মা-বাবার প্রতি দায়িত্ব ও কর্তব্য

মা-বাবার প্রতি দায়িত্ব ও কর্তব্য


বৃদ্ধাশ্রম আমাদের দেশে নতুন কোনো ধারণা নয়। প্রায় এক দশক আগে এ দেশে বৃদ্ধাশ্রম গড়ে উঠতে শুরু করে মূলত সমাজসেবামূলক কাজের অংশ হিসেবে। কিন্তু ধীরে ধীরে এটা ব্যবসায়িক রূপ লাভ করে। বর্তমানে ঢাকা শহরে বেশ কিছু বৃদ্ধাশ্রম গড়ে উঠেছে। সেখানে অর্থের বিনিময়ে বয়স্কদের থাকা, খাওয়া, চিকিৎসা, বিনোদনসহ আনুষঙ্গিক সব ব্যবস্থা করা হয়।

পাশ্চাত্যের অনেক কিছুর সাথে সাথে বৃদ্ধনিবাসএই ধারণাটি আমাদের দেশে প্রবেশ করেছে। পাশ্চাত্যের দেশগুলোতে পরিবারের ভঙ্গুর অবস্থা এমন পর্যায়ে উপনীত হয়েছে যে সেখানে পরিবারের কেউ কারো প্রতি কোনো প্রকার দায়িত্ব পালন করে না। এর ফলে বৃদ্ধরা বিশেষভাবে অসহায় হয়ে পড়ে তাদের দেখাশোনা করার লোকের অভাবে। এ কারণে তাদের শেষ বয়সে প্রয়োজনীয় সেবা প্রদান করার উদ্দেশ্যে ওল্ড এইজ হোম বা বৃদ্ধাশ্রম গড়ে ওঠে।

পশ্চিমের ভোগবাদী জীবনব্যবস্থার অনেক অনিবার্য কুফলের মধ্যে এটিও একটি। যেখানে বেশির ভাগ পরিবার টিনএজ বয়সেই সন্তানের প্রতি দায়িত্ব পালন বন্ধ করে দেয়। এ অবস্থায় তরুণ-তরুণীদের অপরিণত বয়সেই জীবন সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়তে হয়। এক সময় এই তরুণ-তরুণী নিজেদের জীবন নিয়ে এত বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়ে যে মা-বাবার দিকে তাকানোর সময় তাদের থাকে না, সে দায়ও বোধ করে না। তাদের অনুভূতি প্রকাশ করার জন্য তারা এক অভিনব ও বিচিত্র পদ্ধতি আবিষ্কার করেছে মা-বাবার প্রতি একেবারে অকৃতজ্ঞ না হওয়ার জন্য। তা হচ্ছে মা দিবস, বাবা দিবসে বছরে অন্তত একবার মা-বাবার খোঁজ নেয়া ও তাদের জন্য উপহার প্রেরণ যা একই সাথে তাদের ব্যবসায়িক উন্নতির পথও খুলে দিয়েছে। মূলত ব্যবসায়িক কারণেই এই দিবসগুলো বেশি করে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে।

আমাদের দেশের প্রসঙ্গঃ এটা অত্যন্ত দুঃখজনক, ৯০ শতাংশ মুসলমানের দেশ আমাদের বাংলাদেশেও এই বৃদ্ধনিবাস গড়ে উঠেছে এবং তা ক্রমবর্ধমান। এই ক্রমবর্ধমান বৃদ্ধনিবাস গড়ে ওঠা আমাদের সমাজের প্রতি একটা মারাত্মক সঙ্কেত দিচ্ছে তা হলো পিতা-মাতার সাথে সন্তানের বন্ধনের ক্রমহ্রাসমানতা। যেকোনো কারণেই বৃদ্ধাশ্রম গড়ে উঠুক না কেন এটা এই মেসেজই দিচ্ছে যে, এই সমাজের সন্তানের সাথে তাদের মা-বাবার সম্পর্কে ক্রমেই দূরত্ব সৃষ্টি হচ্ছে এবং এমনকি তা মুছেও যাচ্ছে।

আমাদের দেশে বৃদ্ধাশ্রম গড়ে ওঠার পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে দেখা যায় বাবা-মায়ের প্রতি সন্তানদের অবহেলা ও উপেক্ষা। গাজীপুরে প্রতিষ্ঠিত সম্ভবত দেশের প্রথম বৃদ্ধনিবাসের বিভিন্ন সময়ে মিডিয়ার নেয়া সাক্ষাৎকার থেকে এটাই প্রতীয়মান হয় যে, তারা সন্তানদের কাছ থেকে অবহেলা, অনাদর, অবজ্ঞা, উপেক্ষা, মানসিক নির্যাতন এসব কারণেই তাদের সারা জীবনের সংগ্রাম ও সাধনার ফসল সন্তানদের কাছ থেকে চলে আসতে বাধ্য হয়েছেন শেষ বয়সে অন্তত একটু সম্মান ও শান্তিময় জীবনের জন্য। এখানে এসে হয়তো তারা অসম্মান ও অবহেলা থেকে রেহাই পেয়েছেন, অনেকের হয়তো তুলনামূলক অনেক ভালো ব্যবস্থা হয়েছে থাকা, খাওয়া ও চিকিৎসার ক্ষেত্রে, হয়তো সেবাযত্নও পাচ্ছেন, কিন্তু তার পরও প্রশ্ন থেকে যায় মনের শান্তি কি তারা পেয়েছেন? তাদের মনের পর্দায় কি ভেসে ওঠে না প্রিয় সন্তান, নাতি-নাতনী ও স্বজনদের মুখ? সারা জীবন যাদের জন্য সংগ্রাম করেছেন শেষ বয়সে তাদের ছেড়ে কি তারা আসলেই শান্তি পাচ্ছেন? তারা তো পাশ্চাত্যের মা-বাবার মতো সন্তানদের প্রতি উদাসীন থেকে বল্গাহীন জীবন যাপন করেননি। তাহলে এ কেমন প্রতিদান?

একেবারে বিত্তহীন পরিবার থেকে শুরু করে নিুবিত্ত, মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্ত সব ধরনের পরিবারের বয়স্কদের পাওয়া যাবে এসব বৃদ্ধাশ্রমে। আর্থিকভাবে অসচ্ছল পরিবারের বৃদ্ধরা চেরিটেবল আশ্রমে আর সচ্ছল ধনী পরিবারের বৃদ্ধরা অর্থের বিনিময়ে বৃদ্ধাশ্রমে ঠাঁই নিয়েছেন। কখনো তাদের সন্তান এই অর্থের জোগান দিচ্ছেন আবার কেউ হয়তো জীবনের শেষ সম্বল জমানো অর্থ দিয়ে চালাচ্ছেন আশ্রমের খরচ।

খুব কম সদস্যই আছেন যারা শুধু অভাবের তাড়নায় এসে বৃদ্ধাশ্রমে ঠাঁই নিয়েছেন। অনেকে আছেন যাদের সন্তানরা সব বিদেশে থাকে, দেখাশোনার কেউ নেই। আমাদের সমাজে এ ধরনের সমস্যাটি এখন প্রকট আকার ধারণ করতে যাচ্ছে মানুষের বিদেশ গিয়ে উপার্জনে শুধু নয়, চিরতরে সেখানেই থেকে যাওয়ার প্রবণতা বৃদ্ধিতে। আর কেউ হয়তো আছেন তাদের প্রকৃতই দেখাশোনা করার কেউ নেই তবে এ সংখ্যা বোধহয় খুবই কম হবে।

বৃদ্ধাশ্রম গড়ে ওঠার বিভিন্ন কারণঃ বৃদ্ধাশ্রমের অস্তিত্ব প্রমাণ করে আমাদের সমাজে বয়স্করা কোনো না কোনোভাবে অবহেলিত, নিগৃহীত, উপেক্ষিত ও বঞ্চিত হচ্ছেন তাদের পরিবারে। অনেকে সয়ে যাচ্ছেন মুখ বুজে আর কেউ কেউ প্রতিবাদস্বরূপ গিয়ে উঠেছেন বৃদ্ধাশ্রমে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কেন এই অবস্থ্‌া পরিবারগুলোতে? জবাব একটি কথায় দেয়া যেতে পারে যথাযথ শিক্ষার অভাব। মা-বাবার প্রতি সন্তানের কর্তব্য কী এবং তাদের প্রতি সন্তানের দায়িত্ব কতটুকু এ সম্পর্কে যথাযথ নৈতিক ও ধর্মীয় জ্ঞানের অভাবই এর মূল কারণ। আমাদের দেশে সাধারণ শিক্ষাব্যবস্থায় এ বিষয়ে তেমন কোনো গুরুত্ব দেয়া হয় না; ধর্মীয় শিক্ষার প্রতি অনীহা প্রকাশ পায়। সে ক্ষেত্রে একজন শিক্ষার্থী পরিবার থেকেই সামান্য যেটুকু ধর্মীয় জ্ঞান তা পেয়ে থাকে; সেটুকুও বেশির ভাগ ক্ষেত্রে কুরআন তেলাওয়াত শিক্ষার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। নৈতিক শিক্ষাবিহীন শিক্ষাব্যবস্থার ফলটা এই দাঁড়াচ্ছে যে, পড়ালেখা শেষ করে একজন শিক্ষার্থী অর্থ উপার্জনের এক চৌকস মেশিনে পরিণত হয়, যার মধ্যে নৈতিক ও মানবিক গুণ ও মূল্যবোধ জাগ্রত না হয়ে ধীরে ধীরে চাপা পড়ে যায় ব্যক্তিস্বার্থের আড়ালে।

প্রতিবেশী হিন্দুপ্রধান দেশেও দেখা যায় একই চিত্র। সেখানে কলকাতাসহ বিভিন্ন রাজ্যে শত শত বৃদ্ধনিবাস গড়ে উঠেছে কয়েক বছরের ব্যবধানে। এগুলোর বেশির ভাগই ব্যক্তি মালিকানাধীন ও ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। হিন্দুদের মধ্যে শেষ বয়সে আশ্রমে গিয়ে ধ্যান ও উপাসনার জীবন কাটিয়ে দেয়ার উৎসাহ দেয়া হয় ধর্মীয়ভাবেই। কাজেই তাদের মধ্যে স্বেচ্ছায় সংসার ত্যাগ করে গয়া বা কাশী আশ্রমে গিয়ে থাকার প্রবণতা অনেক আগে থেকেই বিদ্যমান। বর্তমানে বাণিজ্যিকভাবে প্রতিষ্ঠিত আশ্রমগুলোতে হিন্দুদের এই ধর্মীয় বিধানকে কাজে লাগানো হচ্ছে সন্তানদের সংসারে বোঝা হয়ে না থেকে আশ্রমে গিয়ে আশ্রয় নিতে, যদিও হিন্দু ধর্মেও পিতা-মাতার প্রতি যথেষ্ট সম্মান প্রদর্শন ও কর্তব্য পালনের তাগিদ দেয়া হয়েছে।

ভারতে দেখা যাচ্ছে অনেকেই কর্মজীবন থেকে অবসরে যাওয়ার আগেই আশ্রমগুলোর খোঁজখবর নিচ্ছেন একটি মানসম্পন্ন বৃদ্ধাশ্রমের সন্ধানে।

তবে আমাদের দেশের প্রেক্ষাপট একেবারেই ভিন্ন। এখানে কোনো হিন্দুকেও শেষ বয়সে কোনো আশ্রমে বাস করতে দেখা যায় না। আবহমানকাল ধরে তারা পরিবারের সাথেই সুখ-দুঃখে জীবনের শেষ দিনটি পর্যন্ত কাটিয়ে দিচ্ছেন। মুসলমানরাও একইভাবে পরিবারের মধ্যেই জীবন কাটিয়ে দিচ্ছে সংসার ত্যাগ করে অন্য কোথাও গিয়ে থাকার কথা তারা চিন্তাও করতে পারে না, কারণ ইসলামে সংসার ত্যাগ সমর্থন করে না। পরিবার ও সমাজে বয়োজ্যেষ্ঠরা যথেষ্ট সম্মান লাভ করে থাকেন হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে আবহমানকাল ধরে এটাই বাংলাদেশের গ্রাম ও শহরের সাধারণ চিত্র। যখন থেকে যৌথ পরিবার ভেঙে একক পরিবারের সংখ্যা বেড়ে যেতে লাগল আর জীবন হয়ে পড়ল ব্যক্তিস্বার্থকেন্দ্রিক। ধনাকাঙ্ক্ষী ও অল্পে তুষ্টিহীন তখন থেকেই বাংলার এই শান্তিময় পরিবার ও সমাজের চিত্রটি বদলে যেতে লাগল। এখন অবসরপ্রাপ্ত মা-বাবাকে তারা পরিবার থেকে বাদ দিয়ে বৃদ্ধাশ্রমে রেখে আসতে পারছে অবলীলায়। সারা জীবনের শ্রমে-ঘামে তিলতিল করে গড়ে তোলা সংসার থেকে শেষ বয়সে প্রিয়জন সান্নিধ্যে সেবাযত্নে দিন কাটাতে ব্যাকুল ঠিক সেই সময়টাতে তাদের বৃদ্ধাশ্রমে রেখে আসা চরম নির্মমতা ও অকৃজ্ঞতা ছাড়া কিছুই নয়।

প্রশ্ন উঠতে পারে একেবারে নিঃস্ব ও অসহায় লোকদের ব্যাপারে। সে ক্ষেত্রে সরকারিভাবে তাদের সাহায্য প্রদান করা যেমন আমাদের দেশে প্রচলিত, ভিজিএফ প্রোগ্রামের মতো আরো কার্যকর অন্যান্য কর্মসূচি চালু করা যেতে পারে। এ ছাড়া সমাজেরও তাদের প্রতি দায়িত্ব পালন করা উচিত, যাতে তাদের নিজ এলাকায় পরিচিত পরিবেশে রেখেই প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা দেয়া যায়। আমাদের দেশে গড়ে ওঠা অসংখ্য এনজিও সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এ ব্যাপারে কর্মসূচি গ্রহণ করতে পারে।

সংখ্যাগুরু মুসলিম দেশে বৃদ্ধাশ্রমের অস্তিত্ব ও বিকাশ লাভ তাই শুধু দুঃখজনকই নয়, অমানবিক ও অবাঞ্ছিতও বটে। এটা প্রমাণ করে, আমাদের সমাজে ও পরিবারে বয়স্করা অসম্মানিত ও অবহেলিত এবং মুসলিম হওয়া সত্ত্বেও ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা থেকে তারা কত দূরে! উপরন্তু ধর্মহীন শিক্ষা ও বিজাতীয় সংস্কৃতির আগ্রাসনে মুসলমানরা নিজেদের অমূল্য শিক্ষা সম্পর্কে উদাসীন হয়ে পড়েছে।

উত্তরণের উপায়ঃ পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মতো বৃদ্ধাশ্রম গড়ে ওঠার প্রবণতা যদি অব্যাহতভাবে বৃদ্ধি পেতে থাকে তাহলে আমাদের হাজার বছরের পারিবারিক ও সামাজিক মূল্যবোধ ধ্বংস ও সমাজ কাঠামো পরিবর্তিত হয়ে এক সময় বিলুপ্ত হবে। পশ্চিমের দেশগুলোর মতো ভোগবাদী ও হতাশাগ্রস্ত সমাজের পরিণতি ডেকে আনবে। এ থেকে উত্তরণের জন্য সচেতন হওয়া ও কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার এখনই সময়। তা নাহলে আজ যারা হয়তো তারুণ্যদীপ্ত উচ্ছল ঝামেলামুক্ত জীবনযাপন করছেন মা-বাবাকে বিদায় করে কয়েক বছর পর তাদেরও এই একই ভাগ্য বরণ করতে হবে সেটা খারাপও হতে পারে। ১. প্রথমেই মা-বাবাকে সচেতন হতে হবে সন্তানকে উপযুক্ত শিক্ষাদানের ব্যাপারে। কারণ পরিবারই হলো সন্তানের শিক্ষার পাঠশালা। সন্তানকে প্রকৃত ইসলামী শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলতে মা-বাবাকেই প্রধান ভূমিকা পালন করতে হবে। ২. আমাদের কারিকুলামে সব ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষা কঠোরভাবে নিশ্চিত করতে হবে। ৩. বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন পিতা-মাতা ও বয়স্কদের প্রতি দায়িত্ব পালনে সমাজের মানুষকে উদ্বুদ্ধ করতে পারে। ৪. মসজিদের ইমাম, সমাজের শিক্ষিত ও নেতৃêস্থানীয় ব্যক্তিরা এ ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেন। ৫. ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে যারা বৃদ্ধাশ্রম গড়ে তুলছেন তাদের উচিত সামাজিক দায়দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন হওয়া। ব্যবসার স্বার্থে একটি সমাজ কাঠামো ও মূল্যবোধ ভেঙে দেয়া যে অনৈতিক তা তাদের মানতে হবে। ৬. মিডিয়াগুলো বয়স্কদের পরিবারে শ্যামল ছায়ায় থাকার অধিকার সম্পর্কে সোচ্চার হয়ে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

সর্বোপরি একটি জনকল্যাণমূলক সরকার দেশ, সমাজ ও পরিবার রক্ষা করতে, মূল্যবোধ বাঁচিয়ে রাখতে সক্রিয়ভাবে এগিয়ে আসতে পারে। বৃদ্ধাশ্রম প্রতিষ্ঠাকে সব দিক থেকে নিরুৎসাহিত করতে হবে। দুস্থ ও অসহায়দের সর্বতোভাবে সাহায্য করতে হবে, তবে তা কোনোভাবেই ব্যবসায়িক স্বার্থে নয়। সবচেয়ে বড় কথা, ইসলামের শিক্ষাকে ঘরে ঘরে পৌঁছে দিতে হবে। বিশেষ করে মা-বোনদেরই এ কাজে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। কাজেই ইসলামী শিক্ষার সাথে বৃদ্ধাশ্রমের ধারণাটি সামঞ্জস্যপূর্ণ তো নয়ই, বরং সাংঘর্ষিক। তাই মুসলমানদের উচিত নিজেদের ধর্মীয় ও তমুদ্দুনিক চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে পিতা-মাতা ও বয়স্কদের প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করা এবং এর মাধ্যমে নিজেদের ইহ-পরকালের মুক্তির ব্যবস্থা করা।

Advertisements

একটি জান্নাতি আমল

একটি জান্নাতি আমল

পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের জন্য আজান দেয়া হয় আর জামায়াতে নামাজ আদায়ের আগে দেয়া হয় ইকামাত। আজান ও ইকামাত শুনলে ধর্মের নিয়মানুযায়ী জবাব দিতে হয়, আর এ জবাবের জন্য রয়েছে ছাওয়াব। আমরা আজানের জবাব দিলেও ইকামাতের জবাব হয়তো অনেকেই দিই না। কেউ কেউ শুধু আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসুলুল্লাহর জবাব দিয়ে থাকেন।
আজান ও ইকামাত শুনে জবাবে কী বলতে হবে তা হাদিসে বর্ণিত হয়েছে। আজানের জবাব সম্পর্কে মুসলিম ও আবুদাউদে বর্ণিত হাদিস হচ্ছে—উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন,মুয়াজ্জিন বলবে, আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার তখন তোমাদের কেউ বলে আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, এরপর যখন মুয়াজ্জিন বলে আশহাদু আন লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, সে বলে আশহাদু আন লা ইলাহা ইল্লাল্লাহা; এরপর যখন মুয়াজ্জিনবলে আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসুলুল্লাহ, সেও বলে আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসুলুল্লাহ (সা.), পরে মুয়াজ্জিন যখন বলে হাইয়্যা আলাস সালাহ, সে বলে লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লাহ বিল্লাহ, পরে মুয়াজ্জিন যখন বলে হাইয়্যা আলাল ফালাহ, সে বলে লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ; এরপর মুয়াজ্জিন যখন বলে আল্লাহু আকবার সে বলে আল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার, পরে মুয়াজ্জিন যখন বলে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ সে তখন বলে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ—এ বাক্যগুলো যদি অন্তর থেকে বলে তবে সে অবশ্যই জান্নাতে প্রবেশ করবে। আর ইকামাতের জবাব সম্পর্কে আবু দাউদে বর্ণিত হাদিস হচ্ছে—আবু উমামা আল-বাহিলি (রা.) অথবা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর অন্য কোনো সাহাবি থেকে বর্ণিত যে,বিলাল (রা.) ইকামাত দিচ্ছিলেন। যখন তিনি কাদ কামাতিস সালাত বললেন, তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন,আকামাহাল্লাহু ওয়া আদামাহা (অর্থাত্ আল্লাহ তা প্রতিষ্ঠিত রাখুন এবং তা চিরস্থায়ী করুন)। বর্ণনাকারী আরও বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইকামাতের অন্যান্য শব্দের বেলায় হজরত উমর (রা.) থেকে বর্ণিত আজানের হাদিসের অনুরূপ বলেছেন। হাদিস দুটি থেকে প্রমাণিত যে, আজানের মতো ইকামাতেরও জবাব দেয়া সুন্নত।
আজানের মৌখিক জবাবের পাশাপাশি বাস্তব জবাবও কিন্তু দিতে হবে নামাজ আদায়ের মাধ্যমে! কাজেই আসুন,ইকামাতের জবাবের বেলায় আর অবহেলা নয়, আজানের মতো আমরা ইকামাতেরও জবাব দিতে সচেষ্ট হই এবংমুসল্লিদের ইকামাতের জবাব দেয়ার সুযোগ দিই। আল্লাহ আমাদের সবাইকে কবুল করুন।

গীবত একটি মারাত্মক কবীরা গুনাহ্‌

গীবত একটি মারাত্মক কবীরা গুনাহ্‌

মানুষ সামাজিক জীব। সমাজবদ্ধ জীবনযাপন ছাড়া একাকী জীবন যাপন করা মানুষের পক্ষে সহজ নয়, তেমনটি কেউ কামনাও করে না। আবার পরিচিত সমাজের বাইরেও মানুষের পক্ষে চলা খুবই কঠিন। পৃথিবীর সমাজবদ্ধ কোনো মানুষই সামাজিক বিপর্যয় কামনা করতে পারেন না। মানুষ সব সময় সুখ ও শান্তি চায়। শান্তি মানুষের একটি আরাধ্য বিষয়। কিন্তু এই প্রত্যাশিত সুখ-শান্তি নির্ভর করে সমাজবদ্ধ মানুষের পারস্পরিক সম্পর্কের ওপর। উঁচু-নিচু, ধনী-দরিদ্র  এসব পার্থক্যই আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন। মানুষের পারস্পরিক পরিচয়ের জন্যই এ সম্পর্কে মহান আল্লাহ সূরা হুজরাতে এরশাদ করেছেন,

يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنَّا خَلَقْنَاكُمْ مِنْ ذَكَرٍ وَأُنْثَى وَجَعَلْنَاكُمْ شُعُوبًا وَقَبَائِلَ لِتَعَارَفُوا إِنَّ أَكْرَمَكُمْ عِنْدَ اللَّهِ أَتْقَاكُمْ إِنَّ اللَّهَ عَلِيمٌ خَبِيرٌ ﴿13﴾

হে মানুষ, আমি তোমাদেরকে এক নারী ও এক পুরুষ থেকে সৃষ্টি করেছি আর তোমাদেরকে বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি।যাতে তোমরা পরস্পর পরিচিত হতে পার। তোমাদের মধ্যে আল্লাহর কাছে সেই অধিক মর্যাদাসম্পন্ন যে তোমাদের মধ্যে অধিক তাকওয়া সম্পন্ন। নিশ্চয় আল্লাহ তো সর্বজ্ঞ, সম্যক অবহিত। (সূরা হুজুরাত: ১৩)

সুতরাং মানব সমাজের এই পার্থক্য সামাজিক ভারসাম্য রক্ষার নিমিত্তেই। যেসব কারণে সমাজের মধ্যে ভ্রাতৃত্ববোধ বিনষ্ট হয়, সমাজ বিপর্যয়ের দিকে ধাবিত হয়, সামাজিক মূল্যবোধ বিনষ্ট হয়, পারস্পরিক সম্পর্ক নষ্ট হয়, তার মধ্যে অন্যতম কারণ হলো গীবত, যা মানুষকে নিকৃষ্টতম প্রাণীতে পরিণত করে। তাই তো মহান আল্লাহ ও তার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মানুষকে এই নিকৃষ্ট স্বভাব থেকে বিরত থাকার তাগিদ দিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ সূরা হুজরাতের ১২ নম্বর আয়াতে বলেন,

وَلَا يَغْتَبْ بَعْضُكُمْ بَعْضًا أَيُحِبُّ أَحَدُكُمْ أَنْ يَأْكُلَ لَحْمَ أَخِيهِ مَيْتًا فَكَرِهْتُمُوهُ

‘আর তোমরা কেউ কারো গীবত করো না, তোমরা কি কেউ আপন মৃত ভাইয়ের গোশত খাওয়া পছন্দ করবে ? একে তোমরা অবশ্যই ঘৃণা করবে।, (সূরা হুজুরাত:১২)

সুস্থ, স্বাধীন কোনো বিবেকবান মানুষই জ্ঞান অবশিষ্ট থাকা পর্যন্ত মৃত মানুষ তো দূরের কথা, যে পশু জীবিত থাকলে হালাল সেই পশু মৃত হলে তার গোশতও ভক্ষণ করবে না। অথচ মানুষ সুস্থ মস্তিষ্কে, স্বাচ্ছন্দ্যের সাথে গীবতের মতো জঘন্য ফেতনায় নিমজ্জিত হয়।
গীবত কী?

গীবত শব্দটির আভিধানিক অর্থ হচ্ছে দোষারোপ করা, অনুপস্থিত থাকা, পরচর্চা করা, পরনিন্দা করা, কুৎসা রটনা করা, পিছে সমালোচনা করা ইত্যাদি।

পরিভাষায় গীবত বলা হয় ‘তোমার কোনো ভাইয়ের পেছনে তার এমন দোষের কথা উল্লেখ করা যা সে গোপন রেখেছে অথবা যার উল্লেখ সে অপছন্দ করে।’ (মু’জামুল ওয়াসিত) গীবতের সবচেয়ে উত্তম ও বাস্তবসম্মত সংজ্ঞা দিয়েছেন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যা নিম্মোক্ত হাদিস থেকে পেতে পারি।

সাহাবি আবু হুরায়রা রাঃ থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, গীবত কাকে বলে, তোমরা জান কি?সাহাবিগণ বললেন, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -ই ভালো জানেন। তিনি বললেন, তোমার কোনো ভাই (দীনি) সম্পর্কে এমন কথা বলা, যা সে অপছন্দ করে, তা-ই গীবত। সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল, আমি যে দোষের কথা বলি তা যদি আমার ভাইয়ের মধ্যে থাকে তাহলেও কি গীবত হবে? উত্তরে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন,তুমি যে দোষের কথা বল, তা যদি তোমার ভাইয়ের থাকে তবে তুমি অবশ্যই তার গীবত করলে আর তুমি যা বলছ তা যদি তার মধ্যে না থাকে তবে তুমি তার ওপর মিথ্যা অপবাদ দিয়েছ। (মুসলিম)
সুতরাং এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়, কোনো ভাইয়ের এমন দোষের কথা বলা গীবত যা সে অপছন্দ করে।

গীবতের পরিণাম

গীবত ইসলামি শরিয়তে হারাম ও কবিরা গুনাহের অন্তর্ভুক্ত। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন,

وَيْلٌ لِكُلِّ هُمَزَةٍ لُمَزَةٍ ﴿1﴾

‘ধ্বংস তাদের জন্য, যারা অগ্র-পশ্চাতে দোষ বলে বেড়ায়।’ (সূরা হুমাজাহ-১)

কেউ গীবত শুনলে তার অনুপস্থিত ভাইয়ের পক্ষ থেকে তা প্রতিরোধ করবে সাধ্যমতো। আর যদি প্রতিরোধের শক্তি না থাকে তবে তা শ্রবণ থেকে বিরত থাকবে। কেননা, ইচ্ছাকৃতভাবে গীবত শোনা নিজে গীবত করার মতোই অপরাধ। হাদিসে আছে, সাহাবি মায়মুন রাঃ বলেন, ‘একদিন স্বপ্নে দেখলাম এক সঙ্গী ব্যক্তির মৃতদেহ পড়ে আছে এবং এক ব্যক্তি আমাকে তা ভক্ষণ করতে বলছে। আমি বললাম, আমি একে কেন ভক্ষণ করব? সে বলল, কারণ তুমি অমুক ব্যক্তির সঙ্গী গোলামের গীবত করেছ। আমি বললাম, আল্লাহর কসম আমি তো তার সম্পর্কে কখনো কোনো ভালোমন্দ কথা বলিনি। সে বলল, হ্যাঁ, এ কথা ঠিক। কিন্তু তুমি তার গীবত শুনেছ এবং সম্মত রয়েছ।’

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, মিরাজের সময় আমাকে এমন এক সম্প্রদায়ের কাছে নিয়ে যাওয়া হলো যাদের নখ ছিল তামার। তারা তাদের মুখমণ্ডল ও দেহ আঁচড়াচ্ছিল। আমি জিবরীল আঃ-কে জিজ্ঞাসা করলাম, এরা কারা? তিনি বললেন, এরা নিজ ভাইদের গীবত করত ও ইজ্জতহানি করত। (মাজহারি)

আবু সায়িদ ও জাবের রাঃ থেকে বর্ণিত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘গীবত ব্যাভিচারের চেয়েও মারাত্মক গুনাহ।সাহাবায়ে কেরাম আরজ করলেন, এটা কিভাবে? তিনি বললেন, ব্যক্তি ব্যভিচার করার পর তওবা করলে তার গোনাহ মাফ হয়েযায়। কিন্তু গীবত যে করে তার গোনাহ আক্রান্ত প্রতিপক্ষের ক্ষমা না করা পর্যন্ত মাফ হয় না।
সুতরাং এ কথা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত  হল যে, গীবত একটি জঘন্য পাপাচার। এ থেকে সবাইকে সতর্কতার সাথে বিরত থাকতে হবে।

যাদের দোষ বর্ণনা করা যায়

গীবত নিঃসন্দেহে হারাম। তারপরও যাদের দোষ বর্ণনা করা যায় তা হচ্ছে

  • কোনো অত্যাচারীর অত্যাচারের কাহিনী প্রতিকারের আশায় বর্ণনা করা।

  • সন্তান ও স্ত্রীর বিরুদ্ধে তার পিতা ও স্বামীর কাছে অভিযোগ করা।

  • ফতোয়া গ্রহণ করার জন্য ঘটনার বিবরণ দেয়া ও – প্রয়োজন ও উপযোগিতার কারণে কারো দোষ বর্ণনা করা জরুরি।

  • আবার যাদের স্বভাব গীবত করা তাদের সম্পর্কে অন্যদের সাবধান করার জন্য তার দোষ বর্ণনা করা জায়েজ। যেমন উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রাঃ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘একদা এক ব্যক্তি (মাখরামা ইবনে নওফেল) নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর কাছে সাক্ষাতের অনুমতি প্রার্থনা করলেন। তখন তিনি বললেন, তাকে আসার অনুমতি দাও, সে গোত্রের কতই না নিকৃষ্ট লোক। অতঃপর তিনি তার সাথে প্রশস্ত চেহারায় তাকালেন এবং হাসিমুখে কথা বললেন। অতঃপর লোকটি চলে গেলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি তার সম্পর্কে এমন কথা বলেছেন, অতঃপর আপনিই প্রশস্ত চেহারায় তার প্রতি তাকালেন এবং হাসিমুখে কথা বললেন। এ কথা শুনে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হে আয়েশা, তুমি কি কখনো আমাকে অশ্লীলভাষী পেয়েছ ? নিশ্চয়ই কেয়ামতের দিন আল্লাহতায়ালার কাছে মর্যাদার দিক দিয়ে সর্বাধিক নিকৃষ্ট সেই লোক হবে, যাকে মানুষ তার অনিষ্টের ভয়ে ত্যাগ করেছে। (বুখারি, মুসলিম)

গীবত করার কারণ

মানুষ সব সময় নিজেকে বড় করে দেখে, এই আমিত্বের আরেক নাম আত্মপূজা। এটা শুরু হয়ে গেলে আত্মপ্রীতি মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে।তখন তার আত্মত্যাগের মতো মহৎ বৈশিষ্ট্য দূরিভূত হতে থাকে। ফলে এ স্থানে দানা বাঁধে হিংসা-বিদ্বেষ। আবার হিংসা-বিদ্বেষ থেকেই অপরের প্রতি কুধারণার সৃষ্টি হবে, যা মানুষকে গীবত করতে বাধ্য করে। সুতরাং আত্মপূজা, আত্মপ্রীতি, হিংসা-বিদ্বেষ, কুধারণাই মানুষকে গীবত করতে বাধ্য করে।

বেঁচে থাকার উপায়

গীবত থেকে বেঁচে থাকা অত্যন্ত জরুরি। এ থেকে বাঁচার প্রথম উপায় হচ্ছে অপরের কল্যাণ কামনা করা। কেননা, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘দীন হচ্ছে নিছক কল্যাণ কামনা করা।’

দ্বিতীয়ত, আত্মত্যাগ অর্থাৎ যেকোনো প্রয়োজনে অপর ভাইকে অগ্রাধিকার দেয়া। যেমন আল্লাহ সূরা হাশরের ৯ নম্বর আয়াতে এরশাদ করেছেন,

وَيُؤْثِرُونَ عَلَى أَنْفُسِهِمْ وَلَوْ كَانَ بِهِمْ خَصَاصَةٌ ﴿9﴾

‘তারা নিজের ওপর অন্যদের প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দেয়, যদিও তারা অনটনের মধ্যে থাকে।’

তৃতীয়ত, অপরের অপরাধকে ক্ষমা করে দেয়া।

চতুর্থত, মহৎ ব্যক্তিদের জীবনী বেশি বেশি করে অধ্যয়ন করা।

শেষ কথা আমাদের সব সময় আল্লাহতায়ালার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করতে হবে তিনি যেন অনুগ্রহ করে গীবতের মতো জঘন্য সামাজিক ব্যাধিতে আমাদের নিমজ্জিত হতে না দেন। এ ক্ষেত্রে জিহ্বাকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে সর্বাগ্রে। কেননা, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘বান্দা যখন ভোরে নিদ্রা থেকে জাগ্রত হয় তখন শরীরের সব অঙ্গ জিহ্বার কাছে আরজ করে, তুমি আমাদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করো, আল্লাহর নাফরমানি কাজে পরিচালিত করো না। কেননা, তুমি যদি ঠিক থাক, তবে আমরা সঠিক পথে থাকব। কিন্তু যদি তুমি বাঁকা পথে চলো, তবে আমরাও বাঁকা হয়ে যাবো। (তিরমিজি)

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অন্যত্র বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আমার জন্য তার জিহ্বা ও লজ্জাস্থানের জিম্মাদার হবে, আমি তার জন্য জান্নাতের জিম্মাদার হবো।’ (বুখারি)

উগ্রতা নয় বিনয় মুমিনের অহঙ্কার

উগ্রতা নয় বিনয় মুমিনের অহঙ্কার


শত শত মুসলিমের অংশগ্রহণে একটি মসজিদে জামাতে নামাজ চলছিল। পিনপতন নীরবতার মধ্যে ইমামের নেতৃত্বসুলভ গাম্ভীর্যপূর্ণ উচ্চারণ ছাড়া আর কোনো শব্দ শোনা যাচ্ছিল না। নামাজ প্রায় শেষলগ্নে। সহসা নামাজরত এক মুসলিমের মোবাইল ফোন বেজে উঠল। ফোনটি অনবরত বাজতে লাগল। ব্যবহারকারী হয়তো জানতেন না,নামাজের মধ্যে ফোন বেজে উঠলে তা দ্রুত বন্ধ করতে হয়। এ বিষয়ে বিশিষ্ট আলেমদের ফতোয়া রয়েছে। তবুও এটি সুস্পষ্ট, ব্যবহারকারী ইচ্ছা করে ফোনটি খোলা রাখেননি। হয়তো দ্রুততা বা বিস্মৃতির কারণে ফোনটি বন্ধ করা হয়নি। এমন ভুল যে কারো দ্বারা যখন তখন হতে পারে এবং তা প্রায়ই হতে দেখা যায়। তাই সঙ্গত কারণেই ব্যবহারকারীর ওপর ক্ষুব্ধ হওয়া বা তাকে ঘিরে অসৌজন্যমূলক মন্তব্য করার অধিকার কারো ছিল না। কিন্তু বিস্ময়ের সাথে দেখা গেল নামাজ শেষ হওয়ার সাথে সাথেই মসজিদজুড়ে শোরগোল শুরু হয়েছে। চতুর্দিক থেকেই বাক্যবাণ ছুটে আসছে ওই লোকটির দিকে। প্রতিটি বাক্যই অসৌজন্যমূলক আর মানহানিকর। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছিল ওই লোকটিকে নিন্দা করাই পরহেজগারি। আর সবাই যেন সেই পরহেজগারি অর্জনের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত।

লজ্জার বিষয় হলো কটু মন্তব্যগুলো যাদের মুখ থেকে বের হচ্ছিল তারা সবাই নিজেকে মুসলিম দাবি করে। অথচ আল্লাহর রাসূল সাঃ বলছেন, ‘মুসলিম সেই ব্যক্তি যার জিহ্বার (কটুবাক্য) ও হাতের (অনিষ্ট ও নির্যাতন) থেকে অন্যরা নিরাপদ থাকে।’ (মিশকাত)।

তা হলে আমরা কেমন মুসলিম! অন্যকে কটুবাক্য বলতে দ্বিধাবোধ করছি না। আমরা ইসলামের কতটুকু গ্রহণ করেছি? আমরা কতটুকু মুসলিম? এ প্রশ্নগুলো আরো দীর্ঘায়িত হয় রাসূল সাঃ-এর একটি হাদিস মনে করলে। হজরত আবু হুরায়রা রাঃ বলেন, ‘একদিন এক বেদুইন দাঁড়িয়ে মসজিদে প্রস্রাব শুরু করল। উপস্থিত লোকজন দেখে তাকে বাধা দিতে যাচ্ছিল। কিন্তু প্রিয় নবী সাঃ তাদের বললেন, ওকে ছেড়ে দাও। ওর প্রস্রাব শেষ হলে এক বালতি পানি ঢেলে দিয়ো।নিশ্চিতভাবে জেনে রেখো, তোমাদের সহজ ও বিনয়ী আচরণ করার জন্য পাঠানো হয়েছে, কঠোরতা বা উগ্রতার জন্য পাঠানো হয়নি।’ (বুখারি শরিফ, ২২০ নম্বর হাদিস)।

উপরিউক্ত হাদিস আর আমাদের মতো নামধারী মুসলিমদের আচরণ দেখলে মনে হয়, আমরা প্রিয় রাসূলের চেয়েও বড় মুসলিম! মসজিদে প্রস্রাব করা সত্ত্বেও রাসূল একজন বেদুইনের সাথেও উগ্র না হয়ে বিনয়ী আচরণ করতে বললেন। অথচ আমরা সামান্য মোবাইল বেজে ওঠার শব্দেই ক্ষেপে যাই। বিনয় হারিয়ে ফেলি। অন্যের মর্যাদা রক্ষা করি না। সামান্য মতের বৈপরীত্য ঘটলেই আমরা অন্যকে অবলীলায় হেয়প্রতিপন্ন করি। এভাবে প্রতিটি ক্ষেত্রেই ইসলামের বিনয়ের আদর্শকে বিসর্জন দিয়ে আমরা মুসলিমরা ক্রমান্বয়ে উন্নাসিকতা আর উগ্রতার চোরাবালিতে আটকে যাচ্ছি।

সহজ, সরল ও স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ জীবনব্যবস্থা ইসলামকে আমরা কঠোর থেকে কঠোরতর করে তুলছি। অথচ রাসূল বলছেন, ‘নিশ্চয়ই দ্বীন সহজ-সরল। দ্বীন নিয়ে যে বাড়াবাড়ি করবে, দ্বীন তাকে পরাজিত করবে। সুতরাং তোমরা মধ্যপন্থা অবলম্বন করো এবং মধ্যপন্থার নিকটবর্তী থাকো।’ (বুখারি শরীফ, হাদিস নম্বর ৩৮)।

রাসূল সাঃ সব বিষয়েই উগ্রতা ও কঠোরতার পরিবর্তে মধ্যপন্থা ও নম্রতা অবলম্বন করতে বলেছেন। এমনকি ওয়াজ-নসিহত দীর্ঘায়িত করে মানুষকে বিরক্ত করতেও রাসূল নিষেধ করেছেন। হজরত আনাস রাঃ বলেন, ‘নবী করিম সাঃ বলেছেন, তোমরা দ্বীনের ব্যাপারে সহজ পন্থা অবলম্বন করবে, কঠিন পন্থা অবলম্বন করবে না। মানুষকে সুসংবাদ শোনাবে, বিরক্তি সৃষ্টি করবে না ।’ (সহি বুখারি, হাদিস নম্বর ৬৯)

রাসূল সাঃ-এর ব্যক্তিজীবনও ছিল বিনয়ের আদর্শের শ্রেষ্ঠতম উদাহরণ। তিনি নিজেও যেমন বিনয়ী ছিলেন তেমনি তার সামনেও কেউ বিনয়ের পরিপন্থী কিছু করলে তিনি তা সহ্য করতেন না।

হজরত আয়েশা সিদ্দিকা রাঃ-এর উপস্থিতিতে এক কাফির এসে রাসূল সাঃ-কে লক্ষ করে বলেছিল, হে মুহাম্মদ! তুমি ধ্বংস হও। রাসূল সাঃ এতে কোনো প্রতিক্রিয়া দেখালেন না। কিন্তু আয়েশা সিদ্দিকা রাঃ ওই কাফিরকে লক্ষ করে একই কথার দ্বারা উত্তর দিয়ে দিলেন। এতে রাসূল সাঃ বিরক্ত হয়ে আয়েশা সিদ্দিকা রাঃকে বললেনআলাইকি বির রিফ্‌কি।হে আয়েশা! তোমার বিনয়ী হওয়া প্রয়োজন (যেহেতু তুমি মুসলিম)। এভাবে রাসূল সাঃ অসংখ্য জায়গায় বিভিন্নভাবে মুসলিমদের বিনয়ী হতে নির্দেশ দিয়েছেন।

মুসলিমরা যত দিন বিনয়ের আদর্শকে সমুন্নত রেখেছে তত দিন পৃথিবীর বেশির ভাগ মানুষের কাছে তাদের গ্রহণযোগ্যতা ও মর্যাদা সমুন্নত ছিল। বিনয় বিসর্জন দিয়ে তারা এখন সৌন্দর্যহীন এক ভাগ্যবিড়ম্বিত জাতি।

মুসলিম মানে পরম পালনকর্তা আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণকারী ব্যক্তি। আর আল্লাহ বলছেন, ‘আমার কাছে আত্মসমর্পণকারী বান্দা হলো তারা যারা পৃথিবীতে বিনয়ের সাথে চলে। এমনকি কোনো মূর্খ তাদের মূর্খতাসুলভ কথা বললেও তারা (বিশৃঙ্খলা এড়িয়ে) সালাম দিয়ে চলে যায়।’ (আল কুরআন ২৫ঃ৬৩)

এ আয়াত প্রমাণ করে মুসলিম হতে হলে বিনয় থাকতে হবে, বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির পরিবর্তে সহনশীলতা থাকতে হবে। অন্যের প্রতি যথার্থ শ্রদ্ধাশীল হতে হবে।

অন্যের সাফল্য দেখে আপনি হিংসায় জ্বলবেন, তাকে টেনে নামাতে নানা ফন্দি-ফিকির করবেন, পান থেকে চুন খসতেই কারো প্রতি ক্ষেপে যাবেন, দাঁত-মুখ খিঁচিয়ে খিস্তি-খেউর আওড়াবেন। আপনি আবার মুসলিম! না। আপনার মতো বিনয়ের সৌন্দর্যহীন প্রাণী আল্লাহর বান্দা হওয়ার যোগ্যতা রাখে না।

রাসূল সাঃ শুধু মুসলিমদের সাথে নয়, সব মতাদর্শের, সব ধর্মের, সব বর্ণের মানুষের সাথেই বিনয়ী আচরণ করেছেন। বিপদে পাশে দাঁড়িয়েছেন। সেবা করেছেন। মুসলিমদেরও করতে নির্দেশ দিয়েছেন। ব্যক্তিগতভাবে এমনকি শারীরিকভাবে চরম নিগৃহীত হয়েও তিনি বিনয় বিসর্জন দেননি। চরম ক্রোধ আর ক্ষোভকে পদদলিত করে তিনি জীবনের সব ক্ষেত্রে বিনয়-নম্রতাকে সমুন্নত রেখেছেন। এক বেদুইনের জন্য কূপ থেকে পানি তুলতে গিয়ে রাসূল সাঃ-এর হাত থেকে রশি ছিঁড়ে বালতি পড়ে গিয়েছিল গভীর কূপে। বালতির মালিক বেদুইন ক্রোধের কাছে পরাজিত হয়ে রাসূলের পবিত্র চেহারায় চড় বসিয়ে দিয়েছিল। এ অবস্থায়ও বিনয়ের মূর্তপ্রতীক নবী বিনয়কেই এগিয়ে রাখলেন। নিজের ক্ষোভকে নিজের নিয়ন্ত্রণে রেখে আল্লাহর নামে একটু থুথু ফেললেন কূপের মধ্যে। কূপের পানি ফেঁপে উঠল। সাথে সাথে বালতিও ভেসে উঠল। রাসূল বালতিটি তুলে নিয়ে বেদুইনের হাতে দিয়ে ফিরে গেলেন। রাসূলের বিনয়ের কাছে পরাজিত বেদুইন এবার মর্মপীড়ায় ভুগতে লাগল। এক রাখালের কাছে রাসূলের পরিচয় জানতে পেরে আঁতকে উঠল। নিজের হাত নিজেই কেটে ফেলল, যে হাত দিয়ে সে রাসূলকে আঘাত করেছিল। বিনয়ের তীরে বিদ্ধ বেদুইন কাটা হাত নিয়ে হাজির হলো রাসূলের কাছে। সমর্পণ করল সব। তাওহিদের দাওয়াত গ্রহণ করল সানন্দে। বিনয় সমুন্নত হলো।

আজকের মুসলিম বিনয়বিবর্জিত। বিনয় না থাকায় কারো কারো মধ্যে উগ্রতা জেঁকে বসছে। ধর্মের নাম করে একে অন্যের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়াচ্ছে কেউ কেউ। মতের সামান্য বৈপরীত্য ঘটলেই আখ্যা দিচ্ছে ভিন্নমতাবলম্বী, ভ্রান্তবিশ্বাসী। একে অন্যের বিরুদ্ধে মেতে উঠছে কদর্য মিথ্যাচার আর বিবেকবিবর্জিত প্রচারণায়।

টুপির আকৃতিগত পার্থক্য বা প্রস্তুতজনিত ভিন্নতা আর জিকিরের ধ্বনিগত বা শব্দগত বৈপরীত্যের মতো ঠুনকো বিষয় নিয়ে পরস্পর আলাদা হয়ে রয়েছে বিপুল জনগোষ্ঠী। বিনয়ের অভাবে পরস্পরকে তারা সম্মান না করে ঘৃণা করতে বা হেয়প্রতিপন্ন করতেই আগ্রহ বোধ করে। নিজেদের মধ্যে আলোচনা-পর্যালোচনার মাধ্যমে পার্থক্য কমিয়ে আনার পরিবর্তে বিভেদকে স্থায়ী রূপ দিতে তারা বেশি পারঙ্গম।

অথচ আল্লাহ বলছেন, ‘ঈমানদাররা পরস্পর ভাই ভাই। তাদের মধ্যে বিবাদ দেখা দিলে অন্যরা মীমাংসা করে দাও।’ (আল কুরআন ৪৯ঃ১০)।

মুসলিমদের মধ্যে বিনয়ের অভাবে আর অনৈক্যের সুবাদে অসংখ্য উগ্র ও চরমপন্থী গ্রুপ দানবীয়রূপে আবির্ভূত হচ্ছে। মনে হচ্ছে, তারা পুরো মানবমণ্ডলীকে জবরদস্তি করে হলেও মুসলিম বানিয়ে ফেলতে চায়। অথচ আল্লাহ বলছেন, ‘আমি তোমাদের বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি যাতে তোমরা একে অপরকে চিনতে পারো।’ (আল কুরআন ৪৯ঃ১৩)।

ইসলামের নামে কারো ওপর জবরদস্তি করার কোনো সুযোগ নেই। আল্লাহ স্বয়ং বলছেন, ‘আমি তোমাদের পথ দেখিয়ে দিয়েছি। এখন চাইলে তোমরা আমার পথ অনুসরণ করতে পারো অথবা এ পথ অস্বীকার করে নিজের মতো চলতে পারো।’ (আল কুরআন ৭৬ঃ৩)

আল্লাহ নবীদেরও স্পষ্ট করে বলেছেন, ‘হে রাসূল, আপনার দায়িত্ব শুধু মানুষের কাছে আমার দাওয়াত পৌঁছে দেয়া। আর আমার দায়িত্ব তাদের থেকে হিসাব বুঝে নেয়া।’ (আল কুরআন ১৩ঃ৪০)

মানুষের কাছে ইসলামের বাণী পৌঁছে দেয়া মুসলিমদের দায়িত্ব। কিন্তু সে দাওয়াত কে গ্রহণ করল আর কে প্রত্যাখ্যান করল তার বিচার করার দায়িত্ব আল্লাহ ছাড়া কারো নেই। অতএব কারো প্রতি কোনো জোরজবরদস্তির সুযোগ নেই। অথচ কিছু উগ্র মস্তিষ্কের মানুষ জোরজবরদস্তির পথ গ্রহণ করে বিশ্বব্যাপী ইসলাম নিয়ে আতঙ্কের সৃষ্টি করেছে।

তাই আজ প্রত্যেক মুসলিমের দায়িত্ব বিনয়ের আলোয় নিজের জীবনকে উদ্ভাসিত করা। কোনো ধরনের উগ্রতাকে প্রশ্রয় না দেয়া। আর যে অপশক্তি বিশ্বব্যাপী নিরীহ মানুষকে অবলীলায় হত্যা করে চলছে তাদের বিরুদ্ধে ইস্পাত দৃঢ় ঐক্য গড়ে তোলা। এই চরমপন্থীরাই ইসলাম রক্ষার নাম করে হত্যা করেছিল হজরত উমর রাঃকে ও হজরত ওসমান রাঃকে। আজো তারা ইসলামের নাম ব্যবহার করে নিরীহ বনি আদমকে হত্যা করে চলছে। ইসলামকে কলঙ্কিত করে দেশে দেশে সাম্রাজ্যবাদীদের আগ্রাসনের সুযোগ তৈরি করে দেয়াই হয়তো তাদের লক্ষ্য।

পর্দার মর্যাদা

পর্দার মর্যাদা


আল্লাহ বলেন, ‘হে আদম! তুমি ও তোমার স্ত্রী জান্নাতে থাকো এবং যা ইচ্ছে খাও তবে এ গাছের কাছে যেও না,তাহলে জালিমদের অন্তর্ভুক্ত হবে।শয়তান উভয়কে ধোঁকা দিলো যেন তাদের গোপন অঙ্গ প্রকাশিত হয় যা তাদের কাছে গোপন ছিল। সে ধোঁকায় ফেলল, বৃক্ষের ফল খেল এবং তাদের লজ্জাস্থান প্রকাশ হয়ে পড়ল। আর তারা জান্নাতের পাতা দিয়ে ঢাকতে লাগল। আল্লাহ বললেনতোমরা পরস্পর শত্রুরূপে নেমে যাও।সূরা আহজাব।

আল্লাহ তোমাদের জন্য কুরআনে সাবধান বাণী পাঠালেনহে আদম সন্তান। শয়তান যেন বিপদে না ফেলে যেভাবে সে তোমাদের পিতা-মাতাকে বেহেশত হতে বের করেছিল। সে তাদের লজ্জাস্থান দেখানোর জন্য তাদের বিবস্ত্র করেছিল। নিশ্চয়ই সে ও তার দল তোমাদের এমনভাবে দেখে অথচ তোমরা তাদের দেখো না। যারা ঈমান আনে না শয়তানকে আমি তাদের বন্ধু করেছি।’- সূরা আহজাব।

নিরাপত্তা বা নষ্ট না হওয়ার ব্যবস্থা হিসেবে আল্লাহ প্রতিটি প্রাণী, ফল এবং সব সৃষ্টিকে এক রকমের পর্দা বা আবরণ দিয়ে সৃষ্টি করলেন। পাখির গায়ে পালকের পর্দা; গরু, ছাগল, ভেড়া সব সৃষ্টিতে আছে আবরণ। জীবজন্তুর অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলো শালীনতার সাথে প্রকাশ পায়। প্রকৃতির বিচিত্র লীলাখেলায় আমরা কোনো কিছুই অশালীন-অপবিত্র,দৃষ্টিকটু লক্ষ করি না। আল্লাহ মানুষকে নিজ হাতে শালীন বা অশালীনের পথ বেছে নেয়ার ক্ষমতা দিলেন।

আল্লাহ বলেন, ‘হে আদম সন্তান। আমি তোমাদের জন্য পোশাক সৃষ্টি করেছি লজ্জাস্থান ঢাকার ও জাঁকজমকতার আর তাকওয়ার পোশাক। এটি উত্তম। এটি আল্লাহর আয়াতসমূহের বা নিদর্শনসমূহের মধ্যে অন্যতম, আল্লাহ জিকিরের বা স্মরণের জন্য।এই আয়াতটিতে জাঁকজমকতা বলতে পবিত্রতার জাঁকজমকতা এবং তাকওয়ার পোশাক বলতে পবিত্র শালীন পোশাক বোঝানো হয়েছে।

আমরা যে যার খুশি বা ইচ্ছেমতো পোশাক বা আচার-ব্যবহার করতে পারি না। পোশাক, আচার-ব্যবহার কিভাবে করতে হবে সেটিও কুরআনে আল্লাহ বলেছেন। নারী-পুরুষ পরস্পর কথা বলবে কর্কশ স্বরে (মাহরুমদের ক্ষেত্রে)।

আল্লাহ বলেন, ‘হে নবী! আপনি আপনার স্ত্রীদের কন্যাদের এবং যারা ঈমানদার নারী তাদেরকে বলে দিন, তারা যেন তাদের নিজেদের ওড়নাসমূহ ওপরের দিক থেকে টেনে নিচের দিকে ঝুলিয়ে দেয়। তাদেরকে চিনতে পারার জন্য এটা উত্তম পন্থা, ফলে তারা উত্ত্যক্ত হবে না। আল্লাহই ক্ষমাশীল ও দয়ালু।’- সূরা আহজাব।

অর্থাৎ শালীনতা আনয়নে ওড়না ওপর দিক থেকে নিচ দিকে ঝুলিয়ে (মাথা থেকে যেহেতু বলা হয়নি সেহেতু ঘাড় থেকে হতে পারে) ঢেকে রেখে পর্দার কথা বলা হলো।

এতে রয়েছে নারী-পুরুষ উভয়ের নিরাপত্তার সুব্যবস্থা। নারীর বেপর্দায় প্রথমত পুরুষরা উত্ত্যক্ত হয়, পরে নারীরা উত্ত্যক্ত হয়। এই উত্ত্যক্ততা নিয়ে যায় ব্যভিচারের দিকে। তাহলে ব্যভিচারের মূলে নারীর বেপর্দা। কুরআনে আল্লাহ ব্যভিচারীর কঠিন শাস্তি এবং রহমত থেকে বঞ্চিতকরণের কথা ঘোষণা করেন। তাহলে পর্দা হলো নিরাপত্তার ঢালস্বরূপ। আপনি মুমিনদের বলে দিন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থান হেফাজত করে;এটা তাদের পবিত্রতা। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাদের কর্ম সম্পর্কে অবহিত। আর মুমিন নারীদের বলে দিন তারা তাদের দৃষ্টি যেন সংযত রাখে ও লজ্জাস্থান হিফাজত করে।’ – সূরা নূর।

এখানে আল্লাহ পুরুষের পর্দার কথা বললেন নারীর পাশাপাশি। আজকাল নারী-পুরুষ নিজ নিজ সৌন্দর্য আকর্ষণীয় করে তা প্রকাশে আগ্রহী হয়ে নিজকে সার্থক, যোগ্য বলে ধারণা পোষণ করছে।

আল্লাহ এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘সাধারণত প্রকাশমান তা ব্যতীত কারো কাছে রূপ প্রকাশ না করে আর তারা যেন তাদের ওড়নাগুলো স্বীয় বক্ষের ওপর জড়িয়ে রাখে; আর নিজেদের সৌন্দর্য স্বামী, পিতা, শ্বশুর, পুত্র, স্বামীর পুত্র, ভাই, ভাই-পো,বোন-পো, নারী দাসী, কামনাহীন পুরুষ, নাবালক বালকদের ব্যতীত স্বীয় সৌন্দর্য প্রকাশ না করে। এমনভাবে পা না ফেলে যাতে তাদের অলঙ্কার প্রকাশ পায়।’ –সূরা নূর।

তাহলে অলঙ্কার ব্যবহারে নিষেধ নেই, প্রকাশে বিধিনিষেধ রয়েছে।

একজন পুরুষ ও একজন নারীর জন্ম একই স্বাধীনভাবে। নারী অর্থ এই নয় যে তাদের খাওয়া, পরা, চিন্তাভাবনা নেই; জড় পদার্থের মতো পঙ্গু হয়ে পরনির্ভর হওয়া।

হিজাব বা পর্দায় রয়েছে পুরুষের সমান শক্তি ও সেই সাথে স্মার্টনেস। পর্দায় একজন নারীর প্রতি পুরুষের কোনো উত্ত্যক্ত করার মতো দৃষ্টি থাকে না বলে নারীর থাকে না জড়তা, ভীতু না হয়ে সে হয়ে ওঠে সাহসী এবং থাকে না কোনো নিরাপত্তার প্রয়োজন এবং সে হয়ে ওঠে পরনির্ভর না হয়ে আত্মনির্ভর এবং ব্যক্তিত্ব পবিত্রতা-গাম্ভীর্যতায় ভরপুর যা তাকে করে তোলে অধিকতর স্মার্ট ও কর্মদক্ষ। আল্লাহ আত্মনির্ভরতা, ব্যক্তিত্ব, কর্মদক্ষতা ও স্মার্টনেস পছন্দ করেন।

পর্দা ছাড়া পুরুষের সাথে সহ-অবস্থানে, সম-অধিকারে একযোগ হওয়া কিছুতেই সম্ভব নয়। তবে বিবেক-চক্ষু বন্ধ রেখে পর্দা, পবিত্রতা, শালীনতার তোয়াক্কা না করে হীনতা, অমর্যাদা মাথায় তুলে নিলে সম্ভব; যা আজকাল লক্ষ করা যায়।

পর্দায় জড়তা ও কৃত্রিমতা থাকে না বলে নারী হয়ে যায় অধিকতর বলীয়ান এবং আল্লাহর আদেশ বাস্তবায়নে অধিকতর মনোবলে হয় সক্ষম। সব কাজ করতে ঘরে-বাইরে এবং থাকে না কোনো ডর-ভয়, উত্ত্যক্ততা; যার ফলে আত্মনির্ভর হয় নারী জাতি।

পর্দা পালনে একজন নারী হয় না দুর্বল। সব রকমের জড়তা কাটিয়ে হয়ে ওঠে অধিকতর তেজস্বী। একজন বেপর্দা নারী লোলুপ দৃষ্টির শিকারে সে হয়ে পড়ে পঙ্গু, ভীতিপ্রদ ও পরনির্ভর। আত্মনির্ভরতার একমাত্র অবলম্বন পর্দা।

নারী-পুরুষ চিহ্নিতকরণের লক্ষ্যে পোশাকে থাকতে হবে ব্যবধান। হাদিসে আছেনারীগণ পুরুষের পোশাক এবং পুরুষগণ নারীদের পোশাক পরিধান করো না।

কুরআনের আদেশ-নিষেধের সীমারেখায় আবদ্ধ আমাদের জীবন। ঠিক যেমন জন্ম-মৃতুø আমাদের ইচ্ছাধীন নয়। কুরআনে বাঁধা আমাদের জীবন-জৌলুশ সব কিছু।

পর্দায় আছে জীবনযুদ্ধে অশরীরী শক্তির জোগান। আল্লাহ ও রাসূলের সান্নিধ্য, সাহায্য ও সফলতা লাভ। আল্লাহর রাস্তায় যে থাকে তার জন্য রয়েছে সঙ্কটের বদলে স্বস্তি এবং আল্লাহর নিজ হাতে সঙ্কটের পথে না চালিয়ে স্বস্তির পথে চালনা ও রহমত দান।’- কুরআন।

পর্দা মানুষের স্বভাবজাত ধর্ম বা জন্মগত স্বভাব। আমাদের কারণেই হয় বিকৃত। আল্লাহ বলেন, ‘নূরুন আলা নূরিন।’ –সূরা নূর অর্থ একটি নূরের ওপর আরেকটি নূর। অর্থাৎ আল্লাহর নূরের ওপর মানুষের নূর। আমাদের পর্দায়,পবিত্রতায়, মর্যাদায় রয়েছে পবিত্র নূরের অবস্থান।

নাশতায় ডিম খান

নাশতায় ডিম খান


নাশতায় প্রতিদিন ডিম খেলে তা ক্ষুধা হ্রাসের পাশাপাশি দুপুরের খাবারে ক্যালরি গ্রহণের চাহিদা কমিয়ে দেবে। এতে উপকার অনেক বেশি। গবেষকরা জানিয়েছেন, সকালের নাশতায় ডিম খাওয়াটা অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে উপকারী। তারা বলেন, বেশি ওজনধারী লোকদের ওপর জরিপ চালিয়ে দেখা গেছে, সকালের নাশতায় যারা ডিম খায় ৬৫ শতাংশ ক্ষেত্রে তাদের ওজন হ্রাস পায়।


আনন্দ উল্লাসের সীমা

আনন্দ উল্লাসের সীমা


ইসলাম মানবজাতির পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান। এতে জীবনের প্রতিটি বিষয় সুবিন্যস্তভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। এতে মানুষের যা কল্যাণ তা গ্রহণ এবং যা অকল্যাণ তা পরিহার করার জন্য সুস্পষ্টভাবে নির্দেশ রয়েছে। তাই হাদিস ও মহাগ্রন্থ আল কুরআন গভীরভাবে অধ্যয়ন করলে দেখা যায় ইসলাম প্রতিষ্ঠার জন্য যেমন আল্লাহর নবী এবং সাহাবায়ে কেরাম প্রাণান্তকর চেষ্টা-সাধনা করেছেন। আবার কখনো কখনো নিজেদের একঘেয়েমি বা অবসাদ দূর করার জন্য মাঝে মধ্যে কবিতা পাঠ এবং আমোদ আহ্লাদ করেছেন। কিন্তু এ বিষয়গুলো এমনই যে, এর সীমা খুবই নিয়ন্ত্রিত। এর বাইরে গেলে তা হবে হারাম (নিষিদ্ধ), মাকরুহ (নিন্দনীয়), মাকরুহ তানজিহি অর্থাৎ অনুত্তম। তাই পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেন, ‘এক শ্রেণীর লোক আছে যারা মানুষকে গোমরা বা পথভ্রষ্ট করার উদ্দেশ্যে অবান্তর কথাবার্তা সংগ্রহ করে অন্ধভাবে এবং তা নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করে। এদের জন্য রয়েছে অবমাননাকর শাস্তি।’ (সূরা লোকমানঃ আয়াত-৬)। এই আয়াতে এ ধরনের লোকদের এবং এ ধরনের কাজকর্মকে পরিষ্কারভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। কাফিররা আল্লাহর বাণী শোনার পরিবর্তে বিভিন্ন কিসসা-কাহিনী সংগ্রহ করত এবং তা তারা নিজেরা শুনতো এবং অন্যদের শুনাতো যাতে মানুষকে ইসলাম থেকে গাফেল করা যায় এবং কুরআন থেকে বিমুখ করা যায়। তারা গায়ক-গায়িকা এনে গানবাজনা করত এবং মানুষকে আল্লাহর স্মরণ থেকে বিমুখ করে রাখাই ছিল তাদের উদ্দেশ্য।

ক্রীড়া-কৌতুক ও তার সাজসরঞ্জামাদি সম্পর্কে শরিয়তের

বিধানঃ মুস্তাদরাক হাকেমে বর্ণিত হজরত আবু হুরায়রার রেওয়াতে রাসূলুল্লাহ সাঃ বলেন, ‘পার্থিব সব খেলাধুলা বাতিল, কিন্তু তিনটি বিষয় বাতিল নয়; (১) তীর-ধনুক নিয়ে খেলা, (বর্তমান যুগে আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র সরঞ্জামাদি দিয়ে প্রশিক্ষণ) (২) অশ্বকে প্রশিক্ষণ দানের খেলা, (বর্তমান যুগে বিভিন্ন উন্নত যানবাহন যা যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়) এবং (৩) নিজের স্ত্রীর সাথে হাস্যরস করা। এ তিন প্রকারের খেলা বৈধ বলে বর্ণনা করা হয়েছে।

যে খেলা দ্বীন থেকে পথভ্রষ্ট হওয়ার অথবা অপরকে পথভ্রষ্ট করার উপায় হয়, তা অবৈধ। যেমন আলোচ্য আয়াতেমানুষকে গোমরাহ করার উদ্দেশ্যে অবান্তর কথা সংগ্রহ করে।যে খেলা আনন্দ অনুষ্ঠান মানুষকে কুফরের দিকে নিয়ে যায় না বা গোমরা করে না তা অবশ্যই গ্রহণযোগ্য। অশ্লীল কবিতা, উপন্যাস এবং বাতিলপন্থীদের পুস্তক পাঠ করাও নাজায়েজ বলা হয়েছে।

যেসব সাজসরঞ্জামাদি কুফর অথবা হারাম খেলায় বা আনন্দে ব্যবহৃত হয়, সেগুলো ক্রয়-বিক্রয় করাও হারাম। তবে শারীরিক ব্যায়াম তথা স্বাস্থ্য রক্ষার জন্য অথবা অন্য কোনো ধর্মীয় ও পার্থিব উপকারিতা লাভের জন্য অথবা কমপক্ষে মানসিক অবসাদ দূর করার জন্য যে খেলা হয় বা আনন্দ অনুষ্ঠান হয় তা শরীয়ত অনুমোদন করে, যদি তাতে বাড়াবাড়ি না করা হয় এবং এতে ব্যস্ত থাকার কারণে প্রয়োজনীয় কাজকর্ম বিঘ্নিত না হয়। আর ধর্মীয় প্রয়োজনের নিয়তে খেলা হলে তাতে সওয়াবও আছে। ইবনে আব্বাস রাঃ-এর বর্ণনা মতে রাসূলুল্লাহ সাঃ বলেন, ‘মুমিনের শ্রেষ্ঠ খেলা সাঁতার কাটা এবং নারীর শ্রেষ্ঠ খেলা সুতা কাটা।যেসব খেলায় কুফর নেই এবং কোনো প্রকার গোনাহ নেই, সেগুলো মাকরুহ। কারণ, এতে অনর্থক কাজে শক্তি ও সময় বিনষ্ট করা হয়। সহি মুসলিম ও মুসনাদে আহমদে হজরত সালাম ইবনে আকওয়া বর্ণনা করেন, জনৈক আনসারি দৌড়ে অত্যন্ত পারদর্শী ছিলেন। প্রতিযোগিতায় কেউ তাকে হারাতে পারত না। তিনি একদিন ঘোষণা করলেন কেউ আমার সাথে দৌড় প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হতে প্রস্তুত আছে কি? আমি রাসূলুল্লাহ সাঃ-এর কাছে অনুমতি চাইলে তিনি অনুমতি দিলেন। অতঃপর প্রতিযোগিতায় জয়ী হলাম। এ থেকে জানা গেল দৌড় প্রতিযোগিতা বৈধ। খ্যাতনামা কুস্তিগির রোকানা একবার রাসূলুল্লাহ সাঃ-এর সাথে কুস্তিতে অবতীর্ণ হলে তিনি তাকে ধরাশায়ী করেন। (আবু দাউদ)। আবিসিনিয়ার কিছু যুবক মদিনা তাইয়্যেবার সামরিক কলা-কৌশল অনুশীলনকল্পে বর্শা ইত্যাদি নিয়ে খেলায় প্রবৃত্ত ছিল। রাসূলুল্লাহ সাঃ হজরত আয়েশা রাঃকে নিজের পেছনে দাঁড় করিয়ে তাদের খেলা উপভোগ করাচ্ছিলেন। তিনি তাদের বলেছিলেন, খেলাধুলা অব্যাহত রাখো (বায়হাকি, কানজ) কতক রেওয়াতে আরো আছে তোমাদের ধর্মে শুষ্কতা ও কঠোরতা পরিলক্ষিত হোক এটা আমি পছন্দ করি না।

অনুরূপভাবে কোনো কোনো সাহাবায়ে কেরাম সম্পর্কে বর্ণিত আছে, যখন তারা কুরআন ও হাদিস সম্পর্কিত কাজে ব্যস্ততার ফলে অবসন্ন হয়ে পড়তেন, তখন অবসাদ দূর করার জন্য মাঝে মধ্যে আরবে প্রচলিত কবিতা ও ঐতিহাসিক ঘটনাবলি দ্বারা মনোরঞ্জন করতেন। এক হাদিসে এরশাদ হয়েছে, ‘তোমরা মাঝে মধ্যে অন্তরকে বিশ্রাম ও আরাম দেবে।’ (আবু দাউদ)। এ থেকে অন্তর মস্তিষ্কের বিনোদন এবং এর জন্য কিছু সময় বের করার বৈধতা প্রমাণ হয়।

কিছু খেলা, যেগুলো পরিষ্কার নিষিদ্ধঃ এমন কিছু খেলা রয়েছে যেগুলো রাসূলুল্লাহ সাঃ বিশেষভাবে নিষিদ্ধ করেছেন,যদিও সেগুলোর কিছু উপকারিতা আছে বলেও উল্লেখ করা হয়, যেমন দাবা ইত্যাদি। এগুলোর সাথে হার-জিত ও টাকা-পয়সার লেনদেন জড়িত থাকলে এগুলো জুয়া, অকাট্য হারাম। অন্যথায় কেবল চিত্তবিনোদনের উদ্দেশ্যে খেলা হলেও হাদিসে এসব খেলা নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

গান ও বাদ্যযন্ত্র সম্পর্কিত বিধানঃ কয়েকজন সাহাবি উল্লিখিত আয়াতে লাহওয়াল হাদিসে এর তাফসির করেছেন গানবাজনা করা। অন্য সাহাবিরা ব্যাপক তাফসির করে বলেছেন, আয়াতে এমন যেকোনো খেলা বোঝানো হয়েছে, যা মানুষকে আল্লাহ থেকে গাফেল করে দেয়।

হজরত ইবনে আব্বাস রাঃ থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাঃ বলেন, আল্লাহতায়ালা মদ, জুয়া, তবলা ও সারেঙ্গি হারাম করেছেন। তিনি আরো বলেন, নেশাগ্রস্ত করে এমন প্রত্যেক বস্তু হারাম। (আহমদ, আবু দাউদ)।

অশ্লীলতা এবং হারাম আনন্দ-উল্লাসের পরিণতিঃ আবু দাউদ, ইবনে মাজা ও ইবনে হাব্বান বর্ণিত হজরত আবু মালেক আশআরির রেওয়াতে রাসূলুল্লাহ সাঃ বলেনঃ আমার উম্মতের কিছু লোক মদের নাম পাল্টিয়ে তা পান করবে। তাদের সামনে গায়িকারা বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র সহকারে গান করবে। আল্লাহতায়ালা তাদের ভূগর্ভে বিলীন করে দেবেন এবং কতকের আকৃতি বিকৃত করে বানর ও শূকরে পরিণত করে দেবেন।

হজরত আবু হুরায়রা রাঃ থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাঃ বলেন, ‘যখন জেহাদলব্ধ সম্পদকে ব্যক্তিগত সম্পদে পরিণত করা হবে, যখন গচ্ছিত বস্তুকে লুটের মাল গণ্য করা হবে, জাকাতকে জরিমানার মতো কঠিন মনে করা হবে, যখন পার্থিব সম্পদ লাভের উদ্দেশ্যে শিক্ষা করা হবে, যখন মানুষ স্ত্রীর আনুগত্য ও মাতার অবাধ্যতা শুরু করবে, যখন বন্ধুকে নিকটে টেনে নেবে এবং পিতাকে দূরে সরিয়ে রাখবে, যখন মসজিদগুলোতে হট্টগোল হবে, যখন পাপাচারী-কুকর্মী ব্যক্তি গোত্রের নেতা হবে, যখন নীচতম ব্যক্তি তার সম্প্রদায়ের প্রধান হবে, যখন দুষ্ট লোকদের সম্মান করা হবে তাদের অনিষ্টের ভয়ে, যখন গায়িকা নারী ও বাদ্যযন্ত্রের ব্যাপক প্রচলন হবে, যখন মদ্যপান শুরু হবে, যখন মুসলিম সম্প্রদায়ের পরবর্তী লোক পূর্ববর্তীকে অভিসম্পাত করবে, তখন তোমরা প্রতীক্ষা করো একটি লালবর্ণ বায়ুর,ভূমিকম্পের, ভূমিধসের, আকার-আকৃতি বিকৃত হয়ে যাওয়ার এবং কিয়ামতের এমন নিদর্শনগুলোর যেগুলো একের পর এক খসে পড়তে থাকে।

সুতরাং যেকোনো আচার-অনুষ্ঠানে আমাদের নির্ধারিত সীমা সম্পর্কে অবশ্যই সচেতন থাকতে হবে যাতে করে পাপ তথা সীমা অতিক্রম করে বাড়াবাড়ির পর্যায় যাতে না যায় এটা অবশ্যই লক্ষ রাখতে হবে। আনন্দের নামে কৌতুক করে যাচ্ছেতাই বলা কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না

%d bloggers like this: