ইসলামে মাতৃভাষার গুরুত্ব

ইসলামে মাতৃভাষার গুরুত্ব


ভাষা ও বণেêর নিদশন সম্পকে এরশাদ হয়েছেতার আরো একটি নিদশন হচ্ছে নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলের সৃষ্টি এবং তোমাদের ভাষা ও বণেêর বৈচিত্র্য। নিশ্চয়ই এতে জ্ঞানীদের জন্য নিদশêনাবলি রয়েছে।’ (সূরা আর-রুম, আয়াত ২২)। এ সম্পকেê পবিত্র কুরআনুল কারিমে ঘোষণা করা হয়েছেকরুণাময় আল্লাহ, শিক্ষা দিয়েছেন কুরআন, সৃষ্টি করেছেন মানুষ এবং তাকে কথা বলা শিখিয়েছেন।’ (সূরা আর-রহমান, আয়াত ১-৪)।

পৃথিবীতে অসংখ্য ভাষা রয়েছে। বাংলাদেশের মানুষের ভাষা বাংলা, এমনিভাবে নানা দেশের মানুষের ভাষা নানান ধরনের। আবার একই দেশে রয়েছে অনেক ধরনের ভাষা। আবার একই ভাষার উচ্চারণগত ভিন্নতাও লক্ষ করা যায়। ভাষা ও বণেêর এই বিচিত্রতা বিশ্বজ্ঞানমণ্ডলের শোভা বৃদ্ধি করেছে এবং নানা ধরনের মানুষের মধ্যে পারস্পরিক জানার ও জানানোর স্পৃহা গতিশীল করেছে। মাতৃভাষার মাধ্যমে অন্য ভাষার মানুষের চিন্তা-চেতনা ও জ্ঞান-বিজ্ঞানকে সহজে রপ্ত করা যায় এবং আত্মার গভীরে তা আত্মস্থ করা যায়। মাতৃভাষা অতি সহজেই একজন মানুষের ব্যত্ত্নিসত্তার অন্তগêত হয়ে যায়। অথচ অন্য ভাষা আয়ত্ত করতে হলে যথেষ্ট অনুশীলনের প্রয়োজন হয়। অন্য ভাষা বহু কষ্টে আয়ত্তে আনা সম্ভব হলেও তার প্রতিটি শব্দ ও বাক্যের অথê কিন্তু অনুধাবনে আসে মাতৃভাষার মাধ্যমেই।

মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন পৃথিবীতে অসংখ্য নবী-রাসূল প্রেরণ করেছেন। তারা পৃথিবীতে এসেছেন আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের বাণী মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়ার জন্য। যুগে যুগে আল্লাহতায়ালা যে অঞ্চলে নবী-রাসূল প্রেরণ করেছেন সেই নবী বা রাসূলকে সে অঞ্চলের মানুষের ভাষাভাষী করেছেন। এ সম্পকে পবিত্র কুরআন মজিদে এরশাদ হয়েছেআমি সব নবীকেই তাদের স্বজাতির ভাষাভাষী করেই প্রেরণ করেছি, যাতে তাদেরকে পরিষ্কারভাবে বুঝতে পারে। অতঃপর আল্লাহ যাকে ইচ্ছা পথভ্রষ্ট করেন এবং যাকে ইচ্ছা সৎপথ প্রদশêন করেন। তিনি পরাত্র্নান্ত, প্রজ্ঞাময়।’ (সূরা ইবরাহিম, আয়াত ৪)। আবার এমনটিও লক্ষ করা যায়, কোনো নবী বা রাসূল জন্মগ্রহণ করেছেন এক ভাষাভাষী অঞ্চলে কিন্তু তাকে অন্য ভাষাভাষী অঞ্চলে গিয়ে বসবাস করতে হয়েছে। সেই অঞ্চলের মানুষের ভাষা তিনি আয়ত্তে এনেছেন এবং সেই ভাষাতেই তার প্রচারকাযê করেছেন। যেমন আল্লাহর নবী হজরত লুত আঃ জন্মগ্রহণ করেছিলেন উবêর হেলাল অঞ্চলে বলে পরিচিত মেসোপটেমিয়া অথêাৎ বতêমান ইরাক অঞ্চলে। তিনি পরবতীকালে ফিলিস্তিন অঞ্চলে চলে যান এবং সেই অঞ্চলের মানুষের ভাষায় প্রচারকাযê চালান। এমনিভাবে দেখা যায়, প্রত্যেক নবী-রাসূলই তার মাতৃভাষাতেই মানুষের কাছে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের বাণী পৌঁছে দিয়েছেন, মানুষকে সত্য ও সুন্দরের পথে আহ্বান করেছেন।

আমাদের প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ সাঃ-এর মাতৃভাষা ছিল আরবি। তার কাছে আসমানি কিতাব পবিত্র কুরআন মজিদ নাজিল হয় মানুষের দিশারি এবং সৎপথের স্পষ্ট নিদশêন ও সত্য-মিথ্যার পাথêক্যকারী রূপে। আর এই কুরআন মজিদের ভাষা আরবি। প্রিয় নবী সাঃ-এর মাতৃভাষা আরবিতে কুরআন মজিদ নাজিল হওয়া প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন এরশাদ করেনআমি আপনার ভাষায় কুরআনকে সহজ করে দিয়েছি, যাতে তারা স্মরণ রাখে।’ (সূরা আদদুখান, আয়াত ৫৮)। এমনিভাবে আমি আপনার প্রতি আরবি ভাষায় কুরআন নাজিল করেছি, যাতে আপনি মক্কা ও তার আশপাশের লোকদের সতকê করেন এবং সতকê করেন সমাবেশের দিন সম্পকে।’ (সূরা আশ-শুরা, আয়াত ৭)। আমি একে আরবি ভাষায় কুরআন রূপে নাজিল করেছি, যাতে তোমরা বুঝতে পারো।’ (সূরা ইউসুফ, আয়াত ২)। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তার প্রিয় হাবিব রাসূলে কারিম সাঃ-কে উদ্দেশ করে এরশাদ করেনআমি কুরআনকে আপনার ভাষায় সহজ করে দিয়েছি, যাতে আপনি মুত্তাকিদের সুসংবাদ দেন এবং কলহকারী সম্প্রদায়কে সতকê করেন।’ (সূরা মরিয়ম, আয়াত ৯৭)। এমনিভাবে আমি আরবি ভাষায় কুরআন নাজিল করেছি এবং এতে নানাভাবে সতকêবাণী ব্যত্ত্ন করেছি, যাতে তারা আল্লাহভীরু হয় অথবা তাদের অন্তরে চিন্তার খোরাক জোগায়।’ (সূরা তোয়াহা, আয়াত ১১৩)। আরবি ভাষায় এই কুরআন যাতে কোনো বত্র্নতা নেই। যাতে তারা সাবধান হয়ে চলে।’ (সূরা আয-যুমার, আয়াত ২৮)।

পবিত্র কুরআন মজিদ হতেই আমরা জানতে পারি যে, ইসলামি আদশê যেমন সাবêজনীন ইসলামের ভাষাও তেমনি সাবêজনীন, এভাবে ভাষা, বণê ও আঞ্চলিকতার সীমাবদ্ধতা পেরিয়ে ইসলাম শাশ্বত সত্য ধমê প্রচারে মাতৃভাষা চচêার জোরালো তাগিদ দিয়ে স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেছেনআপনি মানুষকে আপনার রবের পথে বিজ্ঞানসম্মত ও উত্তম ভাষণ দ্বারা আহ্বান করুন এবং তাদের সাথে সদ্ভাবে আলোচনা করুন।’ (সূরা আন-নাহল, আয়াত ১২৫)। আর এ কারণেই দেখা যায়, পরবতীê সময়ে ইসলাম প্রচারকগণ পৃথিবীর যে অঞ্চলে ইসলাম প্রচার করতে গেছেন, সেই অঞ্চলের মানুষের ভাষা আয়ত্ত করে সেই ভাষাতেই ইসলামের সুমহান বাণী তাদের কাছে তুলে ধরেছেন। তাদের মাতৃভাষায় পবিত্র কুরআন মজিদ অনুবাদ করে তাদেরকে কুরআন-হাদিসের জ্ঞান দান করেছেন এবং নামাজ, রোজা, হজ, জাকাতের হুকুম-আহকাম, নিয়মকানুন শিক্ষা দিয়েছেন। যত দূর জানা যায়, বাংলাদেশে ইসলাম প্রচার শুরু হয় ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হজরত ওমর ইবনুল খাত্তাব রাঃ-এর খিলাফতকালের মধ্যভাগ হতে অথêাৎ ৬৪০ খ্রিষ্টাব্দের দিকে। আরব,ইয়েমেন, ইরাক, ইরান, খোরাসান, তুরস্ক, মিসর প্রভৃতি দেশ হতে ইসলাম প্রচারকগণ বাংলাদেশে ইসলাম প্রচার করার জন্য এসেছেন। তারা এ দেশে এসে এ দেশের মানুষের ভাষা আয়ত্ত করেছেন এবং এ দেশের মানুষের ভাষাতেই ইসলাম প্রচার করেছেন। এ দেশের মানুষ অতি সহজেই তাদের কাছ থেকে ইসলাম সম্পকেê জানতে পারে, ফলে দলে দলে মানুষ ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহণ করে। আরো লক্ষ করা যায়, বাংলা ভাষা এক দারুণ অবহেলিত অবস্থা থেকে উদ্ধারপ্রাপ্ত হয় মুসলমানদের আগমনের ফলে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, বাংলার সুলতানদের মাধ্যমেই বাংলা ভাষার উৎকষê ও বিকাশ সাধিত হয়। এ সম্পকে দীনেশ চন্দ্র সেন বঙ্গভাষার ওপর মুসলমানদের প্রভাব শীষêক প্রবন্ধে বলেছেনমুসলমান আগমনের পূবেê বঙ্গভাষা কোনো কৃষক রমণীর ন্যায় দীনহীন বেশে পল্লী কুটিরে বাস করিতেছিল। … বাঙ্গলা ভাষা মুসলমান প্রভাবের পূবেê অতীব অনাদর ও উপেক্ষায় বঙ্গীয় চাষার গানে কথাঞ্চিত আত্মপ্রকাশ করিতেছিল। পণ্ডিতেরা নস্যাধার হইতে নস্যা গ্রহণ করিয়া শিখা দোলাইয়া সংস্কৃত শ্লোকের আবৃত্তি করিতেছিলেন এবংতৈলাধার পাত্রকিম্বা পাত্রাধার তৈলএই লইয়া ঘোর বিচারে প্রবৃত্ত ছিলেন। তাঁহারা হষêচরিত হইতে হাবং দেহি মে হরিণিপ্রভৃতি অনুপ্রাসের দৃষ্টান্ত আবিষ্কার করিয়া আত্মপ্রসাদ লাভ করিতেছিলেন এবং কাদম্বরী, দশকুমার চরিত প্রভৃতি পদ্য রসাত্মক গদ্যের অপূবê সমাসবদ্ধ পদের গৌরবে আত্মহতারা হইতেছিলেন। …সেখানে বঙ্গভাষার স্থান কোথায়?ইতরের ভাষা বলিয়া বঙ্গভাষাকে পণ্ডিতমণ্ডলী দূর দূর করিয়া তাড়াইয়া দিতেন, হাঁড়ি-ডোমের স্পশê হইতে ব্রাহ্মণেরা যেরূপ দূরে থাকেন বঙ্গভাষা তেমনই সুধী সমাজের কাছে অপাঙ্‌ত্ত্নেয় ছিল তেমনি ঘৃণা, অনাদর ও উপেক্ষার পাত্র ছিল। কিন্তু হীরা-কয়লার খনির মধ্যে থাকিয়া যেমন জহুরীর আগমনের প্রতীক্ষা করে, শুত্ত্নির ভিতর মুত্ত্না লুকাইয়া থাকিয়া যেরূপ ডুবুরীর অপেক্ষা করিয়া থাকে, বঙ্গভাষা তেমনিই কোন শুভদিন, শুভক্ষণের জন্য প্রতীক্ষা করিতেছিল। মুসলমান বিজয় বাঙ্গলা ভাষার সেই শুভদিন, শুভক্ষণের সুযোগ আনয়ন করিল। … বঙ্গ-সাহিত্যকে একরূপ মুসলমানের সৃষ্টি বলিলেও অতুøত্ত্নি হইবে না।

উপরি উত্ত্ন উত্ত্নি হতে স্পষ্ট হয়ে যায় যে, মুসলমানরাই বাংলা ভাষাকে স্বমহিমতায় সমুন্নত করেছে। বস্তুত মুসলিম মননে মাতৃভাষাপ্রীতি সঞ্চারিত হয়েছে ইসলামের মাতৃভাষার ওপর অত্যধিক গুরুত্ব আরোপের কারণে। সুতরাং নিজ মাতৃভাষা বাংলা ভাষার স্বকীয়তা রক্ষা করা অপরিহাযê বিষয়। পবিত্র কুরআন মজিদ ও হাদিসে নববী তথা ইসলামের আলোকে ধমêপ্রাণ মানুষের সৎ মনোভাব প্রকাশের দ্বারা মাতৃভাষার প্রতি দায়িত্ব ও কতêব্য, ইসলাম প্রচারে মাতৃভাষার প্রয়োজনীয়তা এবং সবেêাপরি বিশ্বমানবতার কল্যাণে মাতৃভাষার চচা, অনুশীলন, সংরক্ষণ ও উৎকষ সাধনে ভাষাশহীদদের প্রতি যথাযথ শ্রদ্ধাবোধ প্রদশêনে সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।


Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: