ইসলামের আলোকে পরিবেশ সংরক্ষণ

ইসলামের আলোকে পরিবেশ সংরক্ষণ


পরিবেশ মহান আল্লাহতায়ালার মহান সৃষ্টি। মানুষের কল্যাণ ও স্বাভাবিক প্রয়োজনের তাগিদে পরিবেশের যাবতীয় জিনিস আল্লাহ তৈরি করেছেন। এর কোনোটাই অপ্রয়োজনে সৃষ্টি করা হয়নি। আল্লাহপাক এ বিষয়ে কুরআনপাকে সূরা লুকমানের ২০ নম্বর আয়াতে ঘোষণা করেছেন, ‘তিনি পৃথিবীর সব কিছু তোমাদের কল্যাণের জন্য সৃষ্টি করেছেন। তোমরা কি দেখো না, নিশ্চয়ই আসমান ও জমিনের যা কিছু আছে সবই আল্লাহতায়ালা তোমাদের কল্যাণে নিয়োজিত রেখেছেন এবং তোমাদের প্রতি তার প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য নিয়ামতগুলো পরিপূর্ণ করে দিয়েছেন।সূরা আল-বাকারার ২৯ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘তিনি পৃথিবীর সব কিছু তোমাদের কল্যাণের জন্য সৃষ্টি করেছেন।সূরা ইয়াসিনের ৩৩ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেন, ‘তাদের জন্য একটি নিদর্শন মৃত ভূমি। আমি একে সঞ্জীবিত করি এবং তা থেকে উৎপন্ন করি শস্য, তা তারা ভক্ষণ করে। আমি তাতে সৃষ্টি করি খেজুর এবং প্রবাহিত করি ঝর্ণা। যাতে তারা ফল পায়।একই বিষয়ে সূরা বাকারার ২২ নম্বর আয়াতে আল্লাহপাক বলেন, ‘যে পবিত্র সত্তা তোমাদের জন্য ভূমিকে বিছানা ও আকাশকে ছাদস্বরূপ করে দিয়েছেন আর আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করে তোমাদের জন্য ফল-ফসল উৎপন্ন করেছেন তোমাদের খাদ্য হিসেবে।সূরা আল কামারে বলা হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই আমি সব জিনিস সৃষ্টি করেছি সুস্পষ্টভাবে ও সুনির্দিষ্ট পরিমাপ অনুযায়ী।

ওপরে উল্লেখিত কুরআনের আয়াতগুলো থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, দুনিয়ার সৃষ্টি, উপায়-উপকরণ আমাদের জন্য পরম নিয়ামত। এগুলোর সংরক্ষণ, যথাযথ ব্যবহার, যত্ন ও পরিচর্যা ঈমানী দায়িত্বের অংশ। আমরা যদি এই পরিবেশকে রক্ষা না করি তাহলে আমাদের জন্য বিপর্যয় অবধারিত। বলা আবশ্যক, আজ দুনিয়াজুড়ে যে বিপর্যয় ও অশান্তি সৃষ্টি হয়েছে তা আমাদের নিজেদেরই তৈরি। মহান আল্লাহপাক এ জন্য সূরা রুমের ৪১ নম্বর আয়াতে বলেছেন, ‘জলে-স্থলে যে বিপর্যয় দেখা দিয়েছে তা মানুষের অর্জনেরই ফল।

এ জন্য মানবতার নবী, বিশ্ব সম্প্রদায়ের অন্যতম কল্যাণকামী আদর্শ মানুষ হজরত মুহাম্মদ সাঃ মানুষের উত্তম জীবন ধারণ ও কল্যাণ সাধনের জন্য সচেষ্ট ছিলেন। উন্নত পরিবেশ তৈরিতে আমাদের প্রিয় নবী ছিলেন বিশেষ যত্নবান। পরিবেশ সংরক্ষণের অন্যতম দিকনির্দেশক ছিলেন তিনি। মানুষের উপযোগী পরিবেশ রক্ষায় মহানবী সাঃ আমাদের জন্য প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দিয়ে গেছেন। নিচে মহানবী সাঃ-এর নির্দেশনা সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো।

১. সামাজিক বিপর্যয় রোধে মহানবী সাঃ মানুষ সমাজবদ্ধ জীব। সমাজে মিলেমিশে বসবাস করা ছাড়া সামাজিক স্বস্তি ও শান্তি অসম্ভব। সমাজে শান্তি না এলে মানবিক বিপর্যয় অনিবার্য। রাসূল সাঃ বলেন, ‘পরম দয়ালু আল্লাহতায়ালা দয়াকারীকে দয়া করেন।’ ‘যার অনিষ্ট থেকে তার প্রতিবেশী নিরাপদ নয় সে মুমেন নয়।’ ‘ওই ব্যক্তি মুমেন নয়, যে ব্যক্তি পেটপুরে খায় আর তার প্রতিবেশী পাশে ক্ষুধার্ত থাকে।’ ‘এক মুসলমান অপর মুসলমানের ভাই। সে তাকে জুলুম করবে না, অপমান করবে না এবং অসম্মান করবে না।একজন মুসলমানের ওপর অপর মুসলমানের জান, মাল ও ইজ্জত হারাম।শুধু মুসলমানদের বিষয়ই নয়, সমাজের অমুসলিমদের প্রতিও যত্নশীল হয়ে দায়িত্ব পালন করে সামাজিক স্থিতি বা পরিবেশ সুষ্ঠু রাখতে হবে। তাই তিনি বলেছেন, ‘কোনো অমুসলিম নাগরিককে যে অত্যাচার করল বা অধিকার ক্ষুণ্ন করল বা তাকে সাধ্যাতীত পরিশ্রম করাল বা তার অমতে তার কাছ থেকে কিছু নিয়ে নিলো,কিয়ামতের দিন আমি হবো তার বিপক্ষে মামলা দায়েরকারী।তিনি সমাজের সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষার জন্য তাগিদ দিয়ে আরো বলেছেন, ‘যে কোনো সংখ্যালঘুকে হত্যা করল সে বেহেশতের ঘ্রাণও উপভোগ করতে পারবে না। অথচ বেহেশতের সুঘ্রাণ চল্লিশ বছরের দূরত্ব হতেও অনুভব করা যাবে।সামাজিক পরিবেশ রক্ষায় এমন সুন্দর নির্দেশনা ও সুবিচারপূর্ণ বিধান দুনিয়ার কোনো ধর্ম কিংবা মতবাদে বিধৃত হয়নি।

২. প্রাকৃতিক পরিবেশ সংরক্ষণে মহানবী সাঃ প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষার দাবিতে দুনিয়াজুড়ে আজ সম্মিলিত রব উঠেছে। মানুষের অদূরদর্শিতা এবং অমানবিক আচরণের কারণে প্রাকৃতিক যে ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়েছে তা তাবৎ বিশ্বের মানুষের ওপর বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। ফলে বায়ুতে বেড়েছে দূষণ, বেড়েছে তাপমাত্রা, বৃদ্ধি পেয়েছে রোগ-শোক এবং প্রাকৃতিক নানা দুর্যোগ। তাই এসব বিপর্যয় থেকে বাঁচার জন্য বিজ্ঞানীরা বন রক্ষা এবং বৃক্ষ রোপণকে অন্যতম উপায় বলে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। অথচ মহানবী সাঃ বৃক্ষ বা বন রক্ষার জন্য তাগিদ দিয়ে গেছেন সেই চৌদ্দ শবছর আগে। বৃক্ষ বা শস্য নষ্ট করাকে নিরুৎসাহিত করতে রাসূল সাঃ মানুষকে উপদেশ দিয়েছেন। এক ব্যক্তি একটি গাছের পাতা ছিঁড়লে রাসূল সাঃ বললেন, ‘প্রত্যেকটি পাতা আল্লাহর মহিমা ঘোষণা করে।বৃক্ষ রোপণকে উৎসাহিত করেছেন মহানবী সাঃ। গাছপালা, লতা-পাতা মানুষ ও জীবজন্তুর জন্য খাদ্য সরবরাহ করে, মানুষ ও জীবের জন্য অক্সিজেন সরবরাহ করে এবং পরিবেশকে দূষণমুক্ত করে। গাছপালা ঝড়ঝঞ্ছা প্রতিরোধ করে এবং মাটির ক্ষয় রোধ করে। এ প্রসঙ্গে নবীজি এক হাদিসে বলেছেন, ‘কোনো মুসলমান যদি একটি বৃক্ষের চারা রোপণ করে অথবা ক্ষেতখামার করে, অতঃপর তা মানুষ, পাখি কোনো জন্তু ভক্ষণ করে, তা তার জন্য সদকার সওয়াব হবে।হজরত আয়েশা রাঃ থেকে বর্ণিত হয়েছে, নবী করিম সাঃ বলেছেন, ‘যদি নিশ্চিতভাবে জানো যে, কিয়ামত এসে গেছে,তখন হাতে যদি একটি গাছের চারা থাকে যা রোপণ করা যায়, তবে সেই চারাটি লাগাবে।

৩. পানি সংরক্ষণে মহানবী সাঃ-এর নির্দেশনাঃ পানি মানুষ এবং জীব জগতের বেঁচে থাকার সবচেয়ে বড় অবলম্বন। পানি ছাড়া বেঁচে থাকা অসম্ভব। পানি দূষিত হলে মাটি, বায়ু ও খাদ্য দূষিত হয়ে পড়ে। বর্তমানে পৃথিবীর ৬০ ভাগ পানিই দূষিত। ফলে রোগ-শোক, জ্বরা-ব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছে মানুষ ও পশুপাখি। মহানবী সাঃ ঘোষণা করেছেন, ‘তোমরা লানত আনয়নকারী তিন প্রকার কাজ থেকে নিজেদের বিরত রাখো। তা হলো পানির উৎসগুলোয়, রাস্তা-ঘাটে ও বৃক্ষের ছায়ায় মলমূত্র ত্যাগ করা।তিনি আরো বলেছেন, ‘তোমরা কেউ বদ্ধ পানিতে প্রস্রাব করে তাতে অজু করো না।

৪. পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা রক্ষায় মহানবী সাঃ বাঁচার জন্য দরকার নিজেদের দেহ-মনকে সতেজ ও নির্মল রাখা। আর এটা নির্ভর করে ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট ও পারিপার্শ্বিক পরিবেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার ওপর। মন ও জীবনকে সুন্দর ও কলুষতামুক্ত রাখা গেলে রোগ-শোক, অসুস্থতা ইত্যাদি থেকে পরিত্রাণ পাওয়া সহজ। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার ব্যাপারে বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ সাঃ বলেছেন, ‘তোমরা তোমাদের পারিপার্শ্বিক পরিবেশকে দূষণমুক্ত করো এবং পবিত্র রাখো।’তিনি আরো বলেন, ‘আল্লাহতায়ালা পবিত্র, তাই তিনি পবিত্রতা ভালোবাসেন। তিনি পরিচ্ছন্ন, তাই পরিচ্ছন্নতা ভালোবাসেন। তিনি সম্মানিত এবং সম্মানিতকে ভালোবাসেন। তোমরা তাই তোমাদের পারিপার্শ্বিক পরিবেশকে পবিত্র রাখো।’ ঈমানের ৭২টি শাখা। তন্মধ্যে সর্বোত্তমটি হলো ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ আর সর্বনিু হচ্ছে রাস্তাঘাট থেকে ক্ষতিকারক জিনিস দূর করা। লজ্জা ঈমানের একটি শাখা।’ শুধু তাই নয়, মানুষের দেহমনকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার ব্যাপারেও মহানবী সাঃ নির্দেশ দিয়েছেন। সে ক্ষেত্রে বায়ু দূষণের হাত থেকে দেহের ভেতরকে রক্ষা করার তাগিদ দিয়েছেন তিনি। কেননা, বায়ু অপরিচ্ছন্ন বা দূষিত হলে তা মানুষের দেহাভ্যন্তরে ক্ষতের সৃষ্টি করে। রাসূল সাঃ তাই বলেছেন, ‘সাবধান! মানুষের দেহাভ্যন্তরে একটি গোশতের টুকরা আছে, সেই গোশতের টুকরাটি যখন ভালো ও সুস্থ থাকবে, পুরো শরীরই ভালো ও সুস্থ থাকবে। আর এটি বিনষ্ট বা কলুষিত হলে পুরো শরীরটাই খারাপ ও বিনষ্ট হয়ে যাবে। মনে রেখো সেই গোশতের টুকরাটি হচ্ছে মানুষের কালব বা হৃৎপিণ্ড।’

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: