চুল পড়া কমাতে

চুল পড়া কমাতে

চুল পড়া নিয়ে দুশ্চিন্তার কিছু নেই। চুল পড়ছে। কী যে করি! এমন কথা প্রায়ই শোনা যায়। আর গরমে চুল পড়ার হার তুলনামূলকভাবে একটু বাড়ে। তাই বলে তো বসে থাকলে চলবে না। চুল পড়া কমানোর সমাধান দিয়েছেন কিউবেলার রূপবিশেষজ্ঞ ফারজানা আরমান। তিনি জানান, গ্রীষ্মকালে মাথার ত্বকের ধরন পরিবর্তন হয়। ত্বকের গ্রন্থি থেকে অতিরিক্ত তেল নিঃসরণ হয়। ফলে চুল তৈলাক্ত হয়ে পড়ে। আবহাওয়ার এই পরিবর্তনের কারণে চুল পড়ে অনেক সময়। এ ছাড়া চুলের গোড়ার ঘাম না শুকালে, অতিরিক্ত তেলযুক্ত খাবার খেলে, চুলের ধরনের সঙ্গে মানানসই নয় এমন শ্যাম্পু ও কন্ডিশনার ব্যবহার করলে সাধারণত চুল পড়ে।
আর এসব থেকে মুক্তি পেতে কী করবেন? ফারজানা আরমান মনে করেন, সঠিক খাদ্যাভ্যাস থাকলে আমাদের চুল পড়ার হার অনেকটা কমে আসবে। তবে প্রতিদিন ১০০টি চুল পড়লে চিন্তিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। পুষ্টিযুক্ত পরিমিত খাবার খেলে তা চুলেও পুষ্টি জোগায়। খাদ্য তালিকায় অবশ্যই ফল, সবজি থাকতে হবে। এসব খাবার খেলে চুলের গোড়া শক্ত হয়। ফলে চুল পড়া কমে যায়। এ ছাড়া চুলের গোড়ায় তেল ও ময়লা জমার কারণেও চুল পড়ে। সে জন্য খুব ভালো হয় ঘন শ্যাম্পু ব্যবহার না করে একটু পাতলা ধরনের শ্যাম্পু ব্যবহার করলে। ঘন শ্যাম্পু হলে তার সঙ্গে সামান্য পরিমাণে পানি মিশিয়ে নিতে পারেন। শ্যাম্পু দিয়ে মোটা চিরুনি বা ব্রাশ দিয়ে চুলের আগাগোড়া আঁচড়িয়ে ফেলুন। এরপর পানি দিয়ে ভালোভাবে ধুয়ে ফেলুন, যাতে চুলে কোনো শ্যাম্পু না থাকে। এভাবে প্রতিদিন চুলে শ্যাম্পু করা যেতে পারে। এবার ব্যবহার করুন কন্ডিশনার। কন্ডিশনার কখনোই চুলের গোড়ায় লাগাবেন না। সারা মাথার চুলে কন্ডিশনার লাগিয়ে দু-তিন মিনিট রেখে ধুয়ে ফেলুন।

চুল পড়া কমাতে যা ব্যবহার করবেন

লিভ ইন কন্ডিশনার: সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি থেকে চুলকে রক্ষা করে লিভ ইন কন্ডিশনার। রং করা চুল কিংবা কোঁকড়া চুলের জন্য এ কন্ডিশনারটি ব্যবহার করা ভালো।
প্রাকৃতিক কন্ডিশনার: শ্যাম্পু দিয়ে চুল ধোয়ার পর পানিতে লেবুর রস মিশিয়ে চুল ধুয়ে ফেলুন। দেখবেন চুল ঝরঝরে হয়ে গেছে। এ ছাড়া সাদা সিরকাও এভাবে প্রাকৃতিক কন্ডিশনার হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন।

হট অয়েল ট্রিটমেন্ট: তৈলাক্ত চুলসহ যেকোনো চুলের জন্য এটি উপকারী। তেল হালকা গরম করে তুলা বা হাত দিয়ে হালকা করে মাথার ত্বকে ঘষে লাগান। আধা ঘণ্টা পর শ্যাম্পু করে ফেলুন।
টু-ইন শ্যাম্পু: যেসব শ্যাম্পুর গায়ে টু-ইন লেখা থাকে তা এ দেশের আবহাওয়ার জন্য খুব একটা উপযোগী নয়। একনাগাড়ে এ ধরনের শ্যাম্পু ব্যবহার করা উচিত নয়।

চুলের প্যাক

l হেনা, সামান্য পরিমাণে টকদই ও ডিমের মিশ্রণ।

l ডিম, মাখন, সামান্য পরিমাণে পানি ও জাম্বুরার রস মিশিয়ে ১৫-২০ মিনিট রেখে ধুয়ে ফেলুন।
l জলপাই তেল, ১০ ফোঁটা ল্যাভেন্ডার তেল মিশিয়ে হালকা গরম করে এর মধ্যে দুটি ভিটামিন ‘ই’ ক্যাপসুল মিশিয়ে তা চুলে দিন। সম্ভব হলে চুলে গরম পানির ভাপ দিতে পারেন। এ জন্য তোয়ালে গরম পানিতে ডুবিয়ে নিন। এরপর এর পানি ঝরিয়ে মাথায় জড়িয়ে রাখুন। ১০ মিনিট পর চুল ধুয়ে ফেলুন।

l পাকা কলা, এক চামচ টকদই ও এক চামচ জলপাই তেল মিশিয়ে চুলে লাগাতে পারেন।
স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজের চর্মরোগ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক রাশেদ মোহাম্মদ খান বলেন, মানসিক চাপ, বড় অসুখের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, মাথার ত্বকে চর্মরোগ, বংশগতির কারণেও চুল পড়ে। তবে চুল পড়া কমাতে প্রধানত চুলে পুষ্টি জোগাতে হবে। সে জন্য তেল-মসলাযুক্ত খাবার, চর্বিযুক্ত খাবার পরিহার করতে হবে এবং মানসিক চাপ কমাতে হবে। এ ছাড়া সময়মতো খাওয়া-ঘুমানো ও পানি পরিমাণমতো পান করতে হবে। খেয়াল রাখতে হবে, শ্যাম্পু করার সময় যেন নখের আঁচড় মাথার ত্বকে না লাগে।

আরেকটি বিষয় হলো, চুল পড়ার সঙ্গে সঙ্গে তা গজিয়ে যায়। সে কারণে এটি নিয়ে খুব বেশি দুশ্চিন্তার কিছু নেই। খুশকি দূর না হলেও চুল পড়ে। খুশকি থাকলে সপ্তাহে দুই দিন খুশকি প্রতিরোধী শ্যাম্পু ব্যবহার করুন। অন্যান্য দিন প্রোটিন, অ্যামাইনো প্রোটিন সমৃদ্ধ শ্যাম্পু দিয়ে চুল ধুয়ে ফেলুন। এর ফলে চুলের গোড়া শক্ত হয়। নিয়মিত জলপাই তেল ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে জেল ও চুলের স্প্রে কম ব্যবহার করাই ভালো। এতে চুলের ক্ষতি কম হয়। আসল কথা হলো, চুলকে পরিষ্কার রাখতে হবে। তবেই দেখবেন চুল পড়া কমে গেছে।

Advertisements

পাশ্চাত্যের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভিত্তি মাদ্রাসা

পাশ্চাত্যের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভিত্তি মাদ্রাসা

পাশ্চাত্যের খ্রিস্টান-ইহুদিরা যখন মাদ্রাসা নিয়ে সমালোচনা করে তখন কিছুটা বোধগম্য, কিন্তু তথাকথিত মুসলমানরা যখন করে তখন দুঃখ হয়। তবে এরা ইসলাম ও মুসলিম সভ্যতার সবকিছু নিয়েই নাক সিটকায়। শরিয়াহ্, কোরআন, হাদিস, ফিকহ, বোরকা, হিজাব, পর্দা, ফতোয়া, মোল্লা (তবে প িত, আচার্য, পুরোহিত, পাদ্রী, ভিক্ষুতে নাক সিটকায় না), পীর, তরিকা, তাছাউফ, খানকা, মাদ্রাসা, তবলিগ, দাওয়া, হজ-হাজী, টুপি-পাগড়ি, তসবিহ, আজান, মিনার, জিহাদ (তবে ক্রুসেড চলবে), যাকাত, ফিতরা, কাফফারা, কোরবানি, ওয়াকফ, হেরেম, আরব, হারাম-হালাল, গুনাহ-সওয়াব ইত্যাদি ইসলামী পরিভাষা উচ্চারিত হলে কোনো কোনো আধুনিক মুসলমানকে নাক সিটকাতে দেখা যায়। যারা এসব উচ্চারণ করে বা পালন করে, তারা যেন মানুষই নয়। এ কোন মানসিকতা? সেক্যুলার বা সমাজতন্ত্রী হলেই কি মুসলমান হয়েও মুসলমানী সংস্কৃতি ও তত্সংশ্লিষ্ট পরিভাষাকে ঘৃণা করতে হবে?

আসলে মুসলমানদের ভেতরের সেক্যুলাররা ‘মোর ক্যাথলিক দ্যান দি পোপ’। এই মনোভাবের জন্য সেক্যুলার মুসলমানরা পশ্চিমের প্ররোচনায় মাদ্রাসার মতো প্রতিষ্ঠানকে ব্যঙ্গ করছেন। অথচ তাদের ভেবে দেখা উচিত, সাদ্দাম হোসেনের মতো সেক্যুলারকে পাশ্চাত্য এত পায়রবি করা সত্ত্বেও ধ্বংস করেছে। মুসলমান নিজের ধর্ম ও সংস্কৃতিকে ব্যঙ্গ করে পাশ্চাত্যের কাছে সাময়িকভাবে প্রিয় হলেও পরিণতি সাদ্দাম হোসেনের মতো হওয়া অবশ্যম্ভাবী।

কথা হলো, মাদ্রাসা নিয়ে ব্যঙ্গ করা হচ্ছে পাশ্চাত্য ও তাদের এদেশি মিত্র সেক্যুলারদের দ্বারা। অথচ আমরা বহু ঐতিহাসিক বইয়ে পড়েছি, মাদ্রাসাকে কপি করে পাশ্চাত্যে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গড়ে ওঠে। মাদ্রাসা এসেছে আগে, আর পশ্চিমা কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলো পরে।

অস্ট্রেলিয়া সফরে সেখানকার বইয়ের দোকান ও পাঠাগারগুলোতে বই নিয়ে প্রচুর ঘাঁটাঘাঁটি করেছি। একটা চমত্কার বই হাতে এলো, ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের সোশ্যাল এনথ্রপলজির এমেরিটাস প্রফেসর জ্যাক গুডির লেখা ‘দি থেফ্ট্ অব হিসটোরি’। ২০০৬ সালে ক্যামব্রিজ ইউনিভার্সিটি প্রেস কর্তৃক প্রকাশিত। প্রায় সাড়ে তিনশ’ পৃষ্ঠার এই চমত্কার বইটিতে প্রফেসর জ্যাক গুডি বিস্তারিতভাবে প্রমাণ করেছেন, মদ্রাসার কারিকুলাম ও ব্যবস্থাপনার ওপর ভিত্তি করেই ইউরোপের কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে উঠেছে। আর যারা বলতে চান যে প্রাচ্যের কোনো অবদান নেই ইউরোপের কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় সৃষ্টিতে, তারা ইতিহাস ‘চুরি’ করেছেন। বইটির একটি চমত্কার পরিচ্ছেদ হলো ‘দি থেফ্ট্ অব ইনস্টিটিউশনস, টাউনস অ্যান্ড ইউনিভার্সিটিজ’।
প্রফেসর জ্যাক গুডি লিখেন, ‘ইউরোপে রেনেসাঁর আগে বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে ওঠে মাদ্রাসার মতো উচ্চ শিক্ষার প্রতিষ্ঠানগুলো এবং তাদের কারিকুলামের আদলে। যদিও সেসব প্রতিষ্ঠানে ধর্ম প্রাধান্য বিস্তার করত, অন্য বহু বিষয়ও তাতে অন্তর্ভুক্ত থাকত।’ (পৃ. ১২৯)। রেনেসাঁ সম্পর্কে ইলাসট্রেটেড অক্সফোর্ড ডিকশনারি বর্ণনা করেছে—‘(ইউরোপে) চৌদ্দ থেকে ষোল শতকে কলা ও সাহিত্যের পুনর্জন্ম’ (পৃ. ৬৯৫) আমলে রেনেসাঁর আগেই পশ্চিম ইউরোপে মাদ্রাসার অনুকরণে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে উঠেছে। প্রেরণা এসেছে মুসলিম স্পেন-পর্তুগাল-সিসিলি থেকে, মধ্যপ্রাচ্য থেকে ক্রুসেডারদের মাধ্যমে। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় গড়ার পর পশ্চিম ইউরোপে রেনেসাঁ এসেছে।

প্রফেসর জ্যাক গুডি বলেন, এই যে বিশ্ববিদ্যালয়ের সূচনা হলো, এর সঙ্গে হয়েছিল ১১০০-১২০০ সালে লেখাপড়ার পুনঃপ্রবর্তন, যা এসেছিল মুসলিম সিসিলি ও আরব স্পেন থেকে। তিনি বলেন, দশম ও একাদশ শতকে সমগ্র মুসলিম বিশ্বে মাদ্রাসাগুলো প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। আর তখন মুসলিম ও খ্রিস্টান পাশ্চাত্যের ভেতর শিক্ষার তাত্পর্যপূর্ণ সাদৃশ্য ছিল। গুডি বলেন, বরঞ্চ কোনো কোনো বিদ্যান (যেমন মাদ্রিদের জে রিবেরা) বলেন, মধ্যযুগের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আরব শিক্ষা ব্যবস্থার কাছে বহুলভাবে ঋণী। গুডি বলেন, ইসলামী ওয়াকফের ওপর ভিত্তি করে কলেজ শিক্ষা ইসলামের নিজস্ব অবদান। জেরুজালেম থেকে ফেরত এক তীর্থযাত্রী পশ্চিম ইউরোপে প্যারিসে প্রথম একটা কলেজ তৈরি করেন ১১৩৮ সালে। এটা সম্ভবত মাদ্রাসার কপি, বলেন প্রফেসর গুডি। অক্সফোর্ডে বেলিওল কলেজও তেমনি, বলেন গুডি। গুডি বলেন, জিমাকদিসি তার ‘দি রাইস অব কলেজেস : ইলাসট্রেশনস অব্ লারনিং ইন ইসলাম অ্যান্ড ওয়েস্ট’ (১৯৮১) বইয়ে স্বীকার করেছেন, মাদ্রাসার পরবর্তী সময়ে প্রতিষ্ঠিত পাশ্চাত্যের কলেজগুলোতে ইসলামী শিক্ষার সাদৃশ্য ও প্রচুর প্রভাব বিদ্যমান ছিল। (পৃ. ২২৮)। প্রফেসর গুডি বলেন, সে সময় ইউরোপীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও মাদ্রাসার শিক্ষা পদ্ধতি ও কারিকুলাম একই ধরনের ছিল (পৃ. ২২৯)।

প্রফেসর গুডি বলেন, ইসলামের প্রথম শিক্ষা ব্যবস্থার শুরু মসজিদ থেকে অস্টম শতকে। দশম শতকে বাগদাদে ছাত্রাবাসসহ মসজিদ মাদ্রাসা ছিল। এরপর এলো নিজামিয়া মাদ্রাসা যা ১০৬৭ সালে প্রতিষ্ঠিত বলা হলেও, এটা পূর্বতন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের স্থানেই পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয় (পৃ. ২২৯)।

কুলহাম কলেজের প্রিন্সিপাল আলফ্রেড গুইলস লিখেছেন বাগদাদের নিজামিয়া বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে, যার প্রতিষ্ঠা ৪৫৭ হিজরিতে। এরপর নিশাপুর, দামাস্কাস, জেরুজালেম, কায়রো, আলেকজান্দ্রিয়া ও অন্যান্য স্থানে বহু বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে ওঠে। খ্রিস্টান স্পেনে রাজা আলফনসো দি ওয়াইজ (১২৫২-৮১) মুসলমান বিদ্বান আবু বকর আল-রিকুটিকে দায়িত্ব প্রদান করেন তার রাজ্যে একটি আরব বিশ্ববিদ্যালয় তৈরিতে। গুইলস লিখেন, ১২৩৪ সালে বাগদাদে মুসতানসিরিয়া প্রতিষ্ঠিত হয়। এসব তথ্য গুইলস মি. জি লে স্ট্রেনজের ‘বাগদাদ ডিউরি; দি আব্বাসিড ক্যালিফেট’ (অক্সফোর্ড, ১৯০০) নামক বই থেকে উদ্ধৃত করে বিস্ময়ে মন্তব্য করেন, ‘এ সবই ছিল তের শতকের প্রথম দিকে।’ (‘দি লিগেসি অব্ ইসলাম’, পৃ. ২৪১-২৪৩)।

গুইলস জোর দিয়ে বলেন, খ্রিস্টান বিশ্ববিদ্যালয়গুলো প্রাচ্যের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কাছে স্পষ্টত ছিল নবীনতর, আর মধ্যযুগের বিদ্বানদের সাক্ষ্য থেকে সুনিশ্চিতভাবে এই থিসিস প্রমাণিত যে, ইসলামী শিক্ষা খ্রিস্টান বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে অনেক উপাদান প্রদান করত পড়াশোনা করার জন্য। গুইলস লিখেন, মুসলমানরা দশম ও একাদশ শতকে যেসব বিষয় পড়াশোনা করত আর খ্রিস্টান ছাত্ররা পরবর্তী সময়ে একাদশ ও দ্বাদশ শতকে যা পড়াশোনা করত তাতে ছিল খুবই মিল প্রাচ্যের ও পাশ্চাত্যের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে।
পিস টিভিতে (যা ইসলামিক টিভিতেও বাংলা ভাষায় তরজমা করে প্রচারিত হয়) মার্কিন পাদ্রী থেকে মুসলমান প্রচারক ইউসুফ এসটেস বলছিলেন, ‘এলামনাই অ্যাসোসিয়েশন’-এর ‘এলামনাই’ শব্দ এসেছে ‘আলেম’ শব্দ থেকে। আসলে পাশ্চাত্যের প্রথম যুগের বিদ্বানরা ‘আলেম’ হতে চেয়েছিলেন। আর তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘কনভোকেশনে’ আরব শেখদের মতো জুব্বা পরত, শেখদের মতো ‘আলেম’ হিসেবে পরিচিতি পেতে।
স্পেনের গ্রানাডা শহরে রানী ইসাবেলা-রাজা ফার্দিনান্দের কবর ক্যাথিড্রালের পাশে দেখলাম ইংরেজিতে একটা নামফলক : মাদ্রাসা (ইউনিভার্সিটি অব গ্রানাডা)। এর অর্থ হলো, সেই প্রাচীন মাদ্রাসা ভবনটিকে গ্রানাডা বিশ্ববিদ্যালয় তাদের প্রাচীনতম ভবন বলে জাহির করতে গর্ববোধ করছে। ভবনটি ইসলামী স্থাপত্যে আরবি ক্যালিগ্রাফিতে ভর্তি। এমনকি একদিকে একটা মিহরাবও দেখলাম। পাশ্চাত্যের কেউ কেউ মাদ্রাসা নিয়ে নাক সিটকালেও গ্রানাডার কর্তৃপক্ষ, বিশেষ করে গ্রানাডা বিশ্ববিদ্যালয়, ‘মাদ্রাসা’ শব্দকে স্বীকৃতি দিয়ে বিশ্বকে বোঝাতে চেয়েছে—‘মাদ্রাসাই’ তো বিশ্ববিদ্যালয়। মাদ্রাসাটির সামনে সৌন্দর্যের জন্য কমলালেবুর গাছ দেখলাম, যে কমলালেবুর গাছ মুসলমানরা প্রথম ইউরোপে নিয়েছে। এখন ইউরোপের কমলালেবু তেমন উপাদেয় না হলেও, এর চমত্কার ঘন সবুজ পাতাগুলো সৌন্দর্য বাড়িয়ে দিচ্ছে, আর যেন প্রচার করছে মুসলিম সভ্যতার চির সবুজ বৈশিষ্ট্যের।

গাজর খেলে গায়ের রং ফর্সা হয় না

গাজর খেলে গায়ের রং ফর্সা হয় না


বাংলাদেশে প্রচুর গাজর উৎপাদিত হয়। গাজরে প্রচুর পরিমাণ ভিটামিন-এ বা বিটা ক্যারোটিন থাকায় এটা চোখের জন্য ভালো এবং ভিটামিন-এ এর নানা উপকারিতা আছে। তবে আজকাল মহিলারা রূপচর্চার উপাদান হিসাবে গাজর বেটে মুখ ও ত্বকে ব্যবহার করেন। তাদের ধারনা গাজর বাটা লাগালে ত্বক ফর্সা হয়, ত্বক উজ্জল হয়। এমনকি বেশীরভাগ বিউটিশিয়ান রূপচর্চার ক্ষেত্রে কল্পনা প্রসূতভাবে গাজরের ত্বক ফর্সা করার কথা বলেন। কিন্তু বিজ্ঞানীদের তথ্য একেবারে উল্টো। আর তা হচ্ছে গাজর ত্বক কালো করে, ফর্সা করেনা। কারণ হিসাবে বলা হয়, ত্বকের বর্ণ নির্ধারণে মূলত: মেলানিন নামক এক ধরণের রাসায়নিক পদার্থ দায়ী। যার শরীরে যত বেশী মেলালিন তার ত্বক তত বেশী কালো।

আর গবেষণায় দেখা গেছে ত্বকের মেলানিনকে উজ্জীবীত করে রক্তের বিলিরুবিন, হিমোগেস্নাবিন ও বিটাক্যারোটিন। আর গাজরে রয়েছে অনেক বেশী বিটাক্যারেটিন। তাই গাজর খেলে বা ত্বকে গাজর ব্যবহার করলে কোন ভাবেই ত্বক ফর্সা করেনা। এমনকি চোখের নীচের কালোদাগ কমাতেও গাজর বাটার কোন ভূমিকা নেই। তবে গাজরের বিটাক্যারোটিন হার্টের জন্য ভালো।

মস্তিষ্কের ব্যায়াম

মস্তিষ্কের ব্যায়াম


দেহকে সুস্থ রাখার পাশাপাশি মস্তিষ্ককেও আরো সক্রিয় করার ব্যাপারে যত্নবান হওয়া উচিত। আমরা সাধারণত এ বিষয়টা এড়িয়ে যাই। অথচ আমরা অনেক ক্ষেত্রে খুব সহজেই কাজটি করতে পারি। কম্পিউটারভিত্তিক কিছু কিছু প্রোগ্রামও মস্তিষ্ক সুস্থ রাখতে সহায়তা করে থাকে। কালো চকলেটে থাকা ডোপামিন স্মরণশক্তি বাড়িয়ে দেয়। মাছ বিশেষ করে শ্যামন মাছ মস্তিষ্ককে সক্রিয় করে। মনোসংযোগ বাড়াতে ছোট একটা বল নিয়ে ওপরে নিক্ষেপ করে ক্যাচ ধরুন। রাতের ঘুম মস্তিষ্কের বিশ্রামের জন্য অনিবার্য। উঁচু-নিচু রাস্তায় হাঁটলেও মনোসংযোগ বাড়ে বলে অনেকে মনে করেন। এতে দেহের ভারসাম্য ক্ষমতাও বাড়ে। নতুন নতুন বিষয় শেখার আগ্রহও মস্তিষ্ককে সক্রিয় করে তোলে। এতে লাভ আরো বেশি।

ইসলামের আলোকে পরিবেশ সংরক্ষণ

ইসলামের আলোকে পরিবেশ সংরক্ষণ


পরিবেশ মহান আল্লাহতায়ালার মহান সৃষ্টি। মানুষের কল্যাণ ও স্বাভাবিক প্রয়োজনের তাগিদে পরিবেশের যাবতীয় জিনিস আল্লাহ তৈরি করেছেন। এর কোনোটাই অপ্রয়োজনে সৃষ্টি করা হয়নি। আল্লাহপাক এ বিষয়ে কুরআনপাকে সূরা লুকমানের ২০ নম্বর আয়াতে ঘোষণা করেছেন, ‘তিনি পৃথিবীর সব কিছু তোমাদের কল্যাণের জন্য সৃষ্টি করেছেন। তোমরা কি দেখো না, নিশ্চয়ই আসমান ও জমিনের যা কিছু আছে সবই আল্লাহতায়ালা তোমাদের কল্যাণে নিয়োজিত রেখেছেন এবং তোমাদের প্রতি তার প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য নিয়ামতগুলো পরিপূর্ণ করে দিয়েছেন।সূরা আল-বাকারার ২৯ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘তিনি পৃথিবীর সব কিছু তোমাদের কল্যাণের জন্য সৃষ্টি করেছেন।সূরা ইয়াসিনের ৩৩ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেন, ‘তাদের জন্য একটি নিদর্শন মৃত ভূমি। আমি একে সঞ্জীবিত করি এবং তা থেকে উৎপন্ন করি শস্য, তা তারা ভক্ষণ করে। আমি তাতে সৃষ্টি করি খেজুর এবং প্রবাহিত করি ঝর্ণা। যাতে তারা ফল পায়।একই বিষয়ে সূরা বাকারার ২২ নম্বর আয়াতে আল্লাহপাক বলেন, ‘যে পবিত্র সত্তা তোমাদের জন্য ভূমিকে বিছানা ও আকাশকে ছাদস্বরূপ করে দিয়েছেন আর আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করে তোমাদের জন্য ফল-ফসল উৎপন্ন করেছেন তোমাদের খাদ্য হিসেবে।সূরা আল কামারে বলা হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই আমি সব জিনিস সৃষ্টি করেছি সুস্পষ্টভাবে ও সুনির্দিষ্ট পরিমাপ অনুযায়ী।

ওপরে উল্লেখিত কুরআনের আয়াতগুলো থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, দুনিয়ার সৃষ্টি, উপায়-উপকরণ আমাদের জন্য পরম নিয়ামত। এগুলোর সংরক্ষণ, যথাযথ ব্যবহার, যত্ন ও পরিচর্যা ঈমানী দায়িত্বের অংশ। আমরা যদি এই পরিবেশকে রক্ষা না করি তাহলে আমাদের জন্য বিপর্যয় অবধারিত। বলা আবশ্যক, আজ দুনিয়াজুড়ে যে বিপর্যয় ও অশান্তি সৃষ্টি হয়েছে তা আমাদের নিজেদেরই তৈরি। মহান আল্লাহপাক এ জন্য সূরা রুমের ৪১ নম্বর আয়াতে বলেছেন, ‘জলে-স্থলে যে বিপর্যয় দেখা দিয়েছে তা মানুষের অর্জনেরই ফল।

এ জন্য মানবতার নবী, বিশ্ব সম্প্রদায়ের অন্যতম কল্যাণকামী আদর্শ মানুষ হজরত মুহাম্মদ সাঃ মানুষের উত্তম জীবন ধারণ ও কল্যাণ সাধনের জন্য সচেষ্ট ছিলেন। উন্নত পরিবেশ তৈরিতে আমাদের প্রিয় নবী ছিলেন বিশেষ যত্নবান। পরিবেশ সংরক্ষণের অন্যতম দিকনির্দেশক ছিলেন তিনি। মানুষের উপযোগী পরিবেশ রক্ষায় মহানবী সাঃ আমাদের জন্য প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দিয়ে গেছেন। নিচে মহানবী সাঃ-এর নির্দেশনা সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো।

১. সামাজিক বিপর্যয় রোধে মহানবী সাঃ মানুষ সমাজবদ্ধ জীব। সমাজে মিলেমিশে বসবাস করা ছাড়া সামাজিক স্বস্তি ও শান্তি অসম্ভব। সমাজে শান্তি না এলে মানবিক বিপর্যয় অনিবার্য। রাসূল সাঃ বলেন, ‘পরম দয়ালু আল্লাহতায়ালা দয়াকারীকে দয়া করেন।’ ‘যার অনিষ্ট থেকে তার প্রতিবেশী নিরাপদ নয় সে মুমেন নয়।’ ‘ওই ব্যক্তি মুমেন নয়, যে ব্যক্তি পেটপুরে খায় আর তার প্রতিবেশী পাশে ক্ষুধার্ত থাকে।’ ‘এক মুসলমান অপর মুসলমানের ভাই। সে তাকে জুলুম করবে না, অপমান করবে না এবং অসম্মান করবে না।একজন মুসলমানের ওপর অপর মুসলমানের জান, মাল ও ইজ্জত হারাম।শুধু মুসলমানদের বিষয়ই নয়, সমাজের অমুসলিমদের প্রতিও যত্নশীল হয়ে দায়িত্ব পালন করে সামাজিক স্থিতি বা পরিবেশ সুষ্ঠু রাখতে হবে। তাই তিনি বলেছেন, ‘কোনো অমুসলিম নাগরিককে যে অত্যাচার করল বা অধিকার ক্ষুণ্ন করল বা তাকে সাধ্যাতীত পরিশ্রম করাল বা তার অমতে তার কাছ থেকে কিছু নিয়ে নিলো,কিয়ামতের দিন আমি হবো তার বিপক্ষে মামলা দায়েরকারী।তিনি সমাজের সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষার জন্য তাগিদ দিয়ে আরো বলেছেন, ‘যে কোনো সংখ্যালঘুকে হত্যা করল সে বেহেশতের ঘ্রাণও উপভোগ করতে পারবে না। অথচ বেহেশতের সুঘ্রাণ চল্লিশ বছরের দূরত্ব হতেও অনুভব করা যাবে।সামাজিক পরিবেশ রক্ষায় এমন সুন্দর নির্দেশনা ও সুবিচারপূর্ণ বিধান দুনিয়ার কোনো ধর্ম কিংবা মতবাদে বিধৃত হয়নি।

২. প্রাকৃতিক পরিবেশ সংরক্ষণে মহানবী সাঃ প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষার দাবিতে দুনিয়াজুড়ে আজ সম্মিলিত রব উঠেছে। মানুষের অদূরদর্শিতা এবং অমানবিক আচরণের কারণে প্রাকৃতিক যে ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়েছে তা তাবৎ বিশ্বের মানুষের ওপর বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। ফলে বায়ুতে বেড়েছে দূষণ, বেড়েছে তাপমাত্রা, বৃদ্ধি পেয়েছে রোগ-শোক এবং প্রাকৃতিক নানা দুর্যোগ। তাই এসব বিপর্যয় থেকে বাঁচার জন্য বিজ্ঞানীরা বন রক্ষা এবং বৃক্ষ রোপণকে অন্যতম উপায় বলে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। অথচ মহানবী সাঃ বৃক্ষ বা বন রক্ষার জন্য তাগিদ দিয়ে গেছেন সেই চৌদ্দ শবছর আগে। বৃক্ষ বা শস্য নষ্ট করাকে নিরুৎসাহিত করতে রাসূল সাঃ মানুষকে উপদেশ দিয়েছেন। এক ব্যক্তি একটি গাছের পাতা ছিঁড়লে রাসূল সাঃ বললেন, ‘প্রত্যেকটি পাতা আল্লাহর মহিমা ঘোষণা করে।বৃক্ষ রোপণকে উৎসাহিত করেছেন মহানবী সাঃ। গাছপালা, লতা-পাতা মানুষ ও জীবজন্তুর জন্য খাদ্য সরবরাহ করে, মানুষ ও জীবের জন্য অক্সিজেন সরবরাহ করে এবং পরিবেশকে দূষণমুক্ত করে। গাছপালা ঝড়ঝঞ্ছা প্রতিরোধ করে এবং মাটির ক্ষয় রোধ করে। এ প্রসঙ্গে নবীজি এক হাদিসে বলেছেন, ‘কোনো মুসলমান যদি একটি বৃক্ষের চারা রোপণ করে অথবা ক্ষেতখামার করে, অতঃপর তা মানুষ, পাখি কোনো জন্তু ভক্ষণ করে, তা তার জন্য সদকার সওয়াব হবে।হজরত আয়েশা রাঃ থেকে বর্ণিত হয়েছে, নবী করিম সাঃ বলেছেন, ‘যদি নিশ্চিতভাবে জানো যে, কিয়ামত এসে গেছে,তখন হাতে যদি একটি গাছের চারা থাকে যা রোপণ করা যায়, তবে সেই চারাটি লাগাবে।

৩. পানি সংরক্ষণে মহানবী সাঃ-এর নির্দেশনাঃ পানি মানুষ এবং জীব জগতের বেঁচে থাকার সবচেয়ে বড় অবলম্বন। পানি ছাড়া বেঁচে থাকা অসম্ভব। পানি দূষিত হলে মাটি, বায়ু ও খাদ্য দূষিত হয়ে পড়ে। বর্তমানে পৃথিবীর ৬০ ভাগ পানিই দূষিত। ফলে রোগ-শোক, জ্বরা-ব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছে মানুষ ও পশুপাখি। মহানবী সাঃ ঘোষণা করেছেন, ‘তোমরা লানত আনয়নকারী তিন প্রকার কাজ থেকে নিজেদের বিরত রাখো। তা হলো পানির উৎসগুলোয়, রাস্তা-ঘাটে ও বৃক্ষের ছায়ায় মলমূত্র ত্যাগ করা।তিনি আরো বলেছেন, ‘তোমরা কেউ বদ্ধ পানিতে প্রস্রাব করে তাতে অজু করো না।

৪. পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা রক্ষায় মহানবী সাঃ বাঁচার জন্য দরকার নিজেদের দেহ-মনকে সতেজ ও নির্মল রাখা। আর এটা নির্ভর করে ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট ও পারিপার্শ্বিক পরিবেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার ওপর। মন ও জীবনকে সুন্দর ও কলুষতামুক্ত রাখা গেলে রোগ-শোক, অসুস্থতা ইত্যাদি থেকে পরিত্রাণ পাওয়া সহজ। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার ব্যাপারে বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ সাঃ বলেছেন, ‘তোমরা তোমাদের পারিপার্শ্বিক পরিবেশকে দূষণমুক্ত করো এবং পবিত্র রাখো।’তিনি আরো বলেন, ‘আল্লাহতায়ালা পবিত্র, তাই তিনি পবিত্রতা ভালোবাসেন। তিনি পরিচ্ছন্ন, তাই পরিচ্ছন্নতা ভালোবাসেন। তিনি সম্মানিত এবং সম্মানিতকে ভালোবাসেন। তোমরা তাই তোমাদের পারিপার্শ্বিক পরিবেশকে পবিত্র রাখো।’ ঈমানের ৭২টি শাখা। তন্মধ্যে সর্বোত্তমটি হলো ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ আর সর্বনিু হচ্ছে রাস্তাঘাট থেকে ক্ষতিকারক জিনিস দূর করা। লজ্জা ঈমানের একটি শাখা।’ শুধু তাই নয়, মানুষের দেহমনকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার ব্যাপারেও মহানবী সাঃ নির্দেশ দিয়েছেন। সে ক্ষেত্রে বায়ু দূষণের হাত থেকে দেহের ভেতরকে রক্ষা করার তাগিদ দিয়েছেন তিনি। কেননা, বায়ু অপরিচ্ছন্ন বা দূষিত হলে তা মানুষের দেহাভ্যন্তরে ক্ষতের সৃষ্টি করে। রাসূল সাঃ তাই বলেছেন, ‘সাবধান! মানুষের দেহাভ্যন্তরে একটি গোশতের টুকরা আছে, সেই গোশতের টুকরাটি যখন ভালো ও সুস্থ থাকবে, পুরো শরীরই ভালো ও সুস্থ থাকবে। আর এটি বিনষ্ট বা কলুষিত হলে পুরো শরীরটাই খারাপ ও বিনষ্ট হয়ে যাবে। মনে রেখো সেই গোশতের টুকরাটি হচ্ছে মানুষের কালব বা হৃৎপিণ্ড।’

শিশুর সুস্থতার জন্য

শিশুর সুস্থতার জন্য


আজকের শিশু আগামী দিনের ভবিষ্যত্। এই শিশুরা ঠিকমত বেড়ে উঠছে কিনা তা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা দরকার। যথেষ্ট খাবারের অভাব, অনুপযুক্ত খাবার, ঘন ঘন অসুখ-বিসুখ এবং প্রয়োজনীয় সেবা-যত্নের অভাবে বিপুলসংখ্যক শিশুর শরীর ঠিকমত বাড়ে না এবং তাদের মানসিক বিকাশ যথাযথ হয় না।

এজন্য কচি শিশুদের বিশেষ প্রয়োজন সম্পর্কে মা-বাবাসহ পরিবারের সদস্যদের সঠিক জ্ঞান লাভ করতে হবে। বাড়ন্ত শিশুদের প্রতি অধিক যত্ন নিতে হবে এবং ঠিকমত বেড়ে ওঠার জন্য নিচের বিষয়গুলো পর্যবেক্ষণ করা দরকার।

জন্মের পর থেকে ২ বছর বয়স পর্যন্ত প্রতি মাসে শিশুর ওজন নিতে হবে। ২ বছরের কম বয়সী শিশুকে যথেষ্ট পরিমাণে উপযুক্ত খাবার দেয়ার পরও যদি তার ওজন না বাড়ে তবে বুঝতে হবে তার অন্য কোনো সমস্যা আছে। এজন্য শিশুকে একজন শিশু বিশেষজ্ঞের কাছে নিয়ে যেতে হবে। অসুখ-বিসুখ বা প্রয়োজনীয় সেবা-যত্নের অভাবে শিশুর ওজন বৃদ্ধি থেমে বা কমে যেতে পারে। অসুখ হলে শিশুকে বিশেষভাবে চেষ্টা করে খাওয়াতে হবে এবং অসুখ সেরে গেলে আগের স্বাস্থ্য ফিরে পেতে তাকে অতিরিক্ত খাবার দিতে হবে। শিশুর খাবারে যথেষ্ট পরিমাণ বলকারক উপাদান (চিনি/গুড় বা তেল) থাকতে হবে। শিশুকে বোতলে খাওয়ানো বন্ধ করে বাটি ও চামচ দিয়ে খাওয়াতে হবে। শিশুর কৃমি থাকলে তাকে কৃমিনাশক ওষুধ দিতে হবে। আর ১ বছর বয়সের মধ্যেই শিশুকে সব কটি টিকা দেয়া জরুরি। টিকা রোগব্যাধি থেকে শিশুকে রক্ষা করে এবং তাকে সঠিকভাবে বেড়ে উঠতে সাহায্য করে।

৬ মাস বয়স পর্যন্ত শুধু বুকের দুধই শিশুর জন্য সেরা খাবার। এই সময়ে তার অন্য কোনো খাবারের দরকার নেই। জন্মের প্রথম ৬ মাসে শিশু নানারকম রোগ-ব্যাধির ঝুঁকির মধ্যে থাকে। বুকের দুধ শিশুকে ডায়রিয়া ও অন্যান্য সাধারণ রোগ থেকে রক্ষা করে।
অন্ততপক্ষে ২ বছর এবং সম্ভব হলে তার চেয়ে বেশিদিন বুকের দুধ খাওয়াতে হবে।
৬ মাস পূর্ণ হলে শিশুকে মায়ের দুধের পাশাপাশি অন্যান্য খাবার দিতে হবে। খিচুড়ি বা জাউয়ের সঙ্গে দিনে অন্তত একবার খোসা ছাড়ানো, সিদ্ধ করা এবং গলানো তরিতরকারি মিশিয়ে শিশুকে খাওয়াতে হবে।

শিশুকে যত রকমারি খাবার দেয়া যায় তত ভালো। ২ বছর বয়স পর্যন্ত শিশুকে ঘন ঘন খাওয়ানো প্রয়োজন।দিনে ৫ থেকে ৬ বার খাওয়াতে হবে। গলানো তরিতরকারি, ছোট মাছ, ডিম, ডাল, তেল, চিনি/গুড় মেশানো খাবার ও মৌসুমী ফল খাওয়াতে হবে। খাবার তৈরির পর ঘণ্টার পর ঘণ্টা ফেলে রাখা যাবে না। তাতে খাবারে রোগজীবাণু জন্মাতে পারে এবং শিশুর অসুখ হতে পারে। এছাড়া শিশুকে ফল, রুটি, মোয়া, নাড়ু, বিস্কুট, বাদাম, কলা বা হাতের কাছে যেসব পুষ্টিকর নিরাপদ খাবার পাওয়া যায় সেগুলো ফাঁকে ফাঁকে দিতে হবে।

শিশুর পুষ্টির জন্য প্রচুর পরিমাণ ভিটামিন প্রয়োজন। যেসব খাবারে ভিটামিন পাওয়া যায় সেগুলোহলোমায়ের দুধ, গাঢ় সবুজ ও রঙিন শাক-সবজি ও ফলমূল, ডিম, কলিজা। ভিটামিন ’-এর অভাবে বাংলাদেশে প্রতি বছর বহু শিশু অন্ধ হয়ে যায়। যথেষ্ট পরিমাণ ভিটামিন পেলে ডায়রিয়া ও হাম গুরুতর আকার ধারণ করতে পারে না। এজন্য প্রত্যেক শিশুর প্রতিদিনের খাবারে যথেষ্ট পরিমাণ ভিটামিন থাকা উচিত।
অসুস্থ অবস্থায় শিশুকে বুকের দুধসহ স্বাভাবিক খাবার খাওয়ানো অব্যাহত রাখতে হবে। অসুখ হলে খাবার ও পানীয় খেতে শিশুকে নানাভাবে উত্সাহ দেয়া প্রয়োজন। শিশু যে ধরনের খাবার পছন্দ করে (যেমন, নরম ও মিষ্টি খাবার) সে ধরনের খাবার অল্প অল্প করে এবং যত ঘন ঘন সম্ভব খাওয়াতে হবে। এ সময় বুকের দুধ অব্যাহত রাখা খুবই জরুরি।

জন্মের পর থেকেই যেমন শিশুর শরীর ঠিকমত বাড়ে, তার মানসিক বিকাশ যথাযথ হয় এবং সে হাসিখুশি থাকে। ঠিকমত বেড়ে ওঠার জন্য শিশুর সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন স্নেহ-মমতা। তাকে স্পর্শ করা, তার সঙ্গে হাসি-ঠাট্টা করা ও কথা বলা এবং তার কাছ থেকে সাড়া পাওয়া প্রয়োজন।

এইডস প্রতিরোধে ইসলামের শিক্ষা

এইডস প্রতিরোধে ইসলামের শিক্ষা


সব ধর্মের মূলকথা মানব কল্যাণ, সুন্দর চরিত্র গঠন, জীবনকে পরিমার্জিত, পরিশীলিত ও উন্নতকরণ। তাই সামাজিক প্রেক্ষাপটে ধর্মের প্রভাব ও ধর্মীয় শিক্ষার গুরুত্ব খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। বর্তমানে সারা বিশ্ব এইডসের ভয়াবহ পরিস্থিতির শিকার। এইডসের করালগ্রাসে মানবসভ্যতা আজ হুমকির মুখে। কিন্তু এ যাবৎ এইডসের ফলপ্রসূ কোনো চিকিৎসা আবিষ্কৃত হয়নি। তবে আশার কথা হলো, এইডস নিরাময় করা না গেলেও এর বিস্তার রোধ করা যায়। এটি একটি প্রতিরোধযোগ্য বিষয়, যা ধর্মীয় শিক্ষা ও ধর্মীয় নীতিমালা অনুশীলনের মাধ্যমে বহুলাংশে প্রতিরোধ করা সম্ভব। পৃথিবীর সেরা চারটি ধর্ম এইডস প্রতিরোধে কী ব্যবস্থাপত্র দিয়েছে সে সম্পর্কে নিØে আলোকপাত করা হলো।

বর্তমানে এইডস হলো মহাবিপর্যয়। এর গতি ঊর্ধ্বমুখী। এখনই এর লাগাম টেনে না ধরলে এ বিপর্যয়ের হাত থেকে মানবসমাজ কিছুতেই রেহাই পাবে না। যার জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত আফ্রিকার সাব-সাহারান অঞ্চল। যেখানে এইডস পরিস্থিতি খুবই ভয়াবহ। যার প্রধান কারণ অবাধ যৌনাচার, সমকামিতা, মাদকাসক্ত, একই সুচ ও সিরিঞ্জের একাধিক ব্যবহার। এ ব্যাপারে ইসলাম ধর্মের দৃষ্টিভঙ্গি হলো

জেনা-ব্যভিচারঃ জেনা ইসলামে নিষিদ্ধ। আল্লাহ বলেছেন, ‘আর তোমরা জেনার কাছেও যেও না। কেননা এটি অত্যন্ত অশ্লীল ও মন্দ পথ।কেউ যেন জেনায় উদ্বুদ্ধ না হয় এবং অপর নারীর সৌন্দর্য যেন কাউকে জেনার দিকে প্ররোচিত না করে, সে জন্য ইসলাম কঠিনভাবে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। আল্লাহ বলেন, ‘হে নবী! আপনি মুমিনদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে সংযত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে। এটি তাদের জন্য পবিত্রতর।কারো যদি বিয়ে করার সামর্থø না থাকে অথচ জৈবিক চাহিদা প্রবল, সে ক্ষেত্রে তিনি যেন অন্যায় কাজে লিপ্ত না হয়ে সংযম প্রদর্শন করেন। আল্লাহর ঘোষণা, ‘যাদের বিয়ের সামর্থø নেই। আল্লাহ তাদেরকে অভাবমুক্ত না করা পর্যন্ত তারা যেন সংযম অবলম্বন করে।রাসূল সাঃ বলেন, ‘যে ব্যক্তি আমার সন্তুষ্টি লাভের জন্য তার দুই চোয়ালের মধ্যবর্তী স্থান (জিহ্বা) আর দুই ঊরুর মধ্যবর্তী স্থানের (যৌনাঙ্গের) দায়িত্ব নেবে, আমি তার জান্নাতের দায়িত্ব নেব।

সমকামিতাঃ এটি ইসলামে নিষিদ্ধ। কুরআনে এসেছে, ‘তোমরা কি তোমাদের যৌন তৃপ্তির জন্য স্ত্রীদেরকে বাদ দিয়ে পুরুষের কাছে আসবে? মূলত তোমরা হচ্ছো এক মূর্খ জাতি।কুরআনের অন্য জায়গায় এসেছে, ‘তোমরা কামবশত পুরুষদের কাছে গমন করো স্ত্রীদের ছেড়ে, বরং তোমরা সীমালঙ্ঘনকারী সম্প্রদায়।আল্লাহর এ বিধান লঙ্ঘনের দায়ে তাদের জনপদকে উল্টিয়ে নিশ্চিহ্ন করা হয়েছে। আজ পর্যন্ত সেই মৃত সাগরে কোনো প্রাণীর অস্তিত্ব পাওয়া যাচ্ছে না।

পশ্চিমা বিশ্বে বিবাহপূর্ব যৌন মিলন আইনবিরোধী নয়। আর পুরুষ পুরুষে সমকামিতাকে বৈধতা দেয়া হয়েছে। ফলে সেখানে দুরারোগ্য ব্যাধি এইডসের প্রাদুর্ভাব মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়ছে। যে ব্যাধিটি ইতঃপূর্বে দেখা যায়নি। এটি আল্লাহর বিধান লঙ্ঘনের ফলে গজব হিসেবে এসেছে। রাসূল সাঃ বলেছেন, ‘যখনই কোনো জাতি বা সম্প্রদায় অশ্লীল ও ঘৃণ্য কাজে লিপ্ত হয়, তখন তাদের মধ্যে এমন এক ভয়ঙ্কর মহামারী দেখা দেয়; যা তারা অতীতে কখনো দেখেনি।

বিকৃত যৌনাচার ঘৃণিত কাজ। আল্লাহ বলেন, ‘বলুন হে নবী! আমার প্রভু প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য সব অশ্লীল কাজকে হারাম করেছেন।ব্যভিচারের ভূমিকাও প্রকাশ্য ব্যভিচার। রাসূল সাঃ বলেন, ‘যে লোক নিষিদ্ধ জায়গার আশপাশে ঘোরাফেরা করে, সে তাতে প্রবেশ করার কাছাকাছি হয়ে যায়।তাই ব্যভিচারের কাছে যেতে নিষেধ করা হয়েছে। আল্লাহ বলেন, ‘লা তাকরাবুল ফাওয়াহেশাঅর্থাৎ তোমরা ব্যভিচারের কাছেও যেও না, তা প্রকাশ্য হোক কিংবা অপ্রকাশ্য হোক। ফাওয়াহেশা অর্থ অশ্লীলতা ও নির্লজ্জতা। শুধু ব্যভিচার নয়, সমকামিতার মতো অপকর্মটিও করার সুযোগ যাতে কেউ না পায়, সে জন্য ইসলাম অধিক সতর্কতা অবলম্বন করে ঘোষণা করেছেদুজন পুরুষ একত্রে একই কাপড়ে জড়াজড়ি করে ঘুমাবে না। অনুরূপভাবে দুজন মহিলাও একত্রে একই বস্ত্রের মধ্যে জড়াজড়ি করে ঘুমাবে না।

কুরআন-হাসিদের উপরি উক্ত আলোচনায় নিØের বিষয়গুলো সুস্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে।

১. অনিয়ন্ত্রিত ও অবাধ যৌনাচার এইডস, যৌনরোগ ও সমাজে অশান্তি ছড়ায়।

২. জেনা-ব্যভিচার ও সমকামিতা ইসলামে হারাম এবং এসব কাজে মানুষকে প্রলুব্ধ করে এমন প্রাসঙ্গিক বিষয়ও হারাম। যেমন অশ্লীল কবিতা, পিন-আপ ম্যাগাজিন ও কুরুচিপূর্ণ ব্লু-ফিল্ম প্রভৃতি।

৩. জেনার শাস্তি এক শবেত্রাঘাত, ক্ষেত্রবিশেষে মৃতুøদণ্ড।

৪. বিবাহপূর্ব ও বিবাহবহির্ভূত যৌন মিলন ইসলামে হারাম। আসমানী গজব ও মহামারী আসার কারণই হলো আল্লাহর বিধান লঙ্ঘন।

মাদকদ্রব্য সেবনঃ এইচআইভি সংক্রমণের অন্যতম কারণ হলো সুই আ সিরিঞ্জ ভাগাভাগি করে মাদকদ্রব্য গ্রহণ করা। ইসলামে এ ধরনের মাদক ও নেশা গ্রহণ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। আল্লাহ বলেন, ‘হে রাসূল সাঃ! তারা আপনাকে মদ ও জুয়া সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। আপনি বলে দিন, এ দুটোর মধ্যে রয়েছে মহাপাপ ও মানুষের জন্য অপকারিতা। তবে এ দুটোর মধ্যে পাপ অপকারিতা অপেক্ষা ভয়াবহ।নেশা ও মাদকতা অনেক পাপকাজের জন্মদাতা। তাই এটা নিষিদ্ধ। নেশাজাতীয় যেকোনো দ্রব্যই মাদক, আর যাবতীয় মাদকদ্রব্য হারাম।

আল্লাহপাক বলেন, ‘হে মুমেনগণ! নিশ্চয়ই মদ, জুয়া, মূর্তিপূজা ও ভাগ্য নির্ধারক তীর নিক্ষেপ এসবই নিকৃষ্ট শয়তানি কাজ। সুতরাং তা বর্জন করো, যাতে তোমরা কল্যাণপ্রাপ্ত হও।কারণ মাদকদ্রব্য সেবনের মাধ্যমে দৈহিক, মানসিক ও আর্থিক ক্ষতি, নৈতিক অবক্ষয় ও সামাজিক বিশৃঙ্খলাসহ এইডসের মতো মহামারীর ছড়াছড়ি দেখা দেয়।

খ্রিষ্ট ধর্মঃ খ্রিষ্ট ধর্ম মতে, ব্যভিচার, বহুগামিতা, সমকামিতা, মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার ও মাতলামিজনিত অনাচার নিষিদ্ধ। পবিত্র শাস্ত্র শিক্ষা দেয় সমকামিতা গুরুতর অনৈতিক কাজ। এটি প্রাকৃতিক বিধান। খ্রিষ্ট ধর্ম এটা কিছুতেই অনুমোদন করে না। খ্রিষ্ট ধর্ম মতে, মানুষ যখন ঈশ্বরপ্রদত্ত নৈতিকতার বিধিবিধান অস্বীকার করে তখন তারা মারাত্মক ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়, জীবন ও সৃষ্টিকে কলুষিত করে। বর্তমানে এইচআইভি/এইডস ঈশ্বরের বিধান লঙ্ঘনের ফল। এ ধরনের ব্যাধি নিজেরও ধ্বংস ডেকে আনে, অন্যদেরকেও ভয়ঙ্কর ঝুঁকিতে ঠেলে দেয়। তাই ঈশ্বর আদেশ দিয়ে বলেন, ব্যভিচার থেকে দূরেই থাকো।

মঙ্গলবাণী প্রচারক সাধু পৌলও বলেছেন, ব্যভিচার, অশুচিতা, উচ্ছৃঙ্খলতা মানুষের নিচু স্বভাবের কাজ। খ্রিষ্ট ধর্ম বলে মানব জীবন অন্তে পরমেশ্বর নিজে নৈতিকতার মানদণ্ডেই সবাইকে বিচার করবেন। আর ব্যভিচারী নিক্ষিপ্ত হবে আগুনের হ্রদে। পরমেশ্বর সব ব্যভিচারী ও দুশ্চরিত্রদের বিচার করবেনই করবেন। অতএব এইচআইভি/এইডস প্রতিরোধে খ্রিষ্ট ধর্মের অনুশাসন একটি অনন্য ব্যবস্থাপত্র।

হিন্দু ধর্মঃ হিন্দু ধর্মে মহাপাপ পাঁচটি। তার মধ্যে পরদ্বার গমনঅর্থাৎ পর স্ত্রীর সাথে যৌন মিলন অন্যতম। এ পাপের শাস্তি মৃতুøর পর বিভীষিকাময় নরক। এ ধর্ম মতে, কাম রিপুর নিয়ন্ত্রণ না থাকলে ভারসাম্যপূর্ণ জীবনযাপন হয় না। এতে যৌনাচারের ছড়াছড়ি দেখা দেয়। যার ফল বর্তমানে অভিশপ্ত এইডস। তাই অবৈধ কাম ও প্রবৃত্তির আহ্বান থেকে দূরে থাকতে হবে। পরদ্বারেষু মাতৃবৎঅর্থাৎ পরস্ত্রীকে মায়ের মতো দেখতে হবে। এ সত্য হৃদয়ে প্রতিফলিত হলে সমাজ হবে শৃঙ্খলাময়, জীবন হবে সুন্দর, সুখময় ও আনন্দময়।

বৌদ্ধ ধর্মঃ বৌদ্ধ ধর্মের মূল ভিত্তি হলো শীল, সমাধি ও প্রজ্ঞা। এ তিনটির ব্যত্যয় ঘটলেই মানব জীবন ধ্বংস হয়। শীল অর্থ চারিত্রিক বিশুদ্ধতা, নীতি, আদর্শ, সুশৃঙ্খল জীবনের গৌরবতা। বৌদ্ধ মতে, শীল পালনের দ্বারা দেহ, বাক্য, মন যেমন সংযত ও পবিত্র হয়; তেমনি চিত্ত হয় দমিত ও শান্ত এবং মানব জীবন হয় পরিশীলিত।

বুদ্ধ বলেছেন, ‘কামেসু মিছছাচারা বেরমনী সিকখাপদং সমাদিয়ামি।অর্থাৎ আমি সর্বপ্রকার মিথ্যা, কামাচার কিংবা অবৈধ যৌনাচার থেকে বিরত থাকব এর শিক্ষাপদ গ্রহণ করেছি। বৌদ্ধ ধর্ম বলে, বহুকামিতার বহু দুঃখ, বহু অশান্তি। মিথ্যা, যৌনাচারেও বহু পরিণতি। এতেই থাকে মারাত্মক এইডসসহ নানা যৌন রোগে আক্রান্ত ও দুর্দশার আশঙ্কা। সুতরাং এইচআইভি/এইডস থেকে মুক্তি পেতে বৌদ্ধ ধর্মের নীতিমালা অনুসরণ খুবই ফলপ্রসূ হিসেবে সবার কাছে সমাদৃত।

উপসংহারঃ উপরি উক্ত আলোচনায় এ বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে প্রতিভাত হয়েছে, এইচআইভি/এইডস হলো অনিয়ন্ত্রিত বিকৃত ও অবাধ যৌনাচারের ফলাফল। যার বিষবাষ্প বিশ্বময় ছড়িয়ে পড়ে মানবসম্পদ উন্নয়নের পথকে বাধাগ্রস্ত করছে। এর থেকে উত্তরণের জন্য নিØমোক্ত বিষয়গুলো পালন করা খুবই জরুরি

(ক) ধর্মীয় ও সামাজিক নীতি, আদর্শ ও অনুশাসন কঠোরভাবে মেনে চলা। শিক্ষা ক্ষেত্রে সব স্তরে ধর্মীয় শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা।

(খ) এইডসের কুফল গণমাধ্যমে তুলে ধরা। বিশেষ করে সর্বজন গ্রহণযোগ্য গণমাধ্যম হিসেবে খ্যাত মসজিদের ইমামদেরকে এইচআইভি/এইডসের ওপর বিশেষ ট্রেনিং দিয়ে পরিকল্পনামাফিক কাজে লাগানো। এ ক্ষেত্রে মন্দির, গির্জা ও প্যাগোডার ধর্মীয় যাজকগণকেও এ কাজে অন্তর্ভুক্ত করা।

(গ) সব ধরনের অনৈতিক, অবৈধ ও অনিরাপদ দৈহিক সম্পর্ক বর্জন করা।

(ঘ) যৌন কৌতূহল জাগে বা যৌনকর্ম সম্পাদনে উত্তেজিত হয়ে ওঠে, এমন কাজ বন্ধ করা। যেমন যৌন আবেদনময়ী অশ্লীল উপন্যাস, নোংরা যৌন পত্রপত্রিকা, স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেলগুলোর নগ্ন দেহ প্রদর্শনী প্রভৃতি।

(ঙ) দেহ ব্যবসায়ীদের পুনর্বাসন ও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা।

(চ) বিবাহে সক্ষম ব্যক্তিদেরকে বিবাহের প্রতি উৎসাহিত করা। নচেৎ সংযম অবলম্বন করা।

(ছ) উঠতি বয়সের তরুণ-তরুণীদের প্রতি অভিভাবকদের সদা সতর্ক দৃষ্টি রাখা। বয়ঃসন্ধিকালে তাদেরকে ধর্মীয় অনুরাগ ও ধর্মীয় নীতি-আদর্শ মেনে চলার ব্যবস্থা করা। (জ) রক্তের প্রয়োজন হলে পরীক্ষা করে নেয়া।

(ঝ) অপারেশনের যন্ত্রপাতি ব্যবহারের আগে জীবাণুমুক্ত করা।

(ঞ) এইচআইভি আক্রান্ত মায়ের দুধ শিশুদের খাওয়ার বিষয়ে বিজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ নেয়া।

সুতরাং এইডসমুক্ত দেশ, এইডসমুক্ত জাতি ও এইডসমুক্ত সমাজ গঠনে উপরি উক্ত বিষয়গুলো পালন করতে হবে। এইডসমুক্ত জীবন ধারণে এর কোনো বিকল্প নেই।

%d bloggers like this: