এইডস প্রতিরোধে ইসলামের শিক্ষা

এইডস প্রতিরোধে ইসলামের শিক্ষা


সব ধর্মের মূলকথা মানব কল্যাণ, সুন্দর চরিত্র গঠন, জীবনকে পরিমার্জিত, পরিশীলিত ও উন্নতকরণ। তাই সামাজিক প্রেক্ষাপটে ধর্মের প্রভাব ও ধর্মীয় শিক্ষার গুরুত্ব খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। বর্তমানে সারা বিশ্ব এইডসের ভয়াবহ পরিস্থিতির শিকার। এইডসের করালগ্রাসে মানবসভ্যতা আজ হুমকির মুখে। কিন্তু এ যাবৎ এইডসের ফলপ্রসূ কোনো চিকিৎসা আবিষ্কৃত হয়নি। তবে আশার কথা হলো, এইডস নিরাময় করা না গেলেও এর বিস্তার রোধ করা যায়। এটি একটি প্রতিরোধযোগ্য বিষয়, যা ধর্মীয় শিক্ষা ও ধর্মীয় নীতিমালা অনুশীলনের মাধ্যমে বহুলাংশে প্রতিরোধ করা সম্ভব। পৃথিবীর সেরা চারটি ধর্ম এইডস প্রতিরোধে কী ব্যবস্থাপত্র দিয়েছে সে সম্পর্কে নিØে আলোকপাত করা হলো।

বর্তমানে এইডস হলো মহাবিপর্যয়। এর গতি ঊর্ধ্বমুখী। এখনই এর লাগাম টেনে না ধরলে এ বিপর্যয়ের হাত থেকে মানবসমাজ কিছুতেই রেহাই পাবে না। যার জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত আফ্রিকার সাব-সাহারান অঞ্চল। যেখানে এইডস পরিস্থিতি খুবই ভয়াবহ। যার প্রধান কারণ অবাধ যৌনাচার, সমকামিতা, মাদকাসক্ত, একই সুচ ও সিরিঞ্জের একাধিক ব্যবহার। এ ব্যাপারে ইসলাম ধর্মের দৃষ্টিভঙ্গি হলো

জেনা-ব্যভিচারঃ জেনা ইসলামে নিষিদ্ধ। আল্লাহ বলেছেন, ‘আর তোমরা জেনার কাছেও যেও না। কেননা এটি অত্যন্ত অশ্লীল ও মন্দ পথ।কেউ যেন জেনায় উদ্বুদ্ধ না হয় এবং অপর নারীর সৌন্দর্য যেন কাউকে জেনার দিকে প্ররোচিত না করে, সে জন্য ইসলাম কঠিনভাবে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। আল্লাহ বলেন, ‘হে নবী! আপনি মুমিনদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে সংযত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে। এটি তাদের জন্য পবিত্রতর।কারো যদি বিয়ে করার সামর্থø না থাকে অথচ জৈবিক চাহিদা প্রবল, সে ক্ষেত্রে তিনি যেন অন্যায় কাজে লিপ্ত না হয়ে সংযম প্রদর্শন করেন। আল্লাহর ঘোষণা, ‘যাদের বিয়ের সামর্থø নেই। আল্লাহ তাদেরকে অভাবমুক্ত না করা পর্যন্ত তারা যেন সংযম অবলম্বন করে।রাসূল সাঃ বলেন, ‘যে ব্যক্তি আমার সন্তুষ্টি লাভের জন্য তার দুই চোয়ালের মধ্যবর্তী স্থান (জিহ্বা) আর দুই ঊরুর মধ্যবর্তী স্থানের (যৌনাঙ্গের) দায়িত্ব নেবে, আমি তার জান্নাতের দায়িত্ব নেব।

সমকামিতাঃ এটি ইসলামে নিষিদ্ধ। কুরআনে এসেছে, ‘তোমরা কি তোমাদের যৌন তৃপ্তির জন্য স্ত্রীদেরকে বাদ দিয়ে পুরুষের কাছে আসবে? মূলত তোমরা হচ্ছো এক মূর্খ জাতি।কুরআনের অন্য জায়গায় এসেছে, ‘তোমরা কামবশত পুরুষদের কাছে গমন করো স্ত্রীদের ছেড়ে, বরং তোমরা সীমালঙ্ঘনকারী সম্প্রদায়।আল্লাহর এ বিধান লঙ্ঘনের দায়ে তাদের জনপদকে উল্টিয়ে নিশ্চিহ্ন করা হয়েছে। আজ পর্যন্ত সেই মৃত সাগরে কোনো প্রাণীর অস্তিত্ব পাওয়া যাচ্ছে না।

পশ্চিমা বিশ্বে বিবাহপূর্ব যৌন মিলন আইনবিরোধী নয়। আর পুরুষ পুরুষে সমকামিতাকে বৈধতা দেয়া হয়েছে। ফলে সেখানে দুরারোগ্য ব্যাধি এইডসের প্রাদুর্ভাব মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়ছে। যে ব্যাধিটি ইতঃপূর্বে দেখা যায়নি। এটি আল্লাহর বিধান লঙ্ঘনের ফলে গজব হিসেবে এসেছে। রাসূল সাঃ বলেছেন, ‘যখনই কোনো জাতি বা সম্প্রদায় অশ্লীল ও ঘৃণ্য কাজে লিপ্ত হয়, তখন তাদের মধ্যে এমন এক ভয়ঙ্কর মহামারী দেখা দেয়; যা তারা অতীতে কখনো দেখেনি।

বিকৃত যৌনাচার ঘৃণিত কাজ। আল্লাহ বলেন, ‘বলুন হে নবী! আমার প্রভু প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য সব অশ্লীল কাজকে হারাম করেছেন।ব্যভিচারের ভূমিকাও প্রকাশ্য ব্যভিচার। রাসূল সাঃ বলেন, ‘যে লোক নিষিদ্ধ জায়গার আশপাশে ঘোরাফেরা করে, সে তাতে প্রবেশ করার কাছাকাছি হয়ে যায়।তাই ব্যভিচারের কাছে যেতে নিষেধ করা হয়েছে। আল্লাহ বলেন, ‘লা তাকরাবুল ফাওয়াহেশাঅর্থাৎ তোমরা ব্যভিচারের কাছেও যেও না, তা প্রকাশ্য হোক কিংবা অপ্রকাশ্য হোক। ফাওয়াহেশা অর্থ অশ্লীলতা ও নির্লজ্জতা। শুধু ব্যভিচার নয়, সমকামিতার মতো অপকর্মটিও করার সুযোগ যাতে কেউ না পায়, সে জন্য ইসলাম অধিক সতর্কতা অবলম্বন করে ঘোষণা করেছেদুজন পুরুষ একত্রে একই কাপড়ে জড়াজড়ি করে ঘুমাবে না। অনুরূপভাবে দুজন মহিলাও একত্রে একই বস্ত্রের মধ্যে জড়াজড়ি করে ঘুমাবে না।

কুরআন-হাসিদের উপরি উক্ত আলোচনায় নিØের বিষয়গুলো সুস্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে।

১. অনিয়ন্ত্রিত ও অবাধ যৌনাচার এইডস, যৌনরোগ ও সমাজে অশান্তি ছড়ায়।

২. জেনা-ব্যভিচার ও সমকামিতা ইসলামে হারাম এবং এসব কাজে মানুষকে প্রলুব্ধ করে এমন প্রাসঙ্গিক বিষয়ও হারাম। যেমন অশ্লীল কবিতা, পিন-আপ ম্যাগাজিন ও কুরুচিপূর্ণ ব্লু-ফিল্ম প্রভৃতি।

৩. জেনার শাস্তি এক শবেত্রাঘাত, ক্ষেত্রবিশেষে মৃতুøদণ্ড।

৪. বিবাহপূর্ব ও বিবাহবহির্ভূত যৌন মিলন ইসলামে হারাম। আসমানী গজব ও মহামারী আসার কারণই হলো আল্লাহর বিধান লঙ্ঘন।

মাদকদ্রব্য সেবনঃ এইচআইভি সংক্রমণের অন্যতম কারণ হলো সুই আ সিরিঞ্জ ভাগাভাগি করে মাদকদ্রব্য গ্রহণ করা। ইসলামে এ ধরনের মাদক ও নেশা গ্রহণ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। আল্লাহ বলেন, ‘হে রাসূল সাঃ! তারা আপনাকে মদ ও জুয়া সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। আপনি বলে দিন, এ দুটোর মধ্যে রয়েছে মহাপাপ ও মানুষের জন্য অপকারিতা। তবে এ দুটোর মধ্যে পাপ অপকারিতা অপেক্ষা ভয়াবহ।নেশা ও মাদকতা অনেক পাপকাজের জন্মদাতা। তাই এটা নিষিদ্ধ। নেশাজাতীয় যেকোনো দ্রব্যই মাদক, আর যাবতীয় মাদকদ্রব্য হারাম।

আল্লাহপাক বলেন, ‘হে মুমেনগণ! নিশ্চয়ই মদ, জুয়া, মূর্তিপূজা ও ভাগ্য নির্ধারক তীর নিক্ষেপ এসবই নিকৃষ্ট শয়তানি কাজ। সুতরাং তা বর্জন করো, যাতে তোমরা কল্যাণপ্রাপ্ত হও।কারণ মাদকদ্রব্য সেবনের মাধ্যমে দৈহিক, মানসিক ও আর্থিক ক্ষতি, নৈতিক অবক্ষয় ও সামাজিক বিশৃঙ্খলাসহ এইডসের মতো মহামারীর ছড়াছড়ি দেখা দেয়।

খ্রিষ্ট ধর্মঃ খ্রিষ্ট ধর্ম মতে, ব্যভিচার, বহুগামিতা, সমকামিতা, মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার ও মাতলামিজনিত অনাচার নিষিদ্ধ। পবিত্র শাস্ত্র শিক্ষা দেয় সমকামিতা গুরুতর অনৈতিক কাজ। এটি প্রাকৃতিক বিধান। খ্রিষ্ট ধর্ম এটা কিছুতেই অনুমোদন করে না। খ্রিষ্ট ধর্ম মতে, মানুষ যখন ঈশ্বরপ্রদত্ত নৈতিকতার বিধিবিধান অস্বীকার করে তখন তারা মারাত্মক ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়, জীবন ও সৃষ্টিকে কলুষিত করে। বর্তমানে এইচআইভি/এইডস ঈশ্বরের বিধান লঙ্ঘনের ফল। এ ধরনের ব্যাধি নিজেরও ধ্বংস ডেকে আনে, অন্যদেরকেও ভয়ঙ্কর ঝুঁকিতে ঠেলে দেয়। তাই ঈশ্বর আদেশ দিয়ে বলেন, ব্যভিচার থেকে দূরেই থাকো।

মঙ্গলবাণী প্রচারক সাধু পৌলও বলেছেন, ব্যভিচার, অশুচিতা, উচ্ছৃঙ্খলতা মানুষের নিচু স্বভাবের কাজ। খ্রিষ্ট ধর্ম বলে মানব জীবন অন্তে পরমেশ্বর নিজে নৈতিকতার মানদণ্ডেই সবাইকে বিচার করবেন। আর ব্যভিচারী নিক্ষিপ্ত হবে আগুনের হ্রদে। পরমেশ্বর সব ব্যভিচারী ও দুশ্চরিত্রদের বিচার করবেনই করবেন। অতএব এইচআইভি/এইডস প্রতিরোধে খ্রিষ্ট ধর্মের অনুশাসন একটি অনন্য ব্যবস্থাপত্র।

হিন্দু ধর্মঃ হিন্দু ধর্মে মহাপাপ পাঁচটি। তার মধ্যে পরদ্বার গমনঅর্থাৎ পর স্ত্রীর সাথে যৌন মিলন অন্যতম। এ পাপের শাস্তি মৃতুøর পর বিভীষিকাময় নরক। এ ধর্ম মতে, কাম রিপুর নিয়ন্ত্রণ না থাকলে ভারসাম্যপূর্ণ জীবনযাপন হয় না। এতে যৌনাচারের ছড়াছড়ি দেখা দেয়। যার ফল বর্তমানে অভিশপ্ত এইডস। তাই অবৈধ কাম ও প্রবৃত্তির আহ্বান থেকে দূরে থাকতে হবে। পরদ্বারেষু মাতৃবৎঅর্থাৎ পরস্ত্রীকে মায়ের মতো দেখতে হবে। এ সত্য হৃদয়ে প্রতিফলিত হলে সমাজ হবে শৃঙ্খলাময়, জীবন হবে সুন্দর, সুখময় ও আনন্দময়।

বৌদ্ধ ধর্মঃ বৌদ্ধ ধর্মের মূল ভিত্তি হলো শীল, সমাধি ও প্রজ্ঞা। এ তিনটির ব্যত্যয় ঘটলেই মানব জীবন ধ্বংস হয়। শীল অর্থ চারিত্রিক বিশুদ্ধতা, নীতি, আদর্শ, সুশৃঙ্খল জীবনের গৌরবতা। বৌদ্ধ মতে, শীল পালনের দ্বারা দেহ, বাক্য, মন যেমন সংযত ও পবিত্র হয়; তেমনি চিত্ত হয় দমিত ও শান্ত এবং মানব জীবন হয় পরিশীলিত।

বুদ্ধ বলেছেন, ‘কামেসু মিছছাচারা বেরমনী সিকখাপদং সমাদিয়ামি।অর্থাৎ আমি সর্বপ্রকার মিথ্যা, কামাচার কিংবা অবৈধ যৌনাচার থেকে বিরত থাকব এর শিক্ষাপদ গ্রহণ করেছি। বৌদ্ধ ধর্ম বলে, বহুকামিতার বহু দুঃখ, বহু অশান্তি। মিথ্যা, যৌনাচারেও বহু পরিণতি। এতেই থাকে মারাত্মক এইডসসহ নানা যৌন রোগে আক্রান্ত ও দুর্দশার আশঙ্কা। সুতরাং এইচআইভি/এইডস থেকে মুক্তি পেতে বৌদ্ধ ধর্মের নীতিমালা অনুসরণ খুবই ফলপ্রসূ হিসেবে সবার কাছে সমাদৃত।

উপসংহারঃ উপরি উক্ত আলোচনায় এ বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে প্রতিভাত হয়েছে, এইচআইভি/এইডস হলো অনিয়ন্ত্রিত বিকৃত ও অবাধ যৌনাচারের ফলাফল। যার বিষবাষ্প বিশ্বময় ছড়িয়ে পড়ে মানবসম্পদ উন্নয়নের পথকে বাধাগ্রস্ত করছে। এর থেকে উত্তরণের জন্য নিØমোক্ত বিষয়গুলো পালন করা খুবই জরুরি

(ক) ধর্মীয় ও সামাজিক নীতি, আদর্শ ও অনুশাসন কঠোরভাবে মেনে চলা। শিক্ষা ক্ষেত্রে সব স্তরে ধর্মীয় শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা।

(খ) এইডসের কুফল গণমাধ্যমে তুলে ধরা। বিশেষ করে সর্বজন গ্রহণযোগ্য গণমাধ্যম হিসেবে খ্যাত মসজিদের ইমামদেরকে এইচআইভি/এইডসের ওপর বিশেষ ট্রেনিং দিয়ে পরিকল্পনামাফিক কাজে লাগানো। এ ক্ষেত্রে মন্দির, গির্জা ও প্যাগোডার ধর্মীয় যাজকগণকেও এ কাজে অন্তর্ভুক্ত করা।

(গ) সব ধরনের অনৈতিক, অবৈধ ও অনিরাপদ দৈহিক সম্পর্ক বর্জন করা।

(ঘ) যৌন কৌতূহল জাগে বা যৌনকর্ম সম্পাদনে উত্তেজিত হয়ে ওঠে, এমন কাজ বন্ধ করা। যেমন যৌন আবেদনময়ী অশ্লীল উপন্যাস, নোংরা যৌন পত্রপত্রিকা, স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেলগুলোর নগ্ন দেহ প্রদর্শনী প্রভৃতি।

(ঙ) দেহ ব্যবসায়ীদের পুনর্বাসন ও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা।

(চ) বিবাহে সক্ষম ব্যক্তিদেরকে বিবাহের প্রতি উৎসাহিত করা। নচেৎ সংযম অবলম্বন করা।

(ছ) উঠতি বয়সের তরুণ-তরুণীদের প্রতি অভিভাবকদের সদা সতর্ক দৃষ্টি রাখা। বয়ঃসন্ধিকালে তাদেরকে ধর্মীয় অনুরাগ ও ধর্মীয় নীতি-আদর্শ মেনে চলার ব্যবস্থা করা। (জ) রক্তের প্রয়োজন হলে পরীক্ষা করে নেয়া।

(ঝ) অপারেশনের যন্ত্রপাতি ব্যবহারের আগে জীবাণুমুক্ত করা।

(ঞ) এইচআইভি আক্রান্ত মায়ের দুধ শিশুদের খাওয়ার বিষয়ে বিজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ নেয়া।

সুতরাং এইডসমুক্ত দেশ, এইডসমুক্ত জাতি ও এইডসমুক্ত সমাজ গঠনে উপরি উক্ত বিষয়গুলো পালন করতে হবে। এইডসমুক্ত জীবন ধারণে এর কোনো বিকল্প নেই।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: