ইসলামে বাণিজ্যিক সুদ ও ইউজারি

ইসলামে বাণিজ্যিক সুদ ও ইউজারি


১৭ শতকে যখন ব্যাংকিং ব্যবস্থার উদ্ভব হয়, তখন সুদ সম্পর্কীয় দুটি নতুন ধারণা জন্ম লাভ করে। তা হলো এক. তেজারতি সুদ (বাণিজ্যিক)ঃ এটি উৎপাদন ও মুনাফাভিত্তিক খাতে নেয়া ঋণের ওপর প্রদেয় সুদ হিসেবে বিবেচিত। দুই. সারফি সুদ (ইউজারি)ঃ এটি ব্যক্তিগত প্রয়োজন ও খরচের জন্য নেয়া ঋণের ওপর প্রদেয় সুদ হিসেবে বিবেচিত।

উভয় সুদের প্রেক্ষাপটঃ আধুনিক ব্যাংকিং ব্যবস্থায় সুদ ওতপ্রোতভাবে জড়িত। পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থার মেরুদণ্ড হলো সুদ। পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে সুদকে বৈধ ও নৈতিক বলে ছাড়পত্র দেয়া হয়েছে। শিল্প, ব্যবসায় বাণিজ্য যখন সমাজজীবনের অপরিহার্য অঙ্গ হয়ে উঠল, তখন মুসলিম মনীষীরা সুদ সম্পর্কে চিন্তাভাবনা শুরু করলেন। এ সময় তাদের অনেকে সুদের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে ইউজারি হারাম বলে মত প্রকাশ করলেন। আর শিল্প উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির কথা চিন্তা করে তারা বাণিজ্যিক সুদকে বৈধ বলে মত প্রকাশ করলেন। তারা এ মতও পোষণ করলেন যে, কুরআন ও হাদিসে নিষিদ্ধ যে রিবা, তা হলো ইউজারি এবং এ ধরনের রিবাই অবৈধ বা হারাম। এভাবে একটি মত চালু হলো যে, নিষিদ্ধ ঘোষিত সুদ হলো ইউজারি আর বাণিজ্যিক সুদ ইসলামসম্মত।

আদিম সভ্যতায় ইউজারিঃ ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, আদিম সমাজে ব্যবসায় বাণিজ্যে সব সময়ই ইউজারি প্রচলিত ছিল। অতীতে ব্যাবিলনীয় আমলে ইউজারি ছিল স্বাভাবিক। ব্যাবিলনীয়রা ইউজারির ব্যবহারই শুধু করত না, তখন সুদের হারও ছিল অসম্ভব। সেই সময় সুদের হার ২০০ শতাংশ থেকে ৫০০ শতাংশ পর্যন্ত ওঠানামা করত। ইউজারি প্রচলিত থাকায় সমাজের গুটিকতেক প্রভাবশালী মানুষের হাতে গিয়ে সম্পদ জমা হতো। এর ফলে সমাজের বিশাল জনগোষ্ঠী দারিদ্র্যের কশাঘাতে জর্জরিত হতো। ফলে ব্যাবিলনীয় সমাজে বৈষম্য ছিল স্বাভাবিক। তাই এ বৈষম্য দূর করার জন্য হাম্মুরাবি কোড প্রচলন করা হলো। এই কোডে সময় পরিক্রমায় পরিবর্তন আনা হলো। চেষ্টা করা হলো যাতে ঋণদাতার অন্যায় বা নিপীড়ন থেকে ঋণগ্রহীতা পরিত্রাণ পেতে পারে। প্লোটো ও অ্যারিস্টটলের মতে, ইউজারি হলো এমন এক ব্যবস্থা যার মাধ্যমে ঋণদাতা জড় ধাতব মুদ্রাব্যবহার করে অর্থ উপার্জন করছে, যা শুধু অন্যায়ই নয়, বরং প্রকৃতিবিরোধী। এ প্রসঙ্গে অ্যারিস্টটল দি নিউ ক্যাথলিক এনসাইক্লোপিডিয়ায় উদ্ধৃত করেছেন, ‘কোনো প্রাণী প্রাণীর জন্ম দিতে পারে, জমি থেকে ফসল উৎপন্ন হতে পারে কিন্তু মুদ্রা হলো জড় পদার্থ এবং এটা অপরিবর্তনীয়।গ্রিক সভ্যতায় ইউজারি সম্পর্কে যে ধারণা ছিল তা রোমান সাম্রাজ্যের খ্যাতনামা দার্শনিক কাইসেরো, ক্যাট ও সেনিকারাও মনে করতেন। ইউজারির ব্যাপারে সমালোচনা থাকা সত্ত্বেও ৪৫১-৪৫০ খ্রিষ্টপূর্বে দি ল অব দি টুয়েলভ টেবিলসপ্রতিষ্ঠা করা হয় এবং সুদের হার ১২ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়। রোমান আইন অনুযায়ী ব্যবসায় সুদ আরোপ করার কারণ এটা ছিল যে, নির্দিষ্ট সময় পর ঋণগ্রহীতা ঋণদাতার ঋণের অর্থ ফেরত দিতে ব্যর্থ হলে তা যেন ঋণদাতার ক্ষতিপূরণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। এভাবে রোমান আইন ইউজারিকে ঋণগ্রহীতার ঋণ পরিশোধে ব্যর্থতার বিপরীতে ইন্সুøরেন্স হিসেবে ধরা হতো। এর ফলে ঋণের সাথে জড়িত ঝুঁকি হ্রাস সম্ভব হতো।

ইহুদি ধর্মে ইউজারিঃ প্রাচীন সভ্যতায় ঋণদাতা যেমন ঋণগ্রহীতার ওপর অন্যায় নিপীড়ন চালাত, তেমনি প্রচলিত ইহুদি সমাজেও ঋণগ্রহীতা অমানবিক আচরণের শিকার হতো। ইহুদি সমাজে বাড়িঘর ও জমি বন্ধকের বিপরীতে ঋণ প্রদান হতো এবং ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হলে ঋণগ্রহীতার বন্ধকী সম্পত্তি ঋণদাতার অধীনে চলে যেত। আবার ঋণগ্রহীতা বাড়িঘর বা জমি জামানত হিসেবে দিতে ব্যর্থ হলে ঋণগ্রহীতা ও তার পরিবারপরিজনকে বাজারে বিক্রি করে ঋণের অর্থ আদায় করা হতো। ইহুদিদের ধর্মগ্রন্থ এক্সডোস-এর ২২ স্তবকে সুদকে বর্জন করার তাগিদ দেয়া হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, ‘তোমরা যদি আমার কোনো লোককে অর্থ ধার দাও, যারা গরিব, তবে তোমরা উত্তমর্ণ হবে না এবং তোমরা তার কাছ থেকে সুদ আদায় করবে না। অতএব ইহুদি ধর্মে ইউজারি শর্তসাপেক্ষে প্রযোজ্য ছিল এবং তা বেআইনি ও ক্ষতিকর হিসেবে বিবেচিত ছিল।

খ্রিষ্টান ধর্মে ইউজারিঃ খ্রিষ্টানদের ধর্মগ্রন্থ ডিউটারোনোমিতে বলা হয়েছে, ‘তোমরা তোমাদের ভাইকে সুদে ধার দেবে না।খ্রিষ্টানদের অন্য ধর্মগ্রন্থ লুক-এ স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, ‘ধার দাও, কোনো বিনিময় ছাড়াই।ইতিহাস থেকে জানা যায়, প্রাচীনকালের ধর্মযাজকরা ইউজারিকে অনুমোদন করেনি। ১১৭৯ সালে তৃতীয় ল্যানটার্ন কাউন্সিলের গির্জার এক বিধানে বলা হয়, যারা সুদ খাবে তারা খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত হবে না এবং তারা মারা গেলে খ্রিষ্টানরা কবরস্থ করবে না।

ইসলামে ইউজারিঃ ইসলামে ইউজারিকে বেআইনি ও ধ্বংসাত্মক বলে ঘোষণা করা হয়েছে। আরবে ইসলাম আগমনের আগে ইউজারি ব্যাপকভাবে প্রচলিত ছিল। আরবের লোকেরা উচ্চ সুদের হারে একে অপরকে ধার দিত এবং ব্যবসায় বাণিজ্য করত। যদি কেউ ধারের অর্থ শোধ করতে না পারত, তাহলে ইউজারির হার বাড়িয়ে দেয়া হতো এবং ধারের অর্থের পরিমাণ বেড়ে যেত।

যেহেতু আরবরা ব্যবসায় বাণিজ্যে পারদর্শী ছিল, হজরত মুহাম্মদ সাঃ-এর কাছে ইসলামের বাণী আসার পর ইউজারি নিষিদ্ধ হওয়ায় তা আরব জাতির ওপর বড় ধরনের প্রভাব সৃষ্টি করল। আরবে ইউজারির ব্যাপক প্রচলন থাকায় আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইউজারিকে ধীরে ধীরে চার স্তরে নিষিদ্ধ করেন। কারণ আরবরা ইউজারিতে অভ্যস্ত ছিল এবং আল্লাহর ঘোষণা শোনার সাথে সাথে তারা যাতে দীর্ঘ দিনের এ অভ্যাসকে মেনে নিতে বিপদে পড়ে না যায় সে জন্যই আল্লাহতায়ালা এ ব্যবস্থা নিয়েছেন।

এ ছাড়াও আল্লাহ ঈমানদারদের মধ্যে যাদের সাথে তাদের দেনা রয়েছে তা বন্ধ করার জন্য তাগিদ দিয়েছেন। আল্লাহপাক সূরা আল বাকারার ২৭৫ থেকে ২৮১ নম্বর আয়াতে এ প্রসঙ্গে স্পষ্ট আদেশ জারি করেছেন। আয়াত ২৭৫ঃ যারা সুদ খায় তারা দাঁড়াবে ওই ব্যক্তির মতো যাকে শয়তান স্পর্শ করে মোহাবিষ্ট করে দেয়। এ অবস্থা তাদের এ জন্য যে তারা বলে, ‘বেচাকেনা তো সুদেরই মতো। অথচ আল্লাহ বেচাকেনাকে বৈধ করেছেন এবং সুদকে অবৈধ করেছেন। যার কাছে তার পালনকর্তার তরফ থেকে উপদেশ এসেছে এবং সে নিবৃত্ত হয়েছে, তবে আগে যা হয়ে গেছে তা তার, আর তার ব্যাপারে আল্লাহর কাছে সোপর্দ। কিন্তু যারা আবার সুদ নেবে, তারাই দোজখবাসী, তারা সেখানে চিরকাল থাকবে। আয়াত ২৭৬ঃ আল্লাহ সুদকে নিশ্চিহ্ন করেন এবং দানখয়রাতকে বর্ধিত করেন। আল্লাহ কোনো অকৃতজ্ঞ পাপিকে পছন্দ করেন না। আয়াত ২৭৭ঃ নিশ্চয়ই যারা ঈমান এনেছে, নেক কাজ করেছে, নামাজ কায়েম করেছে এবং জাকাত দিয়েছে, তাদের জন্য রয়েছে তাদের পুরস্কার তাদের পালনকর্তার কাছে। তাদের নেই কোনো ভয় এবং তারা দুঃখিতও হবে না। আয়াত ২৭৮ঃ হে মুমিনরা, যারা ঈমান এনেছ, তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং সুদের যা কিছু বকেয়া রয়েছে তা পরিত্যাগ করো, যদি তোমরা প্রকৃত মুমিন হয়ে থাকো। আয়াত ২৭৯ঃ তারপর যদি তোমরা পরিত্যাগ না করো, তাহলে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সাথে যুদ্ধ করতে তৈরি হয়ে যাও। কিন্তু যদি তোমরা তওবা করো, তবে তোমাদের জন্য তোমাদের মূলধন রয়ে যাবে। তোমরা কাউকে অত্যাচার করবে না,আর না কেউ তোমাদের অত্যাচার করবে। আয়াত ২৮০ঃ খাতক যদি অভাবগ্রস্ত হয় তবে তা সচ্ছলতা আসা পর্যন্ত তাকে অবকাশ দেয়া উচিত। আর যদি তোমরা ক্ষমা করে দাও, তা হবে তোমাদের জন্য উত্তম কাজ, যদি তোমরা জানতে। আয়াত ২৮১ঃ আর সে দিনকে ভয় করো, যে দিন তোমরা আল্লাহর কাছে প্রত্যাবর্তিত হবে। তারপর প্রত্যেকেই তার কর্মফল পুরোপুরি দেয়া হবে, আর তাদের প্রতি কোনো অবিচার করা হবে না।

এবার আমরা ইউজারি হারাম ও বাণিজ্যিক সুদ হালালের বিপক্ষের যুক্তিগুলো এবং বাস্তবে উভয় সুদই যে হারাম তার পক্ষের যুক্তি ও বাস্তবতা নিয়ে আলোচনা করছি।

প্রথম মতাদর্শঃ এ মতের অনুসারীরা ইউজারি হারাম এবং বাণিজ্যিক সুদ হালাল বলে মত প্রকাশ করেছেন। এ মতের পক্ষে তারা দুটি যুক্তি দাঁড় করিয়েছেন।

যুক্তি একঃ বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ সাঃ-এর সময়কালে রিবা ছিল ইউজারি হিসেবে বিবেচিত।

পাল্টা যুক্তিঃ যুক্তি একের যারা পক্ষে নন তাদের মতে, রিবাকে ইউজারিবা ব্যক্তিগত প্রয়োজনের ওপর নেয়া সুদ মনে করে কেবল এটা হারাম বলে গণ্য করার কোনো ভিত্তি নেই। তাদের মত হলো, ইসলাম যখন কোনো কিছুকে নিষিদ্ধ করে তখন তা সব ধরনের পরিস্থিতিতেই নিষিদ্ধ থাকবে। কোনো পরিবর্তিত পরিস্থিতির কারণে হারাম হালাল হয়ে যায় না বা তা বদলে যায় না। উদাহরণ হিসেবে কুরআনে বর্ণিত ঘোষিত নিচের নিষিদ্ধ বিষয়গুলো আলোচনা করা যেতে পারে।

ক. মদ (খামার)ঃ মহানবী হজরত মুহাম্মদ সাঃ-এর সময় মদের ধরন এবং তার উৎপাদন পদ্ধতি ছিল ভিন্ন রকম। আধুনিককালের উৎপাদন প্রক্রিয়ার সাথে তার মিল নেই। তার পরও এ মদ সম্পর্কীয় নিষিদ্ধ ভিন্ন রকম। আধুনিককালের উৎপাদন প্রক্রিয়ার সাথে তার মিল নেই। তার পরও এ মদ সম্পর্কীয় নিষিদ্ধ বিধান আধুনিককালে এসে পরিবর্তিত হয়নি, যদিও মদের ধরন ও উৎপাদন প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ বদলে গেছে।

খ. শূকরের মাংস (খিঞ্জির)ঃ শূকর এখন উন্নত খামারে পালিত হয়ে থাকে এবং শূকরের মাংস আধুনিক পদ্ধতিতে প্রস্তুত ও রান্নাবান্না হচ্ছে, যা অবশ্যই আগের মতো নেই। এতদসত্ত্বেও শূকরের মাংস আগের মতোই হারাম রয়ে গেছে,পরিবর্তিত পরিস্থিতির কারণে শূকরের মাংস হালাল করা হয়নি।

গ. অপরাধ বা অনৈতিকতা (আল ফাহেশা)ঃ বিভিন্ন অপরাধ এবং অনৈতিক কাজ আধুনিককালে অনেক উন্নত কায়দায় চালু রয়েছে। যেমন চুরি, ডাকাতি, মারামারি, ঘুষ, দুর্নীতি ইত্যাদি। পরিবর্তিত হয়েছে এসব অপরাধের ধরন ও আচরণ। তার পরও এ সম্পর্কে কুরআনের ঘোষণায় কোনো পরিবর্তন হয়নি। অর্থাৎ অপরাধ ও অনৈতিকতা হারামই রয়ে গেছে। এই একই কার্যকারণ আমরা সুদ ও জুয়ার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য বলে মনে করতে পারি। মহানবী হজরত মুহাম্মদ সাঃ-এর সময়ের তুলনায় সুদের ধরন ও প্রকৃতি বদলালেও সুদকে কোনোভাবেই হালাল হিসেবে গণ্য করা যায় না। এটিও খামার, খিঞ্জির ও আল ফাহেশার মতোই অপরিবর্তনীয়।

যুক্তি দুইঃ মহানবী হজরত মুহাম্মদ সাঃ-এর সময়কালে বাণিজ্যিক সুদের অস্তিত্ব ছিল না।

পাল্টা যুক্তিঃ এই দাবিও সম্পূর্ণ ভুল। আরব ইতিহাসের প্রাক-ইসলামিক এবং ইসলামিক সময়কালের দিকে লক্ষ করলে দেখা যায়, সুদের ধরন শুধু ইউজারির মধ্যে সীমিত ছিল না, তখনো বাণিজ্যিকভাবে এবং মুনাফার ভিত্তিতে ঋণ প্রদান করতে হতো। এ বিষয় সম্পর্কে নিচে কয়েকটি উদাহরণ দেয়া হলো

ক. ওমর বিন আমরের গোত্র মুগাইরা গোত্র থেকে সুদ গ্রহণ করত। ইসলামের আগমনের সময় মুগাইরা আমর থেকে বিরাট অঙ্কের সুদ গ্রহণ করেছিল। উল্লেখ্য, এ দুটি গোত্র ছিল বেশ সচ্ছল। তাহলে এ দুই গোত্র কি নিজেদের ব্যক্তিগত কারণে এবং তাদের খরচ মেটানোর জন্যই সুদের লেনদেন করত? তা মোটেও সত্য নয়। তাদের এই সুদি লেনদেন ছিল বাণিজ্যিক কারণে প্রচলিত।

খ. বর্তমান সৌদি আরবের তায়েফের ইতিহাস প্রমাণ করে যে, ব্যবসায় বাণিজ্য ও শিল্পের বেলায় তায়েফের অবস্থান ছিল মক্কার পরই দ্বিতীয় স্থানে। তায়েফের প্রধান রফতানি ছিল মদ, মোনাক্কা, ছোট আঙুর, গম ও কাঠ। আর শিল্পের মধ্যে প্রধান ছিল চামড়া ও রঙ শিল্প। সাকিফ গোত্র (ইহুদি সম্প্রদায়) তায়েফের ব্যবসায়ী ও মক্কার ব্যবসায়ীদের অগ্রিম টাকা সুদের বিনিময়ে প্রদান করত। মক্কার মুগাইরা গোত্রও ছিল সাকিফ গোত্রের স্থায়ী গ্রাহক। সাকিফ গোত্রের এই লেনদেন শুধু নগদ অর্থের মধ্যে সীমিত ছিল না, পণ্যও লেনদেন করা হতো। তারা উভয়ে ছিল ব্যবসায়ী। তাই তাদের লেনদেন বাণিজ্যিক কারণেই সংঘটিত হতো। নিজস্ব প্রয়োজনে এ ধরনের লেনদেন বা সুদি কারবার চালু ছিল না। তাদের মধ্যে এমনও প্রচলন ছিল যে, ঋণের অর্থ পরিশোধ করতে কেউ ব্যর্থ হলে মূলধনের দ্বিগুণসহ সুদ আদায় করা হতো। এভাবে তাদের মধ্যে সুদের ভিত্তিতে যথারীতি ব্যবসা চলত। মহানবী হজরত মুহাম্মদ সাঃ তায়েফের লোকদের সাথে যখন শান্তিচুক্তি সম্পাদন করেন, তখন তিনি যে শর্ত দেন তা ছিল ১. যাবতীয় সুদি কারবার নির্মূল করতে হবে, ২. তাদের মধ্যকার সুদের দেনাপাওনা পরিত্যাগ করতে হবে।

গ. কুরাইশরা শীতকালে ইয়েমেন এবং গ্রীষ্মকালে সিরিয়ায় বাণিজ্যের জন্য যাতায়াত করত। কুরাইশরা ছিল কাবাঘরের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে নিয়োজিত এবং এটা তাদের জন্য ছিল খুবই সম্মানের বিষয়। তাই ইয়েমেন ও সিরিয়ায় বাণিজ্যের বেলায় কুরাইশরা বিশেষ বাণিজ্য সুবিধা লাভ করত।

ঘ. প্রাক-ইসলামি যুগে আমরা দেখতে পাই, আব্বাস বিন আবদুল মুত্তালিব ও খালিদ বিন ওয়ালিদ যৌথ মূলধনে একটি কোম্পানি গঠন করেন। তাদের প্রধান ব্যবসা ছিল সুদের ভিত্তিতে নগদ ঋণ প্রদান। তাদের মতো আরো অনেকেই সুদি কারবারে জড়িত ছিলেন।

ঙ. তখনকার আরবে হজরত জোবায়ের বিন আউয়াম বিশ্বস্ত লোক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তিনি আধুনিক ব্যাংকিংয়ের মতো লেনদেন পরিচালনা করতেন। লোকেরা তার কাছে আমানত (নিরাপত্তার জন্য) হিসেবে অর্থ জমা রাখত। তিনি আমানতকারীদের এই বলে বোঝাতেন যে, তিনি এ আমাতন ঋণ হিসেবে গ্রহণ করছেন, নিরাপত্তার জন্য আমানত (নিরাপত্তা) হিসেবে নয়। কারণ তিনি জানতেন, এ আমানত ধ্বংস হয়ে গেলে শরিয়াহ অনুযায়ী তিনি এ আমানত ফেরত দিতে পুরোপুরি বাধ্য থাকবেন না, কিন্তু আমানত ঋণ হিসেবে গ্রহণ করলে তা ফেরত দিতে বাধ্য থাকবেন। তিনি এ ব্যাপারে ভীত ছিলেন যে, কোনো আমানত হারিয়ে গেলে বা নষ্ট হলে, আমানতদার হিসেবে তার ভাবমর্যাদা ক্ষুণ্ন হবে। তাই তার কাছে যারা আমানত রাখত, সেটাকে তিনি ঋণ হিসেবে গ্রহণ করতেন, যাতে আমানতের নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় এবং সবার আস্থা অর্জন করতে পারেন। ঋণশব্দটি ব্যবহারের আরো একটি কারণ ছিল এই যে, এ আমানতের দ্বারা তিনি ব্যবসা এবং তার থেকে অর্জিত মুনাফাকে আইনসিদ্ধ করতে চেয়েছিলেন। তিনি জানতেন, আমানতকে যদি শুধু আমানত হিসেবে গ্রহণ করা হয়, তাহলে এটিকে ব্যবসার কাজে লাগানো যেত না এবং এ ব্যাপারে শরিয়াহর কোনো অনুমোদনও ছিল না। এ ঘটনা দ্বারা এ কথা স্পষ্ট যে, সেকালে ধারশুধু খরচের জন্য বা ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার হতো না, বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যেও তার ব্যবহার ছিল।

দ্বিতীয় মতাদর্শঃ এ মতের চিন্তাশীলরা তাদের মতকে যৌক্তিক প্রমাণ করার জন্য দুটি যুক্তি পেশ করে থাকেন।

প্রথম যুক্তিঃ রিবা (সুদ) নিষিদ্ধ হওয়ার কারণ এই যে, একজন ঋণগ্রহীতা লোকসান করার পরও তাকে মূল টাকার ওপর অতিরিক্ত দিতে হচ্ছে, যা তার ওপর শোষণের শামিল। অথচ ঋণদাতা কোনো প্রচেষ্টা ছাড়াই তার পুঁজির ওপর অতিরিক্ত কিছু পাচ্ছে। এটা অবিচার। কিন্তু বাণিজ্যিক সুদের ব্যাপারে এ ধরনের কার্যকারণ ক্রিয়াশীল থাকে না। এ ক্ষেত্রে ঋণদাতা ও ঋণগ্রহীতা উভয়ে মুনাফা অর্জন করে থাকে। ঋণগ্রহীতা ঋণের অর্থ ব্যবসায় খাটায় এবং ঋণদাতা সুদের আকারে তার মূলধনের ওপর মুনাফা অর্জন করে। অতএব, কেউ এ ধরনের লেনদেনে অসুন্দর বা অন্যায় কিছু আছে বলে মনে করে না।

পাল্টা যুক্তিঃ নিঃসন্দেহে ওপরের যুক্তিটি আপাতদৃষ্টিতে খুবই আকর্ষণীয় বলে মনে হয়। কেননা এই যুক্তিতে ধারণা করা হয় যে, বাণিজ্যিক সুদের বেলায় কোনো পক্ষই ক্ষতিগ্রস্ত হয় না। কিন্তু চিন্তাভাবনা করলে এ কথাই প্রমাণিত হয় যে, কুরআন কেবল সেটাই নিষিদ্ধ করেনি যাতে একজন লোকসানের সম্মুখীন হয়, অন্যজন মুনাফা অর্জন করে; বরং একই ব্যবসা থেকে একজন নিশ্চিত লাভ পাবে এবং আরেকজন মুনাফার ব্যাপারে অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকবে।

যুক্তি দুইঃ এ যুক্তিটি কুরআনের সূরা নিসার ২৯ নম্বর আয়াতহে যারা ঈমান এনেছ! তোমরা একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে খেয়ে ফেলো না। তবে ওই সব ব্যবসা-বাণিজ্য যা তোমাদের পরস্পরের সম্মতিক্রমে হয় তা বৈধের ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত।এখানে অন্যায়ভাবে সম্পদ আহরণকে কুরআন নিষিদ্ধ করেছে। স্বাভাবিকভাবে বলা যায়,যে অন্যায়ভাবে অন্যের সম্পদ আত্মসাৎ করে বা খেয়ে ফেলে, তার জন্য ওই ব্যক্তির সম্মতি নেয়ার প্রয়োজন পড়ে না। তাই আমরা এ সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারি যে, কোনো লেনদেনে উভয়পক্ষের সম্মতি থাকলে তা অন্যায়ভাবে সংঘটিত হয়েছে বলা যায় না। এই মতানুসারে, বাণিজ্যিক সুদ অনুমোদনযোগ্য, যেহেতু এতে উভয়পক্ষের সম্মতি বর্তমান থাকে। অন্য দিকে একপক্ষ অতিরিক্ত লাভ করলে এবং অপরপক্ষ নিরুপায় হয়ে লোকসানের সম্মুখীন হলে সে ক্ষেত্রে রিবা নিষিদ্ধ।

পাল্টা যুক্তিঃ এটা অতি ভাসা ভাসা বা অগভীর ধরনের যুক্তি। ইসলামে কোনো কিছু নিষিদ্ধ হওয়া না হওয়ার জন্য পারস্পরিক সম্মতি কোনো বিষয় নয়। কেননা, ব্যভিচার কি উভয়ের সম্মতি থাকলে জায়েজ বা বৈধ হয়ে যাবে?অবশ্যই নয়। অতএব, ইসলামে বাণিজ্যিক সুদ এবং ইউজারি বা মহাজনি সুদ অর্থাৎ ব্যক্তিগত প্রয়োজনে নেয়া ঋণের ওপর সুদ উভয়ই নিষিদ্ধ বা হারাম।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: