসলিম সিসিলি ও আরব স্পেন থেকে। তিনি বলেন, দশম ও একাদশ শতকে সমগ্র মুসলিম বিশ্বে মাদ্রাসাগুলো প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। আর তখন মুসলিম ও খ্রিস্টান পাশ্চাত্যের ভেতর শিক্ষার তাত্পর্যপূর্ণ সাদৃশ্য ছিল। গুডি বলেন, বরঞ্চ কোনো কোনো বিদ্যান (যেমন মাদ্রিদের জে রিবেরা) বলেন, মধ্যযুগের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আরব শিক্ষা ব্যবস্থার কাছে বহুলভাবে ঋণী। গুডি বলেন, ইসলামী ওয়াকফের ওপর ভিত্তি করে কলেজ শিক্ষা ইসলামের নিজস্ব অবদান। জেরুজালেম থেকে ফেরত এক তীর্থযাত্রী পশ্চিম ইউরোপে প্যারিসে প্রথম একটা কলেজ তৈরি করেন ১১৩৮ সালে। এটা সম্ভবত মাদ্রাসার কপি, বলেন প্রফেসর গুডি। অক্সফোর্ডে বেলিওল কলেজও তেমনি, বলেন গুডি। গুডি বলেন, জিমাকদিসি তার ‘দি রাইস অব কলেজেস : ইলাসট্রেশনস অব্ লারনিং ইন ইসলাম অ্যান্ড ওয়েস্ট’ (১৯৮১) বইয়ে স্বীকার করেছেন, মাদ্রাসার পরবর্তী সময়ে প্রতিষ্ঠিত পাশ্চাত্যের কলেজগুলোতে ইসলামী শিক্ষার সাদৃশ্য ও প্রচুর প্রভাব বিদ্যমান ছিল। (পৃ. ২২৮)। প্রফেসর গুডি বলেন, সে সময় ইউরোপীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও মাদ্রাসার শিক্ষা পদ্ধতি ও কারিকুলাম একই ধরনের ছিল (পৃ. ২২৯)।

প্রফেসর গুডি বলেন, ইসলামের প্রথম শিক্ষা ব্যবস্থার শুরু মসজিদ থেকে অস্টম শতকে। দশম শতকে বাগদাদে ছাত্রাবাসসহ মসজিদ মাদ্রাসা ছিল। এরপর এলো নিজামিয়া মাদ্রাসা যা ১০৬৭ সালে প্রতিষ্ঠিত বলা হলেও, এটা পূর্বতন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের স্থানেই পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয় (পৃ. ২২৯)।

কুলহাম কলেজের প্রিন্সিপাল আলফ্রেড গুইলস লিখেছেন বাগদাদের নিজামিয়া বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে, যার প্রতিষ্ঠা ৪৫৭ হিজরিতে। এরপর নিশাপুর, দামাস্কাস, জেরুজালেম, কায়রো, আলেকজান্দ্রিয়া ও অন্যান্য স্থানে বহু বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে ওঠে। খ্রিস্টান স্পেনে রাজা আলফনসো দি ওয়াইজ (১২৫২-৮১) মুসলমান বিদ্বান আবু বকর আল-রিকুটিকে দায়িত্ব প্রদান করেন তার রাজ্যে একটি আরব বিশ্ববিদ্যালয় তৈরিতে। গুইলস লিখেন, ১২৩৪ সালে বাগদাদে মুসতানসিরিয়া প্রতিষ্ঠিত হয়। এসব তথ্য গুইলস মি. জি লে স্ট্রেনজের ‘বাগদাদ ডিউরি; দি আব্বাসিড ক্যালিফেট’ (অক্সফোর্ড, ১৯০০) নামক বই থেকে উদ্ধৃত করে বিস্ময়ে মন্তব্য করেন, ‘এ সবই ছিল তের শতকের প্রথম দিকে।’ (‘দি লিগেসি অব্ ইসলাম’, পৃ. ২৪১-২৪৩)।

গুইলস জোর দিয়ে বলেন, খ্রিস্টান বিশ্ববিদ্যালয়গুলো প্রাচ্যের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কাছে স্পষ্টত ছিল নবীনতর, আর মধ্যযুগের বিদ্বানদের সাক্ষ্য থেকে সুনিশ্চিতভাবে এই থিসিস প্রমাণিত যে, ইসলামী শিক্ষা খ্রিস্টান বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে অনেক উপাদান প্রদান করত পড়াশোনা করার জন্য। গুইলস লিখেন, মুসলমানরা দশম ও একাদশ শতকে যেসব বিষয় পড়াশোনা করত আর খ্রিস্টান ছাত্ররা পরবর্তী সময়ে একাদশ ও দ্বাদশ শতকে যা পড়াশোনা করত তাতে ছিল খুবই মিল প্রাচ্যের ও পাশ্চাত্যের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে।
পিস টিভিতে (যা ইসলামিক টিভিতেও বাংলা ভাষায় তরজমা করে প্রচারিত হয়) মার্কিন পাদ্রী থেকে মুসলমান প্রচারক ইউসুফ এসটেস বলছিলেন, ‘এলামনাই অ্যাসোসিয়েশন’-এর ‘এলামনাই’ শব্দ এসেছে ‘আলেম’ শব্দ থেকে। আসলে পাশ্চাত্যের প্রথম যুগের বিদ্বানরা ‘আলেম’ হতে চেয়েছিলেন। আর তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘কনভোকেশনে’ আরব শেখদের মতো জুব্বা পরত, শেখদের মতো ‘আলেম’ হিসেবে পরিচিতি পেতে।
স্পেনের গ্রানাডা শহরে রানী ইসাবেলা-রাজা ফার্দিনান্দের কবর ক্যাথিড্রালের পাশে দেখলাম ইংরেজিতে একটা নামফলক : মাদ্রাসা (ইউনিভার্সিটি অব গ্রানাডা)। এর অর্থ হলো, সেই প্রাচীন মাদ্রাসা ভবনটিকে গ্রানাডা বিশ্ববিদ্যালয় তাদের প্রাচীনতম ভবন বলে জাহির করতে গর্ববোধ করছে। ভবনটি ইসলামী স্থাপত্যে আরবি ক্যালিগ্রাফিতে ভর্তি। এমনকি একদিকে একটা মিহরাবও দেখলাম। পাশ্চাত্যের কেউ কেউ মাদ্রাসা নিয়ে নাক সিটকালেও গ্রানাডার কর্তৃপক্ষ, বিশেষ করে গ্রানাডা বিশ্ববিদ্যালয়, ‘মাদ্রাসা’ শব্দকে স্বীকৃতি দিয়ে বিশ্বকে বোঝাতে চেয়েছে—‘মাদ্রাসাই’ তো বিশ্ববিদ্যালয়। মাদ্রাসাটির সামনে সৌন্দর্যের জন্য কমলালেবুর গাছ দেখলাম, যে কমলালেবুর গাছ মুসলমানরা প্রথম ইউরোপে নিয়েছে। এখন ইউরোপের কমলালেবু তেমন উপাদেয় না হলেও, এর চমত্কার ঘন সবুজ পাতাগুলো সৌন্দর্য বাড়িয়ে দিচ্ছে, আর যেন প্রচার করছে মুসলিম সভ্যতার চির সবুজ বৈশিষ্ট্যের।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: