কাবার ইতিকথা

কাবার ইতিকথা


সর্বপ্রথম আল্লাহতায়াআলার নির্দেশে ফেরেশতারা কাবাগৃহ নির্মাণ করেন আদম আঃ-এর সৃষ্টির দুই হাজার বছর আগে। দ্বিতীয়বার আদম আঃ পাঁচটি পাহাড় থেকে পাথর সংগ্রহ করে বাইতুল্লাহ নির্মাণ করেন। এই পাহাড়গুলো হচ্ছে লেবানন,তুরে সিনা, তুরে জিতা, জুদি ও হেরা। তৃতীয়বার হজরত আদম আঃ-এর পুত্র হজরত শিষ আঃ কাবা নির্মাণ করেন,যা নূহ আঃ-এর যুগে সংঘটিত মহাপ্লাবনের সময় আল্লাহপাক আসমানে উঠিয়ে নেন। চতুর্থবার হজরত ইব্রাহিম আঃ ও তার পুত্র হজরত ইসমাইল আঃ নির্মাণ করেন, যা নয় গজ উঁচু ৩০ গজ লম্বা এবং ২৩ গজ চওড়া ও দুই দরজাবিশিষ্ট ছিল। পঞ্চমবার আমালিকা গোত্র, ষষ্ঠবার জোরহাম গোত্র, সপ্তমবার মহানবী সাঃ-এর পঞ্চম পূর্বপুরুষ কোসাই ইবনে কেলাব নির্মাণ করেন। অষ্টমবার কোরেশরা নতুন করে নির্মাণ করেন। এ নির্মাণকাজে স্বয়ং নবী করিম সাঃও শরিক ছিলেন। তিনি আপন কাঁধে বহন করে পাথর জোগান দেন। তখন তাঁর বয়স ছিল ৩৫ বছর। কাবাঘর নির্মাণকালে হাজরে আসওয়াদকে কেন্দ্র করে কোরেশদের মধ্যে যুদ্ধের উপক্রম হয়। এর ফয়সালা হুজুর সাঃ করেন। এ নির্মাণে কোরেশদের প্রতিজ্ঞা ছিল, কোনো প্রকার হারাম বা সন্দেহযুক্ত মাল ব্যবহার করা হবে না। এ প্রতিজ্ঞায় তারা সবাই শেষ পর্যন্ত অটল-অবিচল ছিলেন। যার ফলে হালাল মাল শেষ হয়ে যাওয়ায় কাবাঘরের উত্তর পার্শ্বের ছয় থেকে সাত হাত পরিমাণ জায়গা ছেড়ে দিয়েই নির্মাণকাজ সমাপ্ত করা হয়। সেই স্থানটুকু হাতিম নামে পরিচিত। নবমবার হজরত আবদুল্লাহ ইবনে জুবায়ের রঃ নির্মাণ করেন। তার এ নির্মাণ ছিল হজরত ইব্রাহিম আঃ-এর নির্মিত কাবার অনুরূপ। দশমবার হাজ্জাজ ইবনে ইউসুফ নির্মাণ করেন। খলিফা অলিদ ইবনে আব্দুল মালিকের নির্দেশে ইবনে জুবায়েরের নির্মিত কাবাগৃহ ভেঙে ফেলা হয় এবং কোরাইশ বংশের নির্মিত কাবার আকৃতিতে পুনরায় নির্মাণ করা হয়, যা আজ পর্যন্ত বিদ্যমান। খলিফা হরুন-অর-রশিদ চেয়ে ছিলেন হাজ্জাজ ইবনে ইউসুফের নির্মিত কাবাঘর ভেঙে দিয়ে হুজুর সঃ-এর আকাঙ্ক্ষা মোতাবেক হজরত ইব্রাহিম আঃ-এর অনুরূপ নির্মাণ করবেন। কিন্তু ইমাম মালেক রঃ কঠোরভাবে নিষেধ করেন। কেননা এতে কাবাঘর রাজা-বাদশাহের খেল-তামাশার বস্তুতে পরিণত হবে। সব ওলামায়ে কেরামও এর ওপর ঐকমত্য পোষণ করেন। ১০২১ (১৬০১ খ্রিঃ) হিজরিতে সুলতান আহমদ তুর্কি বায়তুল্লাহ শরিফ মেরামত করেন এবং ১৩৬৭ হিঃ মহররম মাসে (১৯৪৭ খ্রিঃ) বাদশাহ আজিজ ইবনে সাউদ কাবা শরিফের দরজা নতুন করে তৈরি করেন। ৬০৫ খ্রিঃ হজরত মুহাম্মদ সাঃ কর্তৃক হাজরে আসওয়াদ প্রতিস্থাপনের আগে কাবা শরিফ পাথরের নির্মিত একজন মানুষের উচ্চতার সমান উঁচু এবং চার দেয়ালবিশিষ্ট ছাদবিহীন ছিল। আবিসিনিয়ার রাজা আবরাহাহস্তি বাহিনী নিয়ে কাবাঘরআক্রমণ করলে মেষপালক দাদা আবদুল মুত্তালিব কাবারক্ষায় অসমর্থ হলে আল্লাহতায়ালা আবাবিলপাখি পাঠিয়ে কিভাবে কৌশলে কাবাঘররক্ষা করেছিলেন এ ঘটনার কথা আমরা কুরআনে সূরা ফিলেজানতে পারি।

রাসূল সাঃ-এর সময়ে কাবা ১৮ গজ দীর্ঘ ছিল বলে জানা যায়। এক স্তর পাথর, এক স্তর কাঠ এমনিভাবে পর্যায়ক্রমে পাথর-কাঠ সমন্বয়ে একত্রিশ স্তরে নির্মাণ করা হয়। ১৬টি পাথরের স্তর, ১৫টি কাঠের স্তরের মধ্যে প্রথম ও শেষ স্তর পাথরের ছিল। ইয়াকুবির তথ্যানুসারে ছয়টি স্তম্ভের ওপর কাঠের ছাদ ছিল। আবিসিনীয় খ্রিষ্টান কারিগর বাকুম রাজমিস্ত্রি কাঠমিস্ত্রি হিসেবে কাজ করেছিলেন। লোহিত সাগরের উপকূলে ব্যবসায়ের উদ্দেশ্যে নিয়ে আসা নৌকা ভেঙে গেলে ওই কাঠ সংগ্রহ করে কাবা নির্মাণের কাজে লাগানো হয়। আবিসিনীয় পদ্ধতিতে পর্যায়ক্রমে এক স্তর পাথর ও কাঠ ব্যবহারে নির্মাণ করেন। নষ্ট হওয়া থেকে রক্ষার জন্য একটি উল ও অপরটি সিল্কের গিলাফ দিয়ে ঢেকে দেয়া হয়েছিল। আজ পর্যন্ত গিলাফ দিয়ে ঢাকা কাবাঘর আমরা দেখতে পাই। মুসলমানরা প্রতি বছর এ কাবাঘরে হজ সম্পন্ন করেন।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: