ভাগ্য উন্নয়নের সঠিক পথ

ভাগ্য উন্নয়নের সঠিক পথ

ভাগ্যের সার্বিক উন্নয়ন মানবজীবনের চিরন্তন লক্ষ্য। আর এ লক্ষ্যকেই সামনে রেখে মানুষ জীবন-সংগ্রামের বন্ধুর পথে অগ্রসর হয়। চলার পথে আসে বিভিন্ন রকম বাধা। এই বাধাকে অতিক্রম করার জন্য মানুষ সন্ধান করে কোন পথে আসবে তার মুক্তি, কোন পথে পাবে সে ইহকালীন ও পরকালীন শান্তি। বেশির ভাগ সময় দেখা যায় ভাগ্যের সার্বিক উন্নয়ন করতে গিয়ে মানুষ শুধু এবাদতকেই মুখ্য মনে করে। তাই সে সব ধরনের চেষ্টা-তদবির ছেড়ে দিয়ে এবাদতে মশগুল হয়। তাও আবার প্রতিদিন নয়, বিশেষ বিশেষ রাতে। অনেকের এবাদত বিশেষ বিশেষ রাতে না হয়ে মাত্র একটি রাতে এসে কেন্দ্রীভূত হয়। এমনই একটি হলো শবে বারাআত অর্থাৎ ১৫ শাবানের রাত। এই রাতকে অনেকে ভাগ্য বণ্টনের রাতও মনে করেন বিধায় এই রাতটিকে নিজেদের ভাগ্য উন্নয়নের চাবিকাঠি মনে করে বিশেষ এবাদতের আয়োজন করা হয় এবং আল্লাহ কাছে সাহায্য চাওয়া হয়। ভাগ্য হচ্ছে তাই, যা পরম করুণাময় আল্লাহ কর্তৃক আগ থেকেই নির্ধারিত। এ সম্পর্কে আল্লাহর বাণী হচ্ছে, ‘বলো, আল্লাহ আমাদের জন্য যা নির্ধারিত করেছেন তা ছাড়া অন্য কিছুই আমাদের স্পর্শ করবে না।’

এবার আমরা এবাদত সম্বন্ধে আসতে পারি। এবাদত শব্দটি মূলত আরবি ‘আবদ’ থেকে এসেছে। আবদ অর্থ দাস বা গোলাম। অতএব এবাদত অর্থ দাঁড়ায় দাসত্ব করা বা গোলামি করা। আর গোলামি করা হচ্ছে চাকর তার মনিবের সব ধরনের আদেশ-নিষেধ মেনে চলবে এবং তাঁর প্রতিনিধি হিসেবে তাঁর দেয়া দায়িত্ব পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে আঞ্জাম দেবে। আমরা যে এবাদতের কথা এখানে আলোচনা করছি তা আল্লাহর সাথে সম্পর্কিত। এখানে মানুষ হলো চাকর এবং আল্লাহ হলেন প্রভু। সুতরাং মানুষের কাজ আল্লাহর প্রতিনিধি হিসেবে তাঁর দেয়া বিধিবিধান মেনে চলা এবং সেই অনুযায়ী সমাজব্যবস্থা গড়ে তোলা। পবিত্র কুরআনে আল্লাহপাক এবাদত সম্পর্কে বলতে গিয়ে বলছেন, ‘ওমা খালাকতুল জিন্না ওয়াল ইনছা ইল্লা লিয়া বুদুন।’

অর্থঃ ‘আমি জ্বিন ও মানবজাতিকে আমার এবাদত ছাড়া অন্য কোনো উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করি নাই।’ [আজ-জারিয়াতঃ ৫৬]।

এই আয়াত থেকে আমরা পরিষ্কারভাবে জানতে পারি, আল্লাহ মানুষ ও জ্বিন জাতিকে শুধু এবাদতের জন্যই সৃষ্টি করেছেন। এখন কথা হলো আমরা কি তাহলে কাজ ত্যাগ করে মসজিদ-মাদ্রাসায় শুধু তাছবিহ তাহলিল, জিকির ও নফল এবাদতে মেতে থাকব? না! আল্লাহপাক পবিত্র কুরআনেই আবার এরশাদ করছেন ‘এবং নামাজ শেষ হলেই তোমরা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড় এবং আল্লাহর অনুগ্রহ অন্বেষণ করো।’ [সূরা আল জুমা ১০]।

আসুন, এবার নজর দেয়া যাক যে বিশেষ দিনটিকে নিয়ে এ প্রবন্ধের অবতারণা। প্রতি বছর শাবান মাসের ১৫ তারিখটিকে বিশ্বের মুসলমান বিশেষ মর্যাদার সাথে পালন করেন। এই দিনটি আমাদের কাছে লায়লাতুল বারাআত বা শবে বারাআত নামে পরিচিত। এখানে শব অর্থ রাত আর বারাআত অর্থ নাজাত বা মুক্তি। অতএব শবে বারাআত অর্থ মুক্তির রাত।

রাসূলে পাক সাঃ এরশাদ করেন ‘যখন শাবান চাঁদের ১৫ তারিখ অর্থাৎ ১৪ তারিখ রাত আসবে তখন তোমরা‘শব বেদারি’ (রাত জাগরণ) করে আল্লাহর বন্দেগি করবে আর পরের দিনে রোজা রাখবে। কেননা, ওই রাতে সূর্যাস্তের পরক্ষণেই আল্লাহ রাব্বুল ইজ্জত সর্বনিু আসমানে অবতরণ করেন অর্থাৎ বান্দাদের অধিকতর নিকটবর্তী হন। আর (ডেকে ডেকে) বলে থাকেন ‘ক্ষমা প্রার্থনাকারী কেউ আছে কি, যাকে আমি ক্ষমা করব? রিজিক প্রার্থনাকারী কেউ আছে কি, যাকে আমি রিজকি দেব? বিপদগ্রস্ত কেউ আছে কি, যে বিপদ মুক্তির প্রার্থনা করে। আর আমি তার বিপদ উদ্ধার করে দেবো।’ এইভাবে শাবানের ১৪ তারিখ রাত সম্বন্ধে কিছু হাদিস পাওয়া যায়,কিন্তু অত্যন্ত রূঢ় হলেও সত্য যে এই রাতের সমর্থনে কুরআন ও হাদিসে স্পষ্ট কোনো নির্দেশ নেই। সপক্ষে যে হাদিসগুলো পাওয়া যায় তাও আবার দুর্বল হাদিসের শ্রেণীভুক্ত।

এর পরও বিশেষ রাত সম্বন্ধে হাদেসে বলা হয়েছে হজরত জাবির রাঃ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, ‘আমি রাসূলুল্লাহ সাঃকে এ কথা বলতে শুনেছি যে, নিশ্চয়ই রাতের ভেতর এমন একটি সময় আছে, যদি কোনো মুসলমান ওই সময়টিকে পায়, আর তখন দুনিয়া-আখেরাতের কল্যাণ থেকে কোনো কিছু প্রার্থনা করে, তাহলে অবশ্যই আল্লাহ তাকে তা দেন। আর এ সময়টি প্রতি রাতেই আসে। বিশেষ কোনো রাতের সাথে সংশ্লিষ্ট নয়।’ (মুসলিম)।

উপরিউক্ত হাদিস থেকে পরিষ্কার হলো যেকোনো বিশেষ রাতে আল্লাহর রহমত নাজিল হয় না, বরং প্রতিটি রাতেই আল্লাহর রহমত বান্দার জন্য নাজিল হয়। অতএব যারা প্রতিটি রাতে আল্লাহর রহমত পাওয়ার আশায় চেষ্টা সাধনা করবে তারাই সফলকাম হবে।

সামগ্রিক বিষয় বিবেচনা করে উপসংহারে বলা যায় যে, শাবান মাসটা আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অর্থাৎ এই মাসকে রমজানের প্রস্তুতি মাস হিসেবে ধরা যায়। নৈশ ইবাদতের ব্যাপারে তো আল্লাহপাক নিজেই ঘোষণা করেছেন ‘রাতের এক অংশে তুমি তাহাজ্জুদের নামাজ আদায় করো, এ হলো তোমার জন্য অতিরিক্ত। অচিরেই তোমার প্রতিপালক তোমাকে ‘মাকামে মাহমুদায়’ প্রেরণ করবেন’ (বনি ইসরাঈলঃ ৮০)।

অতএব শাবান মাসের রাতগুলোতে যদি আমরা ইবাদাত করি, নিশ্চয় অন্যায় হবে না। তবে স্মরণ রাখতে হবে যে, ভাগ্য উন্নয়ন এক রাতের ইবাদতে সম্ভব নয়। এ জন্য দিনের পর দিন নেক নিয়তে চেষ্ট- তদবিরের সাথে সাথে কায়মনবাক্যে আল্লাহর দরবারে ইবাদত করা উচিত। আল্লাহ আমাদের সবাইকে সৎ পথে থেকে সার্বিক ভাগ্য উন্নয়নের জন্য চেষ্টা করার তৌফিক দিন। আমিন।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: