উগ্রতা নয় বিনয় মুমিনের অহঙ্কার

উগ্রতা নয় বিনয় মুমিনের অহঙ্কার


শত শত মুসলিমের অংশগ্রহণে একটি মসজিদে জামাতে নামাজ চলছিল। পিনপতন নীরবতার মধ্যে ইমামের নেতৃত্বসুলভ গাম্ভীর্যপূর্ণ উচ্চারণ ছাড়া আর কোনো শব্দ শোনা যাচ্ছিল না। নামাজ প্রায় শেষলগ্নে। সহসা নামাজরত এক মুসলিমের মোবাইল ফোন বেজে উঠল। ফোনটি অনবরত বাজতে লাগল। ব্যবহারকারী হয়তো জানতেন না,নামাজের মধ্যে ফোন বেজে উঠলে তা দ্রুত বন্ধ করতে হয়। এ বিষয়ে বিশিষ্ট আলেমদের ফতোয়া রয়েছে। তবুও এটি সুস্পষ্ট, ব্যবহারকারী ইচ্ছা করে ফোনটি খোলা রাখেননি। হয়তো দ্রুততা বা বিস্মৃতির কারণে ফোনটি বন্ধ করা হয়নি। এমন ভুল যে কারো দ্বারা যখন তখন হতে পারে এবং তা প্রায়ই হতে দেখা যায়। তাই সঙ্গত কারণেই ব্যবহারকারীর ওপর ক্ষুব্ধ হওয়া বা তাকে ঘিরে অসৌজন্যমূলক মন্তব্য করার অধিকার কারো ছিল না। কিন্তু বিস্ময়ের সাথে দেখা গেল নামাজ শেষ হওয়ার সাথে সাথেই মসজিদজুড়ে শোরগোল শুরু হয়েছে। চতুর্দিক থেকেই বাক্যবাণ ছুটে আসছে ওই লোকটির দিকে। প্রতিটি বাক্যই অসৌজন্যমূলক আর মানহানিকর। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছিল ওই লোকটিকে নিন্দা করাই পরহেজগারি। আর সবাই যেন সেই পরহেজগারি অর্জনের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত।

লজ্জার বিষয় হলো কটু মন্তব্যগুলো যাদের মুখ থেকে বের হচ্ছিল তারা সবাই নিজেকে মুসলিম দাবি করে। অথচ আল্লাহর রাসূল সাঃ বলছেন, ‘মুসলিম সেই ব্যক্তি যার জিহ্বার (কটুবাক্য) ও হাতের (অনিষ্ট ও নির্যাতন) থেকে অন্যরা নিরাপদ থাকে।’ (মিশকাত)।

তা হলে আমরা কেমন মুসলিম! অন্যকে কটুবাক্য বলতে দ্বিধাবোধ করছি না। আমরা ইসলামের কতটুকু গ্রহণ করেছি? আমরা কতটুকু মুসলিম? এ প্রশ্নগুলো আরো দীর্ঘায়িত হয় রাসূল সাঃ-এর একটি হাদিস মনে করলে। হজরত আবু হুরায়রা রাঃ বলেন, ‘একদিন এক বেদুইন দাঁড়িয়ে মসজিদে প্রস্রাব শুরু করল। উপস্থিত লোকজন দেখে তাকে বাধা দিতে যাচ্ছিল। কিন্তু প্রিয় নবী সাঃ তাদের বললেন, ওকে ছেড়ে দাও। ওর প্রস্রাব শেষ হলে এক বালতি পানি ঢেলে দিয়ো।নিশ্চিতভাবে জেনে রেখো, তোমাদের সহজ ও বিনয়ী আচরণ করার জন্য পাঠানো হয়েছে, কঠোরতা বা উগ্রতার জন্য পাঠানো হয়নি।’ (বুখারি শরিফ, ২২০ নম্বর হাদিস)।

উপরিউক্ত হাদিস আর আমাদের মতো নামধারী মুসলিমদের আচরণ দেখলে মনে হয়, আমরা প্রিয় রাসূলের চেয়েও বড় মুসলিম! মসজিদে প্রস্রাব করা সত্ত্বেও রাসূল একজন বেদুইনের সাথেও উগ্র না হয়ে বিনয়ী আচরণ করতে বললেন। অথচ আমরা সামান্য মোবাইল বেজে ওঠার শব্দেই ক্ষেপে যাই। বিনয় হারিয়ে ফেলি। অন্যের মর্যাদা রক্ষা করি না। সামান্য মতের বৈপরীত্য ঘটলেই আমরা অন্যকে অবলীলায় হেয়প্রতিপন্ন করি। এভাবে প্রতিটি ক্ষেত্রেই ইসলামের বিনয়ের আদর্শকে বিসর্জন দিয়ে আমরা মুসলিমরা ক্রমান্বয়ে উন্নাসিকতা আর উগ্রতার চোরাবালিতে আটকে যাচ্ছি।

সহজ, সরল ও স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ জীবনব্যবস্থা ইসলামকে আমরা কঠোর থেকে কঠোরতর করে তুলছি। অথচ রাসূল বলছেন, ‘নিশ্চয়ই দ্বীন সহজ-সরল। দ্বীন নিয়ে যে বাড়াবাড়ি করবে, দ্বীন তাকে পরাজিত করবে। সুতরাং তোমরা মধ্যপন্থা অবলম্বন করো এবং মধ্যপন্থার নিকটবর্তী থাকো।’ (বুখারি শরীফ, হাদিস নম্বর ৩৮)।

রাসূল সাঃ সব বিষয়েই উগ্রতা ও কঠোরতার পরিবর্তে মধ্যপন্থা ও নম্রতা অবলম্বন করতে বলেছেন। এমনকি ওয়াজ-নসিহত দীর্ঘায়িত করে মানুষকে বিরক্ত করতেও রাসূল নিষেধ করেছেন। হজরত আনাস রাঃ বলেন, ‘নবী করিম সাঃ বলেছেন, তোমরা দ্বীনের ব্যাপারে সহজ পন্থা অবলম্বন করবে, কঠিন পন্থা অবলম্বন করবে না। মানুষকে সুসংবাদ শোনাবে, বিরক্তি সৃষ্টি করবে না ।’ (সহি বুখারি, হাদিস নম্বর ৬৯)

রাসূল সাঃ-এর ব্যক্তিজীবনও ছিল বিনয়ের আদর্শের শ্রেষ্ঠতম উদাহরণ। তিনি নিজেও যেমন বিনয়ী ছিলেন তেমনি তার সামনেও কেউ বিনয়ের পরিপন্থী কিছু করলে তিনি তা সহ্য করতেন না।

হজরত আয়েশা সিদ্দিকা রাঃ-এর উপস্থিতিতে এক কাফির এসে রাসূল সাঃ-কে লক্ষ করে বলেছিল, হে মুহাম্মদ! তুমি ধ্বংস হও। রাসূল সাঃ এতে কোনো প্রতিক্রিয়া দেখালেন না। কিন্তু আয়েশা সিদ্দিকা রাঃ ওই কাফিরকে লক্ষ করে একই কথার দ্বারা উত্তর দিয়ে দিলেন। এতে রাসূল সাঃ বিরক্ত হয়ে আয়েশা সিদ্দিকা রাঃকে বললেনআলাইকি বির রিফ্‌কি।হে আয়েশা! তোমার বিনয়ী হওয়া প্রয়োজন (যেহেতু তুমি মুসলিম)। এভাবে রাসূল সাঃ অসংখ্য জায়গায় বিভিন্নভাবে মুসলিমদের বিনয়ী হতে নির্দেশ দিয়েছেন।

মুসলিমরা যত দিন বিনয়ের আদর্শকে সমুন্নত রেখেছে তত দিন পৃথিবীর বেশির ভাগ মানুষের কাছে তাদের গ্রহণযোগ্যতা ও মর্যাদা সমুন্নত ছিল। বিনয় বিসর্জন দিয়ে তারা এখন সৌন্দর্যহীন এক ভাগ্যবিড়ম্বিত জাতি।

মুসলিম মানে পরম পালনকর্তা আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণকারী ব্যক্তি। আর আল্লাহ বলছেন, ‘আমার কাছে আত্মসমর্পণকারী বান্দা হলো তারা যারা পৃথিবীতে বিনয়ের সাথে চলে। এমনকি কোনো মূর্খ তাদের মূর্খতাসুলভ কথা বললেও তারা (বিশৃঙ্খলা এড়িয়ে) সালাম দিয়ে চলে যায়।’ (আল কুরআন ২৫ঃ৬৩)

এ আয়াত প্রমাণ করে মুসলিম হতে হলে বিনয় থাকতে হবে, বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির পরিবর্তে সহনশীলতা থাকতে হবে। অন্যের প্রতি যথার্থ শ্রদ্ধাশীল হতে হবে।

অন্যের সাফল্য দেখে আপনি হিংসায় জ্বলবেন, তাকে টেনে নামাতে নানা ফন্দি-ফিকির করবেন, পান থেকে চুন খসতেই কারো প্রতি ক্ষেপে যাবেন, দাঁত-মুখ খিঁচিয়ে খিস্তি-খেউর আওড়াবেন। আপনি আবার মুসলিম! না। আপনার মতো বিনয়ের সৌন্দর্যহীন প্রাণী আল্লাহর বান্দা হওয়ার যোগ্যতা রাখে না।

রাসূল সাঃ শুধু মুসলিমদের সাথে নয়, সব মতাদর্শের, সব ধর্মের, সব বর্ণের মানুষের সাথেই বিনয়ী আচরণ করেছেন। বিপদে পাশে দাঁড়িয়েছেন। সেবা করেছেন। মুসলিমদেরও করতে নির্দেশ দিয়েছেন। ব্যক্তিগতভাবে এমনকি শারীরিকভাবে চরম নিগৃহীত হয়েও তিনি বিনয় বিসর্জন দেননি। চরম ক্রোধ আর ক্ষোভকে পদদলিত করে তিনি জীবনের সব ক্ষেত্রে বিনয়-নম্রতাকে সমুন্নত রেখেছেন। এক বেদুইনের জন্য কূপ থেকে পানি তুলতে গিয়ে রাসূল সাঃ-এর হাত থেকে রশি ছিঁড়ে বালতি পড়ে গিয়েছিল গভীর কূপে। বালতির মালিক বেদুইন ক্রোধের কাছে পরাজিত হয়ে রাসূলের পবিত্র চেহারায় চড় বসিয়ে দিয়েছিল। এ অবস্থায়ও বিনয়ের মূর্তপ্রতীক নবী বিনয়কেই এগিয়ে রাখলেন। নিজের ক্ষোভকে নিজের নিয়ন্ত্রণে রেখে আল্লাহর নামে একটু থুথু ফেললেন কূপের মধ্যে। কূপের পানি ফেঁপে উঠল। সাথে সাথে বালতিও ভেসে উঠল। রাসূল বালতিটি তুলে নিয়ে বেদুইনের হাতে দিয়ে ফিরে গেলেন। রাসূলের বিনয়ের কাছে পরাজিত বেদুইন এবার মর্মপীড়ায় ভুগতে লাগল। এক রাখালের কাছে রাসূলের পরিচয় জানতে পেরে আঁতকে উঠল। নিজের হাত নিজেই কেটে ফেলল, যে হাত দিয়ে সে রাসূলকে আঘাত করেছিল। বিনয়ের তীরে বিদ্ধ বেদুইন কাটা হাত নিয়ে হাজির হলো রাসূলের কাছে। সমর্পণ করল সব। তাওহিদের দাওয়াত গ্রহণ করল সানন্দে। বিনয় সমুন্নত হলো।

আজকের মুসলিম বিনয়বিবর্জিত। বিনয় না থাকায় কারো কারো মধ্যে উগ্রতা জেঁকে বসছে। ধর্মের নাম করে একে অন্যের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়াচ্ছে কেউ কেউ। মতের সামান্য বৈপরীত্য ঘটলেই আখ্যা দিচ্ছে ভিন্নমতাবলম্বী, ভ্রান্তবিশ্বাসী। একে অন্যের বিরুদ্ধে মেতে উঠছে কদর্য মিথ্যাচার আর বিবেকবিবর্জিত প্রচারণায়।

টুপির আকৃতিগত পার্থক্য বা প্রস্তুতজনিত ভিন্নতা আর জিকিরের ধ্বনিগত বা শব্দগত বৈপরীত্যের মতো ঠুনকো বিষয় নিয়ে পরস্পর আলাদা হয়ে রয়েছে বিপুল জনগোষ্ঠী। বিনয়ের অভাবে পরস্পরকে তারা সম্মান না করে ঘৃণা করতে বা হেয়প্রতিপন্ন করতেই আগ্রহ বোধ করে। নিজেদের মধ্যে আলোচনা-পর্যালোচনার মাধ্যমে পার্থক্য কমিয়ে আনার পরিবর্তে বিভেদকে স্থায়ী রূপ দিতে তারা বেশি পারঙ্গম।

অথচ আল্লাহ বলছেন, ‘ঈমানদাররা পরস্পর ভাই ভাই। তাদের মধ্যে বিবাদ দেখা দিলে অন্যরা মীমাংসা করে দাও।’ (আল কুরআন ৪৯ঃ১০)।

মুসলিমদের মধ্যে বিনয়ের অভাবে আর অনৈক্যের সুবাদে অসংখ্য উগ্র ও চরমপন্থী গ্রুপ দানবীয়রূপে আবির্ভূত হচ্ছে। মনে হচ্ছে, তারা পুরো মানবমণ্ডলীকে জবরদস্তি করে হলেও মুসলিম বানিয়ে ফেলতে চায়। অথচ আল্লাহ বলছেন, ‘আমি তোমাদের বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি যাতে তোমরা একে অপরকে চিনতে পারো।’ (আল কুরআন ৪৯ঃ১৩)।

ইসলামের নামে কারো ওপর জবরদস্তি করার কোনো সুযোগ নেই। আল্লাহ স্বয়ং বলছেন, ‘আমি তোমাদের পথ দেখিয়ে দিয়েছি। এখন চাইলে তোমরা আমার পথ অনুসরণ করতে পারো অথবা এ পথ অস্বীকার করে নিজের মতো চলতে পারো।’ (আল কুরআন ৭৬ঃ৩)

আল্লাহ নবীদেরও স্পষ্ট করে বলেছেন, ‘হে রাসূল, আপনার দায়িত্ব শুধু মানুষের কাছে আমার দাওয়াত পৌঁছে দেয়া। আর আমার দায়িত্ব তাদের থেকে হিসাব বুঝে নেয়া।’ (আল কুরআন ১৩ঃ৪০)

মানুষের কাছে ইসলামের বাণী পৌঁছে দেয়া মুসলিমদের দায়িত্ব। কিন্তু সে দাওয়াত কে গ্রহণ করল আর কে প্রত্যাখ্যান করল তার বিচার করার দায়িত্ব আল্লাহ ছাড়া কারো নেই। অতএব কারো প্রতি কোনো জোরজবরদস্তির সুযোগ নেই। অথচ কিছু উগ্র মস্তিষ্কের মানুষ জোরজবরদস্তির পথ গ্রহণ করে বিশ্বব্যাপী ইসলাম নিয়ে আতঙ্কের সৃষ্টি করেছে।

তাই আজ প্রত্যেক মুসলিমের দায়িত্ব বিনয়ের আলোয় নিজের জীবনকে উদ্ভাসিত করা। কোনো ধরনের উগ্রতাকে প্রশ্রয় না দেয়া। আর যে অপশক্তি বিশ্বব্যাপী নিরীহ মানুষকে অবলীলায় হত্যা করে চলছে তাদের বিরুদ্ধে ইস্পাত দৃঢ় ঐক্য গড়ে তোলা। এই চরমপন্থীরাই ইসলাম রক্ষার নাম করে হত্যা করেছিল হজরত উমর রাঃকে ও হজরত ওসমান রাঃকে। আজো তারা ইসলামের নাম ব্যবহার করে নিরীহ বনি আদমকে হত্যা করে চলছে। ইসলামকে কলঙ্কিত করে দেশে দেশে সাম্রাজ্যবাদীদের আগ্রাসনের সুযোগ তৈরি করে দেয়াই হয়তো তাদের লক্ষ্য।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: