কুরআন ও হাদিসের আলোকে রিবা বা সুদ

কুরআন ও হাদিসের আলোকে রিবা বা সুদ


রিবা মানে সুদ। ইসলামে সব ধরনের সুদকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। বর্তমান বিশ্বের প্রচলিত অর্থনীতিতে সুদ একটি অপরিহার্য অঙ্গ হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। বিশেষ করে পশ্চিমা বিশ্বের চালু করা পঁুজিবাদী অর্থব্যবস্থায় সুদ ছাড়া অন্য কিছু কল্পনাই করা যায় না। মুসলিম বিশ্বের দেশে দেশে এই সুদনির্ভর পঁুজিবাদ এখনো শিকড় গেড়ে বসে আছে। যদিও ইসলামি অর্থনীতির প্রসার আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেড়েছে। ফলে সুদের অভিশাপ ও কুফল সম্পর্কে মানুষ অবগত হতে শুরু করেছে। তার পরও ব্যবসায়-বাণিজ্যে সুদের ব্যবহার ও তার পরিণাম সম্পর্কে মুসলিম জনগণের মধ্যেও অস্বচ্ছতা-অস্পষ্টতা বিরাজমান। আমি আশা করি, এই প্রবন্ধে উল্লিখিত কুরআন ও হাদিসের উদ্ধৃতিগুলো আমাদের সবাইকে আরেকবার সুদ সম্পর্কে অবগত হওয়ার এবং সুদের অভিশাপ থেকে দূরে থাকার চিন্তাকে গতিশীল করবে।

পবিত্র কুরআনে রিবা বা সুদঃ

১. প্রথম ওহি (সূরা আল-রুম, আয়াতঃ ৩৯)ঃ অর্থাৎ মানুষের ধনসম্পদে তোমাদের সম্পদ বৃদ্ধি পাবে, এ আশায় যা কিছু তোমরা সুদ দিয়ে থাকো, আল্লাহর কাছে তা বর্ধিত হয় না। পক্ষান্তরে, আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য যা কিছু তোমরা জাকাতরূপে দিয়ে থাকো, আল্লাহর কাছে জাকাত প্রদানকারীরাই বর্ধিত সম্পদ প্রদত্ত হবে।

২. দ্বিতীয় ওহি (সূরা আন নিসা, আয়াতঃ ১৬১)ঃ অর্থাৎ আর (ইহুদিদের জন্য আমি অনেক উপাদেয় বস্তু হারাম করে দিয়েছি) তাদের সুদ গ্রহণের কারণে, অথচ তা তাদের জন্য নিষিদ্ধ করা হয়েছিল এবং তাদের অন্যায়ভাবে মানুষের ধনসম্পদ গ্রাস করার কারণে। আর আমি তাদের মধ্য হতে কাফেরদের জন্য প্রস্তুত রেখেছি যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।

৩. তৃতীয় ওহি (সূরা আল ইমরান, আয়াতঃ ১৩০-১৩২)ঃ আয়াত ১৩০ঃ অর্থাৎ হে ঈমানদারগণ! তোমরা সুদ খেয়ো না চক্রবৃদ্ধি হারে, তোমরা আল্লাহকে ভয় করো, যাতে তোমরা সফলতা লাভ করতে পারো। আয়াত ১৩১ঃ আর তোমরা সে আগুন থেকে বেঁচে থাকো, যা প্রস্তুত করে রাখা হয়েছে কাফেরদের জন্য। আয়াত ১৩২ঃ আর তোমরা আনুগত্য করো আল্লাহর এবং রাসূলের যাতে তোমাদের প্রতি অনুগ্রহ করা হয়।

৪. চতুর্থ ওহি (সূরা আল বাকারা, আয়াতঃ ২৭৫-২৮১)ঃ আয়াত ২৭৫ঃ যারা সুদ খায় তারা দাঁড়াবে ওই ব্যক্তির মতো যাকে শয়তান স্পর্শ করে মোহাবিষ্ট করে দেয়। এ অবস্থা তাদের এ জন্য যে তারা বলে, ‘বেচাকেনা তো সুদেরই মতো। অথচ আল্লাহ বেচাকেনাকে বৈধ করেছন এবং সুদকে অবৈধ করেছেন। যার কাছে তার পালনকর্তার তরফ থেকে উপদেশ এসেছে এবং সে নিবৃত্ত হয়েছে, তবে পূর্বে যা হয়ে গেছে তা তার, আর তার ব্যাপারে আল্লাহর কাছে সোপর্দ। কিন্তু যারা পুনরায় সুদ নেবে, তারাই দোজখবাসী, তারা সেখানে চিরকাল থাকবে। আয়াত ২৭৬ঃ আল্লাহ সুদকে নিশ্চিহ্ন করেন এবং দানখয়রাতকে বর্ধিত করেন। আল্লাহ কোনো অকৃতজ্ঞ পাপিকে পছন্দ করেন না। আয়াত ২৭৭ঃ নিশ্চয়ই যারা ঈমান এনেছে, নেক কাজ করেছে, নামাজ কায়েম করেছে এবং জাকাত দিয়েছে, তাদের জন্য রয়েছে তাদের পুরস্কার তাদের পালনকর্তার কাছে। তাদের নেই কোনো ভয় এবং তারা দুঃখিতও হবে না। আয়াত ২৭৮ঃ হে মুমিনগণ, যারা ঈমান এনেছ, তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং সুদের যা কিছু বকেয়া রয়েছে তা পরিত্যাগ করো, যদি তোমরা প্রকৃত মুমিন হয়ে থাকো। আয়াত ২৭৯ঃ তারপর যদি তোমরা পরিত্যাগ না করো,তাহলে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সাথে যুদ্ধ করতে তৈরি হয়ে যাও। কিন্তু যদি তোমরা তওবা করো, তবে তোমাদের জন্য তোমাদের মূলধন রয়ে যাবে। তোমরা কাউকে অত্যাচার করবে না আর না কেউ তোমাদের অত্যাচার করবে। আয়াত ২৮০ঃ খাতক যদি অভাবগ্রস্ত হয় তবে তার সচ্ছলতা আসা পর্যন্ত তাকে অবকাশ দেয়া উচিত। আর যদি তোমরা ক্ষমা করে দাও, তা হবে তোমাদের জন্য উত্তম কাজ, যদি তোমরা জানতে। আয়াত ২৮১ঃ আর সেদিনকে ভয় করো, যেদিন আল্লাহর কাছে প্রত্যাবর্তিত হবে। তারপর প্রত্যেককেই তার কর্মফল পুরোপুরি দেয়া হবে, আর তাদের প্রতি কোনো অবিচার করা হবে না।

এ ছাড়াও সূরা নিসা এবং সূরা মায়িদায় সুদ সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে।

যেমন বলা হয়েছেঃ

১. তারা (অর্থাৎ বনি ইসরাইলরা) নিষিদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও সুদ গ্রহণ করত এবং অন্যায়ভাবে মানুষের ধনসম্পদ গ্রাস করত, আর আমি তাদের মধ্যে অবিশ্বাসীদের জন্য যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি প্রস্তুত করে রেখেছি। (সূরা নিসা, আয়াতঃ ১৬১)।

২. তাদের অনেককেই তুমি দেখবে পাপে, সীমা লঙ্ঘনে ও অবৈধ (সুদ) ভক্ষণে তৎপর, তারা যা করে নিশ্চয়ই তা নিকৃষ্ট। (সূরা মায়িদা, আয়াতঃ ৬২)।

৩. রাব্বানিগণ (আল্লাহওয়ালাগণ) ও যাজকগণ কেন তাদেরকে পাপ কথা বলতে ও অবৈধ (সুদ) ভক্ষণে নিষেধ করে না? তারা যা করে নিশ্চয়ই তা-ও নিকৃষ্ট। (সূরা মায়িদা, আয়াতঃ ৬৩)।

হাদিসের আলোকে রিবা

১. হজরত জাবির ইবনে আবদুল্লাহ থেকে বর্ণিত তিনি বলেছেন, ‘মহানবী সাঃ সুদদাতা, সুদগ্রহীতা, সুদের দলিল লেখক,হিসাবরক্ষক এবং এর সাক্ষীদের ওপর অভিসম্পাত করেছেন। (মুসলিম, তিরমিজি, মুসনাদে আহমদ, আবু দাউদ)।

২. হজরত আবদুল্লাহ ইবনে হানজালা রাঃ থেকে বর্ণিত রাসূল সাঃ বলেছেন, সুদ খাতে মানুষ যদি এক দিরহামও গ্রহণ করে, তাহলে তার অপরাধ ইসলাম গ্রহণের পর মুসলিম থাকা অবস্থায় ৩৬ বার ব্যভিচারে লিপ্ত হওয়ার চেয়েও মারাত্মক। (তিবরানি, মুসনাদে আহমাদ)।

৩. হজরত আবু হোরায়রা রাঃ থেকে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ সাঃ বলেছেন, ‘মিরাজ রজনীতে আমি সপ্তম আকাশে পৌঁছে যখন ওপরের দিকে তাকালাম তখন বজ্রধ্বনি, বিদুøৎ ও প্রকট শব্দ শুনতে পেলাম। অতঃপর আমি এমন এক সম্প্রদায়ের কাছে এলাম যাদের পেট ছিল একটি ঘরের মতো বিস্তৃত। তাদের পেট ছিল সর্পে ভরপুর। সর্পগুলো বাহির থেকে দেখা যাচ্ছিল। আমি জিজ্ঞেস করলাম, হে জিবরাইল! এরা কারা? তিনি বললেন, তারা হলো সুদখোর সম্প্রদায়।’- (মুসনাদে আহমাদ, ইবনে মাজা)।

৪. হজরত আবু হোরায়রা রাঃ বর্ণিত রাসূলুল্লাহ সাঃ বলেছেন, ‘আল্লাহতায়ালা চার ব্যক্তিকে জান্নাতে প্রবেশ না করানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এবং তাদের জান্নাতের কোনো নিয়ামত ভোগ করার সুযোগও দেবেন না। এরা হলো, ১. মদ্যপানে অভ্যস্ত ব্যক্তি, ২. সুদখোর, ৩. অন্যায়ভাবে এতিমের মাল ভক্ষণকারী এবং ৪. পিতামাতার অবাধ্য সন্তান। (মুসতাদরিক হাকিম)।

৫. হজরত আবু হোরায়রা রাঃ বর্ণিত রাসূলুল্লাহ সাঃ বলেছেন, ক্ষতিকর সাতটি বিষয় থেকে তোমরা পরহেজ থাকবে। সাহাবাগণ জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল সাঃ সে সাতটি বিষয় কী? জবাবে তিনি বললেন, ১. আল্লাহর সাথে কাউকে শরিক করা, ২. জাদুবিদ্যা শিক্ষা ও প্রদর্শন, ৩. অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা করা, ৪. সুদ ভক্ষণ করা, ৫. এতিমের মাল ভক্ষণ করা, ৬. ধর্মযুদ্ধে পলায়ন করা এবং ৭. কোনো সতী-সাধবী রমণীকে অপবাদ দেয়া। (বুখারি,মুসলিম, আবু দাউদ, নাসায়ি)।

৬. হজরত আবু হোরায়রা রাঃ বর্ণিত রাসূলুল্লাহ সাঃ বলেছেন, ‘সুদখোর জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না। (মুসতাদরিক হাকিম)।

৭. হজরত আবু হোরায়রা রাঃ বর্ণিত রাসূলুল্লাহ সাঃ বলেছেন, ‘এমন এক যুগ আসবে যখন কোনো মানুষই সুদ ব্যতীত বাকি থাকবে না। কেউ যদি সুদ না খায় কমপক্ষে সুদের ধোয়া বা ধূলিকণা হলেও তাকে স্পর্শ করবে। (আবু দাউদ, ইবনে মাজাহ)।

৮. জাবির ইবনে আবদুল্লাহ রাঃ বলেছেন, রাসূল সাঃ বিদায় হজের ভাষণে বলেছেন, ‘জাহিলি যুগের সুদ রহিত করা হলো। সর্বপ্রথম আমি আমার কবিলা সুদের দাবি অর্থাৎ চাচা আব্বাসের সুদ মাফ করে দিলাম। সুতরাং সব সুদই আজ রহিত করা হলো। (মুসলিম)।

৯. হজরত আবু হোরায়রা রাঃ বর্ণিত রাসূলুল্লাহ সাঃ বলেছেন, ‘সুদের সত্তরটি শাখা রয়েছে। তার মধ্যে নিুতমটির তুলনা হচ্ছে, কোনো ব্যক্তি তার মাকে বিয়ে করার সমতুল্য। (ইবনে মাজাহ)।

মহান আল্লাহতায়ালা আমাদের সবাইকে সুদের সাথে জড়িত না হওয়ার তৌফিক দান করুন এবং সুদের ভয়ানক পরিণতি থেকে মুক্তি দান করুন।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: