ইউরোপে ইসলাম ও মুসলমান

ইউরোপে ইসলাম ও মুসলমান


৯ সেপ্টেম্বর ২০০১ সালে টুইন টাওয়ার ধ্বংস এবং ৭ জুলাই ২০০৫ লন্ডনে বোমা হামলা সমগ্র বিশ্বের মুসলমানদের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যবহ এবং বেদনাদায়ক দুটো দিন। এর সূত্র ধরে দেশে দেশে বিভিন্ন প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক প্রচারমাধ্যম, গবেষণাধর্মী পুস্তিকা এবং রাজনৈতিক টকশোর মাধ্যমে বিশ্ব-শান্তির বার্তাবাহক মহানবী সাঃ-এর অনুসারীদের সন্ত্রাসী হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা আমরা লক্ষ করছি। যদিও মুসলিমবিশ্বের সবাই দুটো ঘটনাকেই বর্বরোচিত কাজ হিসেবে নিন্দা করেছে এবং এতে আহত ও নিহতদের মধ্যে অনেক মুসলমানও রয়েছেন। উভয় ঘটনার কারণ সম্পর্কে নানা মুনির নানা মত আছে এবং দুটো ঘটনা সঙ্ঘটিত হওয়ার পর তা বিশ্লেষণ করে দেশে দেশে অনেক আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে। আমি এখানে এর কারণ বিশ্লেষণে না গিয়ে মুসলিম উম্মাহর এক নগণ্য সদস্য হিসেবে আত্মসমালোচনার আকারে কিছু কথা উপস্থাপনের চেষ্টা করব।

বিলাতে বাস করার কারণে আমার কথাগুলো ইউরোপ-আমেরিকায় বসবাসকারী মুসলমানদের জন্য অধিকতর উপযোগী হলেও বিশ্বের সব মুসলমানেরই বিষয়গুলো নিয়ে ভাবা দরকার। পরিবর্তিত বিশ্ব-পরিস্থিতির আলোকে সবার দৃষ্টিভঙ্গি এবং কর্মকৌশলে পরিবতর্ন আনা দরকার। বর্তমান সময়ে সমগ্র পৃথিবীকে বলা হয় গ্লোবাল ভিলেজ। প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির কারণে দূর প্রাচ্যের যেকোনো দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে অবস্থিত একটি গ্রাম একজন লন্ডন বা নিউইয়র্কবাসীর কাছে অনেক সময় পাশের বাড়ি বলে অনুভূত হয়। কোথাও কোনো ঘটনা-দুর্ঘটনা সংঘটিত হলে মুহূর্তের মধ্যে তা গোটা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ে। বাংলাদেশ বা পাকিস্তানের কেউ ঘরে বসে কোনো কথা বললে তা টেলিফোন বা ই-মেইলের মাধ্যমে আমরা সাথে সাথে জেনে নিই বা জেনে নিতে পারি। তাই পৃথিবীর যেকোনো স্থান থেকে কোনো বক্তব্য প্রদান এবং পদক্ষেপ গ্রহণের আগে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এর প্রতিক্রিয়াও বিবেচনা করে দেখতে হবে।

বিলাতে আমি প্রথম আসি ভিজিটর হিসেবে ১৯৮৫ সালে। এখানে পা দিয়েই অনুধাবন করেছি, এ দেশে মুসলমানদের স্থায়ীভাবে এবং ইজ্জত-সম্মানের সাথে বসবাস করতে হলে এ দেশকে নিজের দেশ হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। এ দেশকে এবং এ দেশের মানুষকে ভালোবাসতে হবে। সে সময় আমি ব্রাডফোর্ড মদিনাতুল উলুম মাদ্রাসার ছাত্রদের বার্ষিক পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠানে পরিবেশনের জন্য একটি গান লিখে দিই। সে গানের প্রথম দুই লাইন ছিল, ‘দিস আইল ইজ আওয়ার, বি ব্রাইট ইটস ফিউচার এই দ্বীপ বা এই দেশ আমাদের, উজ্জল হোক এর ভবিষ্যৎ।পরে যখন ১৯৯১ সালে স্থায়ীভাবে বসবাসের উদ্দেশ্যে এ দেশে আসি তখন থেকে সেই ১৯৮৫ সালে লিখিত গানের বাণীকে সবার মাঝে ছড়িয়ে দিয়ে তা সমবেত কণ্ঠে গাওয়ার চেষ্টা করছি। তখন দেখেছি আমার মতো আরো অনেকেই এ মতের অনুসারী। কিন্তু আমরা যারা সমস্বরে এ বাণী উচারণ করছি তাদের তুলনায় মুষ্টিমেয় যে কজন ঘৃণা ও বিদ্বেষ ছড়ায় তারা এতটা উচ্চকণ্ঠ যে বৃহত্তর কমিউনিটিতে আমাদের ক্ষীণ আওয়াজ তেমন শ্রুত হচ্ছে না।

এ দেশে বর্তমানে প্রায় আড়াই মিলিয়ন মুসলমান আছেন। এর বেশির ভাগ এসেছেন গত পঞ্চাশ বছরের মধ্যে। মরক্কো থেকে ইন্দোনেশিয়া পর্যন্ত মুসলিমপ্রধান দেশগুলো থেকে অনেক মুসলমান এ দেশে আসার জন্য এখনো লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন। নিজ মাতৃভূমির রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক অবস্থা বেঁচে থাকা বা শান্তিতে জীবনযাপনের উপযোগী না হওয়ায় আমরা বেশির ভাগ মুসলমান এ দেশে এসেছি এবং পরিবার-পরিজন নিয়ে স্থায়ীভাবে বসবাস করছি। বেশির ভাগ মুসলিমপ্রধান দেশের তুলনায় এ দেশে অনেক বেশি শান্তি ও নিরাপত্তা রয়েছে। তাই আমরা এ দেশে আছি এবং এ দেশের সরকারপ্রদত্ত সব সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছি। কিন্তু এ দেশ এবং এ দেশের মানুষের ব্যাপারে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি কী? আমরা কি এ দেশকে ভালোবাসি? এ দেশের উন্নয়নের জন্য আমরা কতটুকু উদগ্রীব? এ দেশের রাজনীতি ও সামাজিক কাজকর্মের সাথে আমরা কতটুকু জড়িত? আমাদের নীতি ও মূল্যবোধ এ দেশের জন্য কতটুকু উপযোগী? এসব প্রশ্ন আমার নয়, এ দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর। তাদের মনে এমনিতেই এসব প্রশ্ন ছিল। পরিবর্তিত আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে তা নতুন মাত্রা পেয়েছে মাত্র।

বলা বাহুল্য এ দেশের ব্যাপারে আমাদের মনোভাব তৈরি ও তা লালনে আমাদের আলেমসমাজ এবং এখানে বসবাসকারী দেশকেন্দ্রিক রাজনীতিবিদরা মুখ্য ভূমিকা পালন করেন। দেশকেন্দ্রিক রাজনীতিবিদরা ছেড়ে আসা দেশীয় রাজনীতি নিয়ে আমাদের এতই ব্যস্ত করে রাখেন যে বিলাতের রাজনীতি নিয়ে আমরা চিন্তাভাবনা করতে পারি না। যে দেশ আপনাকে রাখতে পারেনি বা তাড়িয়ে দিয়েছে তার প্রতি আপনি প্রেম নিবেদন করবেন এবং যে দেশ আপনাকে আশ্রয় দিয়েছে তার প্রতি ঘৃণা পোষণ করবেন তা হতে পারে না। যুক্তি ও বিশ্বস্ততার দাবি হচ্ছে, আমরা যে দেশের আলো-বাতাসে বাস করব সে দেশের প্রতি আমাদের ভালোবাসা থাকবে এবং এর উন্নয়নে ভূমিকা রাখব। ব্রিটেন আমাদের জন্য দারুল হরব নয়, দারুল আমান। আমাদের জন্য এটা মহানবী সাঃ-এর যুগের খ্রিষ্টান শাসক নাজ্জাশির আবিসিনিয়ার মতো। এখানে স্থায়ীভাবে বসবাসের সিদ্ধান্ত বা এ দেশের নাগরিকত্ব গ্রহণের কারণে এ দেশের মানুষকে আমাদের ইয়া কাওমিবা হে আমার জাতির লোকেরাবলে সম্বোধন করতে হবে। কোনো দেশ বা জনগোষ্ঠীর প্রতি কারো ভালোবাসা থাকলেই তাদের কল্যাণের জন্য সে কাজ করতে এবং সে দেশের অধিবাসীর ওপর যেকোনো হামলা প্রতিরোধে জীবন পণ করে এগিয়ে আসতে পারে। আমাদের দেশ বা দেশের মানুষের প্রতি ভালোবাসার কথা শুধু মুখে বললে হবে না, এ দেশের রাজনৈতিক তৎপরতায় অংশ নিয়ে এর প্রমাণ দিতে হবে। নবী ইউসুফ আঃ যেভাবে মিসরের অমুসলিম শাসক এবং বাসিন্দাদের দুর্ভিক্ষ থেকে রক্ষার দায়িত্ব পালন করেছেন ঠিক সেভাবে এ দেশের কল্যাণের জন্য আমাদের কাজ করতে হবে।

পৃথিবীর সব কটি মুসলিম দেশের সাথে ব্রিটেনের বন্ধুত্বপূর্ণ চুক্তি রয়েছে। সে হিসেবে ব্রিটেন আমাদের বন্ধুরাষ্ট্র। বন্ধুরাষ্ট্র ও এর জনগণের মান-মর্যাদার প্রতি সম্মান প্রদর্শন এবং ধনসম্পদের নিরাপত্তা বিধান নিশ্চিত করা প্রত্যেক মুসলমানের ধর্মীয় কর্তব্য। যারা ব্রিটিশ নাগরিকত্ব গ্রহণ করেছেন তাদের দায়িত্ব আরো এক ধাপ এগিয়ে আছে। তারা ব্যক্তিগতভাবে এ দেশের আইন মেনে চলার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন এবং দেশের নাগরিক হিসেবে এর স্বার্থবিরোধী কোনো তৎপরতায় তারা নীতিগতভাবে জড়িত হতে পারেন না। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী এর ব্যতিক্রম করলে ইসলামি বিধান অনুযায়ী তিনি বা তারা চুক্তিভঙ্গের অপরাধে অপরাধী হবেন।

বর্তমান যুগে রাজনীতি জীবনের সব ক্ষেত্রে পরিব্যাপ্ত। জীবনের প্রায় সব কিছু রাজনৈতিক নেতৃত্ব নিয়ন্ত্রণ করছে। তাই এ দেশের একজন অতি সাধারণ মানুষও রাজনীতি নিয়ে চিন্তাভাবনা করে এবং প্রয়োজনে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করে। যে তৎপরতার সাথে আমরা নিজেরাসহ এ দেশের সব মানুষের সুখ-দুঃখ জড়িত সে তৎপরতার ব্যাপারে আমরা নীতিগতভাবে উদাসীন থাকতে পারি না। কিন্তু এটা সুস্পষ্ট যে এ ব্যাপারে আমাদের উদাসীনতা ও উন্নাসিকতা এ কথা উঁচুকণ্ঠে ঘোষণা দিচ্ছে যে, এ দেশকে আমরা আপন করে নিতে পারিনি। আমরা এখনো নিজেদের বহিরাগত বা অতিথি হিসেবে বিবেচনা করছি।

এ দেশে যারা ইসলামের বাণী প্রচার করেন তাদের শতকরা ৯৯ জন এসেছেন বাংলাদেশ, পাকিস্তান, মিসর, সৌদি আরব প্রভৃতি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকা থেকে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, তারা যখন ইসলামের কথা বলেন তখন তারা যে দেশে বড় হয়ে এসেছেন সে দেশে লালিত ধ্যান-ধারণার ঊর্ধ্বে উঠতে পারেন না। তাদের একপেশে এবং অসামঞ্জস্যপূর্ণ বক্তৃতা-বিবৃতি অমুসলমান তো দূরের কথা, এ দেশে বসবাসকারী মুসলমানদেরই আকৃষ্ট করতে পারে না।

মহানবী সাঃ ও তাঁর নিজ হাতে গড়া সাহাবাদের জীবন পর্যালোচনা করলে আমরা আমাদের ত্রুটিগুলো বুঝতে পারব। স্থানীয় অধিবাসীদের মানসিকতা বিচার করে কথা বলা এবং সমসাময়িক পরিস্থিতির আলোকে অগ্রাধিকার নির্ধারণকে কুরআন অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে। মহানবী সাঃ এবং তাঁর সহাবারা সেভাবেই তাদের কর্মপন্থা নির্ধারণ করেছেন। মহানবী সাঃ মক্কার অমুসলিম সমাজে কাজ শুরু করেন এবং মুসলমানরা যখন আবিসিনিয়া হিজরত করেন তখন সেটা ছিল একটি খ্রিষ্টান সমাজ। মহানবী সাঃ মদিনায় হিজরতের আগে অনেক সাহাবি মদিনায় চলে গিয়েছিলেন। সেখানেও তারা অমুসলিম সমাজে কাজ করেছেন। ইসলামের এ তিনটি পর্যায় অমুসলিম সমাজে বসবাসকারী মুসলমানদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এর আলোকে বিলাতের মুসলমানদের প্রয়োজন সামনে রেখে কথা বলার মতো আমাদের আলেম কোথায়? শুধু তা-ই নয়, অনেক বছর আগে বাংলাদেশ, পাকিস্তান, মিসর অথবা ভারতের পরিস্থিতি সামনে রেখে যেসব বই লেখা হয়েছে সে বইয়ের বাস্তব উপযোগিতা কতটুকু তা বিবেচনা না করেই আমরা এসব বই এ দেশে প্রকাশ, বিতরণ এবং মাদ্রাসাগুলোর সিলেবাসের অন্তর্ভুক্ত করছি। ফলে যা হওয়ার তা-ই হচ্ছে। আমাদের সব কিছু লেজেগোবরে অবস্থার মধ্য দিয়ে চলছে।

আমরা জানি, ইসলামের কথা বলতে হবে সুন্দরভাবে, প্রজ্ঞার সাথে। মসজিদে নববীতে এক বেদুইন এসে প্রস্রাব করে। সাহাবিরা তাকে মারতে গেলে মহানবী সাঃ তাদের বিরত করে বলেন, এক বালতি পানি ঢেলে জায়গাটা সাফ করে ফেল। মানুষের জন্য সহজ করো, কঠিন করো না; সুসংবাদ দাও, মানুষকে বিরক্ত করো না। কুরআন আমাদের অমুসলিমদের দেবদেবীর ব্যাপারে কটুকথা না বলতে নির্দেশ দিয়েছে। ফেরাউনের মতো খোদাদ্রোহীর ব্যাপারে নবী মুসা ও হারুন আঃ-এর প্রতি আল্লাহর নির্দেশ ছিল, তোমরা ফেরাউনের সাথে নরম ভাষায় কথা বলবে। কিন্তু আমরা নরম ভাষায় কথাই বলতে পারি না। বজ্রকণ্ঠ বাংলাদেশ বা পাকিস্তানের জন্য উপযোগী হতে পারে, কিন্তু বিলাতের জন্য তা সম্পূর্ণ বেমানান।

আমাদের এক শ্রেণীর আলেম এ দেশে পা দিয়েই বলেন, ‘এটা কাফেরদের দেশ।তাই যদি হয় তাহলে এ দেশে কেন এসেছেন? কেউ কি আপনাকে গ্রেফতার করে এখানে নিয়ে এসেছে? এর আরেকটি দিক রয়েছে। নীতিগতভাবে আমরা এ দেশকে কাফেরদের দেশ বলতে পারি না। এটা ঠিক যে এ দেশের বেশির ভাগ মানুষ কাগজ-কলমে অমুসলমান অর্থাৎ খিষ্টান। মুসলমানদের কুরআনে খ্রিষ্টানদের কাফের না বলে আহলে কিতাববলে সম্বোধন করা হয়েছে। আমরা যার ইবাদত করি তিনি যাদের সম্মান দিয়ে আহলে কিতাব বলে ডাক দিয়েছেন, আমরা তাদের কাফের বলে সম্বোধন করার কারণ কী? যেখানে অমুসলমানরা কাফেরশব্দটিকে গালি হিসেবে গ্রহণ করে সেখানে অমুসলিম অধুøষিত দেশে আহলে কিতাবদের কাফের হিসেবে অভিহিত করা কতটুকু সঙ্গত? এটা কি অজ্ঞতা না ঘৃণা? এর কোন কারণটি ইসলাম ধর্মের প্রতিনিধি হিসেবে আপনাদের জন্য গৌরবের? আপনি তো তাঁর প্রতিনিধি যাকে বিশ্বজাহানের জন্য রহমত হিসেবে প্রেরণ করা হয়েছে। আপনার মুখ থেকে উচ্চারিত হবে ঘৃণা নয়, ভালোবাসার বাণী। আপনারা কি জানেন, আপনাদের মুখ থেকে উচ্চারিত এ কাফের অভিধার পরিণতি কী হচ্ছে? ইসলাম সম্পর্কে অনভিজ্ঞ মা-বাবার মুখ থেকে তা আমাদের কোমলমতি ছেলেমেয়ের কাছে সংক্রমিত হচ্ছে এবং তারা বেপরোয়াভাবে যত্রতত্র তা ব্যবহার করছে।

আরেকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কথা এখানে উল্লেখ করা দরকার। ইসলাম কি শুধু মুসলমানদের জন্য এসেছে? কুরআন কি শুধু মুসলমানদের জন্য হিদায়াত? মুসলমানরা কি শুধু মুসলমানদের কল্যাণের জন্য কাজ করবে? নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে কেউ যদি আমাদের তৎপরতা পর্যালোচনা করে তা হলে কী বুঝবে? ইসলাম সমগ্র মানবতার সম্পদ। সে সম্পদকে মুসলমানদের জন্য সীমাবদ্ধ করার দায়ে কে প্রকৃত অপরাধী? বাঙালি বা পাকিস্তানি কমিউনিটি আয়োজিত মুসলমানদের কোনো সমাবেশে কি এ দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের জন্য কোনো আবেদন থাকে? ফিলিস্তিন, ইরাক বা গুজরাটের ব্যাপারে আমরা ক্রন্দন করি; কিন্তু রুয়ান্ডা, জিম্বাবুয়ে, লুজিয়ানা বা সিংহলের মানুষ কি আমাদের ক্রন্দনের হকদার নয়? ইসলাম পৃথিবীর সব নির্যাতিত-নিপীড়িত মানবগোষ্ঠীর জন্য মুক্তির আবেহায়াত। শুধু মানুষ নয়,গাছপালা ও পশুপাখির নিরাপত্তা বিধানের দায়িত্বও মুসলমানদের ওপর বর্তায়। কিন্তু মুসলমানদের আচরণ দেখে আমরা তা কতটুকু বুঝতে পারি? মানবতার যেসব মহান বাণী আমরা শুনতে পাই এসব কথা ১৪০০ বছর আগে ইসলাম অনেক কঠোর ভাষায় উচ্চারণ করেছে।

হালাল খাবার, মসজিদ বা কমিউনিটি সেন্টার নিয়ে আমরা কতৃêপক্ষের সাথে হাজারো দেন-দরবার করি। ঢাকা বা মিসরে বোমা হামলা হলে রাস্তায় মিছিল করি। এ দেশের হাউজিং সমস্যা, ড্রাগস, আইনশৃঙ্খলার অবনতি, টিউশন ফি,পরিবারে ভাঙন ইত্যাদি সমস্যা কি ইসলামী সমস্যা নয়? আমরা জানি, রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক জিনিস অপসারণ করা ঈমানের অংশ। মানুষের দুঃখ-কষ্টের সময় তাদের পাশে দাঁড়ানো মহানবী সাঃ-এর সুন্নত। কিন্তু ইস্ট লন্ডনের মাদক সমস্যা বা গ্যাং-ফাইট প্রতিরোধে সপ্তাহে একটা দিন আমরা ব্যয় করতে পারি না। আমরা স্কুলের প্যারেন্টস ইভিনিংয়ে গিয়ে ছেলেমেয়ের শিক্ষার ব্যাপারে খোঁজ নিতে পারি না, কিন্তু বাংলাদেশী মন্ত্রী-মিনিস্টারকে সংবর্ধনা দিতে বা তাদের পেছনে অর্থ ও সময় দেয়ার ব্যাপারে কার্পণ্য করি না।

মুসলমানদের মধ্যে এমন লোকের অভাব নেই যারা মনে করেন বর্তমান যুগে ইসলাম অচল এবং ইসলাম অন্যান্য ধর্মের মতো শুধু মানুষের সাথে তার সৃষ্টিকর্তার ব্যক্তিগত সম্পর্কের নাম। আধুনিক মানুষের বহুমুখী জটিল সমস্যার সুষ্ঠু সমাধান সেখানে অন্বেষণ করা বাতুলতা মাত্র। ইসলাম সম্পর্কে ভুল ধারণার কারণেই তাদের মধ্যে এ ধরনের মনোভাব সৃষ্টি হয়েছে। মুসলমানদের মধ্যে এ ধরনের ভুল ধারণার জন্য পাশ্চাত্যকে দায়ী করার একটা প্রবণতা আমাদের মধ্যে রয়েছে। কিন্তু এ জন্য আমরা যারা নিজেদের ইসলামের ধারক ও বাহক মনে করি তারা কি কম দায়ী? আধুনিক মানসকে আকৃষ্ট করার মতো আকর্ষণীয়ভাবে কি আমরা ইসলামকে উপস্থাপন করতে পারছি? যে আদর্শ বাস্তব জীবনে চলার পথে কোনো দিকনির্দেশনা দিতে ব্যর্থ তার প্রতি মানুষ কেন আকর্ষণ অনুভব করবে? বিলাত-আমেরিকায় যারা ইসলাম গ্রহণ করছে তারা মুসলমানদের কথা শুনে বা কাজ দেখে ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় নিচ্ছে না। তারা নিজেদের অনুসন্ধিৎসু মনের কারণে ইসলাম সম্পর্কে পড়াশোনা করে ইসলাম গ্রহণ করছে।

মহানবী সাঃ তরুণদের বিভিন্নভাবে প্রশংসা করে তাদের প্রতি বিশেষ দৃষ্টি রাখার তাগিদ দিয়েছেন। রাসূলের প্রাথমিক যুগের সঙ্গী-সাথীদের প্রায় সবাই বয়সের বিচারে তরুণ ছিলেন। কিন্তু বিলাতের তরুণদের জন্য এখানে মসজিদের দ্বার অবারিত নয়। নেশা সামগ্রীই বলুন আর ক্ষোভ বা ক্রোধই বলুন, এগুলো তরুণদের সহজেই প্রভাবিত করে। মসজিদে যা আলোচিত হয় এর বিষয়বস্তুর সাথে তারা নিজেদের সম্পৃক্ত করতে পারে না। সেখানে প্রদত্ত খুতবা বা আলোচনার ভাষা তাদের বোধগম্য নয়। তাহলে তারা সেখানে কেন যাবে? রাসূলের যুগে তরুণরা মসজিদে নববীতে লাঠি খেলা ও মল্লযুদ্ধ করেছে। মুসলিম তরুণরা পাবে গিয়ে স্নুকার খেলে, টেবিলটেনিস খেলে, রেস্টুরেন্টে গিয়ে আড্ডা দেয়, রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়ায়। কিন্তু মসজিদে যেতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে না। তারুণ্যের ঔৎসুক্য ও অ্যাডভেঞ্চারিজমের কারণে ভালো জিনিসের অভাবে তারা বিভ্রান্ত হওয়া স্বাভাবিক। আমাদের বেশির ভাগ মসজিদ তরুণদের যেভাবে অবহেলা করছে তাতে মনে হয় আমরা তাদের নাম খরচের খাতায় লিখে ফেলেছি।

মুসলিম কমিউনিটিতে মহিলাদের অধিকার সংরক্ষিত নয় বলেও একটা প্রচারণা বাজারে চালু আছে। এর কতটুকু ঘটনা ও কতটুকু রটনা তা নিয়ে তর্কযুদ্ধ হতে পারে। কিন্তু বাস্তবতা অস্বীকার করার উপায় নেই। মহানবী সাঃ মহিলাদের অধিকারের ব্যাপারে আমাদের কঠোরভাবে সাবধান করে দিয়েছেন। তিনি এ কথাও বলেছেন, তোমরা তোমাদের মহিলাদের মসজিদে যেতে বাধা দিয়ো না। অথচ আমাদের মসজিদগুলো মহিলাদের জন্য উন্মুক্ত নয়। রাসূল সাঃ-এর জীবদ্দশায় মসজিদে নববীতে মহিলারা স্বাধীনভাবে যেতে পারতেন। তারা সেখানে প্রধান হলেই নামাজ পড়তেন, তাদের জন্য দেয়ালঘেরা আলাদা কামরা ছিল না। খলিফা উমরের সময় মহিলারা মসজিদে উপস্থিত হয়ে খলিফার সাথে আলোচনায় অংশ নিয়েছেন। একটি ঘটনা আমাদের অনেকের জানা আছে। একবার জুমার খুতবায় খলিফা উমর রাঃ বিয়েতে মহিলারা আজকাল অতিরিক্ত মোহরানা দাবি করছে বলে অভিযোগ করে বলেন, বিয়েতে ৪০০ দিরহামের বেশি মোহরানা দাবি করা ঠিক নয়। উমর রাঃ মিম্বর থেকে নামার সাথে সাথে এক মহিলা তার উদ্দেশে বলেন, কুরআনে বিপুল অঙ্কের মোহরানার ব্যাপারে ইতিবাচক মন্তব্য করা হয়েছে এবং আল্লাহর রাসূল সাঃ মোহরানার পরিমাণ নির্ধারণ করে দেননি। সেখানে আপনি কিসের ভিত্তিতে মোহরানাকে ৪০০ দিরহামে সীমাবদ্ধ করছেন? জবাবে খলিফা উমর কোনো কথা না বলে আবার মিম্বরে উঠে আসেন এবং বলেন, মোহরানার ব্যাপারে আমি যে কথা বলেছি তা ঠিক নয়, ওই মহিলা যা বলছেন সেটিই ঠিক। এ ঘটনা থেকে প্রথমত, আমরা বুঝতে পারি যে মদিনার মহিলাদের বিয়ের সময় মোহরানার ব্যাপারে দরকষাকষি করার অধিকার স্বীকৃত ছিল। দ্বিতীয়ত, মদিনার মহিলারা মসজিদে নববীতে ইমামের সাথে সরাসরি কথা বলতে পারতেন। এতে কেউ ইসলাম চলে যাচ্ছে বলে মনে করতেন না। তৃতীয়ত, তারা এত সাহসী ছিলেন যে, পুরুষদের মধ্যে দাঁড়িয়ে জুমার খুতবায় প্রদত্ত খলিফার বক্তব্যের সমালোচনা করতেও তারা ভীত ছিলেন না। এর সাথে বর্তমান মুসলিম সমাজের মহিলাদের অবস্থার কি কোনো তুলনা হয়? মহিলাদের চার দেয়ালের মধ্যে বন্দী করে রেখে ইসলামের সেবা করছেন বলে মনে করেন, আমাদের সমাজে এমন লোকের কি অভাব আছে? হাদিস অনুসারে যেখানে মেয়ের সম্মতি ছাড়া বিয়েই সিদ্ধ হয় না, সেখানে ব্রিটিশ সরকারকে প্রধানত মুসলিম মেয়েদের অধিকার রক্ষার জন্যই ফোর্স ম্যারেজের বিরুদ্ধে আইন প্রণয়ন করতে হয়েছে। ভাগ্যের পরিহাস আর কাকে বলে?

 

ব্রিটেন মাল্টি কালচারাল, মাল্টি এথনিক ও মাল্টি রিলিজিয়াস দেশ। এর বৈচিত্র্যময় সৌন্দর্য ইউরোপ, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া,কানাডা প্রভৃতি দেশের অনেকের কাছে বিস্ময় ও প্রশ্নের। বিলাতের বর্ণবাদী গোষ্ঠী যেকোনো খোঁড়া অজুহাতে এ দেশেরমাল্টি-কালচারাল নীতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে চেষ্টা করে এবং মাঝে মধ্যে তাদের বিচ্ছিন্ন ঘটনাকে পুঁজি করে নিজেদের বর্ণবাদী খেলায়মেতে উঠতে দেখা যায়। কিন্তু এর জন্য কোনোভাবেই এ দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে দায়ী করা যায় না। ৭ জুলাই লন্ডনে বোমাহামলার পর একটি প্রধান রাজনৈতিক দলের একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি স্পষ্টভাবে বলেছেন, ব্রিটেনের মাল্টি-কালচারাল নীতি ব্যর্থহয়েছে; তাই এ বিষয়ে আমাদের নতুন করে ভাবতে হবে। মুসলমান বলে পরিচিত কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর গৃহীত সন্ত্রাসী কার্যক্রম বাচরমপন্থার কারণে যদি মাল্টি-কালচারাল নীতি নিয়ে কেউ প্রশ্ন তুলে তাহলে এর দায় মুসলমানদেরই বহন করতে হবে।

বহু মত, বহু ভাষা ও বহু বর্ণে তৈরি বৈচিত্র্যময় এ পৃথিবী আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন, শয়তান সৃষ্টি করেনি। মানুষে মানুষে ভাষা ও রঙেরপার্থক্যকে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তার নিদর্শন হিসেবে উল্লেখ করেছেন। সে হিসেবে সমগ্র পৃথিবীই যেন মাল্টি-কালচারাল সমাজ।কুরআন মজিদে আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহ ইচ্ছা করলে তোমাদের সবাইকে এক উম্মত বা জাতি হিসেবে সৃষ্টি করতে পারতেন।’ (৫ঃ৪৮)। ‘আল্লাহ ইচ্ছা করলে পৃথিবীর বুকে যারা আছে সবাই একসাথে ঈমানদার হয়ে যেত। তুমি কি ঈমান গ্রহণের জন্য মানুষেরওপর জবরদস্তি করবে?’ (১০ঃ৯৯)। ‘আমি তোমাদের একজন পুরুষ এবং একজন নারী থেকে সৃষ্টি করেছি এবং তোমাদের বিভিন্নজাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি যাতে তোমরা পরস্পরকে চিনতে পারো।’ (৪৯ঃ১৩)। মহানবী সাঃ নিজের কথা এবং কাজের মাধ্যমেমাল্টি-কালচারাল সমাজের বাস্তব নমুনা স্থাপন করেছিলেন। কুরআনের এক জায়গায় আল্লাহ খ্রিষ্টানদের গির্জা ও ইহুদিদের সিনাগগরক্ষার পরোক্ষ ব্যবস্থা করেন বলেও ইঙ্গিত করেছেন। কুরআন বলে, ‘আল্লাহ যদি মানব জাতির একদলকে অপর দল কর্তৃক প্রতিহতনা করতেন তাহলে গির্জা, ইবাদতখানা, সিনাগগ ও মসজিদগুলো ধ্বংস হয়ে যেত। (২২ঃ৪০)। সে হিসাবে বহু মত ও পথের মিলিতপ্রচেষ্টায় তৈরি ব্রিটেনের মাল্টি-কালচারাল সমাজের যথার্থ কারিগর হিসেবে মুসলমানদের যোগ্যতার পরিচয় দেয়ার কথা।মাল্টি-কালচারাল সমাজের প্রতিষ্ঠিত নীতি বা মূল্যবোধ ক্ষুণ্ন হয় এমন কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা মুসলমানদের জন্য শোভা পায় না।

এটি ঠিক, নানা কারণে মার্কিন ও ব্রিটিশ সরকারের ওপর মুসলমানরা ক্ষুব্ধ। কিন্তু এ অজুহাতে ব্রিটিশ বা আমেরিকার জনগণের ওপরআক্রমণকে বৈধতা দেয়া যায় না। ইসলামের দৃষ্টিতে একজনের অপরাধে অন্যজনকে শাস্তি দেয়া অবৈধ এবং আত্মঘাতী বোমাহামলার মাধ্যমে নিরীহ মানুষকে হত্যা করাকে ইসলাম মোটেই অনুমোদন করে না। কুরআন শরিফে আল্লাহ মুসলমানদের উদ্দেশেবলেন, ‘যারা তোমাদের মসজিদে হারামে যেতে বাধা প্রদান করেছে তাদের প্রতি শত্রুতা যেন তোমাদের সীমা লন্ডনে প্ররোচিত নাকরে। সৎকর্ম ও খোদাভীতিতে একে অপরের সহযোগিতা করো। পাপ ও সীমা লঙ্ঘনে একে অপরের সহায়তা করো না।’ (সূরামায়েদা-আয়াত ২)। অন্যত্র আল্লাহ বলেন, ‘হে ঈমানদাররা, তোমরা আল্লাহর উদ্দেশে ন্যায়ের পক্ষে সাক্ষ্যদানের ব্যাপারে অবিচলথাকো এবং কোনো সম্প্রদায়ের শত্রুতার কারণে ইনসাফের পথ পরিত্যাগ করো না।’ (সূরা মায়েদা-আয়াত ৮)। ‘ভালো কাজ ও মন্দকাজকে সমান মনে করো না। ভালো কাজ দিয়ে মন্দ কাজকে প্রতিহত করো। তা হলে যার সাথে তোমার শত্রুতা সে তোমার ঘনিষ্ঠবন্ধু হয়ে যাবে।’ (হা-মিম সাজদাহ-আয়াত ৩৪)। নিজের এবং নিজের পরিবারের বিরুদ্ধে গেলেও মুসলমানকে ন্যায়ের পক্ষে সাক্ষ্যপ্রদান করতে হবে। এ ব্যাপারে কুরআনের বর্ণনায় কোনো অস্পষ্টতা নেই। আমার প্রতি কেউ অন্যায় আচরণ করলে ন্যায়নীতিরমাধ্যমে এর জবাব দিতে হবে। অন্যায়ের জবাব অন্যায় পন্থায় দেয়া বৈধ নয়। কুরআন এখানে মুসলমানদের সে নির্দেশই প্রদানকরছে। কিন্তু কুরআনের এই সুস্পষ্ট নির্দেশ সম্পর্কে আমরা কতটুকু জানি এবং আমাদের বিক্ষুব্ধ তরুণদের আমরা কতটুকু অবহিতকরতে পেরেছি? হাদিস অনুযায়ী আমার ভাই যদি অত্যাচারী হয় তাহলে তাকে জুলুম করা থেকে বিরত রাখতে হবে। দ্বীনি ভাইহিসেবে তাকে এভাবে সাহায্য করা আমাদের ধর্মীয় দায়িত্ব। আমাদের অন্যায়কে অন্যায় হিসেবে চিহ্নিত করে তা প্রতিরোধ করতেহবে। বোবা শয়তানের মতো নীরব বসে থাকার কোনো সুযোগ ইসলামে নেই।

ব্রিটেন বা ইউরোপ কোনো সময়ই নিরপেক্ষভাবে ইসলামকে নিয়ে চিন্তা-গবেষণা করার পরিবেশ পায়নি। মুসলমানরা যখন বিজয়ীছিলেন তখন ইউরোপ তাদের শত্রু মনে করেছে। আবার যখন মুসলমানরা পরাজিত হন তখন ইউরোপ তাদের মূল্যায়ন করেছেঅধীনস্থ হিসেবে। ইউরোপীয় লেখক ও চিন্তাবিদরা মুসলমানদের কখনো সঠিকভাবে চিত্রিত করেনি। তাদের ভাষায়, মুসলমান মানেবর্বর ও অমার্জিত এক দল লোক। মুসলমানরা এক হাতে খোলা তরবারি এবং ওপর হাতে কুরআন নিয়ে চিৎকার দিয়ে বলে, এখনইইসলাম কবুল করো, নতুবা গর্দান থেকে মাথা বিচ্ছিন্ন করে দেবো। আমরা জানি ইসলাম তরবারির জোরে প্রচারিত হয়নি।কুরআনের স্পষ্ট নির্দেশ, ধর্মের ব্যাপারে কোনো জোর খাটানো যাবে না। কিন্তু কোনো সম্প্রদায় বা আদর্শ সম্পর্কে এ ধরনেরনেতিবাচক কথা চালু হলে তাদের সাথে কী ধরনের আচরণ করা হবে তা সহজেই অনুমান করা যায়। তাই সাধারণভাবে ইউরোপেরজনগণ ইসলামকে গ্রহণযোগ্য আদর্শ বলে মনে করেনি। বর্তমানে বিলাতের অমুসলিম জনগোষ্ঠী মুসলমানদের কাছে থেকে দেখছে,তাদের সাথে লেনদেন এবং ব্যবসা-বাণিজ্য করছে। মুসলমানদের এখন কাজের মাধ্যমে প্রমাণ দিতে হবে যে ওরিয়েন্টালিস্টরামুসলমানদের যে চিত্র অঙ্কন করেছে তা ঠিক নয়। কিন্তু আমরা কি তা করতে পারছি?

মত প্রকাশের স্বাধীনতা এবং অপরের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনের ব্যাপারে এ দেশের গৌরবজনক ঐতিহ্য রয়েছে।পরমতসহিষ্ণুতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত আমাদের চোখের সামনে থাকার পরও ধর্মীয় ও রাজনৈতিক মতপার্থক্যের ব্যাপারে এ দেশেরমুসলমানরা অনুসরণীয় নমুনা পেশ করতে ব্যর্থ হয়েছেন। আমরা নিজেদের মধ্যে মারামারি, ঝগড়া-বিবাদ ও কোন্দল করে বারবারএ দেশের পুলিশের কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করি, স্থানীয় এমপি বা কাউন্সিলরদের কাছে সাহায্য চাই অথবা আদালতের শরণাপন্ন হই।নির্বাচনের সময় মুসলমানদের প্রতিনিধিত্বশীল সংগঠন এমসিবি’র সভায় একদল বিক্ষুব্ধ মুসলিম তরুণ হামলা চালিয়েছে। জর্জগ্যালওয়ের সভায়ও অনুরূপ ঘটনা ঘটেছে। ভিন্ন মতের প্রতি অসহিষ্ণুতা আমরা বাংলাদেশ, পাকিস্তান, মিসর প্রভৃতি মুসলিমপ্রধানদেশ থেকে নিয়ে এসেছি। এসব দেশে ধর্মীয় বা রাজনৈতিক মতপার্থক্যকে কেন্দ্র করে রক্তারক্তির ঘটনা সর্বদাই ঘটছে। দেশেরযেকোনো নির্বাচনে পরাজিত ব্যক্তিই সর্বপ্রথম বিজয়ী প্রার্থীকে অভিনন্দিত করে। কিন্তু মুসলিমপ্রধান দেশগুলোতে নির্বাচনের পরপ্রতিদ্বন্দ্বী ব্যক্তি বা দলের মধ্যে মুখ দেখাদেখি পর্যন্ত বন্ধ হয়ে যায়। আমাদের এ চরিত্র দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কাছে এখন কোনোগোপন ব্যাপার নয়।

আমরা জানি, ইসলামে পোপতন্ত্র নেই এবং প্রত্যেক মুসলমানই ইসলাম সম্পর্কে কথা বলার অধিকার রাখেন। শিয়া মুসলমানদের মধ্যে‘ইমামত বা মারজা’ এবং কোনো কোনো সুন্নি মুসলমানদের মধ্যে পীর বা ধর্মগুরু গ্রহণের প্রচলন থাকলেও মুসলিম সম্প্রদায়েরবেশির ভাগ মানুষ এর বাইরে অবস্থান করছেন, যে কারণে মুসলিম সমাজে চিন্তার ঐক্যের চেয়ে অনৈক্যই নিয়ম হয়ে পড়েছে। মহৎউদ্দেশ্যমূলক যৌক্তিক মতপাথর্কøকে ইসলাম মর্যাদা দেয় এবং বিতর্কের মাধ্যমে সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছতে উৎসাহ প্রদান করে। তাইপরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ ও ভালোবাসা রেখে ধর্মীয় বিষয়ে বিতর্ক করা ইসলামের ঐতিহ্য। আমরা এ ঐতিহ্যকে লালন করছি ঠিকই,তবে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধকে পরিত্যাগ করে। এ কারণে বিরোধ শেষ পর্যন্ত শত্রুতা, মারামারি ও পরস্পরের চরিত্র হননের কারণ হয়েযায়।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: