পর্দার মর্যাদা

পর্দার মর্যাদা


আল্লাহ বলেন, ‘হে আদম! তুমি ও তোমার স্ত্রী জান্নাতে থাকো এবং যা ইচ্ছে খাও তবে এ গাছের কাছে যেও না,তাহলে জালিমদের অন্তর্ভুক্ত হবে।শয়তান উভয়কে ধোঁকা দিলো যেন তাদের গোপন অঙ্গ প্রকাশিত হয় যা তাদের কাছে গোপন ছিল। সে ধোঁকায় ফেলল, বৃক্ষের ফল খেল এবং তাদের লজ্জাস্থান প্রকাশ হয়ে পড়ল। আর তারা জান্নাতের পাতা দিয়ে ঢাকতে লাগল। আল্লাহ বললেনতোমরা পরস্পর শত্রুরূপে নেমে যাও।সূরা আহজাব।

আল্লাহ তোমাদের জন্য কুরআনে সাবধান বাণী পাঠালেনহে আদম সন্তান। শয়তান যেন বিপদে না ফেলে যেভাবে সে তোমাদের পিতা-মাতাকে বেহেশত হতে বের করেছিল। সে তাদের লজ্জাস্থান দেখানোর জন্য তাদের বিবস্ত্র করেছিল। নিশ্চয়ই সে ও তার দল তোমাদের এমনভাবে দেখে অথচ তোমরা তাদের দেখো না। যারা ঈমান আনে না শয়তানকে আমি তাদের বন্ধু করেছি।’- সূরা আহজাব।

নিরাপত্তা বা নষ্ট না হওয়ার ব্যবস্থা হিসেবে আল্লাহ প্রতিটি প্রাণী, ফল এবং সব সৃষ্টিকে এক রকমের পর্দা বা আবরণ দিয়ে সৃষ্টি করলেন। পাখির গায়ে পালকের পর্দা; গরু, ছাগল, ভেড়া সব সৃষ্টিতে আছে আবরণ। জীবজন্তুর অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলো শালীনতার সাথে প্রকাশ পায়। প্রকৃতির বিচিত্র লীলাখেলায় আমরা কোনো কিছুই অশালীন-অপবিত্র,দৃষ্টিকটু লক্ষ করি না। আল্লাহ মানুষকে নিজ হাতে শালীন বা অশালীনের পথ বেছে নেয়ার ক্ষমতা দিলেন।

আল্লাহ বলেন, ‘হে আদম সন্তান। আমি তোমাদের জন্য পোশাক সৃষ্টি করেছি লজ্জাস্থান ঢাকার ও জাঁকজমকতার আর তাকওয়ার পোশাক। এটি উত্তম। এটি আল্লাহর আয়াতসমূহের বা নিদর্শনসমূহের মধ্যে অন্যতম, আল্লাহ জিকিরের বা স্মরণের জন্য।এই আয়াতটিতে জাঁকজমকতা বলতে পবিত্রতার জাঁকজমকতা এবং তাকওয়ার পোশাক বলতে পবিত্র শালীন পোশাক বোঝানো হয়েছে।

আমরা যে যার খুশি বা ইচ্ছেমতো পোশাক বা আচার-ব্যবহার করতে পারি না। পোশাক, আচার-ব্যবহার কিভাবে করতে হবে সেটিও কুরআনে আল্লাহ বলেছেন। নারী-পুরুষ পরস্পর কথা বলবে কর্কশ স্বরে (মাহরুমদের ক্ষেত্রে)।

আল্লাহ বলেন, ‘হে নবী! আপনি আপনার স্ত্রীদের কন্যাদের এবং যারা ঈমানদার নারী তাদেরকে বলে দিন, তারা যেন তাদের নিজেদের ওড়নাসমূহ ওপরের দিক থেকে টেনে নিচের দিকে ঝুলিয়ে দেয়। তাদেরকে চিনতে পারার জন্য এটা উত্তম পন্থা, ফলে তারা উত্ত্যক্ত হবে না। আল্লাহই ক্ষমাশীল ও দয়ালু।’- সূরা আহজাব।

অর্থাৎ শালীনতা আনয়নে ওড়না ওপর দিক থেকে নিচ দিকে ঝুলিয়ে (মাথা থেকে যেহেতু বলা হয়নি সেহেতু ঘাড় থেকে হতে পারে) ঢেকে রেখে পর্দার কথা বলা হলো।

এতে রয়েছে নারী-পুরুষ উভয়ের নিরাপত্তার সুব্যবস্থা। নারীর বেপর্দায় প্রথমত পুরুষরা উত্ত্যক্ত হয়, পরে নারীরা উত্ত্যক্ত হয়। এই উত্ত্যক্ততা নিয়ে যায় ব্যভিচারের দিকে। তাহলে ব্যভিচারের মূলে নারীর বেপর্দা। কুরআনে আল্লাহ ব্যভিচারীর কঠিন শাস্তি এবং রহমত থেকে বঞ্চিতকরণের কথা ঘোষণা করেন। তাহলে পর্দা হলো নিরাপত্তার ঢালস্বরূপ। আপনি মুমিনদের বলে দিন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থান হেফাজত করে;এটা তাদের পবিত্রতা। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাদের কর্ম সম্পর্কে অবহিত। আর মুমিন নারীদের বলে দিন তারা তাদের দৃষ্টি যেন সংযত রাখে ও লজ্জাস্থান হিফাজত করে।’ – সূরা নূর।

এখানে আল্লাহ পুরুষের পর্দার কথা বললেন নারীর পাশাপাশি। আজকাল নারী-পুরুষ নিজ নিজ সৌন্দর্য আকর্ষণীয় করে তা প্রকাশে আগ্রহী হয়ে নিজকে সার্থক, যোগ্য বলে ধারণা পোষণ করছে।

আল্লাহ এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘সাধারণত প্রকাশমান তা ব্যতীত কারো কাছে রূপ প্রকাশ না করে আর তারা যেন তাদের ওড়নাগুলো স্বীয় বক্ষের ওপর জড়িয়ে রাখে; আর নিজেদের সৌন্দর্য স্বামী, পিতা, শ্বশুর, পুত্র, স্বামীর পুত্র, ভাই, ভাই-পো,বোন-পো, নারী দাসী, কামনাহীন পুরুষ, নাবালক বালকদের ব্যতীত স্বীয় সৌন্দর্য প্রকাশ না করে। এমনভাবে পা না ফেলে যাতে তাদের অলঙ্কার প্রকাশ পায়।’ –সূরা নূর।

তাহলে অলঙ্কার ব্যবহারে নিষেধ নেই, প্রকাশে বিধিনিষেধ রয়েছে।

একজন পুরুষ ও একজন নারীর জন্ম একই স্বাধীনভাবে। নারী অর্থ এই নয় যে তাদের খাওয়া, পরা, চিন্তাভাবনা নেই; জড় পদার্থের মতো পঙ্গু হয়ে পরনির্ভর হওয়া।

হিজাব বা পর্দায় রয়েছে পুরুষের সমান শক্তি ও সেই সাথে স্মার্টনেস। পর্দায় একজন নারীর প্রতি পুরুষের কোনো উত্ত্যক্ত করার মতো দৃষ্টি থাকে না বলে নারীর থাকে না জড়তা, ভীতু না হয়ে সে হয়ে ওঠে সাহসী এবং থাকে না কোনো নিরাপত্তার প্রয়োজন এবং সে হয়ে ওঠে পরনির্ভর না হয়ে আত্মনির্ভর এবং ব্যক্তিত্ব পবিত্রতা-গাম্ভীর্যতায় ভরপুর যা তাকে করে তোলে অধিকতর স্মার্ট ও কর্মদক্ষ। আল্লাহ আত্মনির্ভরতা, ব্যক্তিত্ব, কর্মদক্ষতা ও স্মার্টনেস পছন্দ করেন।

পর্দা ছাড়া পুরুষের সাথে সহ-অবস্থানে, সম-অধিকারে একযোগ হওয়া কিছুতেই সম্ভব নয়। তবে বিবেক-চক্ষু বন্ধ রেখে পর্দা, পবিত্রতা, শালীনতার তোয়াক্কা না করে হীনতা, অমর্যাদা মাথায় তুলে নিলে সম্ভব; যা আজকাল লক্ষ করা যায়।

পর্দায় জড়তা ও কৃত্রিমতা থাকে না বলে নারী হয়ে যায় অধিকতর বলীয়ান এবং আল্লাহর আদেশ বাস্তবায়নে অধিকতর মনোবলে হয় সক্ষম। সব কাজ করতে ঘরে-বাইরে এবং থাকে না কোনো ডর-ভয়, উত্ত্যক্ততা; যার ফলে আত্মনির্ভর হয় নারী জাতি।

পর্দা পালনে একজন নারী হয় না দুর্বল। সব রকমের জড়তা কাটিয়ে হয়ে ওঠে অধিকতর তেজস্বী। একজন বেপর্দা নারী লোলুপ দৃষ্টির শিকারে সে হয়ে পড়ে পঙ্গু, ভীতিপ্রদ ও পরনির্ভর। আত্মনির্ভরতার একমাত্র অবলম্বন পর্দা।

নারী-পুরুষ চিহ্নিতকরণের লক্ষ্যে পোশাকে থাকতে হবে ব্যবধান। হাদিসে আছেনারীগণ পুরুষের পোশাক এবং পুরুষগণ নারীদের পোশাক পরিধান করো না।

কুরআনের আদেশ-নিষেধের সীমারেখায় আবদ্ধ আমাদের জীবন। ঠিক যেমন জন্ম-মৃতুø আমাদের ইচ্ছাধীন নয়। কুরআনে বাঁধা আমাদের জীবন-জৌলুশ সব কিছু।

পর্দায় আছে জীবনযুদ্ধে অশরীরী শক্তির জোগান। আল্লাহ ও রাসূলের সান্নিধ্য, সাহায্য ও সফলতা লাভ। আল্লাহর রাস্তায় যে থাকে তার জন্য রয়েছে সঙ্কটের বদলে স্বস্তি এবং আল্লাহর নিজ হাতে সঙ্কটের পথে না চালিয়ে স্বস্তির পথে চালনা ও রহমত দান।’- কুরআন।

পর্দা মানুষের স্বভাবজাত ধর্ম বা জন্মগত স্বভাব। আমাদের কারণেই হয় বিকৃত। আল্লাহ বলেন, ‘নূরুন আলা নূরিন।’ –সূরা নূর অর্থ একটি নূরের ওপর আরেকটি নূর। অর্থাৎ আল্লাহর নূরের ওপর মানুষের নূর। আমাদের পর্দায়,পবিত্রতায়, মর্যাদায় রয়েছে পবিত্র নূরের অবস্থান।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: